কোলোরেক্টাল ক্যানসার: ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা
বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জনস ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘কোলোরেক্টাল ক্যানসার: ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৬ মার্চ ২০২৬
অংশগ্রহণকারী:
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর, সাবেক সভাপতি, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ। অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, সভাপতি, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। অধ্যাপক ডা. এ এম এস এম শরফুজ্জামান, সভাপতি, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ। অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধ্যাপক ডা. মো. রশিদুল ইসলাম, সভাপতি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জনস; বিভাগীয় প্রধান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অধ্যাপক ডা. মো.শাহাদাত হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক ডা. শাহাদৎ হোসেন শেখ, চেয়ারম্যান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল ইসলাম, মহাসচিব, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন খান, সাধারণ সম্পাদক, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ; অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক ডা. তারিক আখতার খান, বিভাগীয় প্রধান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ডা. মো. শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জন; সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। ডা. ইসমাত জাহান লিমা, সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ডা. মোহা. মেজবাহুল বাহার, সহকারী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সূচনা বক্তব্য: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর
সাবেক সভাপতি, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ
কোলোরেক্টাল ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে দৈনিক প্রথম আলোর সঙ্গে এ যৌথ আলোচনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা যুক্ত হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, এর মাধ্যমে জনগণের কাছে অত্যন্ত জরুরি কিছু বার্তা পরিষ্কারভাবে পৌঁছাবে।
আমরা সবাই জানি, ক্যানসার মানেই ভয়। একসময় আমাদের দেশে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল; এখন তা বেড়েছে। এর বড় কারণ আমাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। বাংলাদেশ ডায়রিয়ানির্ভর দেশ থেকে এখন কোষ্ঠকাঠিন্যনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। মাংস, বিশেষ করে গরুর মাংসের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। ফাস্টফুডের প্রবণতা তীব্র হয়েছে আর শাকসবজি ও ফল খাওয়ার অভ্যাস কমেছে। পরিবার ছোট হয়েছে, সন্তানের আবদার বেড়েছে আর খাবারের পছন্দে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এসবই সমস্যাকে গভীর করেছে। শিশুকাল থেকেই আমরা অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাবারের গুরুত্ব উপেক্ষা করে চলেছি।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। আমরা জানি, প্রায় সব শাকসবজিতেই ফাইবার বা আঁশ থাকে। ঝিঙা, লাউ, ডাঁটা শাকসহ অন্যান্য সবজিতে প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য আমাদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত এসব আঁশসমৃদ্ধ শাকসবজি রাখা প্রয়োজন।
কোলোরেক্টাল ক্যানসার সাধারণত একটি পলিপ দিয়ে শুরু হয়। তাই প্রত্যেকের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত পলিপ সৃষ্টি রোধ করা। প্রতিদিন নিয়মিত টয়লেট, আঁশসমৃদ্ধ খাবার, লাল মাংস কম খাওয়া, ফল ও সবজি বেশি খাওয়া ইত্যাদি অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। স্থূলতা কমাতে ব্যায়াম করতে হবে। জাঙ্কফুড কমাতে হবে। পায়খানায় রক্ত এলে ‘সাধারণ রক্ত আমাশয়’ ধরে নিয়ে ওষুধ খেয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া বিপজ্জনক। এই ভুল অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
বয়স চল্লিশের পর নিয়মিত কলোনস্কোপি অত্যন্ত প্রয়োজন। যাঁদের পারিবারিক ইতিহাস আছে বা যাদের পলিপ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি জরুরি। ক্যানসার সারানো যায়, কিন্তু চিকিৎসা কঠিন ও কষ্টদায়ক। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ
সভাপতি,
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)
কোলোরেক্টাল ক্যানসার নিয়ে এমন উদ্যোগ আমাদের দেশে খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সচেতনতার আসল উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো। আমরা চিকিৎসকেরা সেমিনারে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি, কিন্তু সেই জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, এটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চাই কোলোরেক্টাল ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতার ওপর। মানুষকে বোঝাতে হবে, যত দ্রুত চিকিৎসকের কাছে আসা যায় ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আসা যায়, তত বেশি এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। খাদ্যাভ্যাস ঠিক করা সবচেয়ে জরুরি। ‘ক্যানসার’ শব্দটি মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে, কিন্তু সঠিক সময়ে পরীক্ষা হলে অনেক ঝুঁকি এড়ানো যায়। এখানে ‘আর্লি ডায়াগনোসিস’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সহজ পরীক্ষা এফআইটি (ফিট) টেস্ট। সারা দেশেই এটি সহজে চালু করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনক হলো, দেশের অনেক ভালো ল্যাবেও এখনো এই পরীক্ষা হয় না। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় এটি বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা উচিত। এতে মানুষ কম খরচে প্রাথমিক পরীক্ষা করাতে পারবে।
কলোনোস্কপির ক্ষেত্রেও সংকট আছে। দেশের মাত্র কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজে কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ রয়েছে। জনবল কম, অবকাঠামোও সীমিত। অথচ সরকারি পর্যায়ে এসব বিভাগ চালু করতে পারলে বেসরকারি খাতেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বিস্তৃত হবে। কলোনোস্কপি অনেকের পক্ষে ব্যয়বহুল, কিন্তু সরকারি হাসপাতালে খুব কম খরচেই এটি করা সম্ভব, শুধু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় সমস্যা রেডিওথেরাপি। সরকারি পর্যায়ে যে কয়টি মেশিন আছে, সেগুলো বেশির ভাগ সময় অকেজো থাকে। ফলে রোগী চিকিৎসা শুরুর আগেই মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। এখানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সবশেষে আমি মনে করি যে কোলোরেক্টাল বিষয়ে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ইনস্টিটিউট হলে জনবল তৈরি হবে, গবেষণা বাড়বে, রোগীর সেবা উন্নত হবে।
অধ্যাপক ডা. এ এম এস এম শরফুজ্জামান
সভাপতি,
সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ
কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসা চারটি ধাপে করা হয়—রোগপ্রতিরোধ, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন। সচেতনতার মূল ভিত্তি হলো আগাম রোগ প্রতিরোধ। এ জন্য আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে প্রথমে ভীতি বোঝানো জরুরি—এই ক্যানসার দেশে তৃতীয় প্রধান এবং মৃত্যুর কারণের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে। এই ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট ভোগ করে, যার প্রভাব পরিবারেও পড়ে।
সচেতনতা বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর মতো সংস্থা কাজ করছে। তারা পোস্টার ও ব্যানারের মাধ্যমে সীমিত আকারে প্রচার করছে। কিন্তু আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ধারণা দেওয়া। যেসব শিশু জাঙ্ক ফুড খেতে চায়, তাদের ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা দরকার। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার বিষয় রাখা উচিত।
শুরুতেই রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে পায়ুপথের ব্লিডিং নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ব্লিডিংকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। সঠিক সময়ে ডাক্তার রোগীকে পরীক্ষা করলে প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব। ফিট টেস্টের মাধ্যমে শুরুতেই রোগ শনাক্তকরণ সহজ হবে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের কোলোরেক্টাল সার্জনরা দক্ষ। মলিকুলার টেস্ট ও রেডিয়েশন সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন। চিকিৎসা প্রযুক্তির আপডেট ও ক্যানসারের ওষুধ সাশ্রয়ী করা গেলে রোগীরা সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে পুনর্বাসন প্রোগ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আগাম রোগ প্রতিরোধ, শুরুতেই রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং ওষুধ—এই সব ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ালে আমরা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারব। সচেতনতা বাড়ানোর কাজে মিডিয়া সঙ্গী হলে দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হবে এবং আমরা সবাই মিলেই কার্যকর অবদান রাখতে পারব।
অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান
অতিরিক্ত মহাপরিচালক ( প্রশাসন),
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
আলোচনায় ফিট টেস্টের কথা এসেছে। কোলোরেক্টাল ক্যানসার সম্পর্কে ধারণা পেতে ফিট টেস্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সোসাইটির পক্ষ থেকে যদি খরচের ধারণা পাই, আমি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। স্থানীয় ও উপজেলা পর্যায়ে এই পরীক্ষা চালু করা সম্ভব। স্টুল কালেকশন ও পরীক্ষার কিট প্যাকেট করে পাঠানোর বিষয়টি বাস্তবায়নযোগ্য। এখানে তিন পক্ষের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি—স্বাস্থ্য প্রশাসন, সোসাইটির চিকিৎসকবৃন্দ ও সরকার। আগামী মাসে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর সঙ্গে সোসাইটির যৌথ বৈঠক হলে সারা দেশে সচেতনতা কার্যক্রম আরও সুনিয়ন্ত্রিতভাবে চালানো সম্ভব হবে।
সহজ, গ্রহণযোগ্য স্লোগান ও বার্তা ব্যবহার করলে জনসাধারণ গ্রহণ করবে। যেমন: স্তন ক্যানসার ও জরায়ুমুখ ক্যানসার সচেতনতার বিষয়টি এখন ঘরে ঘরে পৌঁছেছে। একইভাবে কোলোরেক্টাল ক্যানসার নিয়েও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষ অন্তত খেয়াল করবে মলের সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে কি না; এটি প্রাথমিক শনাক্তকরণকে অনেক সহজ করবে।
এন্ডোস্কপি সুবিধা সম্প্রসারণ অবশ্যই জরুরি। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে, যাতে পরীক্ষা সহজ ও সাশ্রয়ী হয়। এ ছাড়া কোলোরেক্টাল ইনস্টিটিউট তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটি বড় বিনিয়োগসাপেক্ষ, তাই এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখা যেতে পারে।
কোলোরেক্টাল সার্জারির জন্য সুপারনিউমারি পোস্টও অত্যন্ত দরকারি। আমরা প্রায় সাত হাজার পোস্ট তৈরি করেছি, যার ১০-১৫টি কোলোরেক্টাল সার্জারির। এগুলো স্থায়ী হলে নতুন ইউনিট ও বিভাগ গড়ে তোলা সহজ হবে। চিকিৎসক ও প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় আমরা স্বাস্থ্যসেবায় এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো সফল করতে পারব বলে আশাবাদী।
অধ্যাপক ডা. মো. রশিদুল ইসলাম
সভাপতি, বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জনস; প্রধান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আমরা সবাই জানি, ক্যানসার একটি মরণব্যাধি। কোলোরেক্টাল ক্যানসার হচ্ছে বৃহদন্ত্রের ক্যানসার। এটি বিশ্বে তৃতীয় সর্বাধিক ক্যানসার ও ক্যানসারজনিত মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২০ লাখ (১.৯২ মিলিয়ন) নতুন রোগী শনাক্ত হয়, আর বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে চারজন আক্রান্ত হয়।
এই রোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পলিপ। পলিপ এই ক্যানসারের পূর্বাবস্থা। যদি আমরা সময়মতো পলিপ শনাক্ত করি ও অপসারণ করি, তাহলে ক্যানসার প্রতিরোধ সম্ভব। একটি পলিপ থেকে ক্যানসার হওয়ার সময়সীমা ১০ থেকে ১৫ বছর। পরে এটি দ্রুত অগ্রসর হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করলে নিরাময়ের সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশের বেশি।
কোলোরেক্টাল ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতার মূল দিক হলো জীবনধারার পরিবর্তন, ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন, আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম ও নিয়মিত টয়লেটের অভ্যাস। স্কুলের পাঠ্যক্রমে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা শেখানো গেলে ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
আগাম রোগ শনাক্তকরণের জন্য ফিট বা এফওবিটি টেস্ট খুব কার্যকর। পায়ুপথে ব্লিডিং দেখা গেলে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের কোলোরেক্টাল সার্জনদের দক্ষতা খুবই উঁচু মানের। সঠিক চিকিৎসা ও সাশ্রয়ী ওষুধের মাধ্যমে রোগীদের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও সমাজকর্মীরা একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে কোলোরেক্টাল ক্যানসার কমানো সম্ভব। সাধারণ মানুষের মধ্যে লোকলজ্জা ও ভীতি দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন
সাবেক চেয়ারম্যান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ,
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
কোলোরেক্টাল ক্যানসারের উৎপত্তি হয় শরীরের ভেতরে। শরীরের বাইরের ক্যানসারগুলো সহজে শনাক্ত করা যায়, রোগী নিজে দেখেই ডাক্তারকে দেখাতে পারে। কিন্তু ভেতরের ক্যানসারের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবে অনেক সময় রোগী দেরি করে ফেলে। তাই জনগণকে সচেতন করা এবং দ্রুত ডাক্তারকে পাঠানোর জন্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া আমাদের মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেকোনো বয়সের মানুষ পায়খানার সঙ্গে রক্ত দেখলেই ডাক্তারকে দেখাতে হবে। রক্তের কারণ যা-ই হোক, আমাশয়, পাইলস বা ফিসার-রক্ত গেলেই ডাক্তার দেখানো আবশ্যক। উপজেলা পর্যায়ে এটি পরীক্ষা করা সম্ভব। ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন করে প্রাথমিকভাবে রোগ শনাক্ত করা যায়। রক্ত গেলে রোগীর ইতিহাস নিয়ে স্টুল সংগ্রহ করে ফিট টেস্ট করানো যায়। এটি ঢাকায় অনেক জায়গায় আছে এবং এটি সাশ্রয়ী একটি পরীক্ষা। শুধু আমাদের ল্যাবরেটরি সুবিধা থাকলেই উপজেলা পর্যায়েও ফিট টেস্ট করা সম্ভব।
আগাম রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। শাকসবজি, ফলমূল ও সালাদ নিয়মিত খেতে হবে। বাংলাদেশের প্রচলিত ফল যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, বরই, আতা ও বেল খাওয়া শিশুদের অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি। সব জায়গায় বছরের সব সময় পাওয়া যায় এমন ফল খেতে হবে।
অনেকে টিউমারকে গুরুত্ব দেয় না। নির্দোষ টিউমার বা পলিপ থেকে ক্ষতিকর টিউমার হতে ১২-১৫ বছর সময় লাগে। আমি বলি, বিনাইন টিউমার বিড়ালের মতো, ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বাঘের মতো। বিড়ালকে পোষ মানানো যায়, বাঘকে নয়। তাই ক্যানসারকে বিড়াল অবস্থাতেই ধরতে হবে।
অধ্যাপক ডা. শাহাদৎ হোসেন শেখ
চেয়ারম্যান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ,
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
আজকের মূল আলোচনা কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও স্ক্রিনিং নিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য রোগীকে দেশের বাইরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসা সম্ভব।
অনেক আগে কিছু সময় আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মলিকুলার স্টাডি। আগে ভারত বা পার্শ্ববর্তী দেশে স্যাম্পল পাঠাতে হতো, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এখন অনেক সেন্টারে দেশেই মলিকুলার স্টাডি হচ্ছে, বিশেষ করে আইসিডিডিআরবির সঙ্গে সমন্বয়ে। এভাবে খরচও বেশি লাগে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রেডিওথেরাপি। দেশে অনেকগুলো মেডিকেল কলেজে রেডিওথেরাপি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। তাই যেখানে চালু আছে, সেখানে রোগী এপয়নমেন্ট পেতে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। যদি অন্তত পুরোনো আটটি মেডিকেল কলেজে রেডিওথেরাপি মেশিন সচল করা যায়, তাহলে রেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক উন্নত হবে। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এখন দেশেই উন্নতমানের ল্যাপারোস্কপি চিকিৎসা সম্ভব। বিভিন্ন সেন্টারে ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। বিদেশে গিয়ে অকারণে রোবটিক সার্জারি করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ কোনো স্টাডি এখনো প্রমাণ করেনি যে এটি ল্যাপারোস্কপির চেয়ে বেশি সুবিধা দেয়।
আমি সবাইকে অনুরোধ করছি, রেডিওথেরাপি বিষয়টি গুরুত্ব দিন। আমাদের দেশের রোগী যেন বিদেশে না যেতে হয়। এতে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ীও হবে। বিশেষভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
অধ্যাপক ডা. মো. জহিরুল ইসলাম
মহাসচিব,
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)
বাংলাদেশে কোলোরেক্টাল ক্যানসার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ। ক্যানসার চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা খুবই জরুরি। চিকিৎসকেরা রোগীকে চিকিৎসা দেবেন, কিন্তু সাধারণ মানুষকে জানানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কেন এবং কী কারণে কোলোরেক্টাল ক্যানসার হচ্ছে এবং কী করলে পরবর্তী ধাপে সমস্যা বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ মানুষ প্রায়ই প্রশ্ন করে, শুধু রক্ত গেলেই কি ক্যানসার ভেবে চিন্তা করতে হবে। এ জন্য আমাদের একটি সহজ গাইডলাইন থাকা দরকার, যাতে মানুষ বুঝতে পারে কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সার্জনরা অপারেশন করবেন। কিন্তু কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির জন্য রোগীকে অনকোলজিস্ট বা ক্যানসার হসপিটালে যেতে হয়। সে ক্ষেত্রে সমন্বিত টিম গঠন করলে চিকিৎসা আরও কার্যকর হবে। ডায়েটের ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদদের ভূমিকা রয়েছে। সচেতনতা বাড়ালে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তারা এখন ফাস্টফুড ও জাঙ্ক ফুডে অভ্যস্ত। স্কুলে শিক্ষামূলক প্রচারণা জরুরি।
বর্তমান সরকার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতিতে বিশ্বাসী। আপনারা যে স্ক্রিনিং প্ল্যান করেছেন, সরকারের সঙ্গে আলাপ করলে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব। সামান্য বিনিয়োগে বড় সাশ্রয় হলে সরকার অবশ্যই সমর্থন দেবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে মিনি ল্যাব গঠন করা হয়েছে, সেখানে ব্লাড টেস্ট রাখলে স্ক্রিনিং কার্যকর হবে।
একবার পলিসি স্তরে রেডিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসার জন্য প্রতিটি ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে ক্যানসার হাসপাতাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা সমন্বিতভাবে চেষ্টা করলে এটি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। আশা করি, জনগণ উপকৃত হবে, কোলোরেক্টাল ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব কমবে।
অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন খান
সাধারণ সম্পাদক, সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ;
অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
সোসাইটি অব সার্জনস হলো একটি প্যারেন্ট অর্গানাইজেশন। বিভিন্ন সার্জারির সঙ্গে যুক্ত ২৩টি সাবজেক্ট মিলে আমরা সার্জনদের দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দিচ্ছি। কোলোরেক্টাল এখন আলাদা একটি সাব-স্পেশালিটি, যেখানে সার্জনরা নির্দিষ্টভাবে কাজ করছেন।
‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ যদি আমরা আগাম প্রতিরোধ করি, তাহলে রোগীর শুধু জীবন বাঁচাবে না, অর্থনৈতিক ব্যয়ও কমবে, পরিবারও উপকৃত হবে। কোলোরেক্টাল ক্যানসার একটি সহজে শনাক্তযোগ্য ক্যানসার। যেহেতু মানুষ প্রতিদিন মলত্যাগ করেন, তাই পায়খানায় রক্ত গেলে সচেতন হওয়া উচিত। যেকোনো বয়সে রক্ত গেলে আগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখাতে হবে। যদি রক্ত না যায়, ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী স্টুল টেস্ট করানো দরকার। স্টুল টেস্ট পজিটিভ হলে কলোনোস্কপি করে শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।
পায়খানায় রক্ত গেলে সচেতন হতে হবে, আর ৪০ বছরের পরে স্টুল টেস্টের মাধ্যমে কলোনোস্কপি করা উচিত। পলিপ বা অ্যাডেনোমা থেকে ক্যানসার পর্যন্ত যেতে কমবেশি ১৫ বছর সময় লাগে। আমরা যদি আগে শনাক্ত করি, প্রতিরোধ সম্ভব। লাল মাংস কমানো, আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন কমানো—এসব রিস্ক ফ্যাক্টর বিষয়ে সচেতন হয়ে আমরা ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন আনতে পারি। আর যেসব সমস্যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি না বা জেনেটিক, সেগুলো আমরা পরিবারের ইতিহাস দেখে শুরুতেই শনাক্ত করি। রোগনির্ণয়ের পরে প্রোফাইল্যাকটিক সার্জারি করা যায়।
আমরা সোসাইটি অব সার্জনস হিসেবে সার্জনদের সঙ্গে আছি এবং যৌথভাবে কলাবুরেশন প্রোগ্রাম করব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে অনুরোধ, ‘পাঠ্যপুস্তকে ক্যানসার সচেতনতা ও স্ক্রিনিং’ অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
অধ্যাপক ডা. তারিক আখতার খান
বিভাগীয় প্রধান, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ,
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
আমি মূলত কোলোরেক্টাল ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সাশ্রয়ের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলব। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোলোরেক্টাল ক্যানসার স্ক্রিনিং একটি অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ। প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে চিকিৎসার খরচ বাবদ প্রায় ৭ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
কোলোরেক্টাল ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর অপারেশন, কেমোথেরাপি ও অন্যান্য থেরাপি মিলিয়ে খরচ গড়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা হয়। অথচ প্রাথমিক স্ক্রিনিং টেস্টে খরচ হয় মাত্র ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের ফলাফল নেগেটিভ আসে। ফলে ব্যয়বহুল কলোনোস্কোপি পর্যন্ত তাঁদের যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কেবল বাকি ১০ শতাংশ রোগী, যাঁরা পজিটিভ, তাঁদের কলোনোস্কোপি করতে হয়। বেসরকারি পর্যায়ে এই কলোনোস্কোপির খরচ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
যদি আমরা জাতীয় পর্যায়ে এই স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু করতে পারি, প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ শনাক্ত হবে। ফলে রোগীর জীবন বাঁচানোও অনেক সহজ হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, স্ক্রিনিং টেস্টে পলিপ ধরা পড়লে এটি অপসারণ করার মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। সচেতনতা দরকার বাংলাদেশ সরকারের, যার মাধ্যমে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করে ক্যানসার প্রতিরোধ ও জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে; পাশাপাশি ক্যানসার চিকিৎসার খরচ কমানো যাবে। সচেতনতা দরকার জনগণের, যাতে তাঁরা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারেন।
ডা. মো. শহিদুল ইসলাম
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জন;
সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
কলোরেক্টাল ক্যানসার ধীরে ধীরে বাড়ে, কিন্তু শুরুতেই ধরা পড়লে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি ভালো হওয়া সম্ভব। তাই দেরি না করে নিয়মিত স্ক্রিনিং করা খুব জরুরি।
এ বছর কলোরেক্টাল ক্যানসার সচেতনতা মাসের মূল লক্ষ্য হলো—‘স্ক্রিনিং-এর মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ’। এ ক্ষেত্রে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর একটি পরীক্ষা হলো ফিট (FIT) টেস্ট, যেখানে মলের সামান্য নমুনা দিয়ে প্রাথমিকভাবে সমস্যা আছে কি না বোঝা যায়। বিশেষ করে ৪০ বছর পার হলে বা পরিবারে কারও এ রোগের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত এই পরীক্ষা করা উচিত।
খাদ্যাভ্যাসেও ছোট পরিবর্তন বড় সুরক্ষা দিতে পারে। প্রতিদিন বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। লাল মাংস, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখে এবং ক্যানসার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
আগাম রোগপ্রতিরোধের জন্য সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মনে রাখবেন, পায়খানার অভ্যাসে পরিবর্তন, রক্ত পড়া, দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা অকারণে ওজন কমে গেলে তা কখনোই অবহেলা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও সময়মতো ফিট টেস্ট—এই তিনটি বিষয়ই কলোরেক্টাল ক্যানসার প্রতিরোধ ও আগেভাগে শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ডা. ইসমাত জাহান লিমা
সহযোগী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
একটিমাত্র পলিপ থেকেও কোলোরেক্টাল ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে পলিপ আছে কি নেই, তা আগে নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবছর সবার জন্য কলোনোস্কপি করানো সম্ভব নয়। এ জন্য আমরা যে স্ক্রিনিং টেস্ট ব্যবহার করি, সেটি হলো ফিট টেস্ট। ফিট টেস্টে থাকে একটি কিট। সাধারণত ৪০ বা ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা ঘরে বসেই এই কিটে নিজের স্টুল সংগ্রহ করে সেন্টারে পাঠাতে পারেন।
যাঁদের কোনো উপসর্গ দেখায় না—যেমন রক্তপাত বা ব্যথা—তাঁরাও প্রতিবছর এই টেস্ট করতে পারেন। প্রতিবছর নিয়মিত এই স্ক্রিনিং করলে আমরা সহজেই নির্ণয় করতে পারব যে স্টুলে রক্ত আছে কি নেই। যাঁদের কোনো লক্ষণ নেই, এমন ব্যক্তির মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের ফিট টেস্টে স্টুলে রক্ত পাওয়া যায়। যাঁরা পজিটিভ হন, তাঁদের কলোনোস্কপি করতে হবে। আমরা চাই, এই স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম যেন বাংলাদেশের সব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ফিট টেস্টের কিট সরবরাহ করা সম্ভব। খরচও খুব কম—৬০০ টাকা কিট, মোট খরচ ৭০০ টাকার মতো। বিএমইউ এবং আরও কয়েকটি কেন্দ্রে নিয়মিত এই পরীক্ষা করা হয়।
আমি সরকারের কাছে আবেদন করব, যেন খুব শিগগির বাংলাদেশে কোলোরেক্টাল ক্যানসার প্রতিরোধে জাতীয় স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু হয়। মানুষ যাতে ভয় না পেয়ে সহজে পরীক্ষায় অংশ নেন। সঠিক স্ক্রিনিং ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা অনেক ক্যানসার রোধ করতে পারি।
ডা. মোহা. মেজবাহুল বাহার
সহকারী অধ্যাপক, কোলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
মার্চ মাসে কোলোরেক্টাল ক্যানসার সচেতনতার মাস হিসেবে পালন করা হয়। কোলোরেক্টাল ক্যানসার একটি প্রাণঘাতী রোগ। কিন্তু আশার কথা হলো, এই ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাময় ও প্রতিরোধযোগ্য।
প্রথম প্রশ্ন হলো, কীভাবে আমরা রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের কাছে আনতে পারি। যদি আমরা সাধারণ মানুষকে ক্যানসারের লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে পারি, তাঁরা সময়মতো চিকিৎসকের কাছে আসবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী এলে নিরাময় সম্ভব। এ ছাড়া আমরা তাঁদেরকে জানাতে পারি যে কিছু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব। শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ, কম প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম—এসব অভ্যাস স্থাপন করলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
যেকোনো বিনাইন পলিপ থেকে ক্যানসার শুরু হয়। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্ক্রিনিং। আমরা যদি জনগণকে সচেতন করি যে নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট পরীক্ষা—যেমন ফিট টেস্ট, স্টুল টেস্ট ও কলোনোস্কপি—সময়মতো করা জরুরি। তাহলে ক্যানসার হওয়ার আগেই এটি শনাক্ত করা সম্ভব। আজকের গোলটেবিল বৈঠক থেকে আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, যেন এই স্ক্রিনিং প্রোগ্রামকে আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সুপারিশ
কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি, ফলমূল) বেশি খেতে হবে, লাল মাংস ও জাংক ফুড কমাতে হবে।
যে কোনো বয়সে রক্ত গেলে ডাক্তার দেখানো; এটি প্রাথমিক শনাক্তকরণকে সহজ করবে।
৪০ বছরের পর সবাইকে নিয়মিত স্টুলের ফিট টেস্ট করানো। ফিট টেস্ট ও কলোনোস্কপি পাইলট প্রজেক্টে উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে চালু করা।
সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে কলোনোস্কপি সহজ ও সাশ্রয়ী করা।
মিডিয়ার প্রচার ও পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের শিক্ষিত করা।
কোলোরেক্টাল ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষায়িত ইনস্টিটিটিউট স্থাপন করে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও রোগীর সেবা উন্নত করা।