করোনাকালে মানবিক ক্রিকেট

বিজ্ঞাপন
>মাঠের ২২ গজের ভেতরে ক্রিকেট নেই তো কী হয়েছে, করোনাকালে এখন চলছে অন্য রকম এক ক্রিকেটকাল। মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ক্রিকেটাররা। মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক...কেবল এই তারকাই নন, দুঃসময়ে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছেন আরিফা বা নাজমুলের মতো ক্রিকেটাররাও। তাঁদের গল্প। লিখেছেন তারেক মাহমুদ
default-image

কোভিড-১৯-এর ঘায়ে মাঠ থেকে সাময়িক বিদায় নিল ক্রিকেটও। আগে তো জীবন, তার পরই না খেলা।

অথচ খেলাটাও তো কারও কারও জীবন-জীবিকা। খেলা না হলে অনেকের বাড়িতে চুলা জ্বলে না, হাঁড়িতে চাল চড়ে না। আমরা তাই দেখেছি, করোনায় ক্রিকেট খেলা হচ্ছে না বলে একজন ক্রিকেটার বর্গাচাষি হয়েছেন, আরেকজন হয়েছেন ফেরিওয়ালা। এ রকম আরও আছে। তাঁদের নাম বললে আপনারা চিনবেন না। কারণ এই ক্রিকেটাররা কেউ তামিম, মুশফিক বা সাকিবের মতো তারকাদ্যুতিতে উজ্জ্বল নন।

default-image

করোনাভাইরাস বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বহুমাত্রিক রূপটাই যেন তুলে ধরে আমাদের সামনে। এই অণুজীব ক্রিকেটারদের আর্থিক অনটনে যেমন ফেলেছে, তেমনি করোনাকালেই আমরা দেখেছি ক্রিকেটারদের, কিছু ক্রিকেটারের মানবিক রূপ। ওই যে তামিম, মুশফিক, সাকিবের কথা বলা হলো; এ রকম আরও আছেন। করোনায় আক্রান্তদের বাঁচানোর লড়াইটা লড়ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। আর অতিমারির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যাদের মুখে অন্ন জুটছিল না, তাদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে নাম লেখান ক্রিকেটাররাও।

রংপুরের আরিফা জাহানের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকে খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে আরিফার। এই অমুকের অন্তঃসত্ত্বা বউ ফোন দিয়ে বলে, ‘আমার ঘরে চাল নেই, ডাল নেই...’, তো ওই খোঁজে তমুক পত্রিকার সাংবাদিক, ‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব। সময় হবে...?’

আরিফা ছিলেন একজন ক্রিকেটার। মেয়েদের জাতীয় দলে কখনো খেলেননি। খেলেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। এরপর হয়েছেন কোচ। করোনাভাইরাস যখন একটু একটু করে বাংলাদেশেও ছড়াতে শুরু করল, আরিফা ঠিক করলেন, এবার তবে কিছুদিনের জন্য ব্যাট-বল রেখে দেওয়া যাক। সময়ের দাবি এখন অন্য কিছু করার। যেই ভাবা, সেই কাজ। কাজ তো নয়, আসলে নেশা। মানবতাবোধের তাড়না।

অটোরিকশায় করে রংপুরের অসচ্ছল অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া আরিফা করোনাকালে আবির্ভূত হলেন একেবারে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে। 

default-image

ঠিক একইভাবে চারদিকে কিলবিল করতে থাকা কোভিড-১৯ গায়ে মেখে মানবতার ডাকে এখানে ওখানে ছুটে বেড়িয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আরেক ক্রিকেটার নাজমুল ইসলাম। মানুষকে খাওয়ার কষ্টে থাকতে দেননি। ফল, মা–বাবাসহ নিজেও হয়েছেন করোনায় আক্রান্ত।

নাজমুল, আরিফার মতো মাঠে নেমে লড়াই করেননি তারকা ক্রিকেটাররা। তাঁদের জন্য এভাবে কাজ করা একটু কঠিনও বটে। কিন্তু করোনাকালে ঘরে বসেই তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মুর্তজারা যা করেছেন, তা তাঁদের মাঠের কীর্তির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

করোনাকালে তামিমের কানে এল এক ভদ্রমহিলার কথা। স্বামী নেই, মেসভাড়ার আয় দিয়ে সন্তানদের নিয়ে ভালোই চলছিলেন। এর মধ্যেই করোনার নীরব লু-হাওয়ায় সব এলোমেলো। ব্যাচেলর ভাড়াটেরা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হলো। ফলে ওই ভদ্রমহিলাও পড়ে গেলেন বিপদে। ভাড়াটে নেই মানে তো তার বাড়িভাড়াও বন্ধ। এখন চলবেন কী করে? সন্তানদের কী খাওয়াবেন? মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ তিনি। কারও কাছে সাহায্য চাইতেও অস্বস্তি। এক পরিচিতজনের মাধ্যমে ভদ্রমহিলার দুরবস্থার কথা কানে আসে তামিমের। তখনই তাঁর মাথায় চিন্তাটা খেলে গেল। করোনাভাইরাস মানুষের অভাবের কত রূপই না তুলে ধরছে!

তামিম সেই ভদ্রমহিলার জন্য কিছু টাকা পাঠালেন। এরপর বেছে বেছে সেই সব মানুষদের সাহায্য করতে লাগলেন, যাঁদের সাহায্য দরকার কিন্তু লোকলজ্জায় কারও কাছে কিছু চাইতে পারছেন না। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন খেলার ৯১ জন খেলোয়াড়কে বিকাশে টাকা পাঠালেন। আর্থিক সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়ালেন চট্টগ্রামের ক্রিকেট কোচদের। শুরুতে যাঁর কথা বলা হলো, সেই আরিফা জাহানের কাজে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন তামিম। দায়িত্ব নেন ১৫০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর খাবারদাবারের। এর আগে প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি খবর পড়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক তরুণীর সাহায্য তৎপরতা তথা মানবতার কাজেও সঙ্গী হয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক।

পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে করোনাকালের শুরুতেই সাকিব আল হাসান চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন দেশের করোনাদুর্গত মানুষের পাশে থাকতে। নিজের প্রিয় গত বিশ্বকাপের ব্যাটটা নিলামে তুলে দিলেন। কত প্রিয়, সেটি জানাতে গিয়ে সাকিব বলেছিলেন, ‘এই ব্যাট দিয়ে খেলেই অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ কাটালাম। প্রয়োজনে কখনো ব্যাটে টেপ লাগিয়ে নিয়েছি, তবু পুরো বিশ্বকাপে শুধু এই একটা ব্যাট দিয়েই খেলেছি।’

বিশ্বকাপে দুটি সেঞ্চুরিসহ ৬০৬ রান করেছেন, তার আগে অন্যান্য খেলায় এই ব্যাট দিয়েই আসে ১৫০০ রান। সাকিবের কাছে অমূল্য এই ব্যাটের দাম নিলামে উঠল ২০ লাখ টাকা। সাকিব আল ফাউন্ডেশন সেই টাকা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াল। আর করোনায় মানবতার ডাকে আরও যাঁরা সাড়া দিচ্ছেন, কোথাও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম দিয়ে, কোথাও-বা অ্যাম্বুলেন্স কিনে দিয়ে তিনি সাহায্য করেছেন তাঁদেরও।

default-image

স্মারক প্রিয় মুশফিকুর রহিমও আঁকড়ে ধরে ছিলেন একটি বিশেষ ব্যাট। যে ব্যাট দিয়ে ২০১৩ সালে গল টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এসেছিল তাঁর প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, সময়ের প্রয়োজনে কোভিড-১৯-কে হারাতে সেই ব্যাট তিনি তুলে দিলেন নিলামে। দাম উঠল ১৭ লাখ টাকা, নিজের ফাউন্ডেশনের জন্য ব্যাটটা কিনে নেন ক্রিকেটের বিশ্বতারকা শহীদ আফ্রিদি। বাংলাদেশে যে রকম মুশফিক-তামিমরা, পাকিস্তানেও তেমনি আফ্রিদি করোনাযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা। পরিণতি, পরে তিনিও হন কোভিড পজিটিভ।

করোনায় মাশরাফি বিন মুর্তজা নেন দ্বৈত দায়িত্ব। মানুষ হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাও আগে থেকেই তাঁর চরিত্রের অংশ। আবার নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্যও তিনি। পরে যদিও মাশরাফির ঘরেই করোনা হানা দিয়েছে, শুরুতে নড়াইলকে করোনামুক্ত রাখতে কম চেষ্টা করেননি জাতীয় দলের সদ্য সাবেক হওয়া এই অধিনায়ক। একপর্যায়ে নিলামে তোলেন খোদাই করে ‘মাশরাফি’ লেখা শখের ব্রেসলেটটি। সাকিব, মুশফিকের ব্যাটের দ্বিগুণেরও বেশি দাম উঠে গেল সেটির, ৪২ লাখ টাকা। এই টাকার পুরোটাই মাশরাফি কাজে লাগান নড়াইলে তাঁর করোনা-লড়াইয়ে।

করোনায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ক্রিকেটারদের সারিটা এখানেই শেষ নয়। তামিম-মাশরাফিদের পর তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকার, নাঈম শেখ পর্যন্ত নাম শোনা গেলেও প্রচারের আলোয় না এসেও অনেকে সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে। করোনাকালে ক্রিকেটটা মাঠে না থাকলেও আছে মানুষের মনে, মানবতার বৃহৎ ক্যানভাসে।

করোনাভাইরাস নিশ্চয়ই একদিন দূর হবে। কিন্তু মুছে যাবে না করোনাকালের দুঃসহ স্মৃতি। ক্রিকেটারদের মানবিকতা স্মৃতির আয়নায় রেখে দেবে করোনাকালের ক্রিকেটকালকেও।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন