আলোচনা

আব্দুল কাইয়ুম

সবাইকে স্বাগত জানাই। আমরা চাই, বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসুক। তাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ হবে। সারা বিশ্বেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করতে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের শ্রমিকেরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছেন। কীভাবে তাঁরা সহজে ডিজিটাল মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে পাঠাতে পারেন, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

শওকত হোসেন

ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৪ সালে অভিবাসন আইন পাসের মাধ্যমে উপমহাদেশ থেকে আইনসিদ্ধভাবে মানুষকে সেখানে কাজ করার সুযোগ দেয়। তবে আমরা বাংলাদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স আয় বা শ্রমিক অভিবাসনের কথা বলি, তা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক। মূলত তখন শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা ছিল অনানুষ্ঠানিক। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ নিয়ে গেলেও সেখানে সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। ১৯৭৬ সালে জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরো প্রতিষ্ঠার ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। এর পর থেকেই মূলত প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়।

প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) যে আমাদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ, করোনা মহামারিতে সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পেরেছেন। করোনার সময় প্রবাসী আয় বাড়ায় আমাদের যে সুবিধা হয়েছে, তা সবার জানা। মোটাদাগে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চারটি উৎসের মধ্যে প্রবাসী আয় আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রিজার্ভ কমে আসার কারণে আমাদের ভরসা এখন প্রবাসী আয়েই।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী আয় আসা শুরু হলেও সে সময় হুন্ডি অনেক বড় একটি সমস্যা ছিল। কারণ, দেশে পাঠানো প্রবাসীদের আয় ব্যাংক কত দিনে পৌঁছে দেবে, সে-সংক্রান্ত কোনো নিয়মনীতি অনেক দিন ছিল না। ড. ফরাসউদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার পর এ-সংক্রান্ত একটি নিয়ম করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলো অনুধাবন করল, প্রবাসী আয় দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। এতে হুন্ডি কমেছে। হুন্ডি আদৌ কমেছি কি না, তা অবশ্য গবেষণার বিষয়! বরং হুন্ডির নতুন নতুন ধরন বা পদ্ধতি বের হয়েছে।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খুব জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে সহজে পাঠানোর পদ্ধতি, বৈধ কাগজপত্র থাকা, উপকারভোগীর কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া ও বিনিময় হার। রেমিট্যান্স-যোদ্ধাদের প্রতি বিমানবন্দরে যে আচরণ করা হয়, তারপরও তাঁরা বেশি খরচে বৈধভাবে টাকা পাঠাবেন, এটি ভাবার কারণ নেই। প্রথমত তাঁদের দেশে কাজ দিতে পারিনি বলে বাইরে পাঠিয়েছি। তারপর তাঁদের প্রতি আমাদের আচরণও ঠিক নেই। তাহলে তাঁদের কাছে আমি কীভাবে দেশপ্রেম আশা করব!

বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা মানেই এত দিন আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার কথাই বেশি আলোচনা করেছি। এখন এই খাতে উদয় হয়েছে এমএফএস বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস। এমনিতেই মানুষের দোরগোড়ায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে এমএফএস বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস। এখন তারা দোরগোড়ায় রেমিট্যান্সও পৌঁছে দিচ্ছে। এতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসছে।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমে সম্ভাবনা যেমন আছে, ঝুঁকিও কিন্তু আছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি প্রবাসে গেলেও প্রবাসী আয় কমেছে। এর কারণ হচ্ছে, মানুষ অবৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে হুন্ডি বন্ধ হবে না। কয়েক শ বছর ধরে হুন্ডি টিকে আছে। যত দিন চাহিদা থাকবে, তত দিন হুন্ডি হবে। এটি অর্থনৈতিক বিষয়, অর্থনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে। এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হন। এ জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। তাঁরা যেকোনো জায়গায় বসে যাতে তাৎক্ষণিক রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে। সেসব সুবিধার কারণে প্রবাসীরা হুন্ডির আশ্রয় নেন, এমএফএস মাধ্যমে বৈধভাবেই সেসব সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এ সুবিধা কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

শেখ মো. মনিরুল ইসলাম

এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত। নীতিমালা অনুযায়ী এমএফএসের সব লেনদেন বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে হয়ে থাকে। সুতরাং এমএফএসের মাধ্যমে মুদ্রার বহির্গমনের কোনো সুযোগ নেই। সম্প্রতি এমএফএসের কিছু এজেন্ট নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ‘লাস্ট মাইল সলিউশনস’ হিসেবে প্রবাসী আয়ের অর্থ প্রাপকের এমএফএস অ্যাকাউন্টে ক্যাশ ইন করেছে, এমন বেশ কিছু এজেন্টের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে পাঠিয়েছে। পরে সিআইডি অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে। ট্রানজেকশন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বিকাশসহ অন্যান্য এমএফএস অভিযুক্ত এজেন্টদের তালিকা বাতিল করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও বাতিল করবে। তবে শুধু এজেন্ট বাতিল করে হুন্ডি বন্ধ করার সম্ভাবনা কম। পর্যাপ্ত বিনিময় হার ও বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর সুবিধাগুলো প্রবাসীদের ঠিকভাবে বলা ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় পাঠানোর সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ানো সহজ হবে।

উল্লেখ্য, বৈধ পথে এমএফএসের মাধ্যমে প্রবাসী আয় দেশে আসার প্রবৃদ্ধিও আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে ১৩ থেকে ১৪ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি বৈধ পথে দৈনিক গড়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা সমপরিমাণের প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন বিকাশের গ্রাহকদের কাছে। ২০২১ সালে ব্যাংকে আসা ২৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২২ সালে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ২৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণের টাকা গ্রাহকেরা বিকাশের মাধ্যমে পেয়েছেন। ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটির বেশি কর্মজীবী মানুষ বিদেশে আছেন। এর মধ্যে বড়সংখ্যক আছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ৭০টির বেশি দেশ থেকে বিকাশে প্রবাসী আয় আসে। এর মধ্য থেকে বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে। তৃতীয় অবস্থানে আছে সৌদি আরব, দশম স্থানে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার অবস্থান ১১তম। ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে প্রবাসী আয় ডিজিটাল পথে বেশি আসছে, কারণ সেখানকার প্রবাসীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে যাঁরা সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন, প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাবে তাঁরা এমটিও বা মানি ট্রান্সফার অর্গানাইজেশনের কাছে সশরীর যাওয়ার ঝামেলা নিতে চান না। ফলে হুন্ডি তাঁদের কাছে বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। মোবাইল অ্যাপভিত্তিক প্রযুক্তিগত সুবিধা যদি আমাদের সব প্রবাসীকে দেওয়া যায়, তবে এই সমস্যার একটি ইতিবাচক সমাধান হবে এবং সার্বিক সুফল বয়ে আনবে।

উত্তম কুমার সাহা

প্রবাসী আয়ের টাকা দ্রুত সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ডাচ্ বাংলা ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে। রেমিট্যান্স সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের কার্যক্রম ৭/২৪ (সপ্তাহে সাত দিন সব সময়) চালু থাকে। এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) সফটওয়্যারের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই প্রবাসী আয় পাঠানো সম্ভব। ২০২১ সালে ২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে এনেছে ডাচ্ বাংলা ব্যাংক, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।

বৈধপথে প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো কিছু বাধা রয়েছে। প্রবাসে আমাদের জনশক্তির অধিকাংশই শ্রমিক। তাঁরা সেখানে অনেকেই ক্যাম্পে থাকেন। ক্যাম্প থেকে ব্যাংকের দূরত্ব অনেক। প্রবাসীদের কাজের সময় ও ব্যাংক খোলা থাকার সময় একই। ফলে তাঁকে ছুটি নিয়ে ব্যাংকে যেতে হয়। হুন্ডির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এটিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে সরাসরি শ্রমিকদের আবাসিক ক্যাম্পে চলে যান। অবৈধ অর্থ প্রেরণকারীরা প্রেরিত অর্থ দেশে বেনিফিশিয়ারির দোরগোড়ায় দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেয় বিধায় কোনো অর্থ খরচ হয় না। অর্থাৎ বৈধ চ্যানেলগুলোর সেবাকে আক্ষরিক অর্থে রেমিট্যারদের দোরগোড়ায় না নিতে পারলে এবং প্রেরিত টাকা তাৎক্ষণিকভাবে বেনিফিশিয়ারির কাছে পৌঁছানো না গেলে অবৈধ উপায়ে প্রবাসী আয় প্রেরণের আধিপত্য কমানো কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় প্রেরণকারী ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর নিজস্ব মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপ করার জন্য এনকারেজ করা যেতে পারে। এর ফলে শ্রমিকেরা তাঁদের ক্যাম্প থেকেই নিজে নিজেই মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বৈধ উপায়ে দেশে অর্থ প্রেরণ করতে পারেন।

পাশাপাশি গ্রামেগঞ্জে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃতি আরও বাড়াতে হবে, যাতে প্রবাসী আয় গ্রহীতারা তাঁদের দোরগোড়ায় নিরাপদে টাকা উত্তোলন করতে পারেন। এতে সময় ও খরচ—উভয়ই সাশ্রয় হবে।

প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার বর্তমানে যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়, তা অন্যভাবে দেওয়া যেতে পারে। তার কিছু অর্থের সঙ্গে এ প্রণোদনা একসঙ্গে প্রভিডেন্ট ফান্ড হিসেবে সঞ্চয় করা যেতে পারে। একজন প্রবাসী যখন দেশে আসবেন, তাঁর জন্য এটি তখন বড় সহায়তা হবে। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের আয় সঞ্চিত থাকে না।

মো. জাহিদুল আহসান

একসময় প্রবাসে থাকার কারণে প্রবাসীদের দুঃখ, হাসি-কান্না আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ডিজিটাল আর্থিক সেবামাধ্যমে প্রবাসী আয় পাঠানোকে শুরুতে সবাই ঝুঁকি হিসেবে দেখত। নেতিবাচক বিষয়গুলো আগে সামনে আসত। এখন সে ধারণা অনেকটাই বদলেছে। বর্তমানে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে বিভিন্ন এমএফএসের মাধ্যমে প্রতি মাসে ১৫-২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিই। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ।

অনেক এক্সচেঞ্জ হাউসের রেমিট্যান্স পাঠানোর অ্যাপ আছে, কিন্তু ব্যবহার নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ তত বেশি নয়। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ জরুরি, যেখানে তারা পিছিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের প্রান্তে রেমিট্যান্স বিতরণ প্রক্রিয়ায় প্ল্যাটফর্ম জরুরি। ভারতের জাতীয় পেমেন্ট করপোরেশনের ২০টির বেশি প্রোডাক্ট রয়েছে। অথচ আমরা তিনটি প্রোডাক্ট নিয়ে বসে আছি। দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৭ দিন রেমিট্যান্স বিতরণের কোনো প্ল্যাটফর্মও আমাদের নেই। অনেক ক্ষেত্রে একটা সেটেলমেন্টে পাঁচ দিন সময় লাগে। অথচ সুবিধাভোগীরা চান তাৎক্ষণিক। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামোগত কিছু সমস্যাও আছে।

প্রবাসে আমাদের শ্রমশক্তির ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ অবৈধ। তাঁরা কিন্তু বৈধভাবে টাকা পাঠাতে পারেন না। তাঁরা কীভাবে বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, তার কোনো সমাধান হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি ভাবা প্রয়োজন। বিনিময় হারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কেউ তার আয়ের সর্বোচ্চ টাকাটাই চাইবে। এ ক্ষেত্রে দেশপ্রেম পরে আসে। কারণ, প্রবাসীরা পরিবারের ভরণপোষণের টাকাই মূলত পাঠান। আমি মনে করি, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা উচিত।

গোলাম গাফফার ইমতিয়াজ চৌধুরী

২০২১ সালে ২ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ২০২২ সালে আমরা ৭ লাখ ৮৪ হাজার মানবসম্পদ রপ্তানি করতে পেরেছি। কিন্তু ২০২১ সালে আমাদের রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ ২০২২ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিষয়টি আমাদের জন্য উদ্বেগের। ২০২২ সালের আগস্ট মাসে দেশে ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে। সেপ্টেম্বর মাসে তা কমে ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আমরা যে নতুন মানবসম্পদ রপ্তানি করছি, তাঁদের মজুরি কোথায় যাচ্ছে তাহলে? তাঁরা তো অবশ্যই মজুরি পাচ্ছেন।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের জন্য যদি কোনো লাভজনক পদ্ধতি না থাকে, তবে তিনি বৈধ-অবৈধ কোনো পথের দিকে আকর্ষিত হবেন না। তিনি তো বুঝতেই পারছেন না, আসলে কার মাধ্যমে উপকারভোগীর কাছে টাকা পৌঁছাচ্ছে। তাঁর নামে টাকাটা আসছে নাকি অন্য কারও নামে আসছে, তা তিনি বুঝতে পারেন না। রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তাঁদের সচেতনতামূলক হ্যান্ডবুক দিয়ে এমএফএস একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। কোন প্রক্রিয়ায় টাকা পাঠালে তিনি লাভবান হবেন কিংবা জমি কেনার ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে ঝামেলায় পড়বেন না—এসব কিছু সেখানে উল্লেখ থাকবে।

দিন শেষে দেখা যাচ্ছে, মানবসম্পদ রপ্তানির হার বাড়লেও রেমিট্যান্স আসা কমে যাচ্ছে। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সমাধানের পথে যেতে হবে। ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এনপিএসবি বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে আমাদের। যে কারণে লেনদেন অ্যাপভিত্তিক করা সম্ভব হচ্ছে না।

হুন্ডির লোকেরা বোঝায় যে দ্রুত সময়ের মধ্যে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে তারা। এ ক্ষেত্রে এপিআইভিত্তিক, অ্যাপভিত্তিক ও এনপিএসবিভিত্তিক যে প্রক্রিয়া, তা যদি একীভূত করা যায়, তাহলে কিন্তু হুন্ডির লোকেরা আমাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না। ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পৌঁছালে রেমিট্যান্স–যোদ্ধারা নিজেরাও অনেক লাভবান হন। এই কথাগুলো তাঁদের জানাতে হবে। সচেতনতা তৈরি করতে হবে। [আমার লেখায় রেমিট্যান্স বিষয়ক বক্তব্যে ছাপা সংস্করণে ‘বিলিয়ন’ শব্দের বদলে ভূলক্রমে ‘মিলিয়ন’ ছাপা হওয়ায় দুঃখিত।]

সায়মা হক বিদিশা

আমি দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই। প্রথমটি হলো প্রবাসী আয় কীভাবে বা কোন মাধ্যমে দেশে আসছে। আর অন্যটি হলো এ প্রবাসী আয়ের টাকা কীভাবে খরচ করা হচ্ছে। দুটি বিষয়ই জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ অর্থ খরচ করার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা কিছু কাজ করেছি।

দেখা যাচ্ছে, ভোগের জন্য যে টাকা খরচ করা হয়, সে ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রভাবের কারণে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রবাসী আয়গ্রহীতার প্রসঙ্গে কিছু বিষয় আছে। যেমন গ্রহীতা যদি নারী হন, তবে সে ক্ষেত্রে তাঁরা এই টাকা স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের কিছু আকর্ষণীয় পণ্য তৈরি করা যায় কি না, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। আমি মনে করি, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও একটি বিষয় হলো, যেহেতু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যের, সেহেতু সরকার তাঁদের অন্তত কিছু সুযোগ–সুবিধা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোকে আরও বেশি ডিজিটাল করার সুবিধা থাকতে পারে। এ ছাড়া ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে সহজ করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারে। কিছু আর্থিক ভর্তুকি দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়েও সরকার চিন্তা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি বিষয়গুলোকেও সহজ করার ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। প্রবাসী আয়গ্রহীতারা বেশির ভাগই নারী। ব্যাংকিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে নারীদের কিছু বাধা রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সে বাধাগুলোর কিছুটা দূর করতে পারলেও অনেকগুলো রয়ে গেছে। যেমন ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের ঘাটতি, স্মার্টফোন না থাকা বা চড়া মূল্য প্রভৃতি সমস্যা রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল লিটারেসি অর্থাৎ ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা দেওয়ার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। মৌলিক কিছু সুবিধাসম্পন্ন স্মার্টফোনের কথা ভাবা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের প্রবৃত্তি হলো, মানুষ একটু বেশি টাকা হাতে নিতে চায়। সুতরাং অবৈধ পথে টাকা আনার ক্ষেত্রে তারা আগ্রহী হয়। বৈধ-অবৈধ প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্যটা যত কমানো যায়, কমানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মোবাইলে অর্থনৈতিক সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে হবে।

এ ছাড়া ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্টফোনের বিষয়টি তো সবাইকে আর হাতে হাতে শেখানো যাবে না। সে জন্য মৌলিক ফিচারসমৃদ্ধ স্মার্টফোনের কথা বলছি। এ ধরনের বেশ কিছু কাজ আছে। তবে প্রেরকদের দিক থেকে একটি আইনি অর্থনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে এবং পাশাপাশি গ্রাহকের দিক থেকে ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত বৈধ ও অবৈধ পথের মাঝে বড় পার্থক্য থেকে যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সেদিকেই ঝুঁকবে, যেদিকে সে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

মাশরুর রিয়াজ

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ইতিবাচক কিছু বিষয় আছে। গত সাত থেকে আট বছরে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে ভারতে। কিন্তু প্রবাসী আয় প্রবৃদ্ধির দিকে যদি তাকাই, সে ক্ষেত্রে কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে। এটা আমাদের বড় একটি শক্তির জায়গা। এ ছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কিন্তু পিছিয়ে নেই। তবে আমাদের যা দরকার, সে তুলনায় আমরা কম পাচ্ছি।

অনেক বছর পর এখন দেশের ভারসাম্য মজুরিতে চাপ পড়েছে। সে কারণে আমাদের রিজার্ভ কমছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের বাজার অস্থিতিশীল আছে। এ ছাড়া আমাদের কিন্তু ভোগভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় প্রবাসী আয়ের বড় অঙ্ক ব্যয় হয় পারিবারিক কাজে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ অঞ্চলকে বাদ দিয়ে কিছু করা যাবে না।

ডিজিটাল পথে প্রবাসী আয় আসার প্রক্রিয়া বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার (এমএফএস) যাত্রা চমৎকারভাবে শুরু হয়েছে। তবে এর গতি আরও বাড়াতে হবে। একটি জরিপে দেখা গেছে, যাঁরা এমএফএস ব্যবহার করেন না, তাঁদের ৩২ শতাংশই প্রতারকের ভয়ে ব্যবহার করেন না। এ ছাড়া ডিজিটাল শিক্ষার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের পথ সহজ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান পায়নি ভোক্তা। আর এমএফএস ব্যবহার করেন না, এমন প্রবাসী আয়গ্রহীতাদের বেশির ভাগ নারী এবং গ্রামাঞ্চলের লোক। মোট প্রবাসী আয়গ্রহীতার ৫০ শতাংশ নারী এবং ৪৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। দুটি পক্ষই প্রবাসী আয় গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষত গ্রামাঞ্চলে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ অংশকে ডিজিটাল অর্থনৈতিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। আইডিটিপি সিস্টেম চালু করতে হবে। এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি সমাধান। এ ছাড়া নারীকেন্দ্রিক ও নারী সংবেদনশীল পণ্য বের করতে হবে। এটির অভাব রয়েছে আমাদের।

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

তিনটি ভাগে বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে। সমস্যার কারণ, সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান ও প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা। প্রথমত, আমাদের দেশে অবৈধ পথে হুন্ডিতে লেনদেন সব সময় ছিল। বিষয়টি রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনার প্রশ্নে, অপ্রদর্শিত আয় ও কালোটাকা একটি বড় বাধা। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অপ্রদর্শিত টাকা দেশের বাইরে বিদেশে পাঠানোর জন্য রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে রেখে দিয়ে, অপ্রদর্শিত আয়ের টাকা ব্যবহার করা হয় দেশের ভেতর। এভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের অর্থ বিদেশে পাচার ও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিক–সংক্রান্ত তথ্য–উপাত্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি অর্থ প্রবাহের তুলনামূলক চিত্র আমাদের সে কথা বলে। কাজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানকে দেশ ও জনস্বার্থে শক্ত ও পেশাদারিত্ব ভূমিকা রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গত একদশকে চারটি সূচকের ভিত্তিতে (মানসম্মত বিনিয়োগ, বিশ্বমানের প্রযুক্তি, ডিস্টিবিউশন ও ব্যবস্থাপনা) ডিএফএস গ্রাহক আস্থা অর্জন করেছে। ডিএফএসের প্রধান দুটি অপারেটর বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে বৈধ পথে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকা দেশে আসছে। দেশে ডিএফএস মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টাকা লেনদেন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভালো এই দৃষ্টান্ত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য তৈরি করা আর তার আকার ও পরিসর বাড়ানোই সম্ভাব্য সমাধানের পথ। ডিএফএসগুলোকে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে গিয়ে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোকে ডিএফএসগুলোকে বিদেশে নিজেদের পরিচয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক স্বাথে সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো দরকার।

তৃতীয়ত, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি বিবেচনা করে ইউরোপসহ বিশ্বের নানাদেশে নতুন বাজার খোঁজা ও শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আর দীর্ঘমেয়াদে বৈধ পথে প্রবাসীদের আয় আনার জন্য একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, অর্থ মন্ত্রালয়, প্রবাসী শ্রম মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসগুলো ও প্রবাসী শ্রমিক রপ্তানিকারণ ও প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। যেসব দেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা বেশি রয়েছেন, সেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বসে বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

লীলা রশিদ

একটি বৈধ ও আরেকটি অবৈধ পথ—দুই পথেই প্রবাসী আয় দেশে আসে। এ দুই পথ পরস্পর প্রতিযোগিতায় আছে। এ প্রতিযোগিতার সূচকগুলো বুঝতে যে বিষয়গুলো সামনে আসে, তা হলো কত কম সময়ে সেবা দেওয়া যায়, কত কম খরচে সেবা পাওয়া যায় এবং কতটুকু গোপনীয়তা বজায় রেখে টাকা পৌঁছে দেওয়া যায়। মূলত, এ তিন জায়গাতেই বৈধ ও অবৈধ পথ দুটি প্রতিযোগিতা করছে।

প্রযুক্তি আসার আগে হুন্ডি বা অবৈধ পথে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রটি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। তারা ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ করত। দেখা যেত, দেশে একজন ব্যক্তি থাকত এবং বিদেশে আরও একজন ব্যক্তি থাকত, যারা লেনদেনের কাজটি করত। এ সুবিধা ব্যাংকের ছিল না। প্রযুক্তি আসার পর ব্যাংকের জন্য বিষয়টি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে।

প্রযুক্তি বৈধ পথকে অনেক সুবিধা দিচ্ছে, যার সুফল ভোগ করছেন প্রবাসী আয় গ্রহীতারা। সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় একটি বিনিয়োগ আছে। বড় আকারে ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে সেবামূল্য ধীরে ধীরে কমে আসছে। প্রযুক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান থাকলে এখানে অবশ্যই গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব। আমরা ছোটবেলায় তর্ক করতাম ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ’, তা নিয়ে। মূলত, এটি নির্ভর করে ব্যবহারকারীর ওপর। যখন এটি রাষ্ট্রের জন্য ব্যবহার করা হয়, তখন আমরা বলি তা আশীর্বাদ। যখন ব্যক্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য ব্যবহার করা হয়, তখন আমরা বলি তা রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ।

অবৈধ ও বৈধ—দুটি পথেই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। অবৈধ পথে দুই প্রান্তের লোকেদের মধ্যে লেনদেনের বিষয়ে কথাবার্তা কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমেই হচ্ছে। এখানে পার্থক্য হলো বৈধ পথে টাকা এলে তা রিজার্ভে থাকছে। অন্যদিকে, অবৈধ পথে এলে তা সেখানেই থেকে যাচ্ছে। ক্ষতিটা মূলত জাতীয় ক্ষতি।

বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের প্রসঙ্গে ক্ষুদ্র পর্যায় থেকে যদি বলি, এখানে চাহিদা ও জোগানের একটি বিষয় আছে। এখানে বসে একজন যে কাজ করছেন, অপর প্রান্তের লোকটিও ঠিক তেমন কাজ করছেন। কিন্তু অবৈধ পথের ক্ষেত্রে যা হয়, অপর প্রান্ত থেকে এ প্রান্তের এজেন্টকে বলে দেওয়া হয়, আপনি এভাবে এভাবে বণ্টন করুন। এতে অপর প্রান্তের লোক রেমিট্যান্সের টাকাটা নিজের কাছে রেখে দেয়। তাই আমাদের রিজার্ভে যুক্ত হয় না।

মাহফুজুর রহমান

আগে প্রবাসী আয় ব্যাংকগুলোয় অনেক দিন পড়ে থাকত। এখন আর সে অবস্থা নেই। আলোচনা এসেছে, পুলিশি অভিযানে হুন্ডি বন্ধ হবে না। এটি একেবারেই সত্যি কথা। বিনিময়ের হার ঠিক করাও বেশ জরুরি। কারণ, দেশপ্রেম বিনিময়ের হারের কাছে বেশিক্ষণ টিকবে না। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করার সময় আমি দেখেছি, অধিকাংশ রাষ্ট্রদূতের প্রতি প্রবাসীরা ক্ষুব্ধ থাকেন। এমনকি তাঁদের মারতে উদ্যত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর কারণ তাঁরা প্রবাসীদের জন্য কাজ করেন না। যাঁরা প্রবাসীদের জন্য কাজ করবেন, তাঁদেরই দূতাবাসের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এনআরবি তথ্যভান্ডার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে প্রবাসীদের নাম, মুঠোফোন নম্বর ও ই–মেইল অ্যাড্রেস থাকবে। এর মাধ্যমে আমরা প্রবাসীদের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানাতে পারি। আমরা নিজেরা কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। দূতাবাসগুলোকেও অনুরোধ করা হয়েছে যেন সব প্রবাসী এর তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু আমরা কোনো দূতাবাস থেকেই সাড়া পাইনি। এ বিষয়ে দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে; পাশাপাশি সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে।

বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্কিম করা গেলে বৈধ পথে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো বাড়বে। বিনিময়ের হার বাজারভিত্তিক করা উচিত, এর সঙ্গে আমিও একমত। হুন্ডি বন্ধ হোক, বিদেশিরা সত্যিই এটি চায় না। সিঙ্গাপুরের মতো দেশে রাস্তায় সিগারেটের ছাই ফেললেও পুলিশ হাজির হয়। সেখানে উন্মুক্ত পরিবেশে হুন্ডি কার্যক্রম চালানো হলেও পুলিশ কিছু বলে না। অ্যাপের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আনা গেলে এর পরিমাণ আরও বাড়ত। এ ক্ষেত্রে সবার আন্তরিকতা প্রয়োজন।

ফিরোজ চৌধুরী

গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আজকের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উঠে এসেছে। আশা করা যায়, নীতিনির্ধারকেরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হবে।

সুপারিশ

  • প্রবাসী আয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৭দিন, ২৪ ঘন্টা সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছে দিতে হবে।

  • বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রক্রিয়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে আরও সহজ করা প্রয়োজন।

  • প্রণোদনার সঙ্গে প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের জন্য আকর্ষণীয় স্কিম চালু করা দরকার।

  • হুন্ডি প্রতিরোধে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল জ্ঞান বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ জরুরি।

  • বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনায় দূতাবাসগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

  • বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ের হার বাজারভিত্তিক করা উচিত।

  • অনিবন্ধিত প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ও বৈধভাবে আনার উপায় খুঁজতে হবে।

  • মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মানবসম্পদকে এমএফএস সেবার আওতায় আনতে হবে।