শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
বিশ্ব শৈশব ও কৈশোর মানসিক স্বাস্থ্য দিবস(২৩ এপ্রিল) উপলক্ষে ইউনিসেফ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী:
অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল;
ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ
অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়;
দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক (এমএনসিএএইচ), ইউনিসেফ বাংলাদেশ;
ডা. মো. মাহবুবুর রহমান
সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল;
ডা. আসিফ ইকবাল
সহকারী পরিচালক (স্কুল হেলথ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর;
মো. সাজ্জাদুল ইসলাম
পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), শিশু সুরক্ষা বিভাগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর;
ডা. মো. মনজুর হোসেন
সহকারী পরিচালক, এমসিএইচ-সার্ভিসেস ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর;
ডা. মো. নিজাম উদ্দিন
সদস্যসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি);
ডা. ফারিহা হাসিন
অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়;
হাসিনা মমতাজ
ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (মানসিক স্বাস্থ্য), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ;
লায়লা ফারহানা আপনান বানু
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ;
ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু, কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল;
ডা. মো. রাহেনুল ইসলাম
সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ (বাকাম);
ডা. সিফাত-ই–সাইদ
সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়;
ড. সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহীদ
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়;
মোহাম্মদ সোহেল শমীক
সহযোগী প্রকল্প সমন্বয়ক, আইসিডিডিআরবি;
তৌহিদা শিরোপা
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, মনের বন্ধু;
ডা. সাদিয়া আফরিন
সহকারী অধ্যাপক, শিশু, কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল;
ডা. সাবরিনা রাফি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, অ্যাডলেসেন্ট হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ;
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার
পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
আমাদের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একজন শিশুর জীবনের শুরুতেই যদি তার মা–বাবা বা প্রধান যত্নকারীর সঙ্গে নিরাপদ সংযুক্তি গড়ে না ওঠে, তাহলে তার মধ্যে পরবর্তী সময়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জায়গাটি একজন মানুষের মনোসামাজিক ও নৈতিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আমরা যদি মানবিক ও সুস্থ মানুষ গড়ে তুলতে চাই, তবে এই প্রাথমিক বিকাশকে গুরুত্ব দিতেই হবে।
প্যারেন্টিং এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিবাচক প্যারেন্টিং কী—এটি না জেনে সন্তানের সঠিক লালন-পালন সম্ভব নয়। তাই অভিভাবকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, একক কোনো প্যারেন্টিং পদ্ধতি নেই; এটি শিশুর বয়স, বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ভিন্ন হয়।
শিশুর মানসিক সুস্থতার জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রসবোত্তর বিষণ্নতা প্রতিরোধে পারিবারিক সহায়তা এবং কুসংস্কার দূর করতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
আমাদের বিদ্যমান নীতিমালা বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য হতে হবে। স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, বুলিংবিরোধী কার্যক্রম, সামাজিক-আবেগপ্রবণ শিক্ষা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক গাইডলাইন, আধুনিক ডেটা সিস্টেম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু-কিশোর মানসিক সমস্যায় ভুগছে, যার ৯৪ শতাংশ চিকিৎসার বাইরে। এই বিশাল ব্যবধান কমাতে হলে দ্রুত শনাক্তকরণ, কার্যকর রেফারেল ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ
অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে হলে আমাদের মূল জায়গাগুলোতে যেতে হবে। আমি অটিজম সেলে পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় দেখেছি, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় পরামর্শকেন্দ্র গড়ে উঠলেও অনেক সময় সেখানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির অভাব দেখা যায়। এটি আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা জরুরি।
আমাদের দক্ষ জনবল তৈরি করে সেই জনবল দিয়েই সচেতনতা ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অদক্ষ বা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে টেকসই ফল পাওয়া যায় না। মানসিক স্বাস্থ্য জন্মের সময় থেকেই শুরু হয়; এমনকি এক বছরের শিশুও তার পরিবেশ ও মনোযোগ অনুভব করে। তাই শুরু থেকেই সঠিক লালন-পালন নিশ্চিত করা জরুরি।
লালন-পালন (প্যারেন্টিং) সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। প্রতিটি শিশুই আলাদা, তাই তাদের একইভাবে বিচার করা যায় না। অভিভাবককে তাঁর সন্তানকে বুঝতে হবে, তাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা নিতে হবে। সমস্যাগুলো বড় হওয়ার আগেই চিহ্নিত করা গেলে অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও এখন নানা ধরনের নির্যাতন ও মানসিক চাপে পড়ছে, যা আগে অনেকটা আড়ালে থাকলেও এখন কিছুটা সামনে আসছে।
আমাদের বাজেট, পরিকল্পনা ও সম্পদের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবহার জরুরি, যাতে কোন খাতে কীভাবে বিনিয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা যায়। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব।
দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক (এমএনসিএএইচ), ইউনিসেফ বাংলাদেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ভিত্তি। এটি শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও পারিবারিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই শুরু থেকেই এ খাতে বিনিয়োগ করা জরুরি।
দেশে ১৪ শতাংশের বেশি শিশু মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভুগছে। ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশের আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য–উপাত্তের অভাব, আলাদা প্রশিক্ষণ মডিউল না থাকা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যথাযথ সেবা না থাকা, বাজেট ঘাটতি, সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য।
মানসিক স্বাস্থ্য কেবল হাসপাতালভিত্তিক বিষয় নয়; বরং এটি একটি বহু খাতভিত্তিক ব্যবস্থা। পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা, কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থা এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও এখন মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে একীভূত করা।
নীতি থাকলেই হবে না, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নই মূল বিষয়। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ডা. মো. মাহবুবুর রহমান
সাবেক পরিচালক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভোগেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে ৯৪ শতাংশই চিকিৎসার আওতায় থাকেন না। এই ব্যবধান কমাতে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে একীভূত করা।
মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় কিছু কার্যক্রম চললেও টেকসই অগ্রগতির জন্য বাজেট বৃদ্ধি ও নীতি পর্যায়ে শক্তিশালী অ্যাডভোকেসি জরুরি।
বর্তমানে সেবা মূলত বিশেষায়িত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, তৃণমূল পর্যায়ে তা পৌঁছায় না। কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনার স্কুল হেলথ প্রোগ্রামে শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সিস্টেমে আসা কলগুলো কীভাবে সাড়া দেওয়া হয়, কী ধরনের কাউন্সেলিং দেওয়া হয়, সে বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা দরকার।
ডেটা সিস্টেম, শাসনব্যবস্থা ও জবাবদিহি উন্নত করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনার জন্য নির্ভুল তথ্য প্রয়োজন। স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্য কার্যক্রমে শুধু ভিটামিন বা কৃমিনাশক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ডা. আসিফ ইকবাল
সহকারী পরিচালক (স্কুল হেলথ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য কার্যক্রমে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কমিউনিটি সম্পৃক্ততা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা, স্ক্রিনিং, প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেল এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। মাঠপর্যায় থেকে চিকিৎসা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামো কাজে লাগাতে পারলে এ সেবা আরও কার্যকর করা সম্ভব।
বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় দেশে ২৩টি স্কুল হেলথ ক্লিনিক আছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে কিশোর–কিশোরীদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য টিম গঠনের কাজ চলছে। আমাদের অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ স্ট্র্যাটেজি ২০১৭–২০৩০ সাল পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য, কুসংস্কার দূরীকরণ, মনঃসামাজিক সহায়তা, সহিংসতা প্রতিরোধ ও পুষ্টি বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যালয় পাঠ্যপুস্তকে মানসিক স্বাস্থ্য ও মনঃসামাজিক বিকাশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বিষয়সহ স্বাস্থ্যশিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা ও নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও আমরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তুলতে পারব।
মো. সাজ্জাদুল ইসলাম
পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), শিশু সুরক্ষা বিভাগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর
ইউনিসেফ বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ‘১০৯৮’ চাইল্ড হেল্পলাইনের মাধ্যমে কাজ করছি, যেখানে শিশুরা নানা ধরনের সহায়তার জন্য কল করে। এ হেল্পলাইনে ২৯ জন শিশু সুরক্ষা কর্মী ২৪/৭ কাজ করছেন। ২০২৪ সালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চেয়ে শিশু–কিশোর–কিশোরীদের জন্য কল এসেছিল ৫ হাজার ৩৩০টি। এক বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে এ কলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৪০।
আত্মহত্যার চিন্তা, বিষণ্নতা ও দুঃখবোধসংক্রান্ত ফোন ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সমস্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
আমাদের ৩৭৫ জন শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী সরাসরি মাঠপর্যায়ে শিশু সুরক্ষায় কাজ করছেন এবং ২ হাজার ৮৬৭ জন ইউনিয়ন বা পৌর সমাজকর্মী শিশুদের পরামর্শসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষিত। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের কথা শোনা, সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর কাজ করেন। ইউনিসেফের সহায়তায় কমিউনিটি শিশু সুরক্ষা ও কেস ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত, এরপর সহমর্মিতার মাধ্যমে আস্থা তৈরি করে নির্দেশিকা অনুযায়ী সমস্যা বিশ্লেষণ করে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কল সেন্টারের পরিধি বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে আমাদের।
ডা. মো. মনজুর হোসেন
সহকারী পরিচালক, এমসিএইচ-সার্ভিসেস ইউনিট, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর
গুণগত গর্ভকালীন পরিচর্যায় আমাদের লক্ষ্য মাকে প্রস্তুত করা—গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে কী সমস্যা হতে পারে, তা আগে থেকে জানানো। এটি পরিবারকল্যাণ পরিদর্শকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে করে থাকেন।
মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পরিবার থেকে শুরু করে সেবাকেন্দ্র পর্যন্ত সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাকে সুস্থ রাখতে তার বাড়ির পরিবেশও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সেবাকেন্দ্রে এলে আমরা ঘুম, বিশ্রাম ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে স্ক্রিনিং করি। ঘুমের সমস্যা মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হওয়ায় আমরা এটিকে গুরুত্ব দিই এবং বিশ্রাম ও পুষ্টির পরামর্শ দিই।
প্রসব-পরবর্তী সেবায় চারটি ভিজিটকে গুরুত্ব দেওয়া হয়—৪৮ ঘণ্টার মধ্যে, ৩–৭ দিনে, ১৪ দিনে ও ৪২ দিনে। প্রতিবারই মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দেখা হয়।
সক্ষমতা সীমিত। ২০১৯ সালের সুপারিশ অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য একীভূত করার কথা থাকলেও মনঃসামাজিক সহায়তার ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম গত দুই বছর বন্ধ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য একটি বহুমাত্রিক বিষয়—পরিবার ও সমাজসচেতন না হলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ডা. মো. নিজাম উদ্দিন
সদস্যসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি)
শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য শুরু থেকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য শুধু চিকিৎসা নয়, এটি সমাজের আচরণ ও মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত।
শিশুর বিকাশ গর্ভকালে শুরু হয়। পুষ্টিহীনতা, পারিবারিক অস্থিরতা ও নেতিবাচক পরিবেশ তাদের মানসিক বিকাশে বাধা দেয়। শিশুরা আচরণ অনুকরণ করে শেখে, তাই পরিবার ও পরিবেশ ইতিবাচক হওয়া দরকার। স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সচেতন হয়। ফলে ভবিষ্যতে মানবিক জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।
শিশু ও কিশোর মনোরোগবিদ্যায় নতুন কোর্স চালু হয়েছে, ফলে নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছেন এবং জনসচেতনতা কিছুটা বেড়েছে।
এ ক্ষেত্রে মূল ঘাটতি হলো সচেতনতার অভাব। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে নীতি–সংলাপ ও বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে আন্তবিভাগীয় আলোচনা করছি, যাতে মানসিক স্বাস্থ্য সবার কাছে পৌঁছায়। একই সঙ্গে জনবল, অবকাঠামো ও বাজেটের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করছি পাঠ্যক্রমে এটি অন্তর্ভুক্তি, সচেতনতা বৃদ্ধি ও জনবল–অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার সমন্বিত উদ্যোগে অগ্রগতি সম্ভব।
ডা. ফারিহা হাসিন
অধ্যাপক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ২০২০ সালে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর–কিশোরী, শিক্ষক, সহায়ক ব্যক্তি ও কেয়ারগিভারদের জন্য চারটি পাঠ্য মডিউল তৈরি করে, যা বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশে গত বছর থেকে কাজ শুরু হয়েছে এবং এখন প্রাক্ বাস্তবায়ন পর্যায়ে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চলছে। আমরা বর্তমানে বাগেরহাট ও চাঁদপুরে স্কুলভিত্তিক ও স্কুলের বাইরে থাকা কিশোর–কিশোরীদের নিয়েও কাজ করছি।
অভিভাবকদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক। তাঁরা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আগ্রহী। স্কুলের বাইরে থাকা কিশোর–কিশোরীদের জন্য আলাদা উদ্যোগ দরকার। এ ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি শিশু পরিবারেও এই শিক্ষা প্রয়োজন।
আমরা চার ধাপে কাজ করছি, যা শিক্ষার্থীদের সহজ ভাষায় পরীক্ষার চাপ, সাইবার বুলিং ও সম্পর্কের সমস্যা মোকাবিলা শেখাচ্ছে। এসব উদ্যোগ সফল করতে বাস্তবায়নভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
হাসিনা মমতাজ
ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (মানসিক স্বাস্থ্য), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ
শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক না রেখে পরিবেশভিত্তিক ও সহায়কভাবে বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যেখানে বাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি, কর্মক্ষেত্র, ডিজিটাল পরিসরসহ সব খাত যুক্ত থাকবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বর্তমানে মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রামের আওতায় শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ হচ্ছে, যেখানে বিশেষজ্ঞ নন, এমন সেবা প্রদানকারীরাও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিতকরণ, ব্যবস্থাপনা, ফলোআপ ও রেফারেল-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের জন্য টুলকিট ও স্কুলভিত্তিক কারিকুলাম উন্নয়নের কাজ চলছে, যেখানে প্রাথমিক মানসিক সেবা, কেয়ারগিভার সাপোর্ট ও মনোসামাজিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত।
নিউরো–ডেভেলপমেন্টাল সমস্যা ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কেয়ারগিভারদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ মডিউলও রয়েছে, যা সবার জন্য উন্মুক্ত। স্কুলভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার উন্নয়নেও উদ্যোগ চলছে। শিশু–কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীদারদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লায়লা ফারহানা আপনান বানু
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ
শিশু–কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কেবল মেডিক্যাল মডেল থেকে বের হয়ে মাল্টি-সেক্টরাল পদ্ধতিতে যেতে হবে, যেখানে স্কুল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
শুধু পাঠ্যবই নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; প্রি-সার্ভিস ও ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের প্রস্তুত করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয় বাড়াতে হবে, বিশেষ করে স্কুল হেলথ কার্যক্রমে।
শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতাকে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ—তাঁরা যেন মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বুলিং শনাক্ত করে প্রাথমিক সহায়তা ও সঠিক রেফারেল দিতে পারেন, সে জন্য কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু, কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
শিশু–কিশোরদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা, সাইবার বুলিং ও আত্মহত্যার প্রবণতা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।
শিশু–কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা হতে পারে না—এই ধারণার পরিবর্তন দরকার। পাশাপাশি পড়াশোনার চাপ, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং জিপিএ–নির্ভর প্রতিযোগিতা তাদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। তাই সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকেও মূল্যায়নের অংশ করা উচিত।
মা–বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক বা প্যারেন্টিং একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়। সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ না থাকলে তারা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ গোপন করে। তাই পরিবারে আস্থা ও যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং ও অনলাইন বেটিং শিশু–কিশোরদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। সব মিলিয়ে শিশু–কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতা জরুরি।
ডা. মো. রাহেনুল ইসলাম
সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ (বাকাম)
জাতীয়ভাবে মানসিক স্বাস্থ্যে বরাদ্দ প্রায় ০.৪ শতাংশ, যা মূলত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পাবনা মানসিক হাসপাতালে ব্যবহৃত হয়—শিশু–কিশোরদের জন্য তা যথেষ্ট নয়।
শিশু–কিশোররা পরিবার, স্কুল ও সমাজে বেড়ে ওঠে। বিভিন্ন খাতে আলাদা অর্থ ব্যয় হলেও তা কার্যকরভাবে তাদের কাছে পৌঁছায় না। তাই অর্থ ব্যয় ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নির্ধারণে একটি জাতীয় সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।
২০১৯ সালের তথ্য দিয়ে এখন সঠিক পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণ ও গাইডলাইনেও ঘাটতি রয়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আমরা এখনো বেশি মনোযোগ দিচ্ছি রোগের চিকিৎসায়। বুলিং মানসিক রোগ না হলেও পরবর্তী সময়ে বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে। তাই স্কুল ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগগুলো আলোচনা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি জাতীয় সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে বাস্তবায়িত হওয়া দরকার।
ডা. সিফাত-ই–সাইদ
সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
শিশু–কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই; বিষয়টিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।
পাঠ্যক্রমে ও চিকিৎসা শিক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত চিকিৎসকদের শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকলে সঠিক সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
মানসিক চাপ কমানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি। অনেক দেশে এটি আলাদা প্রোগ্রাম হিসেবে চালু আছে। এতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত সমস্যা শনাক্তকরণ এবং রেফারেল ব্যবস্থা তৈরি হয়। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও এতে যুক্ত করা যায়। ফলে অল্প সময়ে বড় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
শিশু–কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ, স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি ও দ্রুত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
ড. সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহীদ
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
শিশু–কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যে আমরা এখনো চিকিৎসায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, অথচ প্রতিরোধ ও উন্নয়নমূলক কাজগুলোতে আমরা পিছিয়ে আছি। প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এটি অন্তর্ভুক্ত করতে স্পষ্ট নির্দেশনা ও বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
পেশাজীবীদের সমন্বিতভাবে যুক্ত করা দরকার। মনোবিজ্ঞানী ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা শিশুদের আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দক্ষতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। স্কুলভিত্তিক কার্যক্রমে শুধু শিক্ষক নয়, প্রয়োজন হলে স্কুল মনোবিজ্ঞানীও যুক্ত হওয়া উচিত।
নিয়মিত দলভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবনদক্ষতা শেখানো এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে জন্মের শুরু থেকেই মানসিক বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। সব মিলিয়ে প্রতিরোধ ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মোহাম্মদ সোহেল শমীক
সহযোগী প্রকল্প সমন্বয়ক, আইসিডিডিআরবি
২০২২ সাল থেকে আমরা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভিডিও কলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছি; চার জেলার সাতটি কেন্দ্রে ইতিমধ্যে প্রায় ১১ হাজার মানুষ সেবা পেয়েছে। এর মধ্যে ৭৪ শতাংশই নারী এবং কিশোর–কিশোরীদের মধ্যে কিশোরীর সংখ্যাই বেশি। এতে স্পষ্ট, দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছালে নারীরা বেশি উপকৃত হন।
দিনাজপুরে পুষ্টি কর্মসূচির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য যুক্ত থাকায় সচেতনতা বেশি, কিন্তু অন্য এলাকায় তা কম—ফলে ঘাটতি পূরণে এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞের ঘাটতি ও শহরকেন্দ্রিক অবস্থানের কারণে অনলাইন সেবা একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।
স্কুল স্বাস্থ্যসেবায় পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। সব মিলিয়ে নীতিগুলো হালনাগাদ করে সমন্বিতভাবে সেবা সব জায়গায় পৌঁছানো জরুরি।
তৌহিদা শিরোপা
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, মনের বন্ধু
২০১৬ সাল থেকে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে কাজ করছি। বর্তমানে ডব্লিউএইচও, এনআইএমএইচ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং কার্যক্রম চলছে। ইউনিসেফের টুলকিট ব্যবহার করে ব্যবস্থা আরও কার্যকর করাই লক্ষ্য, এ কাজে প্রায় ৪০ জন মাস্টার ট্রেইনার প্রশিক্ষিত হয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, যশোরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকেরা যুক্ত আছেন। ইতিমধ্যে বহু শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং প্রায় ৫০০ শিক্ষক ও ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনলাইন হেল্পলাইনে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কল আসে, যার বড় অংশই কিশোর-কিশোরীদের। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণায় অনলাইন সেবার ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
ডা. সাদিয়া আফরিন
সহকারী অধ্যাপক, শিশু, কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
২০১৮-১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রবণতা প্রায় ১২ শতাংশ এবং ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা ও আত্মক্ষতির প্রবণতা প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা উদ্বেগজনক।
এই প্রবণতা কমাতে প্রতিরোধ ও জরুরি সাড়াদান—দুই দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে ইতিবাচক প্যারেন্টিং, স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও কমিউনিটি সচেতনতা জরুরি। আত্মহত্যার পেছনে বিষণ্নতা, ব্যক্তিগত সমস্যা ও বুলিং-সাইবার বুলিং থাকায় এন্টি-বুলিং কার্যক্রম প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জাতীয় তথ্যভান্ডার গঠন, আত্মহত্যা-সংক্রান্ত আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল প্রতিবেদন জরুরি। দেশে শিশু-কিশোর মনোরোগবিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে, তাই সেবাকাঠামো ও জনবল বাড়াতে হবে।
ডা. সাবরিনা রাফি
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, অ্যাডলেসেন্ট হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ
শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা একটি ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই শিশু-কিশোর। এ খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত লাভজনক—প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ২৩ ডলার পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফেরত পাওয়া যায়।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্য যুক্ত থাকলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা এখনো সীমিত। তাই সব জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফ্রন্টলাইন কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা দরকার।
বড় ঘাটতি হলো শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে কোনো ব্যয়-নির্ধারিত বাজেট বা সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। তাই একটি হালনাগাদ জরিপসহ ব্যয়-নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা ও শক্তিশালী নীতিকাঠামো জরুরি, যাতে কার্যকর অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি আনা যায়।
সুপারিশ:
• শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাতে অন্তর্ভুক্ত করা।
• স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজসেবা ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো (ছাতার নিচে একীভূত ব্যবস্থা) গড়ে তোলা।
• শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকরভাবে একীভূত করা।
• জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা।
• স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাধ্যতামূলক ও বিস্তৃত করা।
• শিক্ষক প্রশিক্ষণ (প্রি-সার্ভিস ও ইন-সার্ভিস) ও স্কুল মনোবিজ্ঞানী অন্তর্ভুক্ত করা।
• পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনদক্ষতা ও সামাজিক-আবেগপ্রবণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।
• শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতা যুক্ত করা।
• ইতিবাচক প্যারেন্টিং ও পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা।
• বুলিং ও সাইবার বুলিংবিরোধী জাতীয় কর্মসূচি জোরদার করা।
• অনলাইন হেল্পলাইন ও টেলি-মেন্টাল হেলথ সেবা আরও সম্প্রসারণ করা।
• অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো।
• জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ও নিয়মিত জরিপ ব্যবস্থা চালু করা।
• শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যয়-নির্ধারিত (কস্টেড) কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।
• মানসিক স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি ও আলাদা করে শিশু-কিশোর অংশ নির্ধারণ করা।
• বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট) জনবল বাড়ানো ও গ্রাম-উপজেলা পর্যায়ে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
• রেফারেল ব্যবস্থা ও জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
• গণমাধ্যমে আত্মহত্যা সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপনের গাইডলাইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
• জন্মের শুরু থেকেই মানসিক বিকাশ ও ইনফ্যান্ট মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া।
• পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটি—সব স্তরে সমন্বিত প্রতিরোধ ও উন্নয়নমূলক কাজ চালু করা।