জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারে সচেতনতা

এসএমসি ওরস্যালাইন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারে সচেতনতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৬ জুলাই ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।

‘জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারে সচেতনতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরাছবি: প্রথম আলো

আলোচনা

তছলিম উদ্দিন খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এসএমসি

জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওরস্যালাইন) একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। বাংলাদেশে ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার কমাতে এর অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে এসএমসি ওরস্যালাইনকে দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন স্যাশে ওরস্যালাইন উৎপাদনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

তবে আমাদের সামনে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, সেটা হলো ওরস্যালাইনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। ওরস্যালাইন অবশ্যই আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে সঠিকভাবে গুলতে হবে এবং তৈরি করার ১২ ঘণ্টার মধ্যে খেতে হবে। এটি কোনো সাধারণ পানীয় নয়; এটি একটি ওষুধ। তাই নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তন, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের কারণে ওরস্যালাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট ও পানি কমে যায়। ফলে নানা ধরনের শারীরিক দুর্বলতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ অবস্থায় নিয়ম মেনে ওরস্যালাইন খেলে শরীরের পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ হয়।

ডায়রিয়ার প্রকোপ এখনো পুরোপুরি কমেনি, কিন্তু ওরস্যালাইনের ব্যাপক ব্যবহার ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব এই অর্জনকে আরও সুসংহত করা। সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি, বেসরকারি খাত ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা এই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে পারব।

সায়েফ নাসির

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পানি ও স্যানিটেশন–সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় ওরস্যালাইনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাপপ্রবাহে শরীরের তাপজনিত চাপ মোকাবিলা এবং পানিবাহিত রোগে শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ওরস্যালাইন কার্যকর ভূমিকা রাখে।

শুরুতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের হাতে ওরস্যালাইন পৌঁছে দেওয়া। এখন সেটি দেশের প্রায় সর্বত্র সহজলভ্য। কারণ, মানুষ ব্যবহার করবে কি না, তার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে ওরস্যালাইন তার হাতের নাগালে আছে।

যেকোনো পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহারই ভালো নয়। এ কারণে আমাদের পণ্যের গায়ে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়া আছে। মানুষও এখন অনেক সচেতন। তাঁরা জানেন কোন পরিস্থিতিতে কী ব্যবহার করতে হবে।

তবে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহের বাস্তবতায় সঠিক সময়ে ওরস্যালাইন ব্যবহারের বার্তা নতুন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

এসএমসি বিশ্বাস করে, আচরণগত পরিবর্তন আনতে ধারাবাহিক যোগাযোগই সবচেয়ে কার্যকর। তাই আমরা স্কুল ক্যাম্পেইন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে এই সচেতনতা আরও বাড়বে এবং আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।

ডা. সুকুমার সরকার

জনস্বাস্থ্যবিদ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, অতিরিক্ত ঘাম, হিট স্ট্রেস ও হিট স্ট্রোকের মতো নতুন জনস্বাস্থ্য–চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আগে ওআরএসের প্রচারে এসব বিষয় ছিল না, কারণ তখন মূল গুরুত্ব ছিল ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা মোকাবিলা। এখন সময় এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে ওআরএস–সংক্রান্ত বার্তায় যুক্ত করার।

আমাদের অর্জন অনেক, কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি। ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপির ব্যবহার ৭৬ শতাংশ। এটিকে এখনো সর্বজনীন বলা যায় না। অনেক পরিবার এখনো সঠিকভাবে ওআরএস ব্যবহার করছে না, আবার ভুল ধারণা ও ভুল চর্চাও রয়ে গেছে। তাই পুরোনো চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।

ওআরএস একটি স্বল্পমূল্যের, কার্যকর এবং পরিবারের সদস্যরাই সহজে ব্যবহার করতে পারেন—এমন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পানিশূন্যতায় কখন, কীভাবে এবং কতটুকু ওআরএস ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

আমার মনে হয়, এ জন্য দুটি কাজ জরুরি। প্রথমত, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাদানকারীদের জন্য একটি মানসম্মত গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সহজ ও একীভূত বার্তা তৈরি করতে হবে। এই বার্তা গবেষণালব্ধ তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

এসএমসি ওআরএসকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সহজলভ্য করেছে। এখন তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই নতুন মানসম্মত বার্তা তৈরিতে নেতৃত্ব দিতে পারে।   

ডা. আবু জামিল ফয়সাল

জনস্বাস্থ্যবিদ

আমরা ওরস্যালাইন নিয়ে যত প্রচার করি, ততটা গুরুত্ব দিয়ে বলি না যে অসুস্থ অবস্থায় খাবার, বিশেষ করে বুকের দুধ, কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। স্বাভাবিক খাবার ও তরল খাবারও চালিয়ে যেতে হবে। একইভাবে জিংক কীভাবে, কত মাত্রায় এবং কত দিন খেতে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা প্রয়োজন।

বমি বা পাতলা পায়খানা হলে ওরস্যালাইন অবশ্যই খাওয়াতে হবে। তবে সঠিক নিয়মটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্যাশে একবারে আধা লিটার পানিতে গুলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে। ১২ ঘণ্টা পার হলে তা ফেলে দিয়ে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এই বার্তাটি আমাদের বারবার প্রচার করা প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে তা যথেষ্ট হচ্ছে না।

একই সঙ্গে মানুষকে জানাতে হবে, সব ক্ষেত্রে শুধু ওরস্যালাইনই যথেষ্ট নয়। পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত থাকলে বা জ্বর, বমি ও ডায়রিয়া কমতে না থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আবার সাধারণ পাতলা পায়খানায় অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারও উচিত নয়। কখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, সেটিও মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে।

অতিরিক্ত ঘামের কারণে পানিশূন্যতা হলে ওরস্যালাইন উপকারী হতে পারে। তবে কতটুকু খেতে হবে, তা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা জরুরি। কারণ, যাঁদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

এখন সময় এসেছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারের জন্য একটি হালনাগাদ জাতীয় গাইডলাইন তৈরির। এতে সাধারণ মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকেরা একই ধরনের বার্তা পাবেন এবং ওরস্যালাইনের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে।

ডা. তাহমীনা বেগম

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

এখন মানুষ জানে ডায়রিয়া হলে ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। কিন্তু এখনো সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সঠিক নিয়ম না জানা। অনেক মা আধা লিটার পানিতে পুরো প্যাকেট না গুলে অল্প পানিতে কিছুটা ওরস্যালাইন মিশিয়ে খাওয়ান। এতে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়, শিশুর পানিশূন্যতা ঠিকমতো পূরণ হয় না, এমনকি জটিলতাও তৈরি হতে পারে।

ওরস্যালাইন শুধু শরীরের পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করে, ডায়রিয়া সারায় না। তাই ওরস্যালাইনের পাশাপাশি শিশুকে স্বাভাবিক খাবার খাওয়াতে হবে। দুধের শিশু হলে কোনো অবস্থাতেই বুকের দুধ বন্ধ করা যাবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সময় চিকিৎসকদের কাছ থেকেও ভুল পরামর্শ দেওয়া হয়। অথচ বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ হতে সহায়তা করে। খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়তে পারলে ডায়রিয়ার ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব। কোনো কারণ ছাড়াই শক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ওরস্যালাইন খাওয়ানোও ঠিক নয়। এতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ এখন নতুন বাস্তবতা। অতিরিক্ত গরমে শরীরের পানিশূন্যতা বাড়তে পারে। তাই এ পরিস্থিতিতে কখন, কতটুকু ওরস্যালাইন খাওয়া উচিত, সে বিষয়ে মানুষের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ওরস্যালাইন তৈরির ক্ষেত্রেও সঠিক নিয়ম মানতে হবে। ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানিতে পুরো প্যাকেট গুলে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে, ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার শেষ করতে হবে এবং পরে তা ফেলে দিতে হবে। ওরস্যালাইন কখনো গরম করা বা ফ্রিজে রাখা যাবে না।

ডা. মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্যবিদ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু প্রচণ্ড তাপপ্রবাহেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাও যুক্ত হয়েছে। অতিরিক্ত গরম, দূষিত পানি, খাদ্যদূষণ ও নিরাপদ পানির সংকট—সবকিছুর সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ছে দরিদ্র মানুষের ওপর। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমছে, খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশু, গর্ভবতী নারী ও দুগ্ধদানকারী নারীরা।

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের প্রথম ঝুঁকি হলো পানিশূন্যতা। শরীরের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এ অবস্থায় ওরস্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সঙ্গে স্বাভাবিক তরল খাবারও সমানভাবে চালু রাখতে হবে। ডাবের পানি, ভাতের ঝোল বা অন্যান্য তরল খাবারও শরীরের জন্য উপকারী। শুধু ওরস্যালাইনের প্রচার নয়, এসব তরল খাবারের বিষয়েও মানুষকে জানানো প্রয়োজন।

ওরস্যালাইন নিয়ে ঝুঁকি–যোগাযোগকে জনস্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শুধু ওরস্যালাইন সহজলভ্য হলেই হবে না, যাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁদের কাছে সঠিক বার্তাও পৌঁছাতে হবে। এই স্বাস্থ্যবার্তা গ্যাস, পানি বা বিদ্যুতের মতোই একটি অপরিহার্য জনসেবা।

বিশেষ করে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন—শ্রমজীবী মানুষ, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ—তাঁদের কাছে ওরস্যালাইন, নিরাপদ তরল খাবার এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবার্তা একসঙ্গে পৌঁছে দিতে হবে।

হাসিন জাহান

কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

ওরস্যালাইন নিয়ে কথা বলতে গেলে নিরাপদ পানির বিষয়টি সবচেয়ে আগে আসে। ২০২৫ সালের জেএমপির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎসের প্রায় ৪৭ শতাংশ পানি ই–কোলাই দ্বারা দূষিত। আর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহারে ত্রুটির কারণে এ দূষণের হার বেড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। তাই নিরাপদ পানিই ওরস্যালাইন ব্যবহারের প্রথম শর্ত।

বারবার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শিশুদের অন্ত্রের পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অপুষ্টি, খর্বাকৃতি ও নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আর ওরস্যালাইন হলো জীবনরক্ষাকারী একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যা পানিশূন্যতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন শুধু শিশু নয়, নির্মাণশ্রমিক, পথের হকার, শিক্ষার্থী—সবাই প্রচণ্ড গরমে পানিশূন্যতার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই নিরাপদ পানিতে ওরস্যালাইন তৈরি করার পাশাপাশি সহজে বহনযোগ্য ও সঠিক মাত্রায় প্রস্তুত করা বিকল্প নিয়েও ভাবা প্রয়োজন, যাতে ভুল অনুপাতে তৈরি করার ঝুঁকি কমে।

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্কুল, বাজার ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী হাইড্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সেখানে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষ ওরস্যালাইন বা উপযুক্ত ইলেকট্রোলাইট পানীয় গ্রহণ করতে পারবে।

একই সঙ্গে এই পণ্যগুলো দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও রাখতে হবে। কারণ, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তাঁরা, যাঁদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকার সুযোগ নেই।

ডা. দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক

হেলথ ম্যানেজার, ইউনিসেফ

ওরস্যালাইন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় সাফল্য এবং এ অর্জনের সঙ্গে ইউনিসেফ শুরু থেকেই সম্পৃক্ত। ওআরএসের উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রসার ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে, তা আমাদের জন্য গর্বের। ইউনিসেফের কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, শিশুর নিরাপদ বেড়ে ওঠা এবং শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ওরস্যালাইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। যদিও এটি ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা মোকাবিলায় পরিচিত, বাস্তবে সব বয়সী মানুষের জন্যই এটি কার্যকর সমাধান। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যে যেসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তার মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার পাশাপাশি ওআরএস অন্যতম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। নিরাপদ পানির সুযোগ এখনো দেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। একইভাবে ওরস্যালাইনের ব্যবহারও এখনো শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে সচেতনতার ঘাটতি এবং সঠিকভাবে ওরস্যালাইন ব্যবহারের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব একটি বড় কারণ। এই বাস্তবতায় শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, সমন্বিত বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে ওআরএসের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। এসএমসির মতো সামাজিক দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ ও অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন।

চিরঞ্জিত দাস

ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ওরস্যালাইন জনস্বাস্থ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং সবচেয়ে কার্যকর জীবনরক্ষাকারী উদ্ভাবনগুলোর একটি। এটি লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, এখনো বাঁচাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও বাঁচাবে। ওরস্যালাইনের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে ভবিষ্যতে ওরস্যালাইনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই মানুষকে বোঝাতে হবে, এটি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে, যথেচ্ছ নয়। ওরস্যালাইন জীবন রক্ষা করে, তবে সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে শুধু প্যাকেটের গায়ে সতর্কবার্তা লিখে দিলেই হবে না। গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবার মাধ্যমে মানুষের কাছে বারবার যৌক্তিক ব্যবহারের বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আজকের মতো আলোচনা এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই বার্তাটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৃষ্টিকোণ থেকেও ওরস্যালাইন একটি নিরাপদ ওষুধ। তবে এটি অবশ্যই নিরাপদ পানিতে তৈরি করতে হবে এবং কখন, কতটুকু ও কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে মানুষকে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও এ ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়রিয়াজনিত রোগ প্রতিরোধেও আমাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের বাস্তবতায় ওরস্যালাইনের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে মানুষের সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। এ কাজটি ধারাবাহিকভাবে করতে পারলেই ওরস্যালাইনের সর্বোচ্চ উপকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সায়কা সিরাজ

হেড অব ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড, ব্র্যাক

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতিও দ্রুত বাড়ছে। নদীভাঙন, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ডায়রিয়াসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

তীব্র তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে এবং ওরস্যালাইন ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। এটি ইতিবাচক হলেও ওরস্যালাইনের যথেচ্ছ ব্যবহার যেন নতুন সমস্যা তৈরি না করে, সে বিষয়ে এখনই সতর্ক হতে হবে। কারণ, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ওরস্যালাইন ব্যবহারে শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ওরস্যালাইন ও ইলেকট্রোলাইট পানীয়কে সাধারণ পানীয় হিসেবে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগের বিষয়।

কোন পরিস্থিতিতে, কতটুকু পানিশূন্যতায়, কোন বয়সে কতটুকু ওরস্যালাইন খেতে হবে, এ বিষয়ে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের জন্য সহজ নির্দেশনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তীব্র গরমে কীভাবে চলাফেরা করতে হবে, কখন বাইরে যাওয়া কমাতে হবে এবং কীভাবে নিরাপদ থাকা যাবে, সে বিষয়েও আচরণগত পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।

ডা. শাহনূর শারমিন

অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

আমি চিকিৎসক হিসেবে গত কয়েক বছরে একটি বড় পরিবর্তন দেখছি। আগে গরমজনিত অসুস্থতাকে আমরা তেমন গুরুত্ব দিতাম না। কিন্তু এখন তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে হিট এক্সহসশন, হিট সিনকোপ, হিট র‍্যাশ, হিট এডিমা থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী হিটস্ট্রোকের রোগীও বাড়ছে। হিট–সম্পর্কিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আমাদের নজরে আসার চেয়ে অনেক বেশি।

তীব্র গরমে ডায়রিয়ার মতোই শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম বেরিয়ে যায়। তাই প্রয়োজন হলে ওরস্যালাইন খাওয়া উচিত। তবে প্রয়োজন না থাকলেও শুধু ভালো লাগে বা দুর্বল লাগে বলে ওরস্যালাইন খাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ওরস্যালাইন একটি অসাধারণ আবিষ্কার। এটি শরীরের শক্তি বাড়ানোর পানীয় নয়; বরং পানিশূন্যতা ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণে কাজ করে। তাই কখন ও কতটুকু খেতে হবে, তা জানা জরুরি। একবার বমি বা পাতলা পায়খানার পর বড়দের সাধারণভাবে এক থেকে দুই গ্লাস ওরস্যালাইন যথেষ্ট।

তবে কিডনি বা হৃদ্‌রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। আলাদা প্রটোকলের চেয়ে ওরস্যালাইন ব্যবহারের একটি সহজ নির্দেশিকা থাকা বেশি বাস্তবসম্মত।

সুচিত্রা সরকার

গবেষক ও অভিভাবক প্রতিনিধি

আমার সন্তানের ছয় মাস বয়সের আগেই ডায়রিয়া হয়েছিল। তখন চিকিৎসকের পরামর্শেই অল্প পরিমাণে ওআরএস দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু অনেক মা এখনো জানেন না, কোন বয়সে কতটুকু ওআরএস দিতে হবে। আবার ডায়রিয়া হলে বুকের দুধ, দুধ বা ডিম খাওয়ানো যাবে না—এমন ভুল ধারণাও অনেকের মধ্যে রয়েছে। ফলে শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রচণ্ড গরমে স্কুলগামী শিশুদের সুরক্ষায়ও সচেতনতা জরুরি। অনেক স্কুল ইতিমধ্যে হালকা পোশাক পরার সুযোগ দিচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি পান করানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে মাঠে খেলাধুলা সীমিত রাখা এবং স্কুলে ওআরএস বা ইলেকট্রোলাইট পানীয়ের ব্যবস্থা থাকলেও তা নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করা উচিত।

বাজারে আসল ও নকল ওআরএস আলাদা করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই নিরাপদ ও আসল পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক বছরের তাপপ্রবাহে দেখেছি, বিভিন্ন স্থানে শ্রমজীবী মানুষকে বিনা মূল্যে ওআরএস ও নিরাপদ পানি দেওয়া হয়েছে। কারণ, প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাঁরাই। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত।

সুপারিশ

  • তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করা জরুরি।

  • ওরস্যালাইন কখন, কীভাবে ও কতটুকু খেতে হবে—এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা দরকার।

  • স্কুল, বাজার ও জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী হাইড্রেশন পয়েন্ট স্থাপন করা উচিত।

  • জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন খাতের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

  • গণমাধ্যমে তাপপ্রবাহ ও ওরস্যালাইনের যৌক্তিক ব্যবহার নিয়ে ধারাবাহিক প্রচার চালাতে হবে।

অংশগ্রহণকারী

 

তছলিম উদ্দিন খান

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এসএমসি

 

সায়েফ নাসির

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড

 

ডা. সুকুমার সরকার

জনস্বাস্থ্যবিদ

 

ডা. আবু জামিল ফয়সাল

জনস্বাস্থ্যবিদ

 

ডা. তাহমীনা বেগম

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

 

ডা. মুশতাক হোসেন

জনস্বাস্থ্যবিদ

 

হাসিন জাহান

কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

 

ডা. দেওয়ান মো. ইমদাদুল হক

হেলথ ম্যানেজার, ইউনিসেফ

 

চিরঞ্জিত দাস

ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

 

সায়কা সিরাজ

হেড অব ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড, ব্র্যাক

 

ডা. শাহনূর শারমিন

অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

 

সুচিত্রা সরকার

গবেষক ও অভিভাবক প্রতিনিধি

 

সঞ্চালনা

ফিরোজ চৌধুরী,

সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো