বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়
এফসিডিও-এর সহযোগিতায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় বরিশালের একটি অভিজাত হোটেলে
অংশগ্রহণকারী
বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, প্রশাসক, বরিশাল সিটি করপোরেশন;
ব্রিগে. জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর, পরিচালক, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল;
ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল, বিভাগীয় পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর;
ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী, সিভিল সার্জন, বরিশাল;
ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, বরিশাল সদর হাসপাতাল;
নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতি;
সাজ্জাদ পারভেজ, সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বরিশাল জেলা;
আবুল কালাম আজাদ শাহীন, সদস্যসচিব, বিএনপি, বরিশাল জেলা (দক্ষিণ);
মাহমুদ হোসাইন দুলাল, নায়েবে আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বরিশাল মহানগর;
ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সমন্বয়ক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বরিশাল জেলা;
মো. রফিকুল ইসলাম রাসেল, সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ), গণ অধিকার পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি;
মো. আবু সাঈদ মুসা, আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বরিশাল জেলা;
মো. রফিকুল আলম, নগর সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বরিশাল;
মো. মাহমুদ হোসাইন আল-মামুন, সদস্যসচিব, মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ), বরিশাল;
দিপু হাফিজুর রহমান, উপপরিচালক, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সস্পাদক, প্রথম আলো
বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন
প্রশাসক, বরিশাল সিটি করপোরেশন
স্বাস্থ্য খাত দেশের সবচেয়ে বড় সেবা খাত, যার সঙ্গে কোটি মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন জড়িত। তবে সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি তাঁদের পেশার সঙ্গে একাত্ম না হন, তাহলে সেবায় ঘাটতি থাকবেই। দায়বদ্ধতা ছাড়া সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে চাই। মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যেমন চিকিৎসকদের দায়িত্ব, তেমনি জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। তাই পারস্পরিক সমন্বয় জরুরি।
বরিশালের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবকাঠামো ও জনবলসংকটের পাশাপাশি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বড় বাধা। অ্যাম্বুলেন্স, ডায়ালাইসিস, ডায়াগনস্টিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে গেলেই তারা বাধা সৃষ্টি করে। তবু পিছিয়ে না গিয়ে সাহস নিয়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলা ও কাজ করা জরুরি।
দক্ষ জনবল ও আধুনিক সেবার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। ভালো চিকিৎসক ধরে রাখতে না পারায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। আমরা চাই, মানুষ নিজের শহরেই চিকিৎসা পাবে, ঢাকায় যেতে হবে না।
মানবিকতা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা শিশু হাসপাতাল চালু, নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং পাবলিক টয়লেট ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে। অবৈধ স্থাপনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মাদক প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সবাই মিলে একটি সুস্থ, সুন্দর বরিশাল গড়তে চাই—যেখানে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে।
ব্রিগে. জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর
পরিচালক, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয় কীভাবে করা যায়, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বাজেটের সঠিক বিন্যাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সেবার উন্নয়নে মনিটরিং বাড়ানো জরুরি।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, ভেতরে মোটরসাইকেল চলাচল ও লিফটে ওঠানো-নামানো হচ্ছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পুরো ব্যবস্থা জিম্মি ছিল। পরে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ, সৌন্দর্যবর্ধন, মূল ফটক নির্মাণ ও সিসিইউর অচল এসি চালু করা হয়। সেবায় অটোমেশন আনা হয়েছে, রেডিওথেরাপি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে জনবলসংকটে এমআরআই মেশিনসহ অনেক যন্ত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
অ্যাপ, রেজিস্ট্রেশন ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিলেও বাস্তবায়নে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ফলে দালাল ও সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকেই যাচ্ছে।
১০০০ শয্যার হাসপাতালে গতকাল ২ হাজার ৭৫২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন হাজার রোগী সেবা নেন। নার্স ও চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব সমস্যা সমাধানে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
রোগীর অতিরিক্ত ভিড়, জনবলঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে চেষ্টা করেও আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত ল্যাব টেকসইভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভালো চিকিৎসক ও অধ্যাপক না আসার পেছনে যে কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, তা সমাধান করা গেলে সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।
ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল
বিভাগীয় পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা ৭০–৮০ শতাংশ মানুষই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। আমি ২০১৫ সালের একটি প্রশিক্ষণে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি। সাধারণ পোশাকে আউটডোরে রোগীসেবা পর্যবেক্ষণ ও টিকিট কেটে পরদিন রিপোর্ট দিতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে বুঝেছি।
আগে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় বহু মানুষ মারা যেত। এখন ভ্যাকসিন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় অনেক রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা রিসোর্সে। অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানোর চেষ্টা হলেও রোগীর চাপ সেই তুলনায় অনেক বেশি। রিসোর্স–ঘাটতির কারণে চিকিৎসকেরাও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন—ল্যাব, ইসিজি, এমআরআইসহ নানা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বরিশালের স্বাস্থ্যসেবায় শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকসহ সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। আমরা সবাই মিলে কাজ করছি, তবে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সদর হাসপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে।
অবকাঠামো ও জনবল না বাড়ালে এবং জনগণকে স্বাস্থ্য বিষয়ে আরও সচেতন না করলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর দায় না চাপিয়ে সেবা উন্নয়নে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী
সিভিল সার্জন, বরিশাল
বরিশালের ১০টি উপজেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো দুর্বল। ১০০ শয্যার সদর হাসপাতালে ১৪০–১৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন, জনবল সেই অনুপাতে না বাড়ায় সেবা দেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
এখানে কাজ করতে এসে দালালের দৌরাত্ম্য ও সিটিজেন চার্টারের অভাব দেখেছি। বিভিন্ন উদ্যোগে দালালের প্রভাব কমেছে, সেবা এখন তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও সহজ হয়েছে।
একই সঙ্গে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সূচকে আমাদের কিছু অগ্রগতি হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত কাজের ফল। তবে এখনো অনেক অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। পুরোনো হাসপাতাল ভবন, জরাজীর্ণ অবস্থা, পানি পড়া ও ওষুধ সংরক্ষণের সমস্যা—এসব দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
আমরা রোগীদের জন্য উন্নত খাদ্যব্যবস্থাও চালু করেছি। মিনিকেট চাল, মানসম্মত তেল, সোনালি মুরগি ও উন্নত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে, যা রোগীদের সন্তুষ্টি বাড়িয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার দেড়–দুই গুণ রোগী থাকলেও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমরা সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এই বাস্তবতায় সমন্বিত উদ্যোগ ও দায়িত্ববোধই এগিয়ে যাওয়ার পথ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—স্বাস্থ্যসেবাকে সবার নিজ দায়িত্ব হিসেবে নিতে হবে। সীমিত বাজেট, জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেও দায়িত্বশীল হলে অনেক কিছু করা সম্ভব।
ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল
আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, বরিশাল সদর হাসপাতাল
আমাদের হাসপাতালে টয়লেট ও স্যানিটেশন বড় সমস্যা। ১০০ শয্যার বিপরীতে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় টয়লেট দ্রুত অচল হয়; স্যানিটারি ন্যাপকিন প্যানে ফেলায় তা বন্ধ হয়ে ভোগান্তি বাড়ে। নিয়মিত পরিষ্কার করলেও সচেতনতার অভাবই প্রধান বাধা।
ভৌত অবকাঠামোর দিকেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের সেবা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ভবনে চলে; বৃষ্টিতে এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যেতে সমস্যায় পড়তে হয়। দুর্বল ড্রেনেজে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত—একটি ফেজ দিয়ে পুরো হাসপাতাল চালাতে হয়, যেখানে বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।
রোগীর চাপ বাড়লেও সক্ষমতা বাড়েনি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সেবা দিতে না পারায় ডায়রিয়া ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে হাম, ডেঙ্গুসহ নানা রোগ বাড়লেও আলাদা ইউনিট না থাকায় রোগীদের সাধারণ ওয়ার্ডেই রাখতে হয়, যা ঝুঁকি বাড়ায়। এ ক্ষেত্রে অন্তত ১০০ শয্যার একটি সংক্রামক রোগ ইউনিট থাকা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও আমাদের জন্য কোনো ঝুঁকি ভাতা নেই। সংক্রামক রোগীর সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিচ্ছেন, কিন্তু তার স্বীকৃতি বা প্রণোদনা পাচ্ছেন না। এটি যৌক্তিক কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
নজরুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতি
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় বলা হয় আমরা ৬৫ শতাংশ সেবা দিই, আবার কেউ কেউ বলেন রাতে সরকারি হাসপাতাল বন্ধ হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই ভরসা—এই বাস্তবতা আমাদের সম্মান দিয়ে দেখা উচিত।
আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করি রোগীর সর্বোচ্চ সেবা দিতে। কিন্তু কোনো জটিলতা বা মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গে ‘ভুল চিকিৎসা’ বা ‘অবহেলা’র অভিযোগ আসে, যা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক।
করোনাকালে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, অনেক সহকর্মী করোনায় আক্রান্ত হলেও সেবা বন্ধ করিনি। বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আইসিইউ, সিসিইউ চালু এবং ডেঙ্গুসহ সংক্রামক রোগের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু রোগীর মৃত্যু হলে অতিরিক্ত জবাবদিহির ভয় ও মানসিক চাপ আমাদের এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে।
একটি হাসপাতাল চালু করতে ১৫–১৭টি লাইসেন্স নিতে হয়, যা জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি আলাদা নিবন্ধন ও বার্ষিক নবায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা প্রস্তুত, সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে এটি আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একক ও নিয়মিত তত্ত্বাবধানে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সাজ্জাদ পারভেজ
সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বরিশাল জেলা
মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্যানসার ও কিডনির রোগীদের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০টি সহায়তার আবেদন থাকলেও আমরা মাত্র ৩০০ জনকে সহায়তা দিতে পেরেছি। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে সহায়তা বাড়ছে না।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের রোগী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে আমরা দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের ওষুধসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে থাকি। এই সহায়তার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় রোগীকে দুস্থ বা অসহায় হিসেবে প্রমাণ করার জন্য যে সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়, সেটি কীভাবে দ্রুত পাওয়া যাবে—বিষয়টি সহজ করা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত দরিদ্র রোগীরা দ্রুত সেবা পাবেন।
হামের মতো সংক্রামক রোগ কেন বাড়ছে, তার একটি বড় কারণ হলো যথাসময়ে টিকা না পাওয়া এবং সচেতনতার অভাব। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার মূলধারায় আনতে হবে ও তাদের সচেতন করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ, শক্তিশালী নেটওয়ার্কিং এবং স্থানীয় সরকারের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
আবুল কালাম আজাদ শাহীন
সদস্যসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বরিশাল জেলা (দক্ষিণ)
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কম। ফলে একজন চিকিৎসককে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
ডায়াগনস্টিক ও জরুরি সেবায় সংকট রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে বা ছুটির দিনে সেবা না পেলে রোগীরা বিপদে পড়েন।
সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন, যাঁদের অধিকাংশই দরিদ্র। তাঁদের জন্য যথাযথ সেবা নিশ্চিত ও সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সমাজের সামগ্রিক সমস্যা—মাদক, ছিনতাইসহ সামাজিক অবক্ষয়—সবকিছুই আমাদের নজরে রাখতে হয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে নানা সমস্যা রয়েছে। আলোচনায় অনেক বাস্তবতা উঠে এলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন সব সময় দেখা যায় না।
হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, অনেক রোগী মেঝেতে শুয়ে থাকেন—এটি খুব কষ্টদায়ক। আমরা রোগীদের পাশে দাঁড়াই, তবে চিকিৎসাব্যবস্থায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবু আমাদের উপস্থিতিই তাদের কাছে স্বস্তির।
সিসিইউতে গিয়ে দেখেছি, কোথাও এসি নষ্ট, কোথাও সচল। পরে কিছু সংস্কার হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে সীমিত বাজেটের মধ্যেও দুর্নীতি কমানো গেলে সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব।
মাহমুদ হোসাইন দুলাল
নায়েবে আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বরিশাল মহানগর
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণ জরুরি। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিটি করপোরেশন ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। প্রশাসক মহোদয়ের উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবার অনেক ঘাটতি কমানো সম্ভব।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো কিছুটা উন্নত হলেও অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো শূন্য পদ রয়েছে, যা দ্রুত পূরণ করতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দরিদ্র ও অসচ্ছল রোগীদের জন্য ওষুধ ও চিকিৎসাসহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অর্থের অভাবে কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে স্বাস্থ্য খাতে ই-সেবা চালু করা প্রয়োজন, যাতে রোগীরা দূর থেকে সহজে সেবা নিতে পারেন এবং ভোগান্তি কমে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনলাইন সিরিয়াল ও ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা আরও বিস্তৃত করা দরকার।
জনগণের সচেতনতা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার পূর্ণ উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্বাস্থ্যকর্মী ও এনজিওদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
ডা. মনীষা চক্রবর্তী
সমন্বয়ক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বরিশাল জেলা
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য বাজেট, যা গত ২০–২৫ বছরে কখনোই মোট বাজেটের ৫ শতাংশের বেশি হয়নি। সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া বাস্তব কোনো বিকল্প নেই। আসন্ন বাজেট অধিবেশনে কেন্দ্রীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য নির্দিষ্ট অনুপাত নির্ধারণ করে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ডায়াগনস্টিক সেবার ক্ষেত্রে দেখা যায়, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুপুরের পর পরীক্ষা বন্ধ থাকায় রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। মেডিকেল কলেজ নয়, সদর হাসপাতাল ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও ২৪ ঘণ্টা এ সেবা চালু করা প্রয়োজন।
রেডিওথেরাপি মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় বরিশালসহ ২১ জেলার ক্যানোরের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও অমানবিক বাস্তবতা। সীমিত ব্যয়ে এটি চালু করা সম্ভব হলেও উদ্যোগের অভাবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বড় কলেজগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে কারখানায় স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট থাকার আইন থাকলেও অনেক জায়গায় তা বাস্তবায়িত হয়নি, এ জায়গায় আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
স্বাস্থ্য খাতকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা গেলে সেবার মান স্বাভাবিকভাবেই আরও উন্নত হবে।
মো. রফিকুল ইসলাম রাসেল
সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ), গণ অধিকার পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি
নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে চালু রাখা সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালের সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অনেক সময় রোগীদের কোনো পরীক্ষা না করেই সরাসরি শের-ই-বাংলায় পাঠানো হয়, যা সেবার ভারসাম্য নষ্ট করছে। সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ আরও কার্যকরভাবে মনিটর করা দরকার।
আইসিইউ ও সিসিইউ সেবা সীমিত হলেও এটি এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, তাই এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি বিভাগে ট্রলি ব্যবস্থায় দালাল চক্র ও সময়ক্ষেপণের কারণে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
অবকাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ক্লিনিক্যাল, সার্জিক্যাল ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করে যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
নগর ও স্বাস্থ্যসেবার এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
মো. আবু সাঈদ মুসা
আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বরিশাল জেলা
আমরা বরিশালের মানুষ চিকিৎসার জন্য খুবই সমস্যায় আছি। জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের পর চিকিৎসকেরা হাসপাতালে থাকেন না। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর শিফটভিত্তিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে জবাবদিহি তৈরি করতে হবে। মাসভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।
ওষুধের ঘাটতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এগুলো দূর করতে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা প্রয়োজন। তথ্য হালনাগাদ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
চিকিৎসকদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়েও ভাবা দরকার। অনেকেই পেশাগত কারণে অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাজেট বরাদ্দ তুলনামূলক কম—এটি একটি বড় বাস্তবতা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরকারের কাছে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন।
বরিশালের মানুষ উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশা করে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা একটি কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব—এই আশাই ব্যক্ত করছি।
মো. রফিকুল আলম
নগর সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বরিশাল
দুই–তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে আনা দরকার। বিশেষ করে সংক্রমণযোগ্য ও অসংক্রমণযোগ্য রোগ নিয়ে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্লাইমেট হেলথ—বিষয়টি নিয়েও আলোচনা দরকার। আমরা সবাই দক্ষিণাঞ্চলের নাগরিক হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছি, যার প্রভাব স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
বরিশালের আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এটি বহুবার আলোচনার টেবিলে তোলা হলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা এখনো অনিশ্চিত। একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ইস্যু। সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের এটি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কোনো ঝুঁকি দেখা দিলে চিকিৎসকেরাই প্রথম আক্রান্ত হন—এ বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন।
সরকারি চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে বেসরকারি চিকিৎসা এখন বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় নীতিনির্ধারক বা জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই বৈষম্যমূলক কাঠামো পরিবর্তনের দরকার রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু একটি খাত হিসেবে নয়, পরিবেশ, জলবায়ু ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে দেখতে হবে। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরিশালের যে বাস্তবতা, সেটি যেন সারা দেশের প্রতিফলন হয়ে ওঠে—এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে।
মো. মাহমুদ হোসাইন আল-মামুন
সদস্যসচিব, মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ), বরিশাল
বরিশালের স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধিতে কয়েকটি সুপারিশ করতে চাই। প্রথমত দালাল সিন্ডিকেট বিষয়ে যে অভিযোগ রয়েছে, তা উত্তরণের জন্য সিভিল সার্জন, সিভিল সোসাইটি, জনপ্রতিনিধি ও মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম যৌথভাবে একটি টিম গঠন করতে পারে। নিয়মিত তদারকি ও অভিযানের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট নির্মূল করা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, জনবল সংকট বরিশালের স্বাস্থ্যসেবার বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি, সঠিক বণ্টন ও দক্ষ জনবল নিয়োগের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিবেচনা করতে হবে।
তৃতীয়ত, জরুরি সেবা সংকট। ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের যানবাহন, স্টাফ ও চিকিৎসাসেবা সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে। এ বিষয়ে সিভিল সোসাইটির টিম ও সমাজসেবা দপ্তরের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চতুর্থত, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি। শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সদর হাসপাতালে আইসিইউ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর ডিও লেটার পাঠাতে পারেন।
পঞ্চমত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ। সরকারি–বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।
দিপু হাফিজুর রহমান
উপপরিচালক, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা শুধু বরিশালকেন্দ্রিক নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি প্রধান নির্ভরতার কেন্দ্র। পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ আশপাশের জেলার মানুষও এই সেবার ওপর নির্ভরশীল।
আজকের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, আমরা সবাই একই পক্ষের। আমাদের লক্ষ্য একটাই, কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করা যায়।
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দপ্তরগুলোর সমন্বয়। একটি ক্লিনিক বা হাসপাতাল তার নিজস্ব সীমার মধ্যে সেবা দেয়, কিন্তু জটিল রোগীকে দ্রুত উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি কার্যকর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন। রোগীর স্বজনদের দৌড়ঝাঁপ না করিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই সমন্বয়ের মাধ্যমে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে পারে কি না, এটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার বিষয়।
একটি সমন্বিত হটলাইন চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে সহায়তা ও অভিযোগ—দুটিই জানানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি আস্থার সংকট দূর করতে ওষুধের মজুত অনলাইনে উন্মুক্ত করা যেতে পারে, যাতে রোগী সহজেই জানতে পারেন, কোন ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে।
সবশেষে বলব, আজকের এই আলোচনা যদি বরিশালের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই আমাদের সবার প্রত্যাশা।
সুপারিশ:
১. স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিশ্চিত করে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
২. সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও যৌথ তদারকি প্রাতিষ্ঠানিক করা।
৩. সরকারি হাসপাতালগুলোয় ২৪ ঘণ্টা ডায়াগনস্টিক ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
৪. দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা।
৫. দরিদ্র রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, ওষুধ সরবরাহ ও সনদ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা।
৬. চিকিৎসা–বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন উন্নয়নে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বেসরকারি সেবা প্রদানকারীদের সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা।
৭. জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ই-স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে স্বাস্থ্য বিভাগ, তথ্য দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৮. ৯৯৯-এর মতো একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা হটলাইন চালু করে জরুরি সেবা, তথ্য ও অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা।