কৈশোরে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা জরুরি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে (কোভিড-১৯) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ ও হতাশা বাড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১২ শতাংশ শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। করোনায় এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। কিন্তু কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা খুবই জরুরি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ইউনিসেফ ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্কুল বন্ধের সময় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব কথা বলেন। গোলটেবিলটি আয়োজনে সহযোগিতা করেছে ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস।

গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ছাড়া গুণগত শিক্ষা সম্ভব নয়। এ জন্য তাঁরা পুষ্টি, প্রজননস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন। মানসিক স্বাস্থ্যর বিষয়ে ‘হেল্পলাইনের’ মাধ্যমে মাসে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই কার্যক্রম আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া ৩৩ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিটির দুজন করে শিক্ষককে কাউন্সেলিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে জানান মাউশির মহাপরিচালক। জুম অ্যাপের মাধ্যমে চলতি ডিসেম্বরেই অনলাইনে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হবে। সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, কোভিডের কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে মানসিক সমস্যায় না পড়ে, সে জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুমের সূচনা বক্তব্যের পর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (মাতৃ ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবা) আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

মানসিক সমস্যার কারণে নানা ধরনের প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে আবু সাদত বলেন, বাংলাদেশে ৪ শতাংশ ছেলে এবং ৬ শতাংশ মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের যেকোনো ধরনের মানসিক সমস্যা আছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা মানুষদের মধ্যে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশের চিকিৎসার সুযোগ নেই। অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা নেই বললেই চলে। স্কুল বন্ধ থাকায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, স্কুল চালু অবস্থাতেই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে শাস্তির শিকার হয়। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে কাউন্সেলিং বাড়ানোসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেন তিনি।
হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সব ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে। এখন সেই ভালো কাজগুলো করতে হবে। নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। স্কুলগুলোকে অনেক বেশি বাস্তবমুখী হতে হবে। স্কুলগুলো যেন জিপিএ-৫–এর কারখানা না হয়ে যায়।

করোনার কারণে স্কুল বন্ধে নানা সমস্যা হওয়ার কথা তুলে ধরে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী সৈয়দা লাবিবা তাহেরা। সে বলে, স্বাভাবিক অবস্থায় বিদ্যালয়ে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে অনেক কথা আদান-প্রদান করা যায়, যা মা–বাবাকে বলা যায় না। এখন সেটা পারছে না। করোনার প্রথম কয়েক মাসে বন্ধুদের সঙ্গে একেবারেই কথা হয়নি তার। ফলে কয়েক মাস কিছুটা হতাশায় ছিল। সম্প্রতি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে বিদ্যালয়ে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে অনেক ভালো লেগেছে।

নিজের এক বন্ধুর কথা উল্লেখ করে সৈয়দা লাবিবা বলল, তার ওই বন্ধু আগে খুব হাসিখুশি থাকত। কিন্তু গত কয়েক মাসে ঠিকমতো কথাই বলে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয় পরামর্শক (মানসিক স্বাস্থ্য) হাসিনা মমতাজ বলেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। করোনায় দেশের কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা বেড়েছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রথমে পরিবারের সদস্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক (অ্যাডলসেন্ট ও স্কুল স্বাস্থ্য) সাবিজুর রহমান কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে মা–বাবার ভূমিকা বেশি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মা–বাবাকে সচেতন করতে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবছর প্রতি স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মা ও শিশুস্বাস্থ্য ইউনিটের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মো. জয়নাল হক বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, তার একটি অংশ হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য।

মা–বাবা এবং শিক্ষককে সচেতন করতে পারলে তাঁদের মাধ্যমেই কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে অনেকটাই সফলতা আসবে বলে মনে করেন বিএপিএসএর প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামিমা আক্তার চৌধুরী।

ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক জিয়াউল মতিন বলেন, করোনার কারণে কিশোর-কিশোরীরা ভালো নেই। তাদের কথা বলার জায়গা নেই। কেবল অনলাইন ক্লাস করে তাদের সব সমস্যার সমাধান হবে না। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যথোপযুক্ত কারণ আছে। কিন্তু দ্রুততম সময়ে তাদের স্কুলে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে নিতে হবে।
কীভাবে বিদ্যালয় খোলা যায়, সে বিষয়ে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানান মাউশির সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ-১) মাজহারুল হক।

গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।