বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি মবিন খান বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’-মুক্ত বিশ্বের লক্ষ্যে এখনো অনেক দূর যেতে হবে। তিনি সরকারি হাসপাতালে হেপাটাইটিস ‘বি’ শনাক্তকরণ পরীক্ষা বিনা মূল্যে করার আহ্বান জানান।

হেপাটাইটিসের বিভিন্ন ভাইরাসের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেন বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য মো. নজরুল ইসলাম। হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ছাড়াও ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাসের কুফল তুলে ধরেন তিনি। ডায়ালাইসিসের মাধ্যমেও হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে বলে জানান এই অধ্যাপক।

গোলটেবিলে জানানো হয়, হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’-কে জনস্বাস্থ্যের হুমকি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সাল নাগাদ তা নির্মূল করার পরিকল্পনা নিয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ রোগীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং মৃত্যুহার ৬৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।

বিশ্বে প্রায় ৩৩ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতি ১০ জনের নয়জন জানেই না তারা হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত।

বাংলাদেশে এখন ৫ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ২৮ বছরের বেশি।

পরিবারে, সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের রোগীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে জানান হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বিএসএমএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহিনুল আলম। তিনি বলেন, চাকরিপ্রার্থীরা কেউ হেপাটাইটিস পজিটিভ হলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এটা অবৈজ্ঞানিক ও অমানবিক। বিশ্বের অনেক জায়গায় চাকরির ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা বন্ধ করা হয়েছে, বাংলাদেশেও এটা বন্ধ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পজিটিভ কোনো রোগী অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো চিকিৎসা পেতেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হেপাটোলজি সোসাইটির বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও বারডেমের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. গোলাম আযম বলেন, হেপাটাইটিস মারাত্মক ব্যাধি হলেও এটি প্রতিরোধ ও নিরাময়যোগ্য। মুখে খাওয়ার ওষুধের চিকিৎসা নিয়ে হেপাটাইটিস সি নির্মূল সম্ভব। এ ছাড়া টিকা ও চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি–কে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) প্রেসিডেন্ট ফেরদৌসী বেগম বলেন, গর্ভকালে হেপাটাইটিস বি–তে আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক হয়। রক্ত জমাট বাঁধার সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কেউ যখন সন্তান ধারণের প্রস্তুতি নেবে, তখনই তাঁকে হেপাটাইটিসের কোনো ভাইরাস আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে। টিকা না নেওয়া থাকলে টিকা নিতে হবে। নারীদের হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

শিশুদের মধ্যে ৯৫ ভাগই এখন হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকার আওতায় এসেছে বলে জানান বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা। তিনি বলেন, যেসব মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, তাদের বেশির ভাগই শিশু বয়সে, বিশেষ করে জন্মের সময় হয়। তিনি জন্মের পরপর শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা বলেন। এ ছাড়া বলেন, টিকা কার্যক্রমের কারণে সংক্রমণের হার ও মৃত্যু কম এসেছে। যেটুকু বাকি আছে, শিশু ও মায়েদের টিকা গ্রহণের মাধ্যমে তা পূরণ করার জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা মোজাহেরুল হক বলেন, এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করার জন্য হাতে সময় খুব বেশি নেই। এ লক্ষ্য পূরণ করার জন্য কৌশল ঠিক করতে হবে। হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে গ্রাম পর্যন্ত এর চিকিৎসাব্যবস্থা ও সচেতনতার কার্যক্রম চালাতে হবে।

যেকোনো বয়সের মানুষই হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে বলে জানান বিএসএমএমইউর লিভার বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম এলিন।

হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস অনিরাপদ যৌনসংসর্গ, অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ, একাধিক ব্যক্তির একই ব্লেড-কাঁচি ব্যবহার, অনিরাপদ দাঁতের চিকিৎসা বা বিভিন্ন অনিরাপদ অস্ত্রোপচার ও সন্তান জন্মদানের সময় আক্রান্ত মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ হতে পারে বলে জানান বিএসএমএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী সহসভাপতি (সেলস ও মার্কেটিং) এস এম মাহমুদুল হক বলেন, দেশে যেসব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে, তা কার্যকর ও সাশ্রয়ী। তবে আরও সাশ্রয়ী কীভাবে করা যায়, তার জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়েও হেপাটাইটিস রোগের সেবার ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। অনেকেই খুব বেশি দিন এর ব্যয় বহন করতে পারে না। এ ব্যাপারে ভাবতে হবে।

আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের অধ্যাপক মো. আকমত আলী বলেন, মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিসের কোনো সংক্রমণ আছে কি না, তা পরীক্ষা করার ব্যাপারে উদ্বদ্ধু করতে হবে।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার তানভীর আহমাদ বলেন, যাঁরা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি ও সি–তে ভুগছেন, তাঁদের করোনা হলে তা মারাত্মক হয়। তিনি হেপাটাইটিস রোগীদের করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকার ওপর জোর দেন।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম সূচনা বক্তব্য দেন। গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

গোলটেবিল বৈঠকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হলেই চাকরিতে অযোগ্য ঘোষণা না করা, সরকারি হাসপাতালে হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা বিনা মূল্যে করা, হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা বিনা মূল্যে প্রদান।

গোলটেবিল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন