বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য সংকট সমাধানে কী ধরনের কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য সংকট সমাধানে কী ধরনের কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

‘বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য সংকট সমাধানে কী ধরনের কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরাছবি: প্রথম আলো

মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার

অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর

বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর বিভিন্ন উৎস নিয়ন্ত্রণে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে যেমন বায়ুদূষণ হচ্ছে, তেমনি অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ ব্যাপক ধুলাবালু ছড়াচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নের প্রয়োজনেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমে বায়ুদূষণ নিরূপণ, নিয়ন্ত্রণ ও কমিয়ে রাখার পূর্বপ্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া চলমান কর্মকাণ্ডের কারণে বিশেষত: শীতকালে বায়ুদূষণ তীব্রতর হচ্ছে।

বায়ুদূষণ লাঘবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন–সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। রাস্তা কেটে কাজ শেষ করার পর আবার অন্য সংস্থা রাস্তা খুঁড়লে অপচয়ের পাশাপাশি ধুলাবালু বাড়ে। বড় প্রকল্প ও মেগা প্রকল্পে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিয়মিত পানি ছিটানো ও পথচারীদের ধুলাবালুমুক্ত চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। একটি অধিদপ্তরের একার পক্ষে সব জায়গা নিয়মিত নজরদারি করা সম্ভব নয়; স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

বায়ুদূষণকারী শিল্পে পরিশোধন ব্যবস্থা স্থাপন এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ বাস্তবায়ণে জাতীয় কমিটি গঠন করেছে। আইন, বিধি ও মানদণ্ড থাকলেও বাস্তবায়নে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানসহ সবার অংশগ্রহণ আরও জোরদার করতে হবে।

খোলা জায়গায় পাতালতা ও প্লাস্টিক মিশ্রিত কঠিন বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। ময়লার ভাগাড়ে আগুন ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে সব সিটি করপোরেশন এবং পৌর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে। ইটভাটা থেকে বায়ুদূষণ বন্ধে উন্নত প্রযুক্তির টানেলশিল্প এবং ব্লক ব্রিক ব্যবহারকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমদানি করা কয়লা ও ডিজেলে সালফারের পরিমাণ যাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম

পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা), স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর

বর্তমানে বাংলাদেশে রোগের ধরন বদলে গেছে। আগে সংক্রামক রোগে মানুষ বেশি মারা যেত, এখন অসংক্রামক ব্যাধি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সিওপিডি, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের মতো রোগের সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক রয়েছে।

আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সিওপিডি ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং যেসব এলাকায় বায়ুদূষণ বেশি, সেখানে এসব রোগের নজরদারি জোরদার করা। হাসপাতালভিত্তিক নজরদারির ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ছোট শিশুদের স্নায়বিক বিকাশের সঙ্গেও বায়ুদূষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আরও বাড়িয়ে সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। যেদিন বায়ুদূষণ বেশি থাকবে, সেদিন জনগণকে বাইরে বের হওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

দূষণের সময়ে হাসপাতালে শ্বাসতন্ত্রের রোগীর চাপ সামলানোর জন্য স্বাস্থ্যসেবায় আগাম প্রস্তুতি রাখতে হবে। কমিউনিটি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়েও বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন এবং তার সঠিক আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

তাহমিদ আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক, আইসিডিডিআরবি

শিশুরা বায়ুদূষণে বড়দের চেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। এর তিনটি কারণ আছে। প্রথমত, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি শ্বাস নেয়। ফলে তাদের শরীরে বেশি পরিমাণ দূষিত বাতাস প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, তারা আকারে ছোট হওয়ায় নিচের দিকের বাতাস বেশি গ্রহণ করে, যেখানে দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তৃতীয়ত, শিশুদের বিভিন্ন অঙ্গ তখনো বিকশিত হতে থাকে। এ সময়ে বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। তাই শিশুদের বায়ুদূষণ থেকে সুরক্ষার বিষয়টি আমাদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

নারীদের ক্ষেত্রেও ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ বড় সমস্যা। গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকায় এখনো কাঠ বা খড়ি দিয়ে ঘরের ভেতরে রান্না করা হয়। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, এসব নারীর শরীরে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বেশি এবং তাঁদের প্রিটার্ম ডেলিভারি ও কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকিও বেশি। মায়েদের অপুষ্টির পাশাপাশি ঘরের বায়ুদূষণও এর অন্যতম কারণ।

বায়ুদূষণের সঙ্গে নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, নিউরোডেভেলপমেন্টের সমস্যা, অটিজম, স্থূলতা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। পিএম ২.৫-এর মতো সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে গিয়ে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ক্যানসারের ক্ষেত্রেও বায়ুদূষণের প্রভাব দেখা গেছে। এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ল্যান্ডফিলে মিথেন গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমরা মিথেনোট্রপিক ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছি, যা মিথেনকে প্রোটিনে রূপান্তর করতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ বাড়াতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন

সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের বড় বড় শহরেও বায়ুদূষণ এখন স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থনীতি ও উন্নয়নের সংকটেও পরিণত হয়েছে।

বায়ুদূষণের উৎসগুলো আমরা জানি। কিন্তু প্রতিটি উৎসকে সুনির্দিষ্টভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ইটভাটা, নির্মাণকাজ, পুরোনো ও অনুপযুক্ত যানবাহন, রাস্তার ধুলা ও বর্জ্য পোড়ানো—এসব উৎস ধরে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার বায়ুদূষণ কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তসীমান্ত সমস্যাও। তাই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়েও এর সমাধান নিয়ে ভাবতে হবে।

বায়ুদূষণকে জনস্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে। শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন অসুস্থতার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ সমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে হবে।

বায়ুদূষণের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে। অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা ও কর্মদিবস হারানোর ফলে যে আয় কমে, সেটিও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় বায়ুদূষণের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাংলাদেশের জিডিপির গড়ে প্রায় ৪ শতাংশ বলে উঠে এসেছে।

আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইটভাটা, অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনসহ বিভিন্ন উৎস নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। বায়ুদূষণকে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার সমন্বিত সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। সেই অনুযায়ী জাতীয়ভাবে সমন্বিত কৌশল ও নীতিমালা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ডা. ফজিলাতুন্নিসা মালিক

অধ্যাপক ও চিফ কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি),

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট

আমরা সাধারণত কালো ধোঁয়া বা ইটভাটার ধোঁয়া দেখতে পাই। কিন্তু পিএম ২.৫ খালি চোখে দেখা যায় না। এটাই বড় সমস্যা। আমরা যা দেখি না, তার ক্ষতিকর দিকটাও অনেক সময় বুঝতে চাই না। অথচ এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।

মানুষের একটি চুল প্রায় ৭০ মাইক্রন, আর পিএম মাত্র ২.৫ মাইক্রন। এই ক্ষুদ্র কণিকা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের একেবারে গভীরে চলে যায়, যেখানে অক্সিজেনের আদান-প্রদান হয়। সেখান থেকে এটি সহজেই রক্তে প্রবেশ করতে পারে। এরপর শরীরের বিভিন্ন ধমনিতে জমে রক্তনালি শক্ত করে এবং কোলেস্টেরল জমার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

এভাবে মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমতে থাকে। একপর্যায়ে সেখানে ফাটল ধরলে রক্তকণিকাগুলো সক্রিয় হয়ে রক্তের দলা তৈরি করতে পারে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হৃৎস্পন্দনের গতি পরিবর্তন ও হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। আমরা এই কণিকা দেখি না বলেই হয়তো এর ভয়াবহতা যথেষ্ট উপলব্ধি করি না। কিন্তু এটি সামনে থাকা অজগর সাপের মতোই ভয়ংকর এবং এর কারণে আমাদের দেশে অকালমৃত্যু হচ্ছে।

উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে প্রায় এক যুগ আগেই হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। একজন মানুষ যখন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষম সময়ে—চল্লিশের শেষভাগ বা পঞ্চাশের শুরুতে—থাকেন, তখন পিএম ২.৫-এর কারণে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারেন অথবা কর্মক্ষমতা হারাতে পারেন। এটি আমাদের জন্য একটি বড় ট্র্যাজেডি। এ কারণেই বাংলাদেশে হৃদ্রোগকে এখন মহামারির মতো পরিস্থিতি হিসেবে দেখছি।

নীতিনির্ধারকেরা অবশ্যই নীতি প্রণয়ন করবেন। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আরও বড় কাজ এবং সেটি কঠিনও। যেকোনো উদ্যোগের জন্য সদিচ্ছা প্রয়োজন। এই সদিচ্ছা শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও হতে হবে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে জনগণকে সচেতন হতে হবে, একই সঙ্গে সরকারকে কার্যকরভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমাদের চিন্তাভাবনায় আমূল পরিবর্তন এনে সরকার ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করতে পারলেই বায়ুদূষণের কারণে স্বাস্থ্যগত যে ক্রমাবনতি হচ্ছে, তা ঠেকানো সম্ভব।

মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা,

আইইডিসিআর

বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা হচ্ছে। অসংক্রামক ব্যাধি, অ্যালার্জি, ত্বকের রোগ, শিশুদের বিকাশ ও স্নায়ুরোগের সমস্যা হচ্ছে। গর্ভবতী নারী ও নবজাতকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যাঁরা ইটভাটা, দূষণকারী শিল্প বা পরিচ্ছন্নতার মতো কাজে সরাসরি যুক্ত, তাঁদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকিও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না।

স্থানীয় সংস্থাগুলোকে আরও স্বশাসিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করা গেলে তারা নিজেদের এলাকাকে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখার দায়িত্ব বেশি অনুভব করবে। বড় ও জটিল বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় সরকার বা জেলা পর্যায়ে করা যেতে পারে, কিন্তু নিজেদের এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থাকেই নিতে হবে।

আমাদের পরিকল্পনার ধরন নিয়েও ভাবতে হবে। আমাদের দেশে বাইরের তাপমাত্রা সহনীয় রাখার সুযোগ আছে। শহরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বাইরের পরিবেশ সহনীয় থাকে এবং ঘর ঠান্ডা রাখতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা কমে। আমরা জানি, স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও রোগ প্রতিরোধ করলে চিকিৎসার খরচ কমে। পরিবেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা দরকার।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে আমাদের উন্নয়ন টেকসই হবে না। হাসপাতালেও বাইরের বাতাসকে নিরাপদ রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। আইসিইউ বা সিসিইউতে ফিল্টার ব্যবহার করে ভেতরের বাতাস পরিশোধন করা হলেও বাইরে যে দূষিত বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে, সেটিও ফিল্টার করে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

অপ্রয়োজনে লতাপাতা ও বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হওয়া ও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, আমাদের সুস্থভাবে দীর্ঘ জীবন নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি প্রচুর গাছপালা লাগিয়ে সবুজ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সবুজ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও বায়ুদূষণ কমানোর বড় কর্মসূচি হওয়া উচিত।

ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ

অধ্যাপক; বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড হাসপাতাল

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বায়ুর মান এমন পর্যায়ে গেছে যে এগুলোকে গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সিসা, সালফার ডাই–অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও ভাসমান বস্তুকণার মতো দূষক আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

এগুলো মূলত মানুষের তৈরি সমস্যা। অতীতে থ্রি-স্ট্রোক স্কুটার বন্ধ করার ফলে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার আধিক্য, যানজট ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে মানুষ এসব দূষিত ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে নিচ্ছে, ফলে পিএম ২.৫-এর মাত্রা বাড়ছে। পিএম ২.৫ যত বাড়বে, ফুসফুসে দূষিত পদার্থের প্রবেশও তত বেশি হবে।

এর ফলে সিওপিডি রোগী বাড়ছে। আগে যেটিকে ব্রঙ্কাইটিস বা এমফাইসিমা বলা হতো, তার সঙ্গে ধূমপান ও পরিবেশদূষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ঘরের ভেতরের দূষণও কম নয়। লাকড়ির চুলার ধোঁয়ায় আমাদের মা-বোনেরা সিওপিডিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। পরে ফুসফুসে চাপ পড়ে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যাও হচ্ছে। পরিবেশদূষণের কারণে ফুসফুসের ক্যানসারের হারও বাড়ছে। শুধু ফুসফুস নয়, চোখ ও মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ধূমপান ও প্যাসিভ স্মোকিংও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন আছে, কিন্তু এর কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নকাজে ধুলাবালু নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো ও ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাপকভাবে সবুজায়ন করা দরকার, অথচ আমরা উল্টো গাছ কেটে ফেলছি।

সব মিলিয়ে বায়ুদূষণের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ বাড়ছে। তাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতাও জরুরি।

সৈয়দ আব্দুল হামিদ

অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা যেভাবে দেখি, সেখানেই বড় একটি সমস্যা রয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মূলত টিকাদান, কিছু স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসাসেবা নিয়ে কাজ করে। অথচ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, বায়ুদূষণ, খাদ্যে ভেজালসহ জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকগুলো স্বাস্থ্য খাতের বাইরের বিভিন্ন দপ্তরের অধীনে। ফলে বায়ুদূষণের মতো একটি বড় জনস্বাস্থ্যসংকটও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরাসরি আওতায় নেই।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুটি মৌলিক দিক হলো প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসামূলক সেবা। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসামূলক সেবার তুলনায় প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অনেকের মতে, চিকিৎসামূলক সেবা যেখানে প্রায় ২০ শতাংশ, সেখানে প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে ৮০ শতাংশ মনোযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মনোযোগের বড় অংশ এখনো চিকিৎসাকেন্দ্রিক।

জনস্বাস্থ্যের এই বিশাল সংকট মোকাবিলায় একটি স্বতন্ত্র জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা পৃথক জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, নিরাপদ পানি, বায়ুদূষণ, খাদ্যে ভেজালসহ জনস্বাস্থ্যের অধিকাংশ সমস্যা বহু দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কেবল চিকিৎসাকেন্দ্রিক একটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব জটিল জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পানি ও বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছে। বায়ুদূষণের কারণে দেশে গড় আয়ু প্রায় পাঁচ বছর কমছে; আর ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দূষণের সরাসরি প্রভাবে মানুষের আয়ু প্রায় আট বছর পর্যন্ত কমতে পারে।

ইমরুল কায়েস চৌধুরী

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল; প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল নামে একটি আলাদা দপ্তর আছে। এর অধীনে ৪৩ জন কাজ করেন। খেলার মাঠ, পার্ক, মসজিদ, কবরস্থান সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, নগর বনায়ন ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের কাজও আমাদের করতে হয়।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সাভারের আমিনবাজারে আমাদের ৫০ একরের পুরোনো ল্যান্ডফিলটি আধুনিক ল্যান্ডফিল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সেখানে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জন অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহক সেখানে কাজ করেন। তাঁদের ফেলে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট থেকে অথবা বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে প্রায়ই আগুন লাগে। ল্যান্ডফিলের গঠনগত কারণ, আগুনের প্রকৃতি এবং বিশাল ময়লার স্তূপের কারণে ফায়ার সার্ভিস সেখানে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। এমন অবস্থায় বৃষ্টিই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। তাই আধুনিক ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা জরুরি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন একটি আধুনিক ল্যান্ডফিলের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হচ্ছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে ফগিংও বায়ুদূষণের একটি কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত ফগিংয়ে ৯৫ শতাংশ ডিজেল ব্যবহার হয় এবং আমাদের ডিজেলে সালফারের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ডিএনসিসি উৎস কমানো ও লার্ভিসাইডিংয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমাদের ১০টি স্থানে বায়ুর মান মাপার সেন্সর আছে এবং নাগরিকদের স্বাস্থ্য পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু কার্যকর বায়ুদূষণ রোধে এনফোর্সমেন্টে ঘাটতি রয়েছে। উন্নয়নকাজে পরিবেশগত শর্ত মানাতে রাজউক, ওয়াসা, পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার পর্যায়ক্রমে সমন্বয় সাধন করা হচ্ছে।

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম

আমরা যখনই কোনো উন্নয়ন করি, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটা ভাবি না। গাছ লাগানোর পরিকল্পনাতেও আমাদের ভুল আছে। ঢাকার রাস্তার পাশে বেশির ভাগ গাছ মেহগনি। শীতকালে এসব গাছের পাতা একসঙ্গে ঝরে পড়ে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সেগুলো স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেন। এভাবেই ঢাকায় বর্জ্য পোড়ানোর বড় ঘটনা ঘটে। কিন্তু এ বিষয়ে বলবে কে, শুনবেই বা কে?

আমরা উন্নয়ন করছি, কিন্তু পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভাবছি না। পাটখড়ি পুড়িয়ে ছাই করে রপ্তানি করা হচ্ছে। যেসব গ্রামে এগুলো পোড়ানো হয়, সেখানকার মানুষ সারা রাত ধোঁয়ার মধ্যে থাকে। আবার মাটির উর্বর স্তর কেটে ইট রপ্তানি করেছি। পরিবেশবান্ধব ব্লকে কেন যাচ্ছি না? কারণ, পোড়ামাটির ইটের পুনর্বিক্রয়মূল্য আছে, ব্লকের নেই। এই রিসেল অর্থনীতি না ভাঙলে পরিবর্তন আসবে না।

হাসপাতালেও বায়ুদূষণের বিষয়টি দেখতে হবে। বিদ্যুৎ চলে গেলে প্যারাফিনের মোমবাতি জ্বালানো হয়। একটি শিশুর প্রাণঘাতী ক্ষতির জন্য এ রকম মোমবাতির ধোঁয়াই যথেষ্ট।

সৌরবিদ্যুতের পুরোনো ব্যাটারিও যত্রতত্র ফেলে রাখায় বিষাক্ত রাসায়নিক মাটি ও পানিকে দূষিত করছে। বুড়িগঙ্গায় কলকারখানার পাশাপাশি নৌপথে চলাচলকারী মানুষের বর্জ্যও পড়ছে।

এসব সমস্যার সমাধান শুধু সিটি গভর্ন্যান্স বা এক জায়গায় মালিকানা দিয়ে হবে না; আমাদের আচরণ ও খাসলত পরিবর্তন করতে হবে, নিয়ত ঠিক করতে হবে। এর পাশাপাশি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল স্থানীয় সরকার দরকার। গ্রাম ও ইউনিয়ন ধরে সচেতনতা ও তদারকির কাজ করতে পারলেই বায়ুদূষণসহ পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সিদ্দীকা সুলতানা

নির্বাহী পরিচালক, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন

বায়ুদূষণ নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছি। এখন প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান নীতিমালা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারছি। সরকারকে অবশ্যই কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

তবে নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে। নিজের স্বার্থে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ না করলে দূষণ কমানো সম্ভব নয়।

আমরা সাধারণত ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও রাস্তার ধুলাকে বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে দেখি। কিন্তু পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য পোড়ানোর বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বাসাবাড়িতেও বর্জ্য পৃথক করার চর্চা নেই। সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে ল্যান্ডফিলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত পোড়ানো হয়। এতে রাসায়নিক ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়ায়, যা ক্যানসার, শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি ঘরের ভেতরের দূষণও (ইনডোর পলিউশন) গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও প্রবীণেরা এর বড় শিকার। তাই আউটডোর ও ইনডোর—দুই ধরনের বায়ুদূষণকে একই নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

শিল্পাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পিএম ২.৫ ও পিএম ১০ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

শিল্পকারখানা, ইটভাটা, যানবাহন ও নির্মাণকাজে নিঃসৃত ধোঁয়া ও ধুলা নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে পরিষ্কার জ্বালানি, উন্নত চুলা ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

আলমগীর কবির

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)

আমরা বহুমাত্রিক দূষণের মধ্যে বাস করছি। বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর কমে যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান বিভাগীয় শহরে বায়ুদূষণজনিত রোগে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যু হয়, প্রতিদিন প্রায় ২৪২ জন।

দূষণের উৎসও আমাদের জানা। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা থেকে ২৯ শতাংশ, যানবাহন থেকে ১৫ শতাংশ এবং আন্তসীমান্ত দূষণ থেকে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ দূষণ হয়। বাকি দূষণ আসে গৃহস্থালির চুলার ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানো থেকে।

সরকার ২০১৯ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। কিন্তু সেই সময়সীমা এখন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এভাবে সময় বাড়ালে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব?

ফিটনেসবিহীন ও ১৫ বছরের পুরোনো যানবাহন বন্ধের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যাঁরা দূষণ করছেন, তাঁদের ওপর ‘পলিউটারস পে’ নীতি প্রয়োগ করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার মতো মেগা সিটিতে সমন্বয়হীনতা দূর করতে সিটি গভর্ন্যান্স চালু করা জরুরি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে অনিয়ন্ত্রিত খোঁড়াখুঁড়ি ও বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ হয়।

মাহমুদুর রহমান

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, রাজশাহী

সবাই রাজশাহীকে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে জানে। রাজশাহীতে অতিরিক্ত শিল্পায়ন, অপচনশীল বর্জ্য ও অতিরিক্ত জনঘনত্ব—বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি কারণের কোনোটিই তেমন নেই। ফলে রাজশাহীতে বসবাসের পরিবেশ অনেক ভালো। সেখানে মানুষ অর্থের চেয়ে শান্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

আমি রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসার সময়ও এর পার্থক্য দেখতে পাই। নারায়ণগঞ্জ পার হওয়ার সময় আকাশে মেঘের দূষিত বাতাস দেখা যায়।

আমি পানি শোধন ও পরিবেশদূষণ কমানোর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি। গবেষণার ক্ষেত্রে সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। কিন্তু আমরা অনেক সময় সমালোচনা গ্রহণ করতে পারি না। এ কারণে আমাদের নিজেদের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।

শুধু বিদেশ থেকে প্রযুক্তি কিনে এনে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বিপুল বায়োমাস রয়েছে। পাটকাঠি পুড়িয়ে বা ফেলে না দিয়ে তা থেকে সক্রিয় উপাদান ও ফিল্টার তৈরির সুযোগ রয়েছে। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার প্রযুক্তি আমাদের নিজেদেরই তৈরি করতে হবে।

রাজশাহীর পরিবেশের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, কোনো শিল্প স্থাপনের আগে পরিবেশগত শর্তগুলো যথাযথভাবে মানা জরুরি। বিদেশে কোনো প্রকল্পের প্রস্তাব দিলে তার পরিবেশগত ও অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধা আন্তর্জাতিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়। আমাদেরও সেই চর্চা গড়ে তুলতে হবে।

সুপারিশ

  • বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

  • দূষণের প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

  • বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও জনস্বার্থে নতুন আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

  • পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করা অতীব জরুরি।

  • দূষণকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।

  • নগর সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণ বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার।

  • দূষণ নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অংশগ্রহণকারী

মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর।

অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম, পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা), স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

তাহমিদ আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, আইসিডিডিআরবি।

ফাহমিদা খাতুন, সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।

ডা. ফজিলাতুন্নিসা মালিক, অধ্যাপক ও চিফ কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর।

ডা. ইকবাল হাসান মাহমুদ, অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড হাসপাতাল।

গওহার নঈম ওয়ারা, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম।

ইমরুল কায়েস চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল; প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সিদ্দিকা সুলতানা, নির্বাহী পরিচালক, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন।

আলমগীর কবির, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন–বাপা।

মাহমুদুর রহমান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিসিএসআইআর গবেষণাগার, রাজশাহী।

সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।