গোলটেবিল বৈঠক
নির্বাচনে নিরাপত্তা চান দলিত নারীরা
‘স্থানীয় রাজনীতিতে দলিত নারীর অধিকার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক বৈঠকটির আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অভিযান ও প্রথম আলো।
‘আমার এলাকায় দলিতদের ১ হাজার ৮০০ ভোট আছে। নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য মনে শক্তি আছে। কিন্তু নিরাপত্তা পাচ্ছি না।’ ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী সোনামনি মোদক বললেন এ কথা। তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে বাস করা দলিত জনগোষ্ঠীর নারী। তাঁর মতে, দলিত নারীরা নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে এলাকার প্রভাবশালী প্রার্থীরা ধমক দিয়ে বলেন, ‘তুই পারবি নাকি!’ একই মন্তব্য করে একই এলাকার আরেক দলিত নারী সাথী সরকার বললেন, নিরাপত্তা ও পাশে থাকার আশ্বাস না পেলে কোনো দলিত নারী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়ে আসা এই দলিত নারীরা জানালেন কীভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে তাঁরা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়েন। লিপি সরকার, তিথি মণ্ডল ও শম্পা রানী দাশ নামের আরও তিন দলিত নারী জানান, কখনো নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে না পাওয়া, কখনো পরিবারের বাধা ও সমাজের কটূক্তির কারণে তাঁরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন না।
‘স্থানীয় রাজনীতিতে দলিত নারীর অধিকার: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটির আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অভিযান ও প্রথম আলো। সুইডেন সরকারের সহযোগিতায় এ আয়োজনে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেকটোরাল সিস্টেম (আইএফইএস)।
বৈঠকে উপস্থাপন করা মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ। ৫০টির বেশি সম্প্রদায়ে বিভক্ত এই জনগোষ্ঠী বংশপরিচয় ও পেশার ভিত্তিতে বঞ্চনার শিকার। নারীরা আরও বেশি বৈষম্যের শিকার। ভোটার হতে পারলেও তাঁদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ কম। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে যেসব এলাকায় দলিত ভোটার তুলনামূলক বেশি, সেখানে দলিত ভোটার ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে দলিত সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোকে। যেন সম্প্রদায় একজন প্রার্থীকে সমর্থন করে ও ভোট ভাগ হয়ে না যায়। পরিবারগুলো যেন দলিত নারীর প্রার্থিতাকে ঝামেলা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে সমর্থন করে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। এই ব্যবস্থায় দলিত মানুষ কীভাবে যুক্ত হতে পারে, তা খুঁজে বের করতে হবে। সরকারকে ধরিয়ে দিতে হবে দলিত নারী–পুরুষ কী চাইছে। এখানে দলিত জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে সরকারের ঘোষিত উদ্যোগের মধ্যে তাঁদের চাওয়া–পাওয়াকে দাবি হিসেবে নিয়ে আসা।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, আগে একটি দলের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এই সরকারের এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত রয়েছে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে না। তিনি বলেন, আইনে কোনো বাধা নেই। দলিত নারীরা ভয় ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তাঁর মতে, অধিকার কেউ দিয়ে দেবে না। অধিকার, সম্মান অর্জন করে নিতে হয়।
বিএনপি–দলীয় তিন সংসদ সদস্যের কথা
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি–দলীয় তিন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে নেওয়াজ হালিমা আরলী বলেন, পিছিয়ে পড়া দলিত নারীদের শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। মাধবী মারমা বলেন, এলাকাভেদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিতে হবে। নারী নেতৃত্বের বিকাশে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আর ফাহমিদা হক বলেন, সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দলিত নারীদের এগিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইলেকটোরাল সিস্টেমের (আইএফইএস) এদেশীয় উপপ্রতিনিধি রুমানা আমিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলিত নারীদের সীমাবদ্ধতা দূর করতে করণীয় ঠিক করতে হবে।
এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, দলিত নারীদের যেকোনো দরকারে তাঁর প্রতিষ্ঠান পাশে থাকবে।
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী দলিত সম্প্রদায়কে সংগঠিত হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কারও দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর বসে থাকলে হবে না। আপনাদের সংগঠিত হতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনে থাকতে হবে।
অভিযানের নির্বাহী পরিচালক বনানী বিশ্বাস বৈষম্য নিরোধ আইন প্রণয়নের দাবি জানান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলিত নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন অনেক গ্রাম আছে, যেখানে দলিত নারীরা প্রার্থী হলে জিতবেন। কিন্তু বিভিন্ন চাপে তাঁরা সাহস পান না।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আন্তরিক হলেই রাজনীতিতে দলিত নারীরা এগিয়ে আসতে পারবেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এখন রাজনীতি ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে গেছে। তাই দাবি আদায় করতে হলে ক্ষমতার এই কেন্দ্রে থাকতে হবে। দলিত নারীদের ভোট দেওয়ার যেমন সুযোগ থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচিত হওয়ারও সুযোগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দলিত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ, সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা ও তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ আগে নিশ্চিত করতে হবে।
দলিত নারীদের হীনম্মন্যতা ভেঙে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্র বঞ্চনার জায়গা তৈরি করে। শিল্পকলার মাধ্যমে এসব প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
এ ছাড়া বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন মুসলিম হ্যান্ডস ইউকের এদেশীয় প্রতিনিধি (কান্ট্রি ডিরেক্টর) অনিক আসাদ, একশনএইড বাংলাদেশের লিড (নারী অধিকার ও জেন্ডার সাম্য) মরিয়ম নেছা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী শৌর্য তালুকদার, সরকারি ইস্পাহানি ডিগ্রি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রদীপ হালদার, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের পার্টনারশিপ অ্যানালিস্ট সৈয়দ সামারা মোরতাদা, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা ও উন্নয়ন কালেক্টিভের (আরডিসি) সাধারণ সম্পাদক জান্নাত–এ–ফেরদৌসী লাকী ও ধন্যবাদ দেন অভিযানের সহসভাপতি জয়ন্তী রায়।
বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।