default-image

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের খুব প্রয়োজন ছিল। একটা বিপ্লব, সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থায় একটুখানি পরিবর্তনের ছোঁয়াটা ছিল অবধারিত। আর এই বিপ্লবের শুরুটা হলো ১০ মিনিটের এক স্কুলকে ঘিরে। বাংলাদেশ ছোট্ট একটা দেশ হলেও এর জনসংখ্যা কিন্তু নেহাতই কম নয়, পুরো বিশ্বে মাত্র ছয়টি দেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের থেকে বেশি! প্রায় ১৭ কোটি জনতার এই দেশে শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক, আর এই সমস্যার সমাধান করতেই এগিয়ে এল টেন মিনিট স্কুল (www.10minuteschool.com) ।

শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালে। বিনা খরচে পড়ালেখার এক সাইট, যেখানে একটু ভিন্নভাবে, কৌশল আর সৃজনশীলতার মিশেলে শেখানো হয়। শুরুর দিকে এমনই ছিল টেন মিনিট স্কুল। শেখো, অনুশীলন করো এবং উন্নত হও—এই ট্যাগ লাইন নিয়ে শুরু হয় অনলাইন স্কুলটির পথচলা। ১০ মিনিটের স্কুল বিশ্বাস করে মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থায়। তারা মনে করে শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।

সময় যত গড়িয়েছে, ছোট্ট স্কুলটিতে যোগ হয়েছে আরও অনেক কিছু। লাইভ ক্লাস থেকে শুরু করে টিউটোরিয়াল ভিডিও—কী নেই সেখানে? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে এখানে রয়েছে অজস্র মডেল টেস্ট আর কুইজ। শুধু তা-ই নয়, জেএসসি, এসএসসি, বিসিএস পরীক্ষা, ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষার জন্যও নানা প্রকার কুইজ আর ভিডিও টিউটোরিয়াল রয়েছে সাইটটিতে। এখানেই শেষ নয়। বিদেশে পড়ালেখা করতে হলে পরীক্ষা নামের যে বাধা পেরিয়ে আসতে হয়, সে বাধাকে সহজ করার জন্য SAT, GRE, GMAT আর IELTS-এর অনুশীলনের জন্যও টেন মিনিট স্কুল রেখেছে ১০ মিনিটের মজাদার সব মডেল টেস্ট আর কুইজ। এসব মডেল টেস্ট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীর কাজ হয়তো শেষ, কিন্তু স্কুলটার কাজ শেষ নয়; বরং আসল কাজ তখনই শুরু। উত্তর মূল্যায়ন করা, অন্যদের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করার পর ফলাফল অনুসারে প্রতিক্রিয়াও জানাবে অনলাইন এ সাইটটি। এসবের সঙ্গে যোগ হয় গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যের এক ভান্ডার, যেসব তথ্যের দেখা সচরাচর অন্তর্জালে মেলে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো এই যে এত কিছু, পুরোটাই একদম ফ্রি। বলতে গেলে এমন একটা সাইট বাংলাদেশে একটিই।

এ তো গেল প্রস্তুতি যাচাইয়ের পালা, প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যও টেন মিনিট স্কুলের রয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকের আয়োজন। টেন মিনিট স্কুলের ইউটিউব পেজে (www.youtube.com/10minuteschool) রয়েছে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন প্রভৃতি বিষয়সহ বিসিএস ও লেভেল ইত্যাদির ওপর হাজার খানেক ভিডিও। পেজটির প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের জ্ঞানের খোরাক জোগাতে নিত্য নতুন টিউটোরিয়াল যোগ হচ্ছে প্রতিদিন। পাঠ্যসূচির বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জ্ঞান ঝালাই করে নেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জীবনের নানা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে টেন মিনিট স্কুলের অনন্য সংযোজন হিসেবে রয়েছে লাইফ হ্যাকস, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতি।

টেন মিনিটস স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংযোজন লাইভ অ্যাডমিশন কোচিং। বিপুল জনপ্রিয় এ ফিচারটির গ্রাহক বর্তমানে ৫৩ হাজার ৪৫০। দেশের সর্বত্র শিক্ষার্থীদের কাছে মানসম্পন্ন শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ফেসবুকের লাইভ ফিচার ব্যবহার করে ২০১৬ সালের জুন থেকে লাইভ ক্লাসের আয়োজন করে আসছে টেন মিনিটস স্কুল। সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের সামনে নির্ধারিত টপিকের ওপর আলোচনা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন দক্ষ ইনস্ট্রাকটররা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), ব্র্যাকসহ বেশ কিছু স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ইনস্ট্রাক্টর টিমের সদস্যরা প্রতিটি বিষয়ের ওপর অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য উপায়ে ক্লাস নেন। গড়ে প্রতিটি ক্লাসে অংশ নেয় সাত হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী, প্রতিটি ক্লাসের পর বিষয়টি সম্পর্কে তাদের ধারণা আরও স্পষ্ট করার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় হাজার খানেক প্রশ্ন আসে।

>শিক্ষাব্যবস্থায় অলৌকিক কোনো পরিবর্তনের আশায় না থেকে টেন মিনিটস স্কুল দেখিয়ে দিয়েছে, উদ্যোগ আর চেষ্টা থাকলে যেকোনো কিছুই সম্ভব

কঠিন বিষয়গুলো হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন এবং ছাত্রদের খুঁটিনাটি সমস্যার সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সমাধান লাইভ ক্লাসের জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী অর্ধ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী লাইভ অ্যাডমিশন কোচিং সেবার দ্বারা উপকৃত হয়েছে।

অনলাইন স্কুলটির শিক্ষার্থী তথা সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা লাখের ঘরে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ লাখ ৭৬ হাজার। এর ভিডিও লাইব্রেরিতে ১ হাজার ১২১-এরও বেশি ভিডিও টিউটোরিয়াল আছে, যার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই মুহূর্তে টেন মিনিটস স্কুলের সবচেয়ে কার্যকরী প্রোগ্রাম হলো লাইভ ক্লাস। গোটা বাংলাদেশে ৫৩ হাজার ৪৫০-এরও বেশি শিক্ষার্থী প্রতিদিন রাত আটটায় অংশগ্রহণ করছে লাইভ ক্লাসে। রবি আজিয়াটা লিমিটেড স্কুলটিকে সম্পূর্ণ সহায়তা করছে, যাতে স্কুলটি বাংলাদেশের দূরদূরান্তের গ্রামেও পৌঁছে যেতে পারে। টেন মিনিটস স্কুল বিশ্বাস করে যদি কোনো শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ ও পূর্ণ ইচ্ছা থাকে, তাহলে সে যে প্রান্ত থেকেই আসুক না কেন, তার আর্থিক অবস্থা যেমনই থাকুক না কেন, তাকে সর্বোচ্চ শিক্ষাদান করা উচিত। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন টেন মিনিটস স্কুলের কর্মীরা। মুক্ত এবং উন্নত শিক্ষা সবার জন্য—এ লক্ষ্যেই এগোচ্ছে স্কুলটি।

টেন মিনিটস স্কুলের একটা টিম আছে। এই টিমই বলতে গেলে স্কুলটির প্রাণ। অদ্ভুত এই টিমে রয়েছেন স্বপ্নবাজ একদল তরুণ, যাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে মিলেছেন এক ছায়াতলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি আর বিইউপির মেধাবী মুখেরা মিলে এই প্রায় অসম্ভব স্বপ্নকে সত্যি করেছেন। স্কুলটার কার্যক্রম একটু অন্য রকম। যতই উদ্ভট হোক, টিমের যে কারও মাথায় কোনো আইডিয়া এলে এখানে সেটি চেষ্টা করে দেখা হয়। টিমের সবার কাজ করার প্রতি আগ্রহ দেখার মতো, আর এ জন্যই সম্ভবত এত অল্পসময়ে একটি অনলাইন সাইট এতটা পরিচিতি পেয়েছে। স্কুলটি একটা প্ল্যাটফর্মের মতো, এখানে যে কেউ চাইলে তাঁদের মেধা ও মননশীলতার দ্বারা সহায়তা করতে পারেন, স্কুলটিকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে নিয়ে মতামত দিতে পারেন। এই টিমটি স্বাগত জানায় আরও মেধাবী, সৃজনশীল মস্তিষ্ককে, আর সে জন্য যা করতে হবে তা হলো স্কুলটির ফেসবুক পেজে (https://www.facebook.com/ 10minuteschool) জানাতে হবে আপনার সম্পর্কে।

 টেন মিনিটস স্কুল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নিঃসন্দেহে একটা বিপ্লব শুরু করেছে। না, এ বিপ্লব রাজ্য জয়ের নয়, এ বিপ্লব ক্লিশে আর জীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার োলনলচে পাল্টানোর। একদল স্বপ্নালু তরুণ যখন রবি আজিয়াটা লিমিটেডের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শিক্ষা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় এক রকম বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে, তখন বলতেই হয়, জয়তু টেন মিনিটস স্কুল! শিক্ষাব্যবস্থায় অলৌকিক কোনো পরিবর্তনের আশায় না থেকে টেন মিনিটস স্কুল দেখিয়ে দিয়েছে, উদ্যোগ আর চেষ্টা থাকলে যেকোনো কিছুই সম্ভব। আপনিও চাইলে হতে পারেন স্কুলটির জয়যাত্রার একটি অংশ, দরকার শুধু একটুখানি উদ্দীপনা আর নতুন কিছু করার উৎসাহ।

আপনার কি ১০ মিনিট সময় হবে?

আয়মান সাদিক

কো-ফাউন্ডার, টেন মিনিটস স্কুল

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন