নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় ব্র্যাক ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৮ আগস্ট ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী:
আরিফুল হক চৌধুরী এমপি, মন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এটিএম মাহবুবুল করিম, যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক, রেইজ প্রকল্প। ড. মো. আল–মামুনুল আনছারী, ডিআইজি (অপারেশনস্), এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, এপিবিএন হেডকোয়ার্টার্স। এটিএম আবু আসাদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। রাকিব আহমেদ তাওয়াব, স্কোয়াড্রন লিডার, উপপরিচালক (কিউএ অ্যান্ড আই), বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। শরিফুল ইসলাম হাসান, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক। নুরুল কাদের, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দূতাবাস । আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমই ফাউন্ডেশন। মো. বদরুল হক, প্রশাসক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)। জাহাঙ্গীর হোসেন, পরিচালক (দক্ষতামান ও পাঠ্যক্রম), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। আলী হায়দার চৌধুরী, সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)। মাহমুদুর রিফাত খান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প জাতীয় সমিতি।
মাহসিন হামুদা, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। হৃদয় চৌধুরী, লিবিয়া ফেরত বাংলাদেশি। তোফায়েল আহমেদ, কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত। মো. মোস্তাফিজুর রহমান সজল, জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
মাহবুবুর রহমান, লিবিয়া ফেরত বাংলাদেশি। লাবণ্য প্রজ্ঞা, শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আরিফুল হক চৌধুরী এমপি
মন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়
আমরা চাই বাংলাদেশ থেকে বৈধ ও দক্ষ অভিবাসন বাড়ুক। সাগরপথে বা অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া কমুক। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া অনলাইনে আনার পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দক্ষতা জরুরি বিষয়। কোনো দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা না থাকলে সেদেশে কর্মী পাঠানো যাবে না। যেমন দুবাই ৬ হাজার চালক নিচ্ছে। এ জন্য তাদের প্রতিনিধিরা এখানে এসে প্রশিক্ষণে সন্তুষ্ট হয়ে তারপরে যেন সরাসরি কর্মী নিয়োগ করেন—এই ব্যবস্থা করছি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণার সুযোগ থাকবে না।
বিদেশে যাঁরা আছেন তাঁরাও যেন সেবা পান, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। কেউ মারা গেলে তিনি বৈধ বা অবৈধ পথে যাক, বাংলাদেশের নাগরিক হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়েও আমরা সহায়তা দিচ্ছি। প্রবাসীদের জন্য কল্যাণ কার্ড চালুর কাজ চলছে, যাতে নানা ধরনের সেবা থাকবে।
বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণের বিষয়েও আমরা পরিকল্পনা করছি। কেউ দেশে এসে বেকার থাকলে তাঁকে কীভাবে আবার কাজে লাগানো যায়, সে জন্য তাঁর পেশা অনুযায়ী সরকার আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে চায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করলে আমরা সহায়তা করব এবং শুধু সহায়তা দিয়েই বসে থাকব না, মনিটরিংও করব, যাতে তিনি ব্যবসাটা করে টিকে থাকতে পারেন।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা শুধু সরকারের কাজ নয়; সমাজের প্রতিটি স্তরকে এই কাজে যুক্ত হতে হবে। গণমাধ্যম, মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় পর্যায়ের সবাইকে নিয়ে এই প্রচার আরও জোরদার করতে হবে।
শরিফুল ইসলাম হাসান
সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক
অভিবাসন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। বছরে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করতে যান। সব মিলিয়ে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি দেশের বাইরে থেকে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন, যার কারণে রাষ্ট্র এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতে সমস্যাও আছে অনেক।
আমাদের মানুষজন বিদেশে যেতে মরিয়া। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য বিশেষ করে দক্ষ হয়ে যাওয়ার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার, সেটা আমাদের নেই। আবার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক। সিলেট, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ বা যে জেলাগুলো থেকে মানুষ বেশি বিদেশ যান সেখানে কোনো এজেন্সি নেই। তথ্যসেবা সীমিত। তাঁদের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ তৈরি হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। দেশে-বিদেশের এই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এবং অদক্ষতার কারণে আমাদের দেশের কর্মীদের বিদেশ যেতে খরচ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, আয় তুলনামূলক কম। এই সংকটের সমাধান করতে হলে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের দিকে নজর দিতে হবে। দক্ষ করে লোকজনকে বিদেশে পাঠাতে হবে।
বিদেশে যেতে আমাদের বেপরোয়া চেষ্টার কারণে অনিয়মিত অভিবাসন আরেকটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার বিষয়টা। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদীসহ আট-দশটি জেলা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লোকজন মরিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ এই তালিকায় সারা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম। অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ভূমধ্যসাগরে, ট্রানজিট দেশগুলোতে। অনেকেই প্রথমে মিসর বা দুবাই হয়ে লিবিয়ায় যান। সেখানে তাঁদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কেউ ২৫ লাখ, কেউ ৩০ লাখ, আবার কেউ কেউ ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দেন। অথচ আমরা সবাই চাইলে সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা বন্ধ করা সম্ভব। এ জন্য ‘সমুদ্রপথে বিদেশ না’ স্লোগানে আমরা প্রচারণা শুরু করেছি। পুলিশ, মসজিদের ইমাম, ধর্মীয় নেতা, স্কুল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে; তাই সেখানেও আমরা আরও সক্রিয় হচ্ছি। তবে রাষ্ট্রকেও
এখানে উদ্যোগী হতে হবে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদেরও। কারণ, এই যে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া সবাইকে ফেলে সাগরপথে ইউরোপে যেতে বাংলাদেশ প্রথম—এটা দেশের জন্য লজ্জার।
নিরাপদ অভিবাসনের পাশাপাশি বিদেশফেরত মানুষের দিকেও নজর দিতে হবে। নানা কারণে একজন মানুষ বিদেশ থেকে ফিরে আসেন। আর আমাদের প্রবাসীরা যেখানে বেশি আছেন সেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নাগরিকত্ব দেবে না। ফলে লোকজন ফিরবেই। এ জন্য প্রস্তুতি দরকার। অনেক মানুষ কাজ না পেয়ে শূন্য হাতে ফেরেন। অনেকেই ২০ থেকে ২৫ বছর বিদেশে থাকলেও সঞ্চয় থাকে না। দেশে ফিরে কীভাবে নিজের দক্ষতা কাজে লাগাবেন, সেটিও তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না। আমরা চাই, যাওয়ার আগে যেমন নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত হবে, ফেরার পরও দেশে তাঁদের দক্ষতা ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ এবং বিদেশফেরত কর্মীদের পুনরেকত্রীকরণে কাজ করছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। তবে এই বিশাল লক্ষ্য কোনো একক মন্ত্রণালয়, ব্র্যাক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্য কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকার, আইওএম, আইএলওসহ সংশ্লিষ্ট সব দেশি-বিদেশি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করলেই অভিবাসন খাতে আরও বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
এটিএম মাহবুবুল করিম
যুগ্ম সচিব ও প্রকল্প পরিচালক, রেইজ প্রকল্প
রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৫৩ হাজার বিদেশফেরত ব্যক্তিকে পুনরেকত্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। ৩৫টি জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে আমরা সারা দেশে রেফারেল, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং দিচ্ছি। ব্র্যাক ও আইওএমসহ সাতটি এনজিও আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরও চার থেকে সাড়ে চার লাখ বিদেশফেরত ব্যক্তিকে এর আওতায় আনার জন্য ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু ফেরত আসার পর পুনরেকত্রীকরণ করলেই হবে না। অভিবাসনের পুরো চক্রকেই শুরু থেকে ঠিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে সমস্যার অনেকখানিই দূর করা সম্ভব—সঠিক নিয়ম ও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মী পাঠানো। বিদেশে গৃহকর্মে গেলেই যে দেশে যেমন কাজ করেন, সেখানেও তেমন হবে—বিষয়টি এমন নয়। ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ, স্থানীয় খাবার রান্না, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার—এসবের জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
আমাদের ডেটাবেজে ২ লাখের বেশি বিদেশফেরত ব্যক্তির তথ্য আছে। তাঁদের মধ্যে নারীও রয়েছেন। কিন্তু অনেক নারী পরিবার ও সমাজের কারণে পুনরেকত্রীকরণ সহায়তার আওতায় আসতে পারেন না। পরিবার তাঁদের বিদেশে পাঠালেও ফেরার পর সন্দেহ করে, মূল্যায়ন করে না। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সহায়তা দরকার। এ জন্য আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণের কথা ভাবছি, যাতে কোন বাড়িতে কখন কোন নারী ফিরেছেন, তা জানা যায় এবং তাঁকে যথাযথ সহায়তায় আনা যায়। নতুন প্রকল্পে নারীদের জন্য আলাদা তহবিল, মডিউল ও প্রশিক্ষণব্যবস্থাও থাকবে।
ড. মো. আল–মামুনুল আনছারী
ডিআইজি (অপারেশনস্), এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, এপিবিএন হেডকোয়ার্টার্স
নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণে পুলিশেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ২০১৩ সাল থেকে বিমানবন্দরে কাজ করছে। বর্তমানে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বিমান বাহিনী ও পুলিশের পাশাপাশি এপিবিএন, এসবির ইমিগ্রেশন পুলিশ ও মানব পাচারবিরোধী তদন্ত দল কাজ করছে। আমরা ইমিগ্রেশনে যাচাইয়ের সময় অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারি, ট্যুরিস্ট ভিসায় যাওয়া ব্যক্তি আসলে কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। তখন যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন হলে রিপোর্ট করি বা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করি। কারও বিরুদ্ধে মামলা থাকলে ডেটাবেজ যাচাই করেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মানব পাচারের শিকার বা বিদেশ থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের আমরা কাউন্সেলিং করি। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তাঁদের পুনর্বাসন ও পুনরেকত্রীকরণের চেষ্টা করি। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মামলা নিয়ে তদন্তও করি। প্রয়োজনে বিদেশে কর্মকর্তা পাঠিয়ে বা বিভিন্ন ব্যবস্থায় ইরান, লিবিয়া ও গ্রিস থেকে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে আনা হয়েছে। বিদেশে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও আমরা দেশে থাকা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করি।
আমাদের ভুলের কারণেও যেন নিরাপদ অভিবাসন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যাঁরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, তাঁদের বিদেশযাত্রা সহজ করতে স্বাস্থ্য, প্রশাসন, পুলিশ, পাসপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো এক জায়গায় এনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা জরুরি।
এ টি এম আবু আসাদ
অতিরিক্ত মহাপরিচালক, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর
নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাছে এমন ঘটনা আছে, যেখানে একজন ব্যক্তি বারবার নাম, জন্মতারিখসহ বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তন করে পাসপোর্ট নিয়েছেন। এতে বিদেশের দূতাবাস ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। ফলে কিছু মানুষকে সহজে পাসপোর্ট দিতে গিয়ে প্রকৃতভাবে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।
হাতের লেখা পাসপোর্টের সময় অনলাইন যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল না। পরে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনের তথ্য সব সময় অনলাইনে যাচাই করা যেত না। ফলে অনিয়মের সুযোগ ছিল। ২০২০ সালে ই–পাসপোর্ট চালুর পর আমরা অনেক বেশি নিরাপদ পদ্ধতিতে পাসপোর্ট দিচ্ছি।
এখন এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন যাচাই করে পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সেবার সময়ও কমেছে; সুপার এক্সপ্রেসে ২৪ ঘণ্টা বা দুই দিনের মধ্যেও পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।
ই–পাসপোর্টে ১০ আঙুলের ছাপ নেওয়ার কারণে এখন একই ব্যক্তি ভিন্ন পরিচয়ে পাসপোর্ট নিতে পারছেন না। কেউ অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে থাকলেও বৈধ তথ্য ও দলিল ছাড়া পাসপোর্ট দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।
দেশের ভেতরেও আমাদের কিছু সমস্যা আছে। অনলাইনে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। আবেদনকারীদের এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
রাকিব আহমেদ তাওয়াব
স্কোয়াড্রন লিডার, উপপরিচালক (কিউএ অ্যান্ড আই), বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ
বিদেশ থেকে ফেরত আসা প্রবাসী ব্যক্তিদের অনেকেই নানা পরিস্থিতি ও কষ্টের মধ্য দিয়ে দেশে ফেরেন। ফলে তাঁরা অনেক সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন। বিমানবন্দরে এসব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ, নিরুপদ্রব ও দক্ষ বিমান চলাচল সেবা নিশ্চিত করতে আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই লাগেজ কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভিডিও ছড়ায়। কিন্তু তদন্ত করে আমরা দেখেছি, ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো আমাদের বিমানবন্দর বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে নয়, যাত্রা শুরুর দেশের বিমানবন্দরে ঘটে।
ঠিক একইভাবে ইমিগ্রেশন ও বোর্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও আমরা নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করি। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বিএমইটি কার্ড, ভুয়া ভিসা বা অন্য ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে যাত্রী আসেন। ইমিগ্রেশন ও এয়ারলাইনসহ বিমানবন্দরে কাজ করা ২৪টি সংস্থা সমন্বিতভাবে এসব যাচাই করে। আমাদের চেষ্টা থাকে প্রকৃত যাত্রীকে সুযোগ দেওয়া ও অবৈধভাবে যাওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা।
বৈধ পথে গেলে প্রবাসীদের জন্য জবাবদিহি ও সহায়তার সুযোগ থাকে। বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কও ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করে। এখন বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তিদের লাগেজ র্যাপিংয়ের সুবিধাও কম খরচে দেওয়া হচ্ছে।
নুরুল কাদের
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়ন দুতাবাস
নিরাপদ অভিবাসনকে একটি ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে দেখে যদি অভিবাসী, সরকার, ব্যাংক, রিক্রুটিং এজেন্সিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা যায়, তবেই মঙ্গল। প্রতারণার শিকার হয়ে বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে মানুষের মানসিকতা ও সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ২০১৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে বাংলাদেশে বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে কাজ শুরু হয়। ব্র্যাক ও আইওএমের মাধ্যমে চলমান প্রকল্পগুলো মূলত একটি পাইলট উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে আমরা পুনরেকত্রীকরণের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগুলো পেয়েছি। এখন সরকার চাইলে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কর্মসূচিটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করতে পারে। ডেমো ও ওয়েলফেয়ার সেন্টারের মতো সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া যায়। পুনরেকত্রীকরণ খুবই জটিল ও বহুমাত্রিক কাজ। একে অভিবাসন চক্রের শেষ ধাপ নয়, পুরো অভিবাসনপ্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। আমরা জানি ঠিকমতো পরিচর্যা না করে গাছের কাছে ভালো ফলনের আশা করা যায় না। বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণের বিষয়টিও তেমন। তাই নিরাপদ অভিবাসনের শুরু থেকে ফেরত আসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। এই প্রক্রিয়াকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে হবে।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমই ফাউন্ডেশন
এসএমই ফাউন্ডেশনের কাজ হলো নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, অর্থায়নের সুযোগ তৈরি ও মূলধারায় তাঁদের সম্পৃক্ত করা। বিদেশফেরতদের অনেকেই দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। কেউ সফল হয়েছেন, কেউ সফল না হয়ে ফিরেছেন। দেশে ফিরে তাঁরা নানা সমস্যায় পড়ছেন। তাঁদের মধ্যে একধরনের ট্রমা কাজ করে, মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারছেন না, চাকরি বা ব্যবসার সুযোগও সহজে পাচ্ছেন না।
এ অবস্থায় আমরা তাঁদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করছি। প্রথম পর্যায়ে সচেতনতা ও মোটিভেশনাল কাজ করছি। আমরা তাঁদের বোঝাতে চাই বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও যোগ্যতা তাঁদের বড় সম্পদ। ভিন্ন দেশের আইনকানুন, প্রথা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করছি। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক সাক্ষরতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন ও বিএসটিআই সনদ এবং পণ্যের বাজার সম্পর্কে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের এই কাজ এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে।
মো. বদরুল হক
প্রশাসক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)
পুনঃএকত্রীকরণের ক্ষেত্রে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের পরিচয় ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের পাঠানো অর্থে কেবল পরিবার নয়, বরং দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধি লাভ করেছে, এ সত্যটি সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। তাঁদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও পুনরেকত্রীকরণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পাশাপাশি প্রবাসীদের পেশাভিত্তিক একটি দেশব্যাপী তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন। কল্যাণ কার্ড তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও বিশেষ পরিচিতি এনে দিতে পারে। দেশে ফেরার পর তাঁদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে। বিদেশে নারী শ্রমিকদের মর্মান্তিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। সরকার ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিচ্ছে। তবুও কেন এমন ভোগান্তির শিকার নারীদের হতে হয়, তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। সব রিক্রুটিং ব্যবসায়ী অসৎ নন, অনেক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি সঠিক নিয়মকানুন মেনেই প্রবাসীদের বিদেশে পাঠান। অন্যদিকে কিছু প্রতারক চক্র প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাল বিস্তার করে টাকা হাতিয়ে নেয়। সৎ রিক্রুটারদের সরকারিভাবে উৎসাহিত এবং প্রতারকদের দমন করতে হবে।
ড. জাহাঙ্গীর হোসেন
পরিচালক (দক্ষতামান ও পাঠ্যক্রম), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
নিরাপদ অভিবাসনের জন্য দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ কর্মী সচেতনও হন এবং তাঁর নিয়ম মেনে সঠিক পথে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে ভাষা ও সাংস্কৃতিক দক্ষতাও প্রয়োজন। আমাদের ইংরেজি, জাপানিজ ও আরবি ভাষায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে; কোরিয়ান, চাইনিজ ও ইতালিয়ান ভাষা নিয়েও কাজ চলছে।
পুনরেকত্রীকরণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও আগের দক্ষতার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতার সনদ থাকলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের সমঝোতার আওতায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণের সুযোগ তাঁদের জন্য রয়েছে। বিদেশফেরত ব্যক্তিদের আগের শেখার স্বীকৃতি বা আরপিএলের মাধ্যমে তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আপস্কিলিং ও রিস্কিলিংয়ের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরে থাকা কর্মীদের আরপিএলের আওতায় আনার কাজও শুরু হয়েছে। আমাদের বড় সমস্যা হলো গুণগত মান। প্রাতিষ্ঠানিক, প্রশিক্ষক ও মূল্যায়নকারীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ক্যারিয়ার গাইডেন্সও জরুরি, যাতে আগ্রহ ও উপযুক্ততা বুঝে প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়।
মো. জাহাঙ্গীর হোসেন
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল কার্যক্রম শুরু করে। আমাদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে অভিবাসন ও পুনরেকত্রীকরণের বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। কারণ, আমরা সহজ শর্তে অভিবাসন ঋণ দেওয়া, পুনর্বাসন ঋণ দেওয়া এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পন্থায় রেমিট্যান্স আনতে কাজ করছি।
২০১১-১২ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আমরা ২ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৯ জনকে অভিবাসন ঋণ দিয়েছি। এ বাবদ ঋণ দেওয়া হয়েছে ৩৮৪ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি বিদেশফেরতদের জন্য বিভিন্ন ধরনের পুনর্বাসন ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে পুনর্বাসন ঋণ, নারী পুনর্বাসন ঋণ, বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ, কোভিডের সময় বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ এবং আত্মকর্মসংস্থান ঋণ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীরা তাঁদের পরিবারের মাধ্যমে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে তাঁদের জন্যও ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক পুনর্বাসন ও বৃহৎ পরিবার ঋণও দেওয়া হয়। এসব পুনর্বাসন ঋণের আওতায় আমরা ২৪ হাজার ৯৭১ জনকে ৭০২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণে ঋণসহায়তার মাধ্যমে এটাই আমাদের কার্যক্রম।
আলী হায়দার চৌধুরী
সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)
নিরাপদ অভিবাসনকে আমি একমুখী যাত্রা হিসেবে দেখি না। কর্মী পাঠানোর জায়গা থেকে গ্রহণকারী দেশ পর্যন্ত তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নিরাপদ অভিবাসন। এখানে শুধু নৈতিক নিয়োগ হলেই হবে না, গন্তব্য দেশে চুক্তি অনুযায়ী বেতন, থাকার ব্যবস্থা ও চিকিৎসার সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে জেনেবুঝে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। পাসপোর্ট, মেডিক্যাল, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, দূতাবাস ও বিএমইটির ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স—পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা দরকার। এগুলো ওয়ান-স্টপ সার্ভিসে আনা গেলে শ্রমিকের ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে তথ্যকেন্দ্রগুলো শক্তিশালী করতে হবে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা ও কাজের সঠিক তথ্য উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানো গেলে দালালের ওপর নির্ভরতা কমবে।
আমাদের একটি সমন্বিত নীতি দরকার—কী করব, কী করব না, তা স্পষ্ট করতে হবে। অভিবাসন আইনকে আরও কর্মীবান্ধব ও শিল্পবান্ধব করতে হবে। কর্মীর অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সি—দুই পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
মাহসিন হামুদা
ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)
যাঁরা কাজের সন্ধানে বিদেশে যান, তাঁদের একসময় দেশে ফিরতেই হয়। তাই দেশে ফেরার পর তাঁদের পুনঃএকত্রীকরণের দায়িত্ব নেওয়া আমাদের কর্তব্য। তবে এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। পুনঃএকত্রীকরণ সহায়তাগুলো সাধারণত প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষে তা বন্ধ হয়ে যায়। তাই এই সহায়তা কার্যক্রমকে টেকসই করতে একে সরাসরি রাজস্ব বাজেটের আওতাভুক্ত করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি সরকার প্রত্যাগত অভিবাসী কর্মী পুনঃএকত্রীকরণ নীতি প্রণয়ন করেছে। আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ঋণ দিলেও সচেতনতার অভাবে অনেকেই তা জানেন না। এ ছাড়া এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, বিদেশফেরত ৯৪ শতাংশ কর্মীই দেশে ফিরে উদ্যোক্তা হতে চান। কিন্তু জটিল প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলার কারণে তাঁরা সহজে ঋণ পান না। এই সমস্যা সমাধানে বর্তমানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র তিনটি কাগজ জমা দিয়ে ৭ শতাংশ সুদে সারা দেশে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হৃদয় চৌধুরী
লিবিয়াফেরত বাংলাদেশি
আমি দেশে থাকাকালে কয়েকজন বন্ধু লিবিয়ায় গিয়েছিল। তারা জানিয়েছিল, সেখানে গেলে কাজের সুযোগ মিলবে। পরে চাইলে গ্রিস বা ইতালিতেও যাওয়া যাবে। এই কথা শুনে এক দালালের সাহায্যে আমি লিবিয়া পাড়ি দিই। আমার দালাল এখনো লিবিয়ায় আছে। আমাদের দুজনের বাড়ি একই অঞ্চলে, সিলেটের হবিগঞ্জে। পরিচিত হওয়ায় দালালের কথা বিশ্বাস করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার সাংঘাতিক ঝুঁকি নিয়েছিলাম। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর একটি কোম্পানিতে টানা দুই মাস কাজ করি। এরপর তারা আমাকে বেনগাজিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে গ্রিসে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠি। প্রায় ১৪ ঘণ্টা নৌকায় থাকার পর কোস্টগার্ড আমাদের আটক করে লিবিয়ায় ফেরত পাঠায়। সেখানে তুবরুকের একটি জেলে আমাকে বন্দী হিসেবে রাখা হয়। অবশেষে দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনোমতে সেই কারাগার থেকে মুক্তি পাই। ইউরোপের স্বপ্নে বিপুল টাকা খরচ হওয়া সত্ত্বেও আমাকে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ
কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত
সৌদি আরব যাওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছিলাম। কিন্তু এক বন্ধুর প্ররোচনায় দুই দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় যাই। আমি বিএমইটির স্মার্ট কার্ড নিয়েই গিয়েছিলাম। কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে একটি রেস্টুরেন্টে আমাকে তিন দিন রাখা হয়। এরপর গভীর রাতে স্ক্যাম সেন্টারে ইন্টারভিউ দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন বুঝতে পারি, এটি একটি স্ক্যাম সেন্টার। যাঁদের মাধ্যমে গিয়েছিলাম, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা আমাকে বলেন, সেখানে আমাকে এ কাজই করতে হবে ও পরে ইউরোপের একটি দেশে পাঠানো হবে। আমাকে স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রায় এক মাস ২৭ দিন সেখানে আটক থাকার পর পালাতে সক্ষম হই। আমাকে এক বছরের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটও দেওয়া হয়নি। এক মাসের সিঙ্গেল-এন্ট্রি ভিসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমি অবৈধ হয়ে পড়ি। পরে পুলিশ অভিযান শুরু করলে ফেসবুকে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরার আবেদন করি। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর গত ১৪ জুন দেশে ফিরি।
সুপারিশ
১. সারা দেশে তৃণমূলপর্যায়ে অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
২. অসাধু দালাল চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. সমুদ্রপথে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে।
৪. লিবিয়া ও অন্য দেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক পাচারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. বিদেশ যাওয়ার আগে কর্মীর দক্ষতা, ভাষা ও গন্তব্য দেশের কাজের পরিবেশ অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. জেলাপর্যায়ে রিক্রুটিং এজেন্সির সেবা বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. অভিবাসন খরচ কমিয়ে আনতে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের সীমা কার্যকর করা।
৮. ফেরত আসা কর্মীদের জন্য বিশেষত নারী বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা বাড়াতে হবে।
৯. পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে টেকসই করা প্রয়োজন।
১০. অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।