জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল: ২০৩০ এর পথে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল: ২০৩০ এর পথে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। এতে সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
অংশগ্রহণকারী
ডা. মির্জা মো. আসাদুজ্জামান,
সহকারী অধ্যাপক, গাইনি অনকোলজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল;
অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম,
প্রাক্তন সভাপতি, অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি);
অধ্যাপক ডা. সাহানা পারভীন,
গাইনি অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ);
অধ্যাপক ডা. রোকেয়া আনোয়ার,
বিভাগীয় প্রধান, গাইনি অনকোলজি বিভাগ, এনআইসিআরএইচ, ভাইস প্রেসিডেন্ট, জিওএসবি;
অধ্যাপক ডা. ফরহাত হোসেন,
সভাপতি ইলেক্ট, জিওএসবি;
অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস জোনাকী,
চেয়ারম্যান, গাইনি অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়;
অধ্যাপক ডা. রেহানা পারভীন,
সিনিয়র কনসাল্টেন্ট, স্কয়ার হাসপাতাল,
অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা,
মহাসচিব, ওজিএসবি ও বিভাগীয় প্রধান (গাইনি অবস), সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল;
অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা,
অধ্যাপক, গাইনি অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ);
ফারহানা লাইজু,
সিনিয়র ম্যানেজার (ভ্যাকসিন), ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড;
ড. আবু সাঈদ মোহাম্মদ হাসান,
এসআরএইচ স্পেশালিস্ট, ইউএনএফপিএ;
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন,
সাবেক লাইন ডিরেক্টর, এনসিডি, ওএসডি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর;
ডা. মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানী,
যুগ্ম সচিব (জনস্বাস্থ্য অধিশাখা), স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ; স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়;
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম,
সভাপতি, অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি);
সূচনা বক্তব্য: ফিরোজ চৌধুরী,
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
ডা. মির্জা মো. আসাদুজ্জামান
সহকারী অধ্যাপক, গাইনি অনকোলজি,
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
জরায়ুমুখ ক্যানসার আজ আমাদের জন্য একটি গুরুতর পাবলিক হেলথ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উপলব্ধি করে যে এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ক্যানসার, যেখানে আর কোনো মৃত্যু হওয়া উচিত নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই ১৯৪টি দেশ একমত হয়—বিশ্ব থেকে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল করতে হবে। এ কারণে বিশ্বজুড়ে জানুয়ারি মাসকে জরায়ুমুখ ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়, যাতে মানুষকে এর ভয়াবহতা, স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিনেশনের গুরুত্ব জানানো যায়।
বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬৬ লাখ নারী এই ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ৩৫ লাখ মারা যান। শুধু নারীদের ক্যানসার আক্রান্তের ক্ষেত্রে এটি চতুর্থ স্থানে আছে। বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। নারীদের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং রোগের ভার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খুব বেশি।
এই বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ডব্লিউএইচও নির্ধারিত ৯০-৭০-৯০ লক্ষ্য—৯০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন, ৭০ শতাংশ স্ক্রিনিং ও ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা—অর্জন করাই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে ২০০৫ সালে ভায়া পদ্ধতিতে স্ক্রিনিং শুরু হয়। বর্তমানে প্রায় ৭০০টি ভায়া সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে, কিন্তু ২০২৫ সালের হিসাবে কাভারেজ মাত্র ২১ শতাংশ। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে স্ক্রিনিং ৭০ শতাংশে নিতে হবে এবং তা ভায়ার বদলে এইচপিভি ডিএনএ টেস্টিংয়ের মাধ্যমে করার সুপারিশ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভায়ার কার্যকারিতা আমাদের খুব আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।
অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম
প্রাক্তন সভাপতি, অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)
জরায়ুমুখ ক্যানসার সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও কেন নির্মূল হচ্ছে না—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমি মনে করি, এর প্রধান কারণ আমাদের স্ক্রিনিং কাভারেজ এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় এই ক্যানসারের প্রকোপ বেশি দেখা যায়, কারণ সেখানে সময়মতো স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে অনেক নারী ঝুঁকির মধ্যেই থেকে যান।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভ্যাকসিনেশন। জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন অত্যন্ত কার্যকর হলেও আমাদের দেশে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। সবাই এই সেবার আওতায় আসতে পারছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা—আমাদের দেশের রোগীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের কাছে আসেন অনেক দেরিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়, তখন তাঁরা গুরুত্ব দেন না বা চিকিৎসা নিতে আসেন না। ফলে রোগটি ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। অথচ আমরা জানি, জরায়ুমুখ ক্যানসার যদি একেবারে শুরুর দিকে, যেমন সিআই-ওয়ান পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়, তাহলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি অনেক বেশি সহজে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেরিতে আসার কারণেই সেই সুযোগটি নষ্ট হয়ে যায়।
ভ্যাকসিনেশন ও স্ক্রিনিং—এই দুই কর্মসূচিকে একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের সচেতন করা জরুরি—তাহলে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের পথে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
অধ্যাপক ডা. সাহানা পারভীন
গাইনি অনকোলজি বিভাগ,
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ)
২০০৫ সালে দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ভায়া কর্মসূচি শুরু হয়। আজ পর্যন্ত এর কভারেজ ২১ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক না হলেও আমি একে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখি না। অন্তত ২১ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও স্ক্রিনিংয়ের আওতায় এসেছেন, এটিও একটি অগ্রগতি। তবে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এই গতিতে চললে হবে না; আমাদের গতি ও পরিসর—দুটোই বাড়াতে হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই স্ক্রিনিং কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত করতে হবে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ভায়া থেকে এইচপিভি ডিএনএ টেস্টিংয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে মা ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে যদি এই টেস্টিং যুক্ত করা যায়, তাহলে ৯০-৭০-৯০ লক্ষ্য অর্জন বাস্তবসম্মত হতে পারে।
এ জন্য বিদ্যমান ভায়া সেন্টারের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে যুক্ত করা জরুরি। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা যেমন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী বা ওষুধ দেন, তেমনি তাঁরা যদি জরায়ুমুখ ক্যানসার সম্পর্কে সহজ ভাষায় বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন, তাহলে সচেতনতা বাড়বে। ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সী বা বিয়ের অন্তত ১০ বছর পার হওয়া নারীদের তথ্য সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ডেটাবেজ তৈরি ও নিয়মিত ফলোআপ জরুরি। বিশেষ করে হাওর, পাহাড়, চা-বাগান, বস্তি ও দুর্গম এলাকায় এই কাজ বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক ডা. রোকেয়া আনোয়ার
বিভাগীয় প্রধান, গাইনি অনকোলজি বিভাগ, এনআইসিআরএইচ;
ভাইস প্রেসিডেন্ট, জিওএসবি
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য জরায়ুমুখ ক্যানসার শনাক্তকরণে যেকোনো কার্যকর পরীক্ষাই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ডব্লিউএইচও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের ডিএনএ পরীক্ষার সুপারিশ করেছে, বাস্তবে ভায়া পরীক্ষা আমাদের জন্য এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ২০০৫ সাল থেকে এই পরীক্ষা দেশে চালু আছে এবং বর্তমানে কাভারেজ ২১ শতাংশ। সংখ্যাটি কম হলেও পরীক্ষাটির সহজতা ও ব্যবহারযোগ্যতা আমাদের জন্য বড় শক্তি।
ভায়া পরীক্ষা খুবই সহজ ও সাশ্রয়ী। উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে, এমনকি কমিউনিটি ক্লিনিকেও এটি করা যায়। বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতির দরকার নেই; প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ, নার্স বা প্যারামেডিকরাই এই পরীক্ষা করতে পারেন। অথচ আমাদের রোগীদের মধ্যে ডাক্তারের কাছে যাওয়া নিয়ে একটি জন্মগত ভয় কাজ করে। তাঁরা মনে করেন, পরীক্ষা মানেই বড় কোনো অসুখ ধরা পড়বে। ভায়া পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভিনেগারের কথা সহজ ভাষায় বোঝালে অনেকের ভয় কেটে যায়। এতে কোনো ব্যথা নেই এবং ক্যানসার হওয়ার ১০ থেকে ১৫ বছর আগেই ঝুঁকি জানা যায়—এই আশ্বাস রোগীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, সচেতনতা বাড়ানোই এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে ক্যানসার প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। এইচপিভি ডিএনএ পরীক্ষার পাশাপাশি ভায়া পরীক্ষাও চালু রেখে প্রশিক্ষণ বাড়াতে পারলেই ২০৩০ সালের লক্ষ্যের পথে অগ্রগতি সম্ভব বলে আমি আশা করি।
অধ্যাপক ডা. ফরহাত হোসেন
সভাপতি ইলেক্ট,
জিওএসবি
বাংলাদেশে জরায়ুমুখ ক্যানসারের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডব্লিউএইচও ক্যানসার কান্ট্রি প্রোফাইল ২০২১ অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে স্ক্রিনিং কাভারেজ মাত্র ৫ শতাংশ, আর জীবনে একবারও স্ক্রিনিং করানো নারীর সংখ্যা ৭ শতাংশ। ২০২৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত ন্যাশনাল প্রায়োরিটি–ভিত্তিক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হবে, কিন্তু ততক্ষণে অগ্রগতি নিশ্চিত করতে কিছু মূল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা জরুরি।
কস্ট বা টাকার কারণে গরিব ও মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য স্ক্রিনিং কঠিন। চায়নার গ্রামাঞ্চলে স্বল্প মূল্যে এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট চালু করে স্ক্রিনিং কাভারেজ বৃদ্ধি পাওয়ার উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে। তাই সরকারের নীতিনির্ধারণে ভায়া বা প্যাপ স্মিয়ার পরিবর্তে প্রাইমারি এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
মিডিয়ার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার ও হেলথকেয়ার প্রোভাইডারদের মানসম্মত ট্রেনিং দিয়ে পারফরম্যান্স বেজড ইনসেনটিভ প্রদান করলে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন।
বিদ্যমান ল্যাবরেটরি ও কোভিড–১৯ সময়ের পিসিআর মেশিন ব্যবহার করে টেস্ট খরচ কমানো সম্ভব। সরকার যদি গ্রামে সাবসিডাইজড এইচপিভি টেস্ট চালু করে এবং হাই–কোয়ালিটি টেস্ট কিট সংগ্রহে সহায়তা করে, তাহলে অংশগ্রহণ বাড়ানো যাবে। স্যাম্পল কালেকশনে এইচপিভি সেলফ স্যাম্পলিং পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। শেষমেশ স্ক্রিনিং ও ফলোআপ ট্রিটমেন্টের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কম্প্রিহেনসিভ, এভিডেন্স বেজড অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে কমিউনিটি লেভেল ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবন্ধকতা দূর করলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অনুযায়ী স্ক্রিনিং কাভারেজ বাড়ানো সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস জোনাকী
চেয়ারম্যান, গাইনি অনকোলজি বিভাগ,
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশ্বব্যাপী ২০০৬ সালে শুরু হলেও আমরা ২০০৮ সালে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছি, যা একটি বড় অর্জন। তবে এইচপিভি টিকাদান কিশোরীদের জন্য হলেও ১৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য গুরুত্ব এখনো পুরোপুরি বহন করছে না, যদিও এ বয়সের নারীরাও ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এখন সফলতা অর্জনের জন্য ধাপে ধাপে এবং রিস্ক-বেজড অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করা জরুরি। যেমন যাঁরা এইচপিভি বা ভায়া নেগেটিভ, তাঁদের টিকাদানের আওতায় আনা যায়। স্ক্রিনিংয়ের সঙ্গে টিকাদান সমন্বয় করলে কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত নারীদের ক্ষেত্রে ইনফর্মড শেয়ার ডিসিশনের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়া যায়। টিকাদান ১০০ শতাংশ প্রতিরোধ দেয় না, তবে ঝুঁকি অনেকাংশে কমায়।
সফল প্রয়াসের জন্য সিস্টেম লেভেলে নীতি জরুরি। স্কুলভিত্তিক টিকাদান কার্যকর হলেও আউট অব স্কুল মেয়েদের জন্য কমিউনিটি আউটরিচ অপরিহার্য। ইপিআই সমন্বিত লজিস্টিক, কোল্ড চেইন ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কমিউনিটি এনগেজমেন্টের মাধ্যমে অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় নেতা, মাদ্রাসা ও ইমামদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে টিকা সংগ্রহ, অর্থায়ন ও জনসচেতনতা কার্যক্রম সুসংহত করা সম্ভব।
ন্যাশনাল ভ্যাকসিনেশন স্ট্র্যাটেজি ও মনিটরিং সিস্টেম ছাড়া কভারেজ নির্ণয়, ডোজ সম্পন্ন হওয়া এবং সেফটি মনিটরিং সম্ভব নয়। সুতরাং এইচপিভি টিকাদান কেবল টিকা নয়, একটি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থানির্ভর কর্মসূচি, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. রেহানা পারভীন
সিনিয়র কনসালট্যান্ট,
স্কয়ার হাসপাতাল
সারভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি ভ্যাকসিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের আগে ভ্যাকসিন দেওয়া সর্বোত্তম হলেও, বিয়ের পরও নারীদের জন্য এটি উপকারী। এইচপিভি ভাইরাসের অনেক টাইপ আছে, এক টাইপের ভাইরাস সংক্রমণ ইতিমধ্যে হয়েছে এমন নারীদের ক্ষেত্রেও ভ্যাকসিন অন্য টাইপের ভাইরাসের ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ছাড়া ভাইরাস সংক্রমণ হলেই ক্যানসার হয় না; অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই বছরের মধ্যে শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাইরাস নির্মূল করে। দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ বা পারসিস্টেন্ট ইনফেকশন শুধু ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে, যা মাত্র ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটে।
এইচপিভি ভ্যাকসিন দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়, ফলে ক্যানসারের পূর্বাবস্থা সিআইএন তৈরি হয় না এবং ক্যানসারের সম্ভাবনাও কমে। এ ছাড়া একবার সংক্রমিত টাইপে পুনরায় ইনফেকশন বা রিইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনাও ভ্যাকসিন দ্বারা প্রতিরোধ করা যায়। যাঁরা ইতিমধ্যে সিআইএন হয়েছে এবং চিকিৎসা নিয়েছেন, তাঁদেরও ভ্যাকসিন দিলে রোগ পুনরায় আসার সম্ভাবনা কমে।
ভ্যাকসিনে থাকা সিক্স ও ইলেভেন টাইপ জেনাইটাল ওয়ার্টসহ অন্যান্য সংক্রমণও কমায়। ফলে বিয়ের পর নারীদেরও ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত, কারণ এটি ভাইরাস লোড কমায়, দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ রোধ করে এবং সারভাইক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। বিবাহিত বা অবিবাহিত—যেকোনো অবস্থায় নারীদের জন্য এইচপিভি ভ্যাকসিন কার্যকর ও অপরিহার্য। এটি কেবল ক্যানসার প্রতিরোধ নয়, একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষারও একটি মূল হাতিয়ার।
অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা
মহাসচিব, ওজিএসবি ও বিভাগীয় প্রধান (গাইনি অবস),
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সারভাইক্যাল ক্যানসার অ্যাওয়ারনেস মাসে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক দেশের জনগণকে এই রোগ সম্পর্কে সচেতন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এই আয়োজন ওজিএসবি সহায়তায় এবং প্রথম আলোর সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে, যা আমাদের জাতিকে সারভাইক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধে আরও জোরদার পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করবে। ভ্যাকসিনের পরেও স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন। ভ্যাকসিন—বাইভালেন্ট, কোয়াড্রিভালেন্ট বা ন্যানোভ্যেন্ট (যা দেশে এখনো আসেনি) এবং বিদ্যমান ভ্যাকসিনগুলো শুধু ১৯টি হাইরিস্ক এইচপিভি স্ট্রেইনের কয়েকটিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। ফলে ভ্যাকসিন নেওয়া নারীরাও বাকি স্ট্রেইনের সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ জন্য ভ্যাকসিন গ্রহণকারী নারীদের অবশ্যই গাইডলাইন অনুযায়ী স্ক্রিনিং করতে হবে। স্ক্রিনিং নিয়মিত থাকলে তাঁরা আরও বেশি সুরক্ষিত থাকবেন এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমবে। সাধারণত এই স্ক্রিনিং পাঁচ বছরের ব্যবধানে পুনরায় করানো হয়। ভ্যাকসিন প্রাইমারি প্রিভেনশন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সঠিক সময়ে স্ক্রিনিং নিশ্চিত না করলে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
ভ্যাকসিন ও স্ক্রিনিং একত্রে চললে নারীদের সারভাইক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক তথ্য প্রচার ও নিয়মিত স্ক্রিনিং নিশ্চিত করার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রোগ নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এ কারণে সব নারীর জন্য সময়মতো স্ক্রিনিং অপরিহার্য।
অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা
অধ্যাপক, গাইনি অনকোলজি বিভাগ,
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)
সরকার সারা দেশে প্রায় ৬০০টি ভায়া এবং সিবিআই কেন্দ্র চালু করেছে, যার মধ্যে ৪৯২টি উপজেলায় কার্যক্রম চলমান। এসব কেন্দ্রে দুই থেকে চারজন প্রশিক্ষিত সেবিকা এবং সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোয়ও কলপোস্কপি সেন্টার রয়েছে। ন্যাশনাল ডেটাবেজে ডিজিএইচএসের এমআইএসের মাধ্যমে সব স্ক্রিনিং তথ্য এন্ট্রি হচ্ছে, যেখানে এনআইডি ও ফোন নম্বর ম্যান্ডেটরি হলেও এ ছাড়া খাতাভিত্তিক রেকর্ডও রাখা হচ্ছে।
স্ক্রিনিংয়ের পরিমাণ কমের অন্যতম কারণ হলো সচেতনতার ঘাটতি। ২০০৫ সালে পাইলট স্টাডিতে এক শতাংশ মানুষই ক্যানসারের বিষয়ে জানত, যা বর্তমানে ৭০–৮০ শতাংশ হয়েছে। তবু স্ক্রিনিংয়ে অংশগ্রহণ কম কারণ পার্সোনাল কমিউনিকেশন, অর্থনৈতিক বাধা, ট্রান্সপোর্ট সমস্যা। তাই ফেস টু ফেস কমিউনিকেশন এবং সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে মহিলাদের নেভিগেশন নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইভেট ল্যাবগুলোও ডেটাবেজে সহজ এন্ট্রি করতে পারছে, তবে ফ্যাসিলিটি কোড না থাকায় সমস্যা দেখা দেয়। সরকারি কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সেবিকাদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধির মাধ্যমে ডেটা এন্ট্রি ও মনিটরিং কার্যকর করা সম্ভব। এ ছাড়া ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থার দীর্ঘ অপেক্ষা ও সম্পূর্ণ না হওয়া ক্যানসার রোগীদের জন্য সাপোর্ট ব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
ফারহানা লাইজু
সিনিয়র ম্যানেজার (ভ্যাকসিন),
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
দেশে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলে বেসরকারি খাতের দুটি মূল দায়িত্ব আছে। তা হলো: সচেতনতা তৈরি করা এবং ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ২০২২ সালে থেকে ভ্যাকসিনেশন চালু করেছে। অন্যদিকে, সরকার অনূর্ধ্ব ১০ বছর বয়সীদের জন্য ভ্যাকসিন দিচ্ছে, বাকিদের কী হবে? ভ্যাকসিন লাগবে না? হ্যাঁ, অবশ্যই লাগবে। ১৫–৪৫ বছর বয়সী নারীদের জন্য ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি। সরকারি সরবরাহ মাত্র অনূর্ধ্ব ১০ বছর বয়সীদের জন্য। তাই এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা খুবই জরুরি। এখানে একটা জিনিস বুঝতে হবে—ভ্যাকসিন শুধু বিয়ের আগে নয়, বিবাহের পরও উপকারী এবং একইভাবে কার্যকরী।। তবে যাঁরা ভ্যাকসিন নেন, তাঁরা সুরক্ষিত থাকেন এবং পুনঃসংক্রমণের ঝুঁকি ও ক্যানসারের সম্ভাবনা এমনিতেই কমে যায়। আমরা বাইভালেন্ট ভ্যাকসিন দিচ্ছি, যা ১৬ ও ১৮ স্ট্রেইনের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি ফোর ভ্যালেন্ট ভ্যাকসিনের মাধ্যমে ৬ ও ১১ স্ট্রেইনও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আজ যারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত আছেন, তাঁদের অনুরোধ করবো, আপনার ভ্যাকসিনেশনের সুপারিশ করুন। কারণ, ডাক্তারের কথা রোগীরা সবচেয়ে বেশি মেনে চলে। নিজের দেশের তৈরি ভ্যাকসিন বেশি করে ব্যবহার করা গেলে, আমাদের পক্ষে দাম আরও কমানো সম্ভব হবে। সবার সহযোগিতায় আমরা জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।
ড. আবু সাঈদ মোহাম্মদ হাসান
এসআরএইচ স্পেশালিস্ট,
ইউএনএফপিএ
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ছয় হাজার নারী সার্ভাইক্যাল ক্যানসারে মারা যান। তবে এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রাইমারি প্রিভেনশন হিসেবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো এইচপিভি ভ্যাকসিনেশন। ২০২৩ সালে ঢাকা ডিভিশনে প্রথম ফেজ শুরু হয়, যেখানে প্রায় ৭৪ শতাংশ কাভারেজ হয়েছে। ২০২৪ সালে অন্য সাতটি ডিভিশনে এইচপিভি ভ্যাকসিনেশন কাভারেজ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৩ শতাংশে পৌঁছায়। ভ্যাকসিন এখন রুটিন ইমিউনাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত, তবে স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েদের টিকার আওতায় আনা কিছুটা দুরূহ। তাই ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মহিলাদের জন্য প্রাইভেট খাতের সহায়তা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বল্প খরচে টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। এইচপিভি টিকা সবচেয়ে কার্যকর তখনই, যখন মেয়েরা বিয়ের আগে বা সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের আগে নেয়। কিন্তু বিবাহিত মহিলাদেরও এটি দেওয়া যেতে পারে। কারণ, যাঁরা ইতিমধ্যে ভাইরাসে সংক্রমিত, তাঁদের জন্যও ভ্যাকসিন দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ কমায়, পুনঃসংক্রমণ প্রতিরোধ করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। বাইভালেন্ট ভ্যাকসিন ১৬ ও ১৮ স্ট্রেইন প্রতিরোধ করে এবং ফোর ভ্যালেন্টের মাধ্যমে ৬ ও ১১ স্ট্রেইনও কভার করা সম্ভব।
স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো সরকারি হাসপাতালে অ্যাসিটিক অ্যাসিডের সরবরাহ না থাকা। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালগুলোতে কলপোস্কপি বা থার্মাল থেরাপি সীমিত। অনেক রোগী স্ক্রিনের পর ড্রপআউট হয়ে যান। প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের অভাবও আছে। ক্যানসার শনাক্ত হওয়া রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোর। স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম কার্যকর করতে হলে এটিকে কমিউনিটি পর্যায়ে প্রসারিত করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালে মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণ এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মহিলারা যাতে ঘরের কাছ থেকে সহজে স্ক্রিনিংয়ে আসতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনে দেশ এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন
সাবেক লাইন ডিরেক্টর, এনসিডি, ওএসডি,
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
আমাদের একটি বড় শক্তি হলো বিদ্যমান অবকাঠামো। ইপিআইয়ের মতো কর্মসূচির সঙ্গে আমরা যখন এইচপিভি ভ্যাকসিনেশন যুক্ত করতে পেরেছি, তখন এটি আমাদের জন্য আশার জায়গা তৈরি করেছে। সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন দিলে সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া যায়—এটা প্রমাণিত। লক্ষ্য আকাশছোঁয়া হতে পারে, কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে হলে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। বাংলাদেশের প্রাইমারি হেলথকেয়ার–ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, অর্থাৎ কাজ করার মতো কাঠামো আমাদের রয়েছে।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রথম পর্যায়ে নিরাময়ের হার ৯০–৯৫ শতাংশ হলেও ৩০–৫০ শতাংশ রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে নীতিনির্ধারক ও সেবাদানকারীদের আগে সচেতন হতে হবে, তবেই রোগীরাও গুরুত্ব বুঝবেন।
ডায়াবেটিসের মতো অনেক রোগেই আমরা দেখি, উপসর্গ না থাকায় মানুষ অবহেলা করে, কিন্তু জটিলতা হলে তখন আর কিছু করার থাকে না। জরায়ুমুখ ক্যানসারও তাই—চতুর্থ পর্যায়ে এলে প্যালিয়েশন ছাড়া বিকল্প থাকে না। নিয়মিত স্ক্রিনিং শক্তিশালী করতে হলে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ভ্যাকসিনেশন, স্ক্রিনিং, চিকিৎসা ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা—এই চারটি বিষয় সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের রেফারেল ও চিকিৎসা সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট নয়। আগেভাগে ধরা না পড়লে রোগীরা অ্যাডভান্সড পর্যায়ে আসে, তখন সার্জারি, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তাই প্রতিরোধ ও দ্রুত শনাক্তকরণই সবচেয়ে কার্যকর পথ। এ ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহও বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেয়ের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়ায়। এই সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে। পাশাপাশি তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে লোকাল এক্সামিনেশনের চর্চা কমে যাওয়াও দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণ। এসব জায়গায় আমরা যদি দায়িত্ব নিয়ে এগোতে পারি, তাহলে ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়।
ডা. মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানী
যুগ্ম সচিব (জনস্বাস্থ্য অধিশাখা), স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়
জরায়ুমুখ ক্যানসার শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের নারীদের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এই ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি, যার প্রধান কারণ এইচপিভি সংক্রমণ। সে কারণেই ২০২০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৪টি দেশকে নিয়ে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের উদ্যোগ নেয়। ২০২৪ সালে কলম্বিয়ায় প্রথম গ্লোবাল সারভিক্যাল ক্যানসার এলিমিনেশন প্রোগ্রামে বাংলাদেশ আমন্ত্রিত হয়েছিল। কারণ, ২০২৩ সালে আমাদের প্রথম এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো।
ডব্লিউএইচও জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের জন্য তিনটি স্তম্ভ নির্ধারণ করেছে—ভ্যাকসিনেশন, স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা। লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচের ৯০ শতাংশ মেয়েকে টিকা দেওয়া, ৩৫ ও ৪৫ বছর বয়সের ৭০ শতাংশ নারীর স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা এবং শনাক্ত ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ সরকার এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ২০১৬–১৭ সালে গাজীপুর জেলায় ডেমোনেস্ট্রেশন, ২০১৯ সালে এনআইটিজির সুপারিশ, ২০২১ সালে জিএভিআইতে এইচপিভি আবেদন জমা দেওয়া এবং ২০২২ সালে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন—সব মিলিয়ে আমরা পরিকল্পিত পথেই এগোচ্ছি। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইনে ৮ মিলিয়ন মেয়ের লক্ষ্য নিয়ে ৮৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ কাভারেজ অর্জিত হয়েছে।
২০২৫ সাল থেকে ১০ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য নিয়মিত ইপিআইতে এই টিকা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে। স্ক্রিনিংয়ের হার এখনো উদ্বেগজনক—২০২১ সালে ভায়া টেস্ট ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। এ নিয়ে আমরা অ্যাকশন প্ল্যান করব। সরকার প্রাইমারি হেলথকেয়ার জোরদার করছে, কমিউনিটি ক্লিনিক এখন বিশ্বে রোল মডেল। কোভিডকালে ব্যবহৃত পিসিআর মেশিন এইচপিভি পরীক্ষায় ব্যবহার এবং সেলফ স্যাম্পলিংয়ের মতো কস্ট-ইফেকটিভ পদ্ধতিও আমাদের বিবেচনায় আছে।
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম
সভাপতি, অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)
এত বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূল করা কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্নটাই আসলে বড়। দুঃখজনক হলেও সত্য, জরায়ুমুখ ক্যানসার সম্পূর্ণ নির্মূলযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও দেশে প্রতিবছর ৯ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে , মৃত্যুর সংখ্যাও প্রায় ৬ হাজার। উন্নয়নের কথা বললেও এই চিত্র আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এই প্রেক্ষাপটে ডব্লিউএইচও ২০৩০ সালের জন্য যে ৯০–৭০–৯০ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেটিই আমাদের পথনির্দেশক—১৫ বছরের নিচে ৯০ শতাংশ মেয়েকে এইচপিভি টিকা, ৩০–৪৫ বছর বয়সী নারীদের ৭০ শতাংশ স্ক্রিনিং এবং শনাক্ত ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আমাদের আগে বুঝতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী কারা। দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অল্প বয়সে বিয়ে, একাধিক সন্তান, স্বাস্থ্যবিধির অভাব এবং একাধিক যৌনসঙ্গী—এই বাস্তবতাগুলো ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সবাইকে একসঙ্গে কাভার করা সম্ভব নয়, আমাদের টার্গেটেড অ্যাপ্রোচ নিতে হবে। স্ক্রিনিং এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভায়া টেস্ট ডব্লিউএইচও অনুমোদিত ও সহজ পদ্ধতি হলেও গত এক দশকে এর কাভারেজ মাত্র ২১ শতাংশ। মেডিকেল কলেজ বা বড় হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ধরা যাবে না। উপজেলা পর্যায়ে নার্স ও মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্ক্রিনিং বিস্তৃত করতে হবে।
ভ্যাকসিনেশনের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। স্কুলগামী মেয়েদের বাইরে ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা ও বস্তির মেয়েরা এখনো কাভারেজের বাইরে। এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট কার্যকর হলেও ব্যয়বহুল—২ হাজার ৫০০ টাকা অধিকাংশ মানুষের জন্য অগ্রহণযোগ্য। স্ক্রিনিং ও টেস্ট ফ্রি বা সাবসিডাইজ না করলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রেফারাল ব্যবস্থা। ভায়া পজিটিভ রোগীদের সময়মতো কলপোস্কপি ও চিকিৎসায় আনা যাচ্ছে না। প্রি-ক্যানসার ও ক্যানসার চিকিৎসা শুধু গাইনি অনকোলজিস্টদের মাধ্যমেই সম্ভব—এখানে চিকিৎসকদের সচেতনতা ও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি।
সুপারিশ
১৫–৪৫ বছর বয়সী নারীদের জন্য ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম বেসরকারি পর্যায়ে জোরদার করতে হবে।
সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে স্ক্রিনিং বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
ভায়া স্ক্রিনিং অব্যাহত রেখে ধাপে ধাপে প্রাইমারি এইচপিভি ডিএনএ টেস্টিংয়ে রূপান্তর করতে হবে।
উপজেলা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নার্স এবং মিডওয়াইফদের প্রশিক্ষণ বাড়িয়ে স্ক্রিনিং বিস্তৃত করতে হবে।
গাইনি চিকিৎসকদের রুটিন চেকআপে জরায়ুমুখ পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ভ্যাকসিনেশন, স্ক্রিনিং ও চিকিৎসাকে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন জরুরি।