গোলটেবিল বৈঠক
হেপাটাইটিস প্রতিরোধে চাই সামাজিক অংশগ্রহণ
যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে হেপাটোলজি সোসাইটি ঢাকা, বাংলাদেশ ও প্রথম আলো।
দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত। বিশ্বে যে ১০ দেশে হেপাটাইটিসে মৃত্যু বেশি, সেই তালিকায় বাংলাদেশ আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে দেশ অনেক পিছিয়ে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সামাজিক অংশগ্রহণ জরুরি।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা উঠে আসে। ‘হেপাটাইটিস: প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার সামাজিক অংশগ্রহণ’ শীর্ষক এ বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে হেপাটোলজি সোসাইটি ঢাকা, বাংলাদেশ ও প্রথম আলো। ২৮ জুলাই ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ সামনে রেখে এটির আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম বলেন, ‘চিকিৎসা করে হেপাটাইটিস সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেন এই রোগ না হয়। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, এই রোগ থেকে দূরে থাকতে হবে, রোগ হয়ে গেলে চিকিৎসা করতে হবে।’ তিনি বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জোর দিয়েছে। টিকার আওতা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত টিকার জন্য গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হেপাটোলজি সোসাইটির বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম একটি গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, দেশে ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে পুরুষ ৫৭ লাখ, নারী ২৮ লাখ। ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রজননক্ষম ১৮ লাখ নারীর এই রোগ আছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশু চার লাখ। দেশের প্রায় ১৫ লাখ পরিবারে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ রয়েছে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২৫ লাখ চাকরিপ্রার্থী ও কর্মক্ষম মানুষ হেপাটাইটিস বিতে আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হলেই চাকরিতে অযোগ্য ঘোষণা করা হচ্ছে। এটি বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বেশ কয়েক ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস আছে। যেমন হেপাটাইটিস এ, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, হেপাটাইটিস ডি, হেপাটাইটিস ই ইত্যাদি। একেকটি ভাইরাস একেক ধরনের রোগের জন্য দায়ী। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস সি। এই রোগে ৬৯ শতাংশ মৃত্যু হয় ১০টি দেশে। এর মধ্যে আছে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম।
হেপাটাইটিস সংক্রমণ প্রতিরোধে স্ক্রিনিং ও টিকাদানের প্রয়োজনীয়তার ওপর বক্তব্য দেন জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (হেপাটোলজি) এবং হেপাটোলজি সোসাইটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ কামরুল আনাম। তিনি বলেন, যেসব অঞ্চলে হেপাটাইটিস বির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেসব অঞ্চলের সব প্রাপ্তবয়স্ককে জীবনে অন্তত একবার হেপাটাইটিস পরীক্ষা করা উচিত। যাঁদের লিভারের রোগ আছে, যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, যাঁরা ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় মাদক নেন বা নিতেন, কারাবন্দী, ডায়ালাইসিসে থাকা রোগী, রক্ত বা অঙ্গদাতা, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, গর্ভবতী নারী—এঁদের হেপাটাইটিস পরীক্ষা করা উচিত। এরপর তিনি রোগ শনাক্ত পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং পদ্ধতির বর্ণনা করেন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং হেপাটোলজি সোসাইটির মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক তানভীর আহমদ বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য, শনাক্তযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রেই হেপাটাইটিস নির্মূলযোগ্য। এ ক্ষেত্রে হেপাটোলজি সোসাইটি চিকিৎসকদের জন্য শিক্ষা–প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, বৈজ্ঞানিক সেমিনার ও কনফারেন্সের আয়োজন করে। তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী প্রচার–প্রচারণা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্দিষ্টভাবে স্ক্রিনিং করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে এই সংগঠনের।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও হেপাটোলজি সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক এস কে এম নাজমুল হাসান বলেন, গণমাধ্যমের পাঁচটি কাজ করার আছে—বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা; প্রতিরোধমূলক আচরণকে জনপ্রিয় করে তোলা, মানুষকে স্ক্রিনিংয়ে উদ্বুদ্ধ করা, ভয় ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয় তুলে ধরা এবং জনস্বাস্থ্যনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ২০০৩ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে হেপাটাইটিসের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২০০৩ সালের আগে যাঁদের জন্ম তাঁদের প্রত্যেকের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিতে হবে। তিনি বলেন, নিরীক্ষায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ছাত্রছাত্রী, সেলুনের কর্মী, হাসপাতালের টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবীর ১ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে হেপাটাইটিস আছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রোকনুজ্জামান বলেন, হেপাটাইটিস এ ও হেপাটাইটিস ই ছড়ায় মূলত খাবারের মাধ্যমে। রাস্তার খাবার এ ধরনের হেপাটাইটিসের অন্যতম উৎস। হেপাটাইটিস টিকা কার্যত লিভার ক্যানসার থেকে রক্ষা করে, তাই একে ক্যানসারের টিকাও বলা যেতে পারে।
অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম বলেন, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি। মা থেকে সন্তানে এবং এক রোগী থেকে অন্য মানুষে এ ভাইরাস ছড়ায়। সাধারণত প্রসবের সময় মা থেকে নবজাতকে এ ভাইরাস ছড়ায়। হেপাটাইটিস প্রতিরোধে জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে হেপাটাইটিসের টিকা দিতে হয়।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের ইতিহাস ও দিবসটির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং বারডেমের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম আযম। তিনি বলেন, ফ্যাটি লিভারের কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। মদ্যপান বা যক্ষ্মার ওষুধের কারণেও হেপাটাইটিস হতে পারে।
সভাপতির বক্তব্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ বা নির্মূলের প্রথম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অজ্ঞতা বা অসচেতনতা। আক্রান্ত ৯০ শতাংশ মানুষ জানেই না তাঁদের শরীরে ভাইরাসটি আছে। দেশে ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ও ১৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে এর চিকিৎসা আছে। এর ওষুধ আছে। তিনি বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার সামাজিক অংশগ্রহণ। সামাজিক অংশগ্রহণের অর্থ সব পক্ষের অংশগ্রহণ। এর মধ্যে আছে চিকিৎসক, সরকার, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন, গবেষক।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।