কৈশোর স্বাস্থ্যসমতায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ

পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ ও প্রথম আলো এ বৈঠকের আয়োজন করে। সায়েন্টিফিক পার্টনার এসকেএফ।

‘কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। গতকাল রাজধানীর প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কিশোর-কিশোরীদের বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। মাসিক নিয়ে কুসংস্কার দূর করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন চিকিৎসক, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা।

বক্তারা বলেছেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সহিংসতা প্রতিরোধ—এ চার ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি কৈশোরের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, গবেষণা ও কার্যকর সেবা বাড়াতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সরকারকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

গতকাল সোমবার ‘কিশোর-কিশোরীর স্বাস্থ্যসমতা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা উঠে আসে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করে পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট গাইনোকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিএজিএসবি) ও প্রথম আলো। এর সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

কিশোর-কিশোরীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও যুক্ত করতে হবে

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম বলেন, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে।

কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্নার ও ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক ফিরোজা বেগম বলেন, বিদ্যালয়ে বয়ঃসন্ধি, মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি ও বিভিন্ন প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা নিয়েও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। তবে বাল্যবিবাহ এখনো বড় সমস্যা। অল্প বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশুর জন্য নানা ঝুঁকি তৈরি করে। এ জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনাসেবা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের কম খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে হবে।

কৈশোর স্বাস্থ্যঝুঁকির সময় হলেও এ বয়সেই সুস্থ জীবনের ভিত্তি তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেন পিএজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক কোহিনূর বেগম। তিনি বলেন, তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের জন্য কর্মসূচি নেওয়ার সময় তাদের মতামত শুনতে হবে। সেবাকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলো ঠিকভাবে চলছে কি না, তা-ও দেখতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন পিএজিএসবির মহাসচিব অধ্যাপক গুলশান আরা এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন আব্বাসি।

অধ্যাপক গুলশান আরা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণেও যুক্ত করতে হবে। চিকিৎসক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

মাসিক নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন এন্ডোমেট্রিওসিস অ্যান্ড অ্যাডেনোমাইওসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএএসবি) মহাসচিব অধ্যাপক সালেহা বেগম চৌধুরী। তিনি বলেন, সাধারণত ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সে মাসিক শুরু হয়। এ সময় কী ধরনের শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, এসব বিষয়ে কিশোরীদের জানাতে হবে। পিসিওএসের মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও শুধু আলট্রাসনোগ্রামের ফল দেখে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়; উপসর্গ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রওশন আরা বলেন, কৈশোরের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন ও মাসিক নিয়ে পরিবারের খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। ছেলেদেরও এসব বিষয়ে জানাতে হবে।

সচেতনতা তৈরির দায়িত্ব সবার

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুলতানা আফরোজ শীলা বলেন, মাসিক কোনো রোগ নয়; এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। মাসিকের কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বা স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা দেওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির দায়িত্ব সবার।

কিশোরদের যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে তেমন আলোচনা হয় না বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা আলগিন। তিনি বলেন, বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মানসিক স্বাস্থ্য যাচাই, কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।

বয়ঃসন্ধি, মাসিক, পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য মানুষকে জানাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন আব্বাসি।

চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রমে কৈশোরস্বাস্থ্যকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবেদ হোসেন।

গোলটেবিল বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার ফারহান আহমেদ।