টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার তাগিদ

গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) যোবায়দুল কবির, শিরিন লিরা, হাসান জাফির, আজমান আহমেদ চৌধুরী ও সাইফুল ইসলাম মজুমদার। গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

‘পানি নিরাপত্তা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজক ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো। 

দেশে পানি নিয়ে আইন, পরিকল্পনা ও বিধিমালার কমতি নেই। পানিসংক্রান্ত নানা প্রকল্প ও অবকাঠামোও আছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় পানি খাত নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু তাদের কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। শুধু সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের মধ্যে নয়, পানি খাতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। টেকসই, জলবায়ু–সহিষ্ণু পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি কাজের সমন্বয় দরকার।

‘পানি নিরাপত্তা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পানি খাতের বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, কৃষিবিদ, উন্নয়নকর্মীরা এ কথা বলেছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল বুধবার এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সহযোগিতায় ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। 

বৈঠকে বক্তারা পানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিকল্পনা তৈরির সময় তাঁদের জনসম্পৃক্ততা, নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানের তৈরি তথ্য ও উপাত্ত পারস্পরিক আদান-প্রদানের ব্যবস্থা এবং সরকারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বিনিময়ের তাগিদ দেন।

ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর আয়োজনে "পানি নিরাপত্তা ও সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা" শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা
ছবি: প্রথম আলো

পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি, কাজে সমন্বয় নেই

দেশে পানির সমস্যা আছে প্রায় সর্বত্র। কিন্তু এলাকাভেদে এর ভিন্নতা আছে। যেমন দেশের উত্তর–পশ্চিমাংশের খরাপ্রবণ এলাকা, হাওর এলাকা, উপকূল, পার্বত্য এলাকা কিংবা রাজধানী বা দেশের শহরাঞ্চলের পানির সমস্যার প্রকৃতি ভিন্ন। সেই ভিন্নতার কথা তুলে ধরেন অনুষ্ঠানের অতিথি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান মো. হাসান জাফির তুহিন। তিনি বলেন, এলাকাভেদে সমস্যার ভিন্নতা থাকলেও সমাধানের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। দেশে যেসব পরিকল্পনা হয়, সেগুলো স্বল্প মেয়াদের। যাঁরা নীতি নির্ধারণে আছেন, তাঁদের সমস্যা রয়েছে।

দেশের বরেন্দ্র এলাকার সেচসুবিধা প্রসারে বিএমডিএর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। হাসান জাফির তুহিন বলেন, উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যের পেছনে সমস্যা ছিল পানি। সেই পানির প্রাপ্যতা অনেকটা নিশ্চিত হওয়ায় দারিদ্র্য অনেকটাই কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) বরেন্দ্র এলাকার বিরাট এলাকাজুড়ে পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। ওয়ারপোর এ কাজের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা মূল্যায়ন না করেই বাংলাদেশে আইন করা হয়।

পানির নিরাপত্তায় করণীয়

পানি নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা শুধু সুপেয় পানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে এর পরিবেশগত দিক, পানির উৎস, আন্তসীমান্ত পানিপ্রবাহ ইত্যাদি নানা বিষয়েও কথা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের ডেল্টা উইংয়ের যুগ্ম প্রধান এস এম যোবায়দুল কবির বলেন, বাংলাদেশের মোট পানিপ্রবাহের প্রায় ৯১ শতাংশই দেশের সীমানার বাইরে থেকে আসে। অর্থাৎ পানির বড় একটি উৎস আন্তসীমান্ত। এ কারণে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যোবায়দুল কবির বলেন, বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু কত পানি আসছে, তা নয়। কখন এবং কতটুকু পানি আসছে, সেই পানি কতটা নিরাপদ ও কৃষির উপযোগী, পানির প্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে এবং এর প্রভাব ভাটির মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর কী পড়ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। দেশে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।

এই সমন্বয়ের তাগিদ দিয়ে পানিকে অর্থনীতির একটা বড় চাবিকাঠি হিসেবে চিহ্নিত করেন ওয়ারটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আজমান আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পানির প্রাপ্যতাটা বিশেষ করে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা আসলে কেবল একটা উন্নয়নের বিষয় নয়। এটা মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এখানেই সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ব্যাপকভাবে উঠে আসে। 

অপচয় রোধ জরুরি 

দেশের পানি খাত এখনো প্রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। পানি ব্যবহারের ৯০ ভাগ যায় কৃষিতে, ৮ ভাগ সুপেয় পানির খাতে আর ২ ভাগ শিল্পে। কৃষিতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার নিয়ে কথা হয়। সেই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতেও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার আছে বলে জানান বক্তারা। এসবের পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়ে পানির অপব্যবহার যথেষ্ট হয় বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের পলিসি সাপোর্ট অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে আচরণ পরিবর্তন খুব জরুরি। পানির সংকট মোকাবিলায় এর বিকল্প নেই।

পানিসংকট উত্তরণে নানা পরামর্শ

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক আনোয়ার জাহিদ বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে কী পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য পানি আছে এবং চাহিদা কত—সেই হিসাব করে পানি বণ্টন করতে হবে। পানি আইনে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এসব কমিটি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন খাতে পানির চাহিদা ও প্রাপ্যতা বিবেচনায় পানি বণ্টন করবে; কিন্তু বাস্তবে কমিটিগুলো কার্যকর নয়।

পানিতে প্রান্তিক মানুষের অভিগম্যতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন এজেন্সি অব সুইজারল্যান্ড ইন বাংলাদেশের গভর্ন্যান্স ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন লিরা। তিনি বলেন, অনেক আদিবাসী অঞ্চলে দেখা যায়, পুকুর বা জলাশয় থাকলেও এগুলোর পাশে বসবাসকারীদের তাতে কোনো অধিকার থাকে না।

পারিবারিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করেন নারীরা। পানি সংগ্রহের মতো কষ্টকর কাজে থাকলেও নারীদের পানি অধিকার মোটেও সুরক্ষিত নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) নির্বাহী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন সরকার, ওয়ারপোর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর, ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওয়াশ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মনিরুল আলম, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক শঙ্কর কুমার বিশ্বাস, বেসরকারি সংগঠন ডরপের উপনির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান, ফ্যানসা-বাংলাদেশের আহ্বায়ক যোসেফ হালদার, ভার্কের উপনির্বাহী পরিচালক মো. মাসুদ হাসান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিরেক্টর–আইসিসি নিশাত সুলতানা, রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের ডিরেক্টর (প্রোগ্রাম অ্যান্ড অপারেশনস) অলোক কুমার মজুমদার, ওয়াটারএইড বাংলাদেশের গো–ফর–ইমপ্যাক্টের টিম লিডার সাইফ মনজুর-আল-ইসলাম। 

গোলটেবিল সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।