গোলটেবিল বৈঠক
ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেই প্রস্তুতি
যেকোনো সময় দেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে শুধু ঢাকা শহরেই প্রাণহানি হতে পারে ৫০ হাজার মানুষের।
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। ঐতিহাসিক তথ্য বিবেচনায় নিলে যেকোনো সময় বাংলাদেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই। এমন অবস্থায় বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানিরও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মানুষের জীবন রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি নতুন ভবন নিয়মনীতি মেনে নির্মাণ এবং পুরোনো ভবনগুলো সংস্কারের মাধ্যমে দৃঢ় করাও পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল শনিবার প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ভূমিকম্প নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে প্রথম আলো ও জিপিএইচ ইস্পাত।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে পাঁচটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশে যেকোনো সময় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ জন্য আমাদের প্রস্তুতি প্রয়োজন।’ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও স্থাপত্য, পরিকল্পনা ও পুরকৌশল বিভাগ থেকে পাস করা সদ্য স্নাতকদের ভূমিকম্পসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। এ ছাড়া ঢাকা শহরের ভবনগুলো ভূমিকম্প-সহনীয়ভাবে নির্মাণ ও নির্মিত ভবন কতটা ভূমিকল্প-সহনীয়, তা জানার জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থার পরামর্শ দেন তিনি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সভাপতি নুরুল হুদা বলেন, ‘ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি আমাদের নেই। ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সরকারকে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে, পেশাজীবীদেরও যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে সঠিক সমন্বয়ের প্রতি জোর দিয়ে তিনি বলেন, রাজউকের আওতাধীন ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করে, এগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য একটি মহানগর সরকার করা যেতে পারে, এখানে একজন মন্ত্রী থাকবেন। যার দায়িত্ব হবে এই ৫০-এর অধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন ও বিধিমালার সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো নিরসন করা। এ ছাড়া নতুন প্রতিটি ভবন যাতে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)’ অনুযায়ী নির্মিত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে এবং বিএনবিসি না মেনে নির্মাণ করা পুরোনো ভবনগুলো ভেঙে ফেলতে হবে।
২০১০ সালে হাইতি ও চিলিতে ভূমিকম্পে প্রাণহানির তথ্য তুলে ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল-পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার এবং চিলিতে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরও চিলিতে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, চিলিতে ষাটের দশকে ভূমিকম্পের পর ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে এই কোড মেনেই সব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, এ জন্যই ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। বাংলাদেশেও বিল্ডিং কোড তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই।
বিল্ডিং কোড প্রয়োগ করতে পারলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে উল্লেখ করে অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, বিল্ডিং কোডের পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত সব আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক দিলারা জাহিদ বলেন, ‘২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে বলে বলা হচ্ছে, কিন্তু ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন নির্মাণ করতে না পারলে সব উন্নয়নই শেষ হয়ে যাবে।’ ধীরে চলো নীতির পরিবর্তে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করতে হবে যে আমরা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে আছি। এই আতঙ্কের মধ্যে থেকেই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চের (সিএইচবিআর) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক বলেন, ঝুঁকি হ্রাসে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে দুর্যোগকালে সেটি ১০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচাবে। ভবন নির্মাণে পোড়ামাটির ইট ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করলে ভবনের ওজন বাড়ে, এতে ভবনে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা আরও বাড়ে। ইটের পরিবর্তে তিনি ব্লক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
ঢাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এবং ওই সময় উদ্ধারকাজ যথাযথভাবে না করা গেলে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, ‘আমরা স্মার্ট, ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি; কিন্তু এখনো ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়াসংক্রান্ত প্রযুক্তি স্থাপন করতে পারিনি। এখন ভূমিকম্প-সহনীয় নগর গড়ার কাজ শুরু করে দিতে হবে।’ ভবন যাতে ভূমিকম্প-সহনীয় হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের (যার যে দায়িত্ব) সঠিক দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তুরস্কে পেশাগত নীতিনৈতিকতা মেনে যেসব প্রকৌশলী ও ডেভেলপার ভবন নির্মাণ করেছিলেন, সেখানে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে, আমাদেরও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পেশাগত নীতিনৈতিকতা কঠোরভাবে মানতে হবে।’
জিপিএইচ ইস্পাতের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আবু সাঈদ মো. মাসুদ পদ্মা সেতু, পদ্মা রেলসেতুর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বড় অবকাঠামোগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় করে নির্মাণ করা হচ্ছে, তাহলে ছোট অবকাঠামোগুলো (ভবন) কেন ভূমিকম্প-সহনীয় করে নির্মাণ করতে পারব না?’ ভবনের চেয়ে মানুষের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাঝে এই বোধোদয় হতে হবে যে ভবনের ক্ষয়ক্ষতি হলে কিছু আসে যায় না, মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। আর জীবন বাঁচানোর জন্য যা যা করার প্রয়োজন, তা আমাদের করতে হবে।’
শুধু ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে নয়, বছরব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়ার ওপর জোর দেন প্রথম আলোর ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্রোগ্রামের সমন্বয়ক মুনির হাসান।
আলোচনায় সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। সূচনা বক্তব্যে তিনি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সঠিক নগর-পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরায়ণ, নিয়মনীতি মেনে ও টেকসই নির্মাণসামগ্রীর মাধ্যমে ভবন নির্মাণ এবং দুর্যোগকালে দেশের ডিজিটাল অগ্রগতিগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রতি জোর দেন।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।