প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর ২০২৬)
ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর ২০২৬)’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ওয়াটারএইড ও সুইসকন্টাক্ট কনসোর্টিয়ামের ‘গো–ফর–ইমপ্যাক্ট’ কর্মসূচি।
অংশগ্রহণকারী:
আবদুল আউয়াল মিন্টু এমপি
মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপপরিচালক, বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ অধিদপ্তর।
সামিম আহমেদ
সভাপতি, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।
মালিক মোহাম্মদ সাঈদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড।
আজমান আহমেদ চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
শিরিন লিরা
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, গভর্ন্যান্স, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাস।
মাহাবুবুর রহমান তালুকদার
এয়ার কমোডর ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী
ক্যাপ্টেন ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।
তানভীর আহমেদ
অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
সুমাইয়া টি আহমেদ
হেড অব সাসটেইনেবিলিটি, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ।
খাদেম মাহমুদ ইউসুফ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল)।
সিদ্দীকা সুলতানা
নির্বাহী পরিচালক, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন।
শাহরিয়ার মান্নান
হেড অব প্রোগ্রাম, ভয়েস, ইনক্লুশন অ্যান্ড কোহেশন, হেলভেটাস বাংলাদেশ।
রাজু বসাক
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানাজার ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, ব্র্যাক।
সৈয়দ মনজুরুল হক
প্রজেক্ট ম্যানেজার, প্লাস্টিক সার্কুলারিটি পোর্টফোলিও, ইউএনডিপি।
মো. নাহিদ আলম
কো-ফাউন্ডার ও সিইও, দ্য স্কেইট লিমিটেড
রঞ্জন কুমার ঘোষ
পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
সাইফ মনজুর-আল-ইসলাম
টিম লিডার, গো–ফর–ইমপ্যাক্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী
সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
আবদুল আউয়াল মিন্টু এমপি
মন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, কমছে না। প্লাস্টিকদূষণ আমাদের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে, প্লাস্টিক বর্জ্য পানিনিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। নদীনালা ও জলাশয়েও জমছে প্লাস্টিক। বুড়িগঙ্গার পানির নিচে ছয় থেকে আট ফুট পর্যন্ত বর্জ্য জমার কথা আমরা শুনেছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। অথচ আমাদের সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো দুর্বল। এত দিন বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও ভরাটের দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর ছিল। পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব তেমনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে আমরা উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) নির্দেশিকা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি।
ইপিআরের আওতায় প্রথম দুই বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ ও রিসাইক্লিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রথম দুই বছর বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পরবর্তী সময়ে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে এর আওতায় আনা হবে। তবে এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদক, ব্যবহারকারী, ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ জরুরি।
ইপিআর বাস্তবায়নে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর সংগ্রহব্যবস্থা ও রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ইপিআরকে বাড়তি ব্যয় নয়, বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখুক। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপপরিচালক, বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ অধিদপ্তর
ইপিআর নির্দেশিকা তৈরির শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজটি করা। আমরা ইপিআরকে ব্যবসাবান্ধব করার চেষ্টা করেছি, যাতে কারও ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
ইপিআর বাস্তবায়নে আমরা প্রচলিত ফি পদ্ধতি ও সার্টিফিকেটভিত্তিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেছি। শেষ পর্যন্ত এমন একটি পদ্ধতি নিয়েছি, যাতে অংশীজনদের অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়ন সহজ হয়। ব্র্যান্ড মালিকেরা পিআরওর মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁদের দায় শেষ হবে না। প্রোডিউসার রেসপন্সিবিলিটি অর্গানাইজেশন (পিআরও) ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাঁদেরই থাকবে। একইভাবে, তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষার মাধ্যমে সংগ্রহ ও রিসাইক্লিংয়ের তথ্য যাচাই করা হবে, যাতে একই বর্জ্য একাধিকবার হিসাবের মধ্যে না আসে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলেই তাদের সংগ্রহ করা বর্জ্য ইপিআরের লক্ষ্যমাত্রায় অন্তর্ভুক্ত
করা যাবে। বর্জ্যের ধরন ও সংগ্রহের প্রক্রিয়াভেদে ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও ভিন্ন হবে।
আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের এ ব্যবস্থায় যুক্ত করা। তাঁদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে পিআরও নির্বাচনে অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সামিম আহমেদ
সভাপতি, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন
বড় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ বেশি ইপিআর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে আমি মনে করি। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা ও কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা না থাকলে ইপিআর তাঁদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইপিআর নির্দেশিকার ভাষা অনেক ছোট ব্যবসায়ীর কাছে কঠিন মনে হতে পারে। তাই সহজ বাংলায় সংক্ষিপ্ত করে এটি আমাদের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করব, যাতে তাঁরা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে পারেন।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টন প্লাস্টিক রেজিন আমদানি হয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় আরও দুই লাখ টন। প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে এলডিপিই, এলএলডিপিই ও মাল্টিলেয়ার প্লাস্টিক সবচেয়ে সমস্যাজনক। এসব প্লাস্টিকের প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন রেজিন আমদানি হয়। বর্জ্য সংগ্রহকারীরা এর প্রায় এক লাখ টন পুনরুদ্ধার করেন। বাকিটা পুনরুদ্ধার করা কঠিন, কারণ এর অর্থনৈতিক মূল্য কম। অন্যদিকে, পিইটি প্লাস্টিকের প্রায় ৯৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার সুপারিশ করেছি আমরা। তবে প্লাস্টিকের ব্যবহার একবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়; পরিকল্পিতভাবে বিকল্প তৈরি করতে হবে। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করাও জরুরি।
মালিক মোহাম্মদ সাঈদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইপিআর ২০২৬ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা দায়িত্ব নিতে চাই। এ উদ্যোগ কার্যকর করতে স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। বর্জ্য রাখার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন না থাকলে বর্জ্য আলাদা করা কঠিন হয়। তাই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে ইপিআর সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যাতে উৎপাদনকারীদের সহযোগিতা করতে পারে।
নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে পিআরও হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবার স্থানীয় সরকারের সংগৃহীত বর্জ্য অর্জিত হারের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না বলা হয়েছে। এই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পিআরও হিসেবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানেরও কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত। গ্রুপ পিআরওর ধারণা থাকলে আমরা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের পাশাপাশি নিজেরাও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাব।
প্লাস্টিকের ধরন শনাক্ত করার জন্য পণ্যের গায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। এইচডিপিই বা পিপির মতো উপাদানের নাম ছোট অক্ষরে লেখা থাকলে তা বোঝা যায় না। ফলে বর্জ্য আলাদা করা কঠিন হয় এবং রিসাইক্লিংয়ের বাণিজ্যিক মূল্য কমে যায়। পাত্রের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপাদানের নাম লেখার নির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন।
আজমান আহমেদ চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
অতিবৃষ্টিতে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ প্লাস্টিক বর্জ্য। এ পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) ২০২৬ নির্দেশিকা সময়োপযোগী উদ্যোগ। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
ইপিআর বাস্তবায়নে চারটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা শুধু বড় শহরে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না; ছোট শহর ও প্রান্তিক এলাকাতেও কার্যক্রম নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাসাবাড়ি, বাজার ও দোকান থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথক করার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদেও বর্জ্য সংগ্রহের নির্দিষ্ট স্থান বা বর্জ্য ব্যাংক গড়ে তুলতে হবে। এ কাজে এনজিওগুলো সহযোগিতা করতে পারে।
চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তরের ই-পোর্টাল বা ড্যাশবোর্ডে উৎপাদক ও ব্র্যান্ড মালিকদের নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ও প্রবাহ অনুসরণ করা সহজ হবে। এ বিষয়ে ওয়াটারএইডের তৈরি ‘ওয়েস্ট ফ্লো ডায়াগ্রাম’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে আমরা আগ্রহী।
শিরিন লিরা
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার গভর্ন্যান্স, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, বাংলাদেশস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাস
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ইপিআর ২০২৬। তবে শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। প্লাস্টিক উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অনেক মানুষের জীবিকা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত। তাই বিকল্প ব্যবস্থা ও প্রণোদনা নিশ্চিত না করে কোনো কিছু নিষিদ্ধ করলে তা কার্যকর হবে না।
সুইজারল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে পরিবেশ, জলবায়ু, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বর্জ্য শেষ পর্যন্ত পানি ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। তাই পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। ইপিআর বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্যকর্মীদের যুক্ত করা জরুরি।
প্রকল্পনির্ভর উদ্যোগের বাইরে গিয়ে টেকসই অর্থায়নের মডেল তৈরি করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সবার দায়িত্ব—উৎপাদক, সরকার ও ভোক্তা, সবারই ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্কুল থেকে শিশুদের সচেতন করা কার্যকর যেতে পারে।
মাহাবুবুর রহমান তালুকদার
এয়ার কমোডর ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিদিন সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর সবটুকু সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না; কিছু বর্জ্য ড্রেন, নদী ও খালবিলে চলে যায়। এ বর্জ্য রোধে খালগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বছর প্রায় এক লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছি। যেসব এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য বেশি, সেখানে বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার চালু করেছি। বর্জ্য জমা দিয়ে মানুষ টোকেনের মাধ্যমে ডিম, মাছ, মুরগি, চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য নিতে পারেন। মতিঝিলে স্থায়ী স্টলও চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।
উৎসে বর্জ্য পৃথক করার উদ্যোগ আগে নিয়েও প্রত্যাশিত ফল পাইনি। জিগাতলা ও ধানমন্ডিতে আলাদা বিন দেওয়ার পরও অনেকে সেগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করেছেন। তাই আগামী মাস থেকে তিন বছর মেয়াদি কর্মসূচি আবার শুরু করব। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতা জরুরি। বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট, ইকোব্রিক, বিকল্প জ্বালানি ও পাইরোলাইসিস তেল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ ও নাগরিক অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করছি। এতে কোন এলাকায় বা বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ হয়নি, তা জানা যাবে।
ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী
ক্যাপ্টেন ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এখনো ইপিআর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে বিভিন্ন দোকানের সামনে পড়ে থাকা প্লাস্টিক রাতে সংগ্রহ করে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনের (এসটিএস) মাধ্যমে ল্যান্ডফিলে নেওয়া হচ্ছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আলোচনায় চিকিৎসাবর্জ্যকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে সুচ, স্যালাইনের প্যাকেটসহ বিভিন্ন প্লাস্টিকের বর্জ্য সরিয়ে ফেলা হয়। পরে অন্ধকার জায়গায় শিশুরা খালি হাতে এসব বর্জ্য বাছাই করে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে এটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই জায়গা থেকে আমাদের এখনই সতর্ক থাকার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প চালু হয়েছে। উৎসে বর্জ্য পৃথক না হওয়ায় মিশ্র বর্জ্য সংগ্রহ করে ইনসিনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, তিন বছরের মধ্যে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
প্লাস্টিকের পাশাপাশি ই-বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য নিয়েও আলোচনা জরুরি। ব্যাটারি, তার ও অন্যান্য ই-বর্জ্য এবং রাসায়নিক শিল্পবর্জ্য ল্যান্ডফিলে দেওয়া যায় না। এসব বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ল্যান্ডফিলের বর্জ্যের তাপ উৎপাদনক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।
তানভীর আহমেদ
অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ইপিআরে অংশ নেওয়া কঠিন হতে পারে। তাদের প্রণোদনা দিতে হবে। সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। আমাদের বর্জ্য বাছাইয়ের অবকাঠামো দুর্বল। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া নির্ভুলভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা কঠিন। অনানুষ্ঠানিক খাতকেও এ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে।
ইপিআর ২০২৬-এর গাইডলাইনের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছি, তার ওপর। কোম্পানিভিত্তিক পুনর্ব্যবহারের হার নির্ধারণ ও প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বর্জ্য মিশে যাওয়ায় ব্র্যান্ডভিত্তিক বাছাই ও পুনর্ব্যবহারের হার হিসাব করা কঠিন।
কোম্পানিগুলোর দেওয়া তথ্য যাচাইয়ে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের ব্যবস্থা জরুরি। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পৃথক ইউনিট গঠন করে নিয়মিত পরিদর্শন, নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাই করতে হবে। প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি অর্গানাইজেশনকে (পিআরও) সক্ষম করতেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের বাজার তৈরি করাও জরুরি। সরকারি ক্রয়ে পুনর্ব্যবহৃত উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পিআরওকে দেওয়া অর্থের হিসাবের জন্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ন্যূনতম একক ব্যয় নির্ধারণ করা দরকার।
সুমাইয়া টি আহমেদ
হেড অব সাসটেইনেবিলিটি প্রাণ আরএফএল গ্রুপ
২০১২ সাল থেকে আমরা প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করছি। বর্তমানে বছরে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টন প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করে সাশ্রয়ী মূল্যে নতুন পণ্য তৈরি করছি। ইপিআরকে শুধু করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখলে হবে না, এর কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল থাকতে হবে। পরিবার থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও রিসাইক্লিং পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রত্যেককে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে হবে।
বাসায় বর্জ্য সঠিকভাবে আলাদা করা গেলে রিসাইক্লিংয়ে পানি, জ্বালানি ও শ্রমের খরচ কমবে। আমরা ঢাকা ও যাত্রাবাড়ীতে প্লাস্টিক ফেরত নেওয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগও চালাচ্ছি।
রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি স্বীকৃতি, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় ও রিসাইকেল পণ্যে কর-সুবিধা প্রয়োজন। এতে ছোট প্রতিষ্ঠানও এ খাতে উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিং রিসাইক্লিংয়ের সাশ্রয়ী পদ্ধতি খুঁজতে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা জরুরি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনানুষ্ঠানিক খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আসার জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
খাদেম মাহমুদ ইউসুফ
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল)
পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রচেষ্টায় প্রায় ছয় বছর পর আমরা ইপিআর ২০২৬ নির্দেশিকা পেয়েছি। তবে বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশে কত প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক উৎপাদন করে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার নেই। প্লাস্টিকের মোট ব্যবহার কত, তা নিয়েও স্পষ্ট ধারণা নেই। এই তথ্য ছাড়া বর্জ্যের পরিমাণ নিরূপণ কঠিন। তাই উৎপাদকদের তথ্যভান্ডার তৈরি ও প্লাস্টিকের ব্যবহার নির্ধারণ জরুরি।
পলিথিন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদেরও এ ব্যবস্থায় আনতে হবে। আমাদের বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইক্লিংয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাদের যুক্ত করা ছাড়া ইপিআর সফল করা কঠিন। তবে তারা মূলত পিইটি ও এইচডিপিইর মতো বিক্রয়মূল্য আছে এমন প্লাস্টিক সংগ্রহ করে। পলিথিন ও মাল্টিলেয়ার প্যাকেজিংয়ের মতো কম মূল্যমানের বর্জ্য সংগ্রহে প্রণোদনা দিতে হবে।
ইপিআর বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর, বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। উৎপাদকদের পাশাপাশি পিআরওকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে পারে। ছোট পৌরসভাগুলোর বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত স্থানও দরকার।
সিদ্দীকা সুলতানা
নির্বাহী পরিচালক, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ইপিআর নিয়ে সরকারের উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করেছে। তবে এটি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ইপিআরের মূল কথা হলো, কোনো কোম্পানির দায়িত্ব পণ্য তৈরি ও বিক্রির মধ্যেই শেষ হবে না; পণ্য ব্যবহারের পর সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিতে হবে। সংগ্রহ, পরিবহন, বাছাই, পুনর্ব্যবহার ও অবশিষ্ট বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। ইপিআর যেন স্বেচ্ছামূলক অবদান না হয়ে বাধ্যতামূলক উদ্যোগ হয়।
দূষণকারীকে ব্যয় বহন করতে হবে—এই নীতি অনুযায়ী উৎপাদক ও আমদানিকারকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রকৃত খরচ বহনের দায়িত্ব কার্যকর করা জরুরি। পাশাপাশি স্বচ্ছ পরিবীক্ষণ, ডিজিটাল ইপিআর নিবন্ধন, স্বাধীন সনদায়ন ও জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং বাড়ানো এবং বর্জ্যকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শাহরিয়ার মান্নান
হেড অব প্রোগ্রাম, ভয়েস, ইনক্লুশন অ্যান্ড কোহেশন, হেলভেটাস বাংলাদেশ
স্থানীয় সরকারকে ইপিআরে সম্পৃক্ত করতে ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বাজেটে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বরাদ্দ এবং উৎপাদকদের সঙ্গে কাজের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া জরুরি। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদক দায়িত্ব সংস্থাগুলোকে তালিকাভুক্ত করে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
সুন্দরবন এলাকায় বাজারের বর্জ্য সরাসরি বনে ফেলা হচ্ছে। গত এক বছরে পর্যটন মৌসুমের বর্জ্য সংগ্রহ করে ১৬ টন বর্জ্য পাওয়া গেলেও তা ফেলার জায়গা পাওয়া যায়নি। স্থানীয় মানুষ প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে পারলেও পলিথিন ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন অধিদপ্তরের সমন্বয় ছাড়া এ অঞ্চলে ইপিআর বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বর্জ্য ফেলার জায়গা না থাকায় গ্রামে পলিথিন পোড়ানো বা মাটিতে পুঁতে রাখা হচ্ছে, যা মাটি ও বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
রাজু বসাক
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, ব্র্যাক
উৎস থেকেই বর্জ্য আলাদা করা ও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ইপিআর বাস্তবায়নে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্য বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া। প্লাস্টিক বর্জ্য অন্য বর্জ্যের সঙ্গে মিশে গেলে তা সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার কঠিন হয়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের পর্যাপ্ত জনবল, সম্পদ ও সক্ষমতা নেই। তাই তাদের শুধু সেবাদানকারী নয়, পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদকেও সম্পৃক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহক ও ভাঙারিদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনতে হবে।
উৎপাদক ও পৌরসভার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে, যাতে সংগ্রহের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার ও আবার ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
কয়েকটি পৌরসভায় পরীক্ষামূলকভাবে ইপিআর বাস্তবায়ন করে বাধাগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে।
সৈয়দ মনজুরুল হক
প্রজেক্ট ম্যানেজার, প্লাস্টিক সার্কুলারিটি পোর্টফোলিও, ইউএনডিপি
আমাদের দেশে অনেক নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। ইপিআর কার্যকর করতে সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োজন। এক থেকে চার বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিবেশ অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে একটি সমন্বয় সেল গঠন করা যেতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শুধু বেসরকারি খাতের দায়িত্ব নিয়ে ভাবলে হবে না, আমরাও ভোক্তা। বাসাবাড়িতে বর্জ্য আলাদা করা হলেও সংগ্রহের সময় তা আবার মিশে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভাগাড়ে চলে যায়। ফলে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয় না।
মূল্যবান উপকরণ সংগ্রহ করা হলেও কম মূল্যবান বর্জ্য পড়ে থাকে। অনেক উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও স্টার্টআপ থাকলেও বাজারের অভাবে সেগুলো টেকসই হচ্ছে না।
পলিথিনের বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা ও বাজার তৈরিতে কৌশলগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পণ্য সরবরাহের চ্যানেল ব্যবহার করে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মো. নাহিদ আলম
কো-ফাউন্ডার ও সিইও দ্য স্কেইট লিমিটেড
২০১৭ সাল থেকে আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছি। প্রথমে জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করলেও পৌরসভার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও শুরু করি। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে হবে, তবে বর্তমান বাস্তবতায় একে পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন। তাই এর ধরন বুঝে কার্যকর সমাধান খুঁজতে হবে।
ইপিআর ও পুনর্ব্যবহারব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি), উপযোগী প্রযুক্তি ও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
আমরা জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করি ও প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিই। জৈব বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ বা বায়োগ্যাস তৈরির চেয়ে আমাদের বেশি প্রয়োজন কম্পোস্ট। অন্যদিকে গবেষণার মাধ্যমে প্লাস্টিককে বিভিন্ন খাতে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। ইপিআর নির্দেশিকা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও গবেষণায় বিনিয়োগ করা গেলে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
রঞ্জন কুমার ঘোষ
পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ বা জাতীয় থ্রি-আর কৌশল, ২০১০ থাকলেও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) বিষয়ক সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশিকাটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নির্দেশিকা জারি করলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সুইজারল্যান্ড সরকারের সহযোগিতায় নওগাঁ ও সাতক্ষীরায় আমরা স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছি। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এসব পক্ষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি উৎপাদকদের দায়িত্বশীলতা এবং আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মূল ভাবনা—‘বর্জ্য যার, দায়িত্ব তার’।
আমরা সবাই বর্জ্য তৈরি করি; পরিবারও করে, কোম্পানিও করে। তাই ব্যবহারের পর প্যাকেটসহ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল গড়ে তোলা জরুরি। ইপিআর ২০২৬ যেন আগের অনেক নীতিমালার মতো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সুপারিশসমূহ
সমন্বয় সেল গঠন: ইপিআর নির্দেশিকা ২০২৬ কার্যকর করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সমন্বয় সেল গঠন করে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
উৎপাদক ও আমদানিকারকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ: প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও আমদানিকারকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (সংগ্রহ, পরিবহন ও পুনঃচক্রায়ন) দায়িত্ব নিশ্চিত করতে আর্থিক দায়িত্বসহ অবলাইজড এনটিটি ডিপোজিট স্কিম, বাই ব্যাক-টেক ব্যাক স্কিমসহ অন্যান্য স্কিম গ্রহণ করতে হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাড়ানো: স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে উৎপাদক, পিআরও, বেসরকারি খাত এবং এনজিওগুলোর সমন্বয় বাড়িয়ে তৃণমূল পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শুধু বড় শহর নয়, ইপিআর বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদ ও ছোট পৌরসভাগুলোকেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
নিবন্ধন সহজীকরণ ও ডেটাবেজ তৈরি: উৎপাদক, আমদানিকারক, ব্র্যান্ড, পিআরও এবং রিসাইক্লারদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটালাইজড করার পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি নির্ভরযোগ্য ও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ: রিসাইকেলকৃত পণ্যের বাজার তৈরি ও সম্প্রসারণে সরকারি পণ্য ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবেশবান্ধব ও রিসাক্লিং পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে, প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।
বর্জ্যকর্মীদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি: প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে জড়িত অনানুষ্ঠানিক খাত ও বর্জ্যকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।
সহজবোধ্য গাইডলাইন ও সচেতনতা বৃদ্ধি: ইপিআর নির্দেশিকা ২০২৬ সফল করতে সবার জন্য সহজবোধ্য নির্দেশনাবলি (গাইডলাইন) প্রণয়ন এবং স্কুলসহ তৃণমূল স্তর পর্যন্ত ব্যাপক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।