নকল ও নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট অয়েল: ঝুঁকিতে ইঞ্জিন, অর্থনীতি ও পরিবেশ
গত মঙ্গলবার প্রথম আলো ও মোবিলের (এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি) যৌথ উদ্যোগে ‘নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের প্রভাব, ঝুঁকিতে ইঞ্জিন অর্থনীতি পরিবেশ’ শীর্ষক বিশেষ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য ও নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে দেশে ৩০ শতাংশ অনুমোদনহীন, নকল ও নিম্নমানের ভেজাল লুব্রিকেন্ট অয়েলের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। পাশাপাশি তাঁরা সমাধানের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ করেন। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রথম আলোর বিজনেস সাপ্লিমেন্ট প্রধান শামসুল হক মো. মিরাজ।
যন্ত্র ও অর্থনীতি রক্ষায় লুব্রিকেন্ট খাতে সমন্বয় প্রয়োজন
ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া
সদস্য, পেট্রোলিয়াম বিভাগ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)
বাজারে নিম্নমানের ও ভেজাল ইঞ্জিন অয়েলের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতির কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। মানহীন লুব্রিকেন্ট ব্যবহারের ফলে যানবাহন এবং শিল্পকারখানার দামি ও স্পর্শকাতর মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি খুব দ্রুত বিকল হয়ে পড়ে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের যেমন বড় অঙ্কের মেরামত খরচ গুনতে হচ্ছে, তেমনি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়ে পুরো জাতীয় অর্থনীতিতেই নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
নিম্নমানের তেল ইঞ্জিনের ঘর্ষণ বাড়ায় এবং তাপীয় ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে ইঞ্জিনের মূল কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং অতিরিক্ত জ্বালানি অপচয় হয়। জ্বালানি দক্ষতা কমে যাওয়ায় একদিকে যেমন ব্যবহারকারীর পকেটের টাকা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গমনের মাধ্যমে পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এই সংকট কাটিয়ে উঠতে রেগুলেটরি কাঠামোর দুর্বলতা দূর করতে হবে। পেট্রোলিয়াম ও লুব্রিকেন্ট খাতে পূর্ণ শৃঙ্খলা ফেরাতে বিইআরসিসহ সরকারের অন্যান্য তদারকি সংস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ঘটাতে হবে। সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক মানদণ্ড নির্ধারণ এবং কঠোর নীতিমালা নিশ্চিত করতে না পারলে এই ভেজাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
যথাযথ মান প্রণয়ন ও মোবাইল কোর্ট জোরদার করা হচ্ছে
কাজী ইমদাদুল হক
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।
আশির দশকের পুরোনো মান বাতিল করে বিএসটিআই ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ‘বিডিএস ২০২৯’ মানদণ্ড প্রণয়ন করছে। এই মান অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের ৬৩টি কোম্পানির মান আমরা পরীক্ষা করছি। এ ছাড়া গত এক বছরে ১ হাজার ৩৪৩টি আমদানি চালন পরীক্ষা করা হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের মাঠপর্যায়ের অভিযান অব্যাহত আছে। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকার আটটি স্পটে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছিল বিএসটিআইয়ের টিম। দুর্ভাগ্যবশত আটটি স্পটের প্রতিটি স্থানেই নকল ও ভেজাল তেলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মামলা করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় বাজারে ভেজালের মাত্রা কতটা ভয়াবহ।
অসাধু ভেজালকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে বিএসটিআই মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যাতে জরিমানা ও কারাদণ্ডের মাত্রা আরও বাড়ানো যায়। পাশাপাশি বায়ুদূষণ কমাতে দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলে সালফারের মাত্রা ১০ পিপিএমে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বিএসটিআই। আগামী দিনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে লুব্রিকেন্ট খাতকে ভেজালমুক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে নজরদারি ও যৌথ অভিযান হবে
মো. জহিরুল ইসলাম
মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি)
ভেজাল ও নকল লুব্রিকেন্ট অয়েলের বিরুদ্ধে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভেজাল তেলের কারবারিরা দেশের সাধারণ ভোক্তাদের সরাসরি প্রতারিত করছে এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা ভোক্তা অধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অধিদপ্তর শুধু সাধারণ খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে ক্ষান্ত হবে না। লুব্রিকেন্টের আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে উৎপাদনকারী কারখানা, ডিস্ট্রিবিউটর বা পাইকারি বাজার এবং সর্বশেষ খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো ‘সাপ্লাই চেইন’ কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। খুচরা দোকানে আসল তেলের চেয়ে নকল তেলে কেন ২০০ টাকা অতিরিক্ত লাভ থাকে—সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অসাধু লাভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আগামী দিনে বিএসটিআই, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ অভিযান জোরদার করা হবে। যারা নকল বোতলে নামী ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে ভেজাল তেল বিক্রি করছে, সেই অসাধু সিন্ডিকেটের মূল উৎসে আঘাত হানা হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে সচেতনতা বৃদ্ধি ও বৈধ লুব্রিকেন্ট খাতকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা থাকবে।
আশির দশকের মানদণ্ড বাতিল করে উৎসে অভিযান চালাতে হবে
মো. মুকুল হোসেন
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসি
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ও দেশের সড়কেও আধুনিক প্রযুক্তির ইঞ্জিন ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে মান নিয়ন্ত্রণের নীতিমালায় এখনো আশির দশকের পুরোনো মানের লুব্রিকেন্টের অনুমোদন রয়ে গেছে, যা বিশ্ববাজার থেকে অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে।
এখন বাজারের লুব্রিকেন্টের ৫২ থেকে ৬০ শতাংশই পুরোনো মানদণ্ডের। এর সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল তৈরি করছে। কেবল রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশেই ৩০ থেকে ৪০টি অবৈধ কারখানা সক্রিয় রয়েছে। এসব কারখানায় বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত পোড়া তেল কেমিক্যাল ও ডাই মিশিয়ে পরিষ্কার করে নামীদামি ব্র্যান্ডের নকল বোতলে ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে।
বাজারে আসল তেলের চেয়ে নকল তেলে খুচরা বিক্রেতাদের লাভের পরিমাণ ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি হওয়ায় অসাধু দোকানদারেরা এটি বিক্রি করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এতে আসল ও বৈধ ব্র্যান্ডগুলো চরম অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। খুচরা দোকানে ছোটখাটো অভিযান চালানোর চেয়ে অবৈধ উৎপাদনের মূল উৎসে অভিযান চালিয়ে কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় অকালমৃত্যু বাড়ছে
মুহাম্মদ সোলাইমান হায়দার
অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর
ভেজাল ও নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বায়ুদূষণ বাড়ছে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বায়ুদূষণের অন্তত ৩০ শতাংশ সরাসরি আসে যানবাহনের ত্রুটিপূর্ণ নির্গমন বা বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে।
ইঞ্জিনে মানহীন লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করলে তা পূর্ণাঙ্গভাবে দাহ্য হয় না এবং ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলে নির্গত ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে মারাত্মক ক্ষতিকর ফাইন পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম ২.৫), অত্যন্ত বিষাক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং সালফার অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এসব ক্ষুদ্র কণা মানুষের শ্বাসনালি দিয়ে সহজেই ফুসফুস ও রক্তে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার ও হৃদ্রোগের কারণ হচ্ছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যানবাহনের ধোঁয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। কেবল ফিটনেস সনদ দিয়ে এটি বন্ধ করা যাবে না, ইঞ্জিনে কী মানের তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা–ও নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং বিএসটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার পাশাপাশি ও কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা দরকার।
পোড়া তেলে ধ্বংস হচ্ছে মাটির প্রাণ ও জলজ জীবন
ড. রাওশন মমতাজ
অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
লুব্রিকেন্টের অপব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করছে। মানহীন লুব্রিকেন্টের ব্যবহার শুধু ইঞ্জিন নষ্ট বা বায়ুদূষণেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মাটি ও পানি ইকোসিস্টেমের জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনছে।
দেশে বাস-ট্রাক, মোটরসাইকেলের পাশাপাশি কৃষি খাতে সেচপাম্প ও ট্রাক্টরে প্রচুর লুব্রিকেন্ট ব্যবহৃত হয়; কিন্তু কাজ শেষে গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ ও কৃষিজমি থেকে এই ব্যবহৃত পোড়া তেল সরাসরি মাটিতে ও ড্রেন-নালায় ফেলে দেওয়া হয়। বিষাক্ত কেমিক্যালসমৃদ্ধ এই তেল মাটিতে মিশে মাটির প্রাকৃতিকভাবে উর্বর রাখা কেঁচো এবং উপকারী অণুজীবগুলোকে মেরে ফেলে, যার ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বৃষ্টির পানিতে ধোয়ে এই পোড়া তেল যখন নদীনালা ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে, তখন পানির উপরিভাগে তেলের একটি পাতলা আস্তরণ তৈরি হয়। এই আস্তরণ বায়ুমণ্ডল থেকে পানিতে অক্সিজেন প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেয়, ফলে জলজ প্রাণী ও মাছ অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়। উৎসে কেমিক্যালের মান নিয়ন্ত্রণ, ব্যবহৃত পোড়া তেল যত্রতত্র ফেলা নিষিদ্ধ করা এবং তা পুনর্ব্যবহারের পরিবেশবান্ধব নীতিমালা করা উচিত।
বন্দরে কড়াকড়ি ও দ্রুত টাস্কফোর্স অভিযান প্রয়োজন
এ এইচ এম সফিকুল জামান
সভাপতি, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
দেশের কোটি কোটি সাধারণ ভোক্তা না বুঝে নিম্নমানের ও নকল ইঞ্জিন অয়েল কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। এতে তাঁদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাহন বিকল হয়ে নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাতিলকৃত বা অত্যন্ত নিম্নমানের রিফাইন্ড তেল কম দামে বাংলাদেশে আমদানি বা ডাম্পিং করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডাম্প হওয়া এই তেল কাস্টমসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দেশে ঢোকানো হয়। তাই এই অনিয়ম বন্ধ করতে কাস্টমস এবং চট্টগ্রাম বন্দরে পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার ও কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে।
এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে তিনটি মূল প্রস্তাব দিচ্ছি। প্রথমত, দেশে কিউআর কোড স্ক্যানিং আইন দ্রুত প্রয়োগ করা, যাতে গ্রাহকেরা কোনটা আসল তেল তা যাচাই করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অসাধু প্রস্তুতকারকদের ডেরায় সরাসরি ঝটিকা যৌথ অভিযান চালানো। এবং তৃতীয়ত, সস্তা তেলের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা।
মানহীন তেলে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকার গাড়ি
আবদুল হক
সভাপতি, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ট্র্যাকার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা)
আমদানীকৃত লাখ লাখ টাকা মূল্যের পুনঃবায়নকৃত (রিকন্ডিশন) যানবাহনগুলো ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের কারণে অকালেই বিকল হয়ে পড়ছে। একজন গ্রাহক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা বা তারও বেশি ব্যয় করে একটি গাড়ি কেনেন। কিন্তু সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে বা না বুঝে বাজার থেকে নকল ও সস্তা লুব্রিকেন্ট কিনে ব্যবহার করার ফলে মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক মাসের মধ্যেই সেই নতুন গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যানবাহন যদি সঠিকভাবে মেইনটেন্যান্স করা যায় এবং সঠিক মানের তেল ব্যবহার করা হয়, তবে একটি গাড়ি দীর্ঘদিন সচল থাকে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে। কিন্তু ভেজাল তেলের কারণে গাড়ি অকেজো হয়ে নতুন যন্ত্রাংশ বারবার আমদানি করতে হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কঠোর প্রশাসনিক কাঠামো জোরদার করা উচিত। লুব্রিকেন্ট বিক্রির খুচরা দোকান এবং অটোমোবাইল মেকানিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। কে কোত্থেকে তেল কিনছে এবং গাড়িতে কী তেল ঢালছে—তার নজরদারি ব্যবস্থা না থাকলে দেশের বৈধ ও আসল তেলের ব্যবসা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
৫১ লাখ বাইকার নকল লুব্রিকেন্টের শিকার
শুভ্র সেন
প্রতিষ্ঠাতা, বাইকবিডি
দেশে মোটরসাইকেলচালকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষায় নকল ইঞ্জিন অয়েল একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৫১ লাখ মোটরসাইকেল চলাচল করে। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাঁরা প্রতিদিনের যাতায়াত বা রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বাজারে ছড়িয়ে থাকা সস্তা ও নকল তেলের প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছেন এই চালকেরাই।
সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণে একটি মোটরসাইকেল ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সচল ও নিরাপদ থাকে। ভেজাল ইঞ্জিন অয়েলের কারণে মাত্র ৭ থেকে ৮ বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চালকদের বারবার মেকানিকের সেবা এবং নতুন ইঞ্জিন বা যন্ত্রাংশ কিনতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
এই সংকট সমাধানে সঠিক তথ্য ও রক্ষণাবেক্ষণ নজরদারিতে আনতে কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরোনো ও ব্যবহৃত খালি লুব্রিকেন্টের বোতল যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কুড়িয়ে নিয়ে আবার ভেজাল তেল ভরে বিক্রি করতে না পারে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পোড়া তেল প্রক্রিয়া করার স্পষ্ট রূপান্তর নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
মানহীন তেলে ওভারহিটিং ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি
মো. ছালেহ উদ্দিন
উপপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
ভেজাল ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহারের ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সড়ক ও শিল্পকারখানার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েলের পিচ্ছিল করার (লুব্রিকেশন) ক্ষমতা অত্যন্ত কম থাকে। ফলে চলমান ইঞ্জিনের ভেতরে ধাতব যন্ত্রাংশগুলোর মধ্যে চরম ঘর্ষণ ও অতিরিক্ত তাপ বা ‘ওভারহিটিং’ তৈরি হয়।
চলন্ত অবস্থায় বা কারখানা চালু থাকা অবস্থায় এই ওভারহিটিং থেকে ইঞ্জিনে হঠাৎ করে আগুন ধরে যেতে পারে। সম্প্রতি সড়ক ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, তার একটি অন্যতম পরোক্ষ কারণ হতে পারে এই ভেজাল ও সস্তা তেলের ব্যবহার।
প্রতিটি শিল্পকারখানা ও পরিবহনমালিকের উচিত ব্যবসার নিরাপত্তার স্বার্থেই ফায়ার সেফটি ও আন্তর্জাতিক মানের লুব্রিকেন্ট নিশ্চিত করা। শুধু সস্তা বা কম দামের কথা চিন্তা করে তেল কেনা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মেকানিক ও ওয়ার্কশপগুলোকে সেফটি লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনতে হবে। মানসম্মত পণ্য ব্যবহারের এই সচেতনতামূলক বার্তাটি গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে স্বমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
তৈরি হচ্ছে জাতীয় লুব্রিকেন্ট নীতিমালা
মেহেদী হাসান
উপপরিচালক, হাইড্রোকার্বন ইউনিট, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ
দেশের জ্বালানি খাতের সার্বিক সুরক্ষায় সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত জাতীয় লুব্রিকেন্ট নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৬১.৮৭ শতাংশই খরচ হয় পরিবহন খাতে। এই খাতে দুর্ঘটনাও বেশি হচ্ছে।
এই পরিবহন খাতে যদি ভেজাল বা নিম্নমানের ইঞ্জিন অয়েল ব্যবহার করা হয়, তবে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও কম্বিনেশন দক্ষতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। ফলে ইঞ্জিনে ১৫ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত জ্বালানি প্রয়োজন হয়। এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানির অপচয় দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে এবং এতে সরকারের বড় রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
এই সংকট নিরসনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতিমধ্যে একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী ‘জাতীয় লুব্রিকেন্ট নীতিমালা’ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এই নতুন নীতিমালায় লুব্রিকেন্ট আমদানি, স্থানীয় প্রস্তুতপ্রণালি, বিএসটিআই স্ট্যান্ডার্ড এবং ব্যবহৃত পোড়া তেলের রিসাইক্লিং সম্পর্কিত কঠোর নিয়মাবলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে বাজারে ভেজাল তেলের উপস্থিতি অনেকাংশে কমে আসবে। অবৈধ ব্যবসা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।