অভিবাসী নারীর জেন্ডার-সংবেদনশীল টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি

ইউএন উইমেন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘অভিবাসী নারীর জেন্ডার-সংবেদনশীল টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়ে।

‘অভিবাসী নারীর জেন্ডার-সংবেদনশীল টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

অংশগ্রহণকারী

 ড. এ টি এম মাহবুব-উল করিম, যুগ্ম সচিব, পরিচালক (অর্থ, বাজেট ও কল্যাণ), ওয়েজ আর্নারস ওয়েলফেয়ার

 সুমাইয়া ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র

 নবনীতা সিনহা, ডেপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ, ইউএন উইমেন

রাহনুমা সালাম খান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)

মো. সিদ্দিকুর রাহমান, প্রোগ্রাম এনালিস্ট, ইউএন উইমেন

শরিফুল হাসান, সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক

শাকিরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম

সৈয়দ সাইফুল হক, চেয়ারপারসন, ওয়ারবি

মেরিনা সুলতানা, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, রামরু

অনন্য রায়হান, চেয়ারপারসন, আই সোশ্যাল

হাসান ইমাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন

শাহনাজ বেগম, জর্ডান থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

আসমা বেগম, সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

সাথী আক্তার, জর্ডান থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

শারারাত ইসলাম, কমিউনিকেশন অ্যানালিস্ট, ইউএন উইমেন

সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

আলোচনা

 এটিএম মাহবুব-উল করিম

যুগ্ম সচিব, পরিচালক (অর্থ, বাজেট ও কল্যাণ), ওয়েজ আর্নারস ওয়েলফেয়ার

করোনা মহামারির পর বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশে ফেরত আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার  রিইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রাম শুরু করে। লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দুই লাখ ফেরত অভিবাসীকে পুনঃ অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা। শুরুতে তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতির কারণে অনেককে পাওয়া যায়নি। পরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রচার, এসএমএস, স্পট রেজিস্ট্রেশন ও মাঠপর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমে অংশগ্রহণ বাড়ে।

এই কর্মসূচির আওতায় সীমিত প্রণোদনা, কাউন্সেলিং ও রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে আমরা বড় পরিসরে পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছি। বাস্তবে দেখা গেছে, প্রত্যাশিত ২০ শতাংশের বদলে প্রায় ৮০ শতাংশ ফেরত অভিবাসী কোনো না কোনোভাবে জীবিকা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। তবে অভিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ছিল ভিন্ন। তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নারীর হার ছিল খুবই কম। এর পেছনে সামাজিক বাধা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও ঘরের বাইরে আসতে না পারার বাস্তবতা বড় ভূমিকা রেখেছে। তবু যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ পুনঃ অন্তর্ভুক্তির আওতায় এসেছে।

আমার অভিজ্ঞতায়, শুধু এককালীন প্রণোদনা দিয়ে বিশেষ করে অভিবাসী নারীদের টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়। অনেক নারী মানসিক আঘাত ও ট্রমার মধ্য দিয়ে ফেরত আসেন। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে মানসিক সহায়তা, সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় বাজারভিত্তিক জীবিকায় যুক্ত

করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, আগ্রহ, দক্ষতা ও এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সহায়তা দিতে হয়। অভিবাসী নারীদের পুনঃ অন্তর্ভুক্তির কাজ সরকার একা করতে পারবে না। সুশীল সমাজ, এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় জরুরি।

শাহনাজ বেগম

জর্ডান থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

আমাদের প্রবাসী নারীদের জন্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারণ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছাড়া কেউ বিদেশ গেলে নানা হয়রানির মুখে পড়তে পারে। নিজে প্রবাসে থেকে দেখা অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দেশে ফিরে এলেও এলাকার মানুষ তাঁদের সম্মান দেয় না; আঙুল তুলে ‘বিদেশি’ বলে, যার মানে এই ক্ষেত্রে ‘খারাপ’। আমি জর্ডানের ক্ল্যাসিক ফ্যাক্টরিতে তিন বছর কাজ করেছি। বর্তমানে বেকার, হাতে কোনো অর্থ নেই এবং বিদেশে যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণও পরিশোধ করতে পারিনি।

প্রবাসে থাকাকালীন মেয়ের অসুস্থতার কারণে অনেক টাকা খরচ হয়েছে; আমার মেয়ের প্লাস্টিক সার্জারিতে ১৪ লাখ ৮০০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবু তিন বছরের কন্ট্রাক্ট শেষ করে দেশে ফিরেছি।

প্রবাসী নারীর পুনঃ অন্তর্ভুক্তি কেবল অর্থ বা কর্মসংস্থান নয়, সামাজিক মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ কার্যকর প্রক্রিয়া, তথ্য সুরক্ষা ও সমর্থন ব্যবস্থা তৈরি করলে নারীরা সম্মানসহ নিরাপদভাবে বিদেশে যেতে এবং দেশে ফিরে সুষ্ঠুভাবে পুনঃ অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।

সুমাইয়া ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ নারী শ্রমিক কেন্দ্র

আমি তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে দেখেছি—যে সংখ্যক নারী বিদেশে গেছেন এবং যে সংখ্যক নারী ফিরে এসেছেন, তাঁদের অর্থনৈতিক অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গৃহকর্মী বা গার্মেন্টসে কর্মরত নারী শ্রমিকেরা যে আয় করেন, তার প্রায় পুরোটা পরিবারে পাঠান। অসুস্থতা বা সংসারের প্রয়োজনে সঞ্চয় না থাকা ভিন্ন বিষয়, কিন্তু তাঁদের উপার্জন সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়।

তবে বিদেশে যেতে যে খরচ লাগে না বা কীভাবে নিরাপদভাবে যাওয়া যায়—এই তথ্য তৃণমূল পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি। ডায়রিয়ার সময় স্যালাইনের প্রচার বা মীনা কার্টুনের মতো করেই নারীদের জন্য বিদেশ গমন ও পুনঃ অন্তর্ভুক্তির তথ্য মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। নারী সমাজেরই অংশ, কিন্তু শুধু নারী হওয়ার কারণে তাঁদের তুচ্ছ করা, গালি দেওয়া বা অবমূল্যায়ন করা আমাদের সমাজে খুব সহজ। অথচ নারীর কাজ, নেতৃত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি।

আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবায়নই আসল লড়াই। বিদেশে নারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আমাদের দেশ থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। পুনঃ অন্তর্ভুক্তির কাজে আমরা মাঠপর্যায়ে বস্তিতে কাজ করছি এবং দেখছি—সঠিক তথ্য ও সহায়তা পেলে নারীরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারেন।

নারী শ্রমিক বিপদে পড়ে সন্তান নিয়ে ফিরলে সমাজ যেভাবে নেতিবাচক আচরণ করে, সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে। বাসাবাড়ির কাজ, শিশুর যত্ন বা রান্নার কাজ—এসব দক্ষ কাজ, কিন্তু নারী করে বলেই এগুলোকে অদক্ষ বলা হয়। দক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের প্রথম কাজ। সমতার অধিকার ছাড়া জেন্ডার-সংবেদনশীল টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়।

নবনীতা সিনহা

ডেপুটি রিপ্রেজেনটেটিভ, ইউএন উইমেন

অভিবাসনের ক্ষেত্রে জেন্ডার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অভিবাসী নারীদের অভিজ্ঞতা, ঝুঁকি ও প্রয়োজনকে আলাদা করে না দেখলে টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় বিশাল অবদান রাখছেন। নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে তাঁরা দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখছেন। অভিবাসী কর্মীদের এই অবদান বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি সাফল্যের গল্প। তবে এই গল্পের ভেতরে নারী অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। অথচ অভিবাসনের প্রতিটি ধাপে—দেশ ত্যাগ করার প্রস্তুতি, গন্তব্য দেশে কাজ ও বসবাস এবং দেশে ফিরে আসা—প্রতিটি পর্যায়েই নারীরা ভিন্ন ধরনের বাস্তবতার/চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।

আমি মনে করি, এই সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাগুলোর আলোকে নীতিমালা তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে অভিবাসন বিষয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু নীতিমালা রয়েছে। এখন প্রয়োজন হলো, অভিবাসী কর্মীদের, বিশেষ করে অভিবাসী নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সেগুলোকে আরও কার্যকর ও জেন্ডার-সংবেদনশীল করা। আমরা চাই এই অভিজ্ঞতাগুলো নীতিমালার আওতায় আসুক এবং বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটুক।

আমাদের লক্ষ্য নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা, যাতে অভিবাসী কর্মীদের জীবনে অর্থবহ পরিবর্তন আসে। আমরা নীতিমালার প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছি এবং সেই আলোকে মন্ত্রণালয়ের বিবেচনার জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ চিহ্নিত করছি। বিশেষভাবে অভিবাসী নারীদের জেন্ডার-সংবেদনশীল ও টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল ফোকাস।

রাহনুমা সালাম খান

প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)

আইএলও যেহেতু কাজের জগৎ ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, আমাদের মূল ফোকাস অর্থনৈতিক পুনঃ অন্তর্ভুক্তির ওপর। সামাজিক পুনঃ অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে আমাদের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হলো নারী অভিবাসী কর্মীরা কীভাবে আবার শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারবেন এবং টেকসইভাবে জীবিকা গড়ে তুলতে পারবেন।

এখনো আমরা নীতি বা জাতীয় পর্যায়ে পুরো শ্রম অভিবাসন চক্রকে বিদেশে যাওয়া থেকে শুরু করে ফেরত আসা পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃতি দিইনি। পুনঃ অন্তর্ভুক্তি কোনো আলাদা বা বিচ্ছিন্ন ধাপ নয়; এটি অভিবাসন চক্রেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই চক্রের প্রতিটি ধাপে জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি ও জেন্ডার-সংবেদনশীলতার প্রয়োজনীয়তা আমরা এখনো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। নীতিতে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা বা কার্যকর কাঠামো নেই। যদি আমরা সত্যিই নারী অভিবাসী কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিতাম, তাহলে পুনঃ অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি জেন্ডার-সংবেদনশীল এসওপি থাকত। বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ, নিবন্ধন, পরামর্শ, কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা সহায়তা—প্রতিটি ধাপে কার দায়িত্ব কী, তা পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত থাকত। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো মানসম্মত কাঠামো এখনো নেই।

আইএলও কনভেনশন ১৯০ অনুসমর্থনের মাধ্যমে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। এই কাজ কোনো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। নারী, সমাজকল্যাণ ও সুশীল সমাজের সমন্বয় ছাড়া টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়ন হবে না। এখনো সময় আছে, এই সময়কে কাজে লাগিয়ে যদি আমরা জেন্ডার-সংবেদনশীল টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির কাঠামো তৈরি না করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জবাবদিহির মুখে পড়তেই হবে।

মো. সিদ্দিকুর রাহমান

প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট, ইউএন উইমেন

বাংলাদেশে অভিবাসনে নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২১ সালে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৬ শতাংশ, ২০২২ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে এর পাশাপাশি কিছু সাধারণ ও কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে, যা অভিবাসী নারীদের টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রয়োজনীয় সঞ্চয়ের অভাব, গন্তব্য দেশে যৌন হয়রানির ঝুঁকি এবং স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে অর্জিত দক্ষতার অমিল—এই সমস্যাগুলো এখনো বাস্তবতা। এসব বিবেচনায় আমি মনে করি, অভিবাসীদের জন্য একটি সুদৃঢ় ও জেন্ডার-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত পুনঃ অন্তর্ভুক্তি মডেলের প্রস্তাব করছি। এই মডেলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক সহায়তার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের পূর্ণ সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

আমার মতে, গন্তব্য দেশ এবং নিজ দেশ—উভয় ক্ষেত্রেই অভিবাসী নারীদের অধিকার সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সমাজে ফেরত আসা অভিবাসীদের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক কালিমা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য, বিশেষ করে জেন্ডারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরির ক্ষেত্রে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও ব্যবসায়িক সহায়তার মতো প্রয়োজনীয় সেবাগুলো স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে শক্তিশালী ডাটাবেজ তৈরি এবং ফেরত আসা কর্মীদের জন্য স্টার্টআপ সহায়তা প্রদান জরুরি। পরিশেষে আমি বলতে চাই, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের নিবিড় সমন্বয় ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

আসমা বেগম

সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

সৌদিতে কাজ করার সময় আমি অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। দেশে ফিরে আমাদের প্রবাসী নারীদের অনেকেই সামাজিক নিন্দার মুখে পড়েন। অনেক বোনের ঘর ভেঙে যায়, অনেকের বিয়ে ভেস্তে যায়। মানুষ শুধু প্রবাসী বলে নিন্দা করে।

আমরা চাই প্রবাসী নারীদের জন্য দেশে ফিরে এলে একটু সহায়তা আর মর্যাদা নিশ্চিত হোক।

আমাকে যে আঙুল তুলে বলা হয় ‘বিদেশি’, আমি তো আমার পেটের দায়ে কিন্তু বিদেশ গেছি। খারাপ কিছু করিনি, তাহলে কেন আঙুল তুলে যে ও বিদেশি, ও বিদেশ থেকে আসছে।

আমি বিএনএসে এসে ক্যানটিনে কাজ করছি এবং নিজে ব্যবসাও করি। প্রবাসী নারীকে সমর্থন ও সুরক্ষা দেওয়া না হলে তাদের পুনঃ অন্তর্ভুক্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

আমার হাতে কোনো টাকাপয়সা নেই, এমনকি আমি যে ঋণ করে গিয়েছিলাম, ওই ঋণটাও আমি পুরো পরিশোধ করতে পারিনি।

যখন আমি বিদেশে গেছি, তখন আমি ৪৫ হাজার টাকা দালালের মাধ্যমে দিয়ে গেছি। বাংলাদেশে ফিরে ছয় মাস অসুস্থ ছিলাম, চিকিৎসার খরচও ছিল অনেক। ঋণ নিয়ে আবার চলাফেরা শুরু করেছি।

শরিফুল হাসান

সহযোগী পরিচালক, ব্র্যাক

নারী অভিবাসনের প্রশ্নটি শুধু কর্মসংস্থানের নয়, এটি সুরক্ষা, মর্যাদা ও টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির বিষয়। ২০১০-১১ সালে সৌদি আরব যখন প্রথম নারী গৃহকর্মী নিতে আগ্রহ দেখায়, তখনই বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীদের আত্মহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সতর্ক করেছিল। খুব কম মজুরিতে, কার্যকর সুরক্ষা ছাড়া নারী কর্মী পাঠানোর ফল ভয়াবহ হয়েছে—ধর্ষণ, নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং মৃত্যুর অসংখ্য ঘটনা সামনে এসেছে।

আমি সৌদি আরবের দূতাবাস ও সরকারি নথির ভিত্তিতে এসব নির্যাতনের তথ্য নথিভুক্ত করেছি। বাস্তবতা হলো, যাঁরা গৃহকর্মী হিসেবে যান, তাঁদের বড় অংশই আর্থিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। দালাল চক্র, এমনকি আত্মীয়স্বজনও অনেক সময় তাঁদের বিনা খরচে পাঠানোর নামে কার্যত বিক্রি করে দেয়। বিদেশে নির্যাতনের শিকার হলেও দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ সীমিত থাকে, বিচার হয় না, জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। এই প্রেক্ষাপটে ফেরত আসা নারী অভিবাসীদের পুনঃ অন্তর্ভুক্তিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমার অভিজ্ঞতায় প্রথম সংকট শুরু হয় বিমানবন্দর থেকেই। সেখানে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য কোনো সুস্পষ্ট জেন্ডার-সংবেদনশীল এসওপি নেই। নির্যাতন ও ট্রমা নিয়ে ফেরা নারীদের সঙ্গে ইমিগ্রেশন বা পুলিশের আচরণ অনেক সময় মানবিক হয় না। অথচ টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য—মানসিক ও মানসিক-সামাজিক সহায়তা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং পরিবার ও সমাজের গ্রহণযোগ্যতা।

রাষ্ট্র যদি নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে চায়, তবে আগে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পুনঃ অন্তর্ভুক্তির প্রতিটি ধাপে জেন্ডার-সংবেদনশীল কার্যপদ্ধতি থাকতে হবে। ভালো আইন করাই যথেষ্ট নয়, বাস্তবে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হলো টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির মূল শর্ত।

শাকিরুল ইসলাম

চেয়ারম্যান, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম

নারী অভিবাসনের বাস্তবতায় আমাদের বুঝতে হবে পুনঃ অন্তর্ভুক্তি কোথা থেকে শুরু হওয়া উচিত। নারী অভিবাসী কর্মী কোন পরিস্থিতি থেকে ফিরছেন, সেটি না বুঝে পুনঃ অন্তর্ভুক্তির কথা বলা যায় না।

পুনঃ অন্তর্ভুক্তিতে একধরনের নিয়ম বা ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ পদ্ধতি কার্যকর নয়। প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা, ট্রমা ও প্রয়োজন আলাদা। তাই জেন্ডার-সংবেদনশীল ও প্রয়োজনভিত্তিক একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করা জরুরি। এ জন্য সমন্বিত রেফারেল মেকানিজম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর, প্রয়োজনভিত্তিক ও সংবেদনশীল—তা নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা দরকার।

আমরা বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছি, রেফারেল মেকানিজমের নামে অনেক সময় শুধু এনজিওর একটি তালিকা তৈরি করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, যেসব প্রকল্পের নাম তালিকায় থাকে, সেগুলোর অনেকগুলোই ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে বিদেশ থেকে ফিরে আসা নারীরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও সহায়তা পান না এবং হতাশ হন। এতে সময় ও অর্থ—দুটোই নষ্ট হয়।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আমাদের একটি সচল, কার্যকর ও জেন্ডার-সংবেদনশীল রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটি শুধু সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়; নাগরিক সমাজ ও অভিবাসী সংগঠনগুলোকেও যুক্ত করতে হবে। এই ব্যবস্থার অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে আসা জরুরি, যাতে অভিজ্ঞ এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে নারী অভিবাসীদের টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায়।

সৈয়দ সাইফুল হক

চেয়ারপারসন, ওয়ারবি

আমি নিজেও একজন ফেরত আসা অভিবাসী, সৌদি আরবে প্রায় ১০ বছর কাটিয়েছি। বাংলাদেশ থেকে নারীদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দুবার নিষেধাজ্ঞা জারি এবং আবার তা প্রত্যাহার হয়েছে, যা আমাদের দেশের জেন্ডার সংবেদনশীলতার অর্ধেক ধারণাই প্রকাশ করে। ফেরত আসার পর নারীদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ থাকে, তা প্রায়ই সমাজের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।

কোভিডের সময় সরকার যখন নীতিমালা তৈরি করতে উদ্যোগ নিয়েছিল, তখনই পুনঃ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওয়ারবি মূলত বাংলাদেশি অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এবং ১৯৯৭ সাল থেকে এই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। বর্তমানে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির কাজ করছে। 

নারীরা যখন দলবদ্ধভাবে কাজ করে, তারা আরও শক্তিশালী হয়। আমরা তৃণমূল পর্যায়ে অভিবাসন তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে তাদের সদস্য হিসেবে যুক্ত করেছি, যাতে তারা দলগতভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে পারে। একা লড়াই কঠিন হলেও সংগঠিতভাবে তা সহজ হয়।

আমাদের লক্ষ্য প্রত্যেক নারীকে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা নিজের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, পাওনা ও সুযোগ বুঝতে পারেন। নারীরা জানেন কীভাবে কাজ করতে হবে, আমাদের শুধু তাঁদের স্বাধীনতা ও শক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মেরিনা সুলতানা

প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, রামরু

আমাদের পুনরেকত্রীকরণের নীতিমালা তৈরি হয়েছে, যেখানে জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাতে সবাই সম্মান নিয়ে ফিরে আসেন। তবে মূল ফোকাস নারী অভিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরেকত্রীকরণে।

আয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক নারী দীর্ঘ সময় কাজ করেও স্বাবলম্বী হতে পারেননি। ছয় মাসের শিশুসহ নারীরাও বিদেশে গেছেন, কেউ কেউ বেনিফিট পেয়েছেন। অনেক সময় পরিবারের আর্থিক স্বার্থের কারণে নারীদের পাঠানো হয়, আবার পাঠানো মেয়ের আয় পরিবারের অন্য কাজে ব্যবহার হয়। এমন পরিস্থিতি পুনরেকত্রীকরণের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। আমাদের কাজ হলো নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং ফিরে আসার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হওয়া। রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অনেক নারীকে সমর্থন দিয়েছি। তাঁরা আয় করে সন্তানদের বড় করছেন, ব্যবসা শুরু করেছেন, পণ্য বাজারজাত করছেন। তাঁদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করাই আমাদের লক্ষ্য।

সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার চালানো দরকার। নারীরা পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করছেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাঁদের সফলতা হাইলাইট করা, রেমিট্যান্সের গুরুত্ব প্রচার করা এবং বিদেশে তাঁদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় টেকসই পুনরেকত্রীকরণের মূল।

সাথী আক্তার

জর্ডান থেকে দেশে ফেরা অভিবাসী কর্মী

জর্ডানে আমি গ্লাস ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি। আমি এসে আর যাইনি। মামা-নানাদের মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে। বিদেশে গেলে খরচ, নিরাপত্তা—সবই সমস্যা।

তাই আমাদের জন্য টেকসই সহায়তা দরকার। প্রবাসী নারী যেন সম্মান পাই, নিরাপদে দেশে ফিরে নিজে ও পরিবারের জন্য কিছু করতে পারে।

দালাল সব জায়গায় আছে। ট্রেনিং করতে গিয়েছিলাম দরজির কাজ শেখার, গার্মেন্টস লাইনে ট্রেনিং। কিন্তু পাস হইনি, দালাল টাকা নিয়েছে।

তারপর সাত বছর পর দেশে ফিরে আমার একটি ছেলে মারা গেছে। জরায়ুর সমস্যা হয়েছে, ৩৫ হাজার টাকা খরচ। তখন আর টাকাপয়সা ছিল না।

এখন আমার তিনটি মেয়ে, স্বামী টুকটাক ব্যবসা করেন, আমি গৃহিণী। সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। এখন জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে—কাঁচাবাজার, মাছ, তরকারি, চাল—সবকিছুই বেশি। পড়াশোনার খরচও বেড়েছে।

অনন্য রায়হান

চেয়ারপারসন, আই সোশ্যাল

পুনঃ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ কেন্দ্র এখন প্রাইমারি এন্ট্রি পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে এবং এখানে দুই লাখের বেশি ফেরত আসা কর্মী চিহ্নিত করা গেছে। তবে এখনো প্রাক্‌-অবতরণের পর্যায়ে নিবন্ধন ও তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পুরোপুরি ব্যবহার হয়নি। প্লেনেই ডেটা কালেকশন এবং ইমিগ্রেশন অফিসার বা সংশ্লিষ্ট এনজিওর মাধ্যমে ফেরত আসা কর্মীদের প্রাইমারি রেফারেল নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে স্পেশালাইজেশনের প্রয়োজন আছে। সব এনজিও একসঙ্গে সব সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু স্কিলস ডেভেলপমেন্ট বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

প্রবাসীকল্যাণ কেন্দ্রকে একটি ক্লিয়ারিং হাউস হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে প্রাইমারি অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতে শ্রমিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে রেফার করা হবে। রেফারেলের ফলাফল ও রিপোর্টিং নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেককে সমানভাবে অর্থ না দিয়ে, যাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজন, তাদের বিশেষভাবে সহায়তা দেওয়া উচিত।

এনজিওগুলো দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের সেবা চালিয়ে যেতে পারবে না; তাই সরকারের আর্থিক প্রণোদনা এবং নতুন ফিন্যান্সিয়াল মডেল তৈরি করা প্রয়োজন। সরকারের নেতৃত্বে কার্যকর এবং টেকসই জেন্ডার-সংবেদনশীল পুনরেকত্রীকরণ বাস্তবায়ন সম্ভব, যা প্রবাসী কর্মী ও সমগ্র সমাজের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ফলপ্রসূ হবে।

হাসান ইমাম

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন

২০২২ সালে শুরু হওয়া সরকারের রিইন্টিগ্রেশন পলিসি ২০২৫ সালে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে, যা জেন্ডার-সংবেদনশীল এবং টেকসই পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব বহন করে। এর সঙ্গে অন্যান্য সিএসওর সমন্বয় ঘটছে। তবে মূল দায়িত্ব সরকারের; এনজিও ও সিভিল সোসাইটি সহযোগিতা করবে। পলিসির ছয়টি অবজেকটিভ লক্ষ্য করে কার্যক্রম পরিকল্পিত হয়েছে।

প্রথমে এমপ্লয়মেন্ট ও বিদেশফেরত শ্রমিকদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা; দ্বিতীয়টি এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট; তৃতীয়টি সোশ্যাল রিইন্টিগ্রেশন ও স্বাস্থ্যসেবা; চতুর্থ সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট; পঞ্চমে এক্সপ্লয়টেশনের শিকার ও নির্যাতিত নারীদের সহায়তা; আর ষষ্ঠ অবজেকটিভ সাসটেইনেবিলিটি।

রিইন্টিগ্রেশনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ডেডিকেটেড সাপোর্ট সিস্টেম, যা এয়ারপোর্ট থেকে তৃণমূল পর্যায়ে প্রবাসী নারীদের সহযোগিতা নিশ্চিত করবে।

শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্য, সামাজিক সেবা ও প্রশিক্ষণের জন্য সঠিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রেফার করা

হবে। সরকারের আর্থিক প্রণোদনা এবং মূল ফান্ড থেকে টেকসই সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে প্রবাসী নারী কর্মীদের স্বাবলম্বিতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

শারারাত ইসলাম

কমিউনিকেশন অ্যানালিস্ট, ইউএন উইমেন

ফেরত আসার পর অভিবাসী নারীদের মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দৃষ্টিভঙ্গির। যত দিন পর্যন্ত আমরা নারীদের সহনাগরিক হিসেবে না দেখে শুধু মা বা বোনের পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখব, তত দিন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নীতিমালা, তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা কিংবা মাঠপর্যায়ের কাজ—কোনোটিই পুরোপুরি ফলপ্রসূ হবে না।

অভিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে আগে এই মানসিক বাধা ভাঙতে হবে।

আমার কাছে স্পষ্ট, মর্যাদাপূর্ণ পুনঃ অন্তর্ভুক্তি মানে শুধু অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নয়। এর সঙ্গে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ এবং সন্তানদের সুরক্ষাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমাজে ফেরত আসা নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর না হলে তাঁরা কখনোই পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন না। তাই নীতির পাশাপাশি সামাজিক আচরণ ও মানসিকতার পরিবর্তনও সমানভাবে জরুরি।

সুপারিশ

  • অভিবাসী নারীদের টেকসই পুনঃ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতে জেন্ডার-সংবেদনশীল নীতি ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।

  • ফেরত আসা নারীদের জন্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় বাজারভিত্তিক জীবিকা সুযোগ নিশ্চিত করা।

  • সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সুশীল সমাজ, এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় অপরিহার্য।

  • অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অনুযায়ী প্রাইমারি রেফারেল ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান।

  • বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দেশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত জেন্ডার-সংবেদনশীল এসওপি ও ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ কার্যকর প্রক্রিয়া প্রণয়ন।