চট্টগ্রামে ২০০৪ সালে আটক হয়েছিল ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১০ সালে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অস্ত্রগুলো এসেছিল চীন থেকে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সমরাস্ত্র কারখানা নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (নরিনকো) থেকে অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়। প্রথমআলোতে এ বিষয় ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর।

তত্ত্বাবধান করেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আসামি হচ্ছেন বাবর, ওমর ফারুকও

default-image

চট্টগ্রামে ছয় বছর আগে আটক হওয়া ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি এসেছিল চীন থেকে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের সমরাস্ত্র কারখানা নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (নরিনকো) থেকে অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তত্কালীন কতিপয় কর্মকর্তা এই অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। নরিনকোর ওয়েবসাইটে একে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যতম বৃহৎ​ কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আদালতের নির্দেশে ও সাতটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে মামলাটির অধিকতর তদন্ত করা হয়। সিআইডি ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতির প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তদন্তের সময় আরও বাড়ানোর জন্য আবেদনও করেছে সিআইডি। আজ রোববার এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের বক্তব্য জানার জন্য গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তবে তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি।

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্কালীন সচিব ওমর ফারুককেও আসামি করা হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় অভিযোগপত্রে তাঁদের আসামি করা হবে বলেও সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। ইতিমধ্যে ওমর ফারুককে চট্টগ্রামের সিআইডি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের ইউরিয়া সার কারখানার (সিইউএফএল) জেটিঘাট থেকে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে পুলিশ ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক করে। এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাদুর রহমান অস্ত্র ও চোরাচালান আইনে দুটি মামলা করেন। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দায়সারা তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় এবং আদালতে মামলার বিচারও শুরু হয়।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর তত্কালীন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এ এন এম বশির উল্লাহ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। আদালত সাতটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এ তদন্ত পরিচালনার জন্য বলেন। চলমান তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে সিআইডি সূত্র দাবি করেছে।

আদালত সূত্র জানায়, অধিকতর তদন্তের সময় আরও ৯০ দিন বাড়ানোর জন্য ১৫ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মনিরুজ্জামান চৌধুরী। তাতে বলা হয়, তদন্তকাজ বিস্তৃতি লাভ করায় অধিকতর তদন্ত কার্যক্রমের সময়সীমা এর আগে আটবার বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে আজ চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে শুনানি হতে পারে। এর আগে আদালতের দেওয়া তদন্তের সময়সীমা গতকাল শেষ হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের ফলাফল: মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে জোট সরকার আমলের তদন্তে সাতটি দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হলো: আটক অস্ত্রগুলো কোন দেশের তৈরি, এগুলো কারা এনেছে, কোন দেশ থেকে এনেছে, কার বা কাদের দ্বারা সরবরাহ করা হয়েছে, কোন জলযানে (জাহাজ) করে অস্ত্রগুলো বাংলাদেশে আনা হয়েছে, চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটিঘাটে কার নির্দেশে অস্ত্র খালাস হয়েছে এবং পুলিশের সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও সার্জেন্ট হেলালের কাছ থেকে র্যাব যে দুটি অস্ত্র উদ্ধার করেছে, তা ১০ ট্রাক চালানের অস্ত্র কি না?

আগের তদন্ত প্রতিবেদনে এ মৌলিক বিষয়গুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না। আদালতের এই সাতটি পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় রেখে ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর থেকে অধিকতর তদন্ত শুরু করে সিআইডি।

আদালতে দাখিল করা সিআইডির সময় বৃদ্ধির আবেদনে বলা হয়, আদালতের সাতটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে ছয়টি পর্যবেক্ষণের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অধিকতর তদন্তের সময় জানা গেছে, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া তাঁর বাংলাদেশি সহযোগী হাফিজুর রহমান ওরফে হাফিজসহ এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের কতিপয় কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে চীন থেকে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনান। তবে কোন জলযানের মাধ্যমে অস্ত্রগুলো বাংলাদেশে আনা হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত অব্যাহত আছে।

অস্ত্র খালাসে সিইউএফএলের কর্মকর্তাদের সম্মতি ছিল: সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু সার খালাসের জন্য নির্ধারিত জেটিঘাটে দুটি ট্রলারযোগে অস্ত্রগুলো খালাসের বিষয়ে সিইউএফএলের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসীন তালুকদার, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এনামুল হকসহ অন্যদের মৌন সম্মতি ছিল। বর্তমানে তাঁরা আটক আছেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

দুই সার্জেন্টের কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র ১০ ট্রাকের চালানের নয়: সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও হেলালের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো একে-৪৭ প্রকৃতির রাইফেল। আর জেটিঘাটে জব্দ হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে একে-৪৭ প্রকৃতির কোনো রাইফেল নেই। তাই এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো ভিন্ন ঘটনার। এর সঙ্গে ১০ ট্রাক অস্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। এ-সংক্রান্ত দুটি মামলা ফেনী সদর ও নোয়াখালীর সুধারাম থানায় বিচারাধীন আছে।’

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শোয়েব আহাম্মদ, ডিজিএফআইয়ের তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সাদেক হাসান রুমি এবং বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) তত্কালীন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইমামুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁদের বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকজন সাক্ষীর জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি মনিরুজ্জামান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ করে আনতে আরও সময় লাগবে।’

নতুন করে কেউ আসামি হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আকাশে চাঁদ উঠলে দেখতে পাবেন। এ বিষয়ে আগাম মন্তব্য করতে চাই না।’

আসামি হচ্ছেন বাবর ও ওমর ফারুক: এই অস্ত্র আটকের ঘটনায় করা সরকারি তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন তত্কালীন স্বরাষ্ট্রসচিব ওমর ফারুক। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন—এনএসআইয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এনামুর রহমান চৌধুরী, ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শামসুল ইসলাম ও সিআইডির ডিআইজি ফররুখ আহাম্মদ।

আদালত সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এনামুর রহমান চৌধুরী ও ডিআইজি ফররুখ আহাম্মদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের স্বীকারোক্তিতে জোট সরকার আমলে তদন্তে এই অবৈধ অস্ত্র চালানের সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, স্বরাষ্ট্রসচিব ওমর ফারুক এবং ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী তত্পর ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।

মহানগর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কামালউদ্দিন আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, লুত্ফুজ্জামান বাবর ও ওমর ফারুক ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মূল হোতাদের বাঁচানোর জন্য সক্রিয় ছিলেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য ১০ ট্রাক অস্ত্র আনা হয়। এ কারণেই বাবর ও ওমর ফারুককে এই মামলার আসামি করতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ফররুখ আহাম্মদ বলেছেন, ‘শুধু চট্টগ্রামের কর্মকর্তা নন, এনএসআইয়ের সদর দপ্তরের কর্মরত কর্মকর্তারাও সেই অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এমনকি এনএসআইয়ের মহাপরিচালকও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, যা আমাকে তত্কালীন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) কবির উদ্দিন জানিয়েছেন।’

জবানবন্দিতে ফররুখ আরও বলেন, ‘আমি বিষয়টি তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরকে জানাই। প্রতিমন্ত্রী আমাকে বলেন, “অনেক ব্যাপারে ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট জড়িত থাকে। এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে কক্সবাজারে এক ট্রলার অস্ত্র ধরা পড়ে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, সে ব্যাপারে কোনো মামলাও হয়নি। কাজেই জাতীয় স্বার্থে আমাদেরকে একটু বুঝেশুনে কাজ করতে হবে। আমি কমিটি করে দিয়েছি। স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করেন। উনাকে সব কিছু বলা আছে।’”

চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান ২০০৯ সালের ২ মার্চ অস্ত্র মামলায় আদালতে প্রথম জবানবন্দি দেন। তাঁর বক্তব্যে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপর ডিজিএফআইয়ের তত্কালীন পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, এনএসআইয়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, এনএসআইয়ের তত্কালীন পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবউদ্দিন, উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন ও মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন এবং সিইউএফএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসীন তালুকদার ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এনামুল হককে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি সূত্র জানায়, মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল ও মেজর লিয়াকত ছাড়া অন্য সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এই ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের ওপর ২০০৯ সালের ৫ মার্চ প্রথম আলোতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতেও এ অস্ত্র চালানের উত্স, গন্তব্য এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্তদের ব্যাপারে অনেকগুলো প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0