default-image
default-image

১৯৪০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ২০। এরই মধ্যে তিনি কলকাতা গেছেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করেছেন, গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেছেন। তিনি গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের সম্পাদক। মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটির হলেন সেক্রেটারি। এই অবস্থায় তাঁর ঝোঁক রাজনীতির দিকে, আর ঝোঁক খেলাধুলার দিকে।

বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আমরা পাচ্ছি, ১৯৪০ সালে তিনি ফুটবল খেলছেন। টানটান উত্তেজনাময় এক ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছে। শেখ মুজিব মিশন স্কুল ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন। তাঁর আব্বা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি। তাঁর আব্বার দলে টাকার অভাব ছিল না, তাঁরা হায়ার করে খেলোয়াড় আনতেন। বেচারা স্কুলছাত্ররা, তাদের টিমে তো আর বাইরের খেলোয়াড় আসবে না, টাকা কই! তবু পাঁচ দিন খেলা ড্র হলো। স্কুলের টিম ক্লান্ত। আর অফিসার্স টিমে নতুন খেলোয়াড়। তাঁরা তরতাজা। শেখ মুজিব কয়েক দিন বিশ্রাম চান, অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সেই বিবরণ পাচ্ছি:

আব্বা বললেন, “কাল সকালেই খেলতে হবে। বাইরের খেলোয়াড়দের আর রাখা যাবে না, অনেক খরচ।”

আমি বললাম, “আগামীকাল সকালে আমরা খেলতে পারব না, আমাদের পরীক্ষা।”

গোপালগঞ্জ ফুটবল ক্লাবের সেক্রেটারি আব্বার কাছে আর আমার কাছে কয়েকবার হাঁটাহাঁটি করে বললেন, “তোমাদের বাপ-বেটার ব্যাপার, আমি বাবা আর হাঁটতে পারি না।” আমাদের হেডমাস্টার তখন রসরঞ্জন সেনগুপ্ত। আমাকে তিনি প্রাইভেটও পড়াতেন। আব্বা হেডমাস্টারকে খবর দিয়ে আনলেন। আমি আমার দলবল নিয়ে এক গোলপোস্টে আর আব্বা তাঁর দলবল নিয়ে অন্য গোলপোস্টে। হেডমাস্টার বললেন, “মুজিব, তোমার বাবার কাছে হার মানো। আগামীকাল সকালে খেলো, তাদের অসুবিধা হবে।” আমি বললাম, “স্যার, আমাদের সবাই ক্লান্ত, এগারোজনই সারা বছর খেলেছি। সবার পায়ে ব্যথা, দু-চার দিন বিশ্রাম দরকার। নতুবা হেরে যাব।” এ বছর তো একটা খেলায়ও আমরা হারিনি, আর এ জেড খান শিল্ডের এই শেষ ফাইনাল খেলা।

হেডমাস্টারবাবুর কথা মানতে হলো। পরের দিন সকালে খেলা হলো।

আমার টিম আব্বার টিমের কাছে এক গোলে পরাজিত হলো।

ফুটবল জার্সি পরা সেই টিমের সঙ্গে কিশোর শেখ মুজিবের সেই ছবিটা এখন আমরা দেখতে পাই। 

কী মধুর এই বর্ণনা! বঙ্গবন্ধু কিন্তু খেলাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। শেখ রেহানার কাছ থেকে জেনেছি, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর খবর যখন শেখ মুজিবের কাছে আসে, তখন তিনি হাফপ্যান্ট পরা, কেডস পরা, হাতে ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট, এই সময় ফোন আসে। খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু কেঁদে উঠেছিলেন, ‘বস আর নাই’। এই সব বিবরণ থেকে আমরা এই পরিবারটির ক্রীড়াপ্রীতি সম্পর্কে জানতে পারি।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেই পাচ্ছি, ১৯৪১ সালের ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলনের একটা বিবরণ। সেই সম্মেলনে শেখ মুজিব কাদের নিয়ে গিয়েছিলেন? কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও হুমায়ুন কবিরকে। ১৪৪ ধারা জারি হলো। সম্মেলন হলো হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। সেখানে রাজনীতি নিয়ে নয়, আলোচনা হলো শিক্ষা নিয়ে। গান গাইলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

১৯৪১ সালে শেখ মুজিব ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। বাংলা পরীক্ষার দিন প্রচণ্ড জ্বর হয়। গোপালগঞ্জের সব ডাক্তারকে ডেকে আনলেন তাঁর আব্বা। সব বিষয়েই তিনি ভালো নম্বর পেয়েছিলেন। শুধু বাংলায় কম। শেখ মুজিবের লেখা বই পড়ে এখন আমরা জানি, তিনি বাংলায় ভালো ছিলেন, অসুস্থ না হয়ে পড়লে তিনি নিশ্চয়ই বাংলাতেও ভালো নম্বরই পেতেন। যাহোক, দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। বেকার হোস্টেলে ওঠেন। সেখানে গিয়ে তিনি নেতা হয়ে পড়েন। যেমন–তেমন নেতা নন, প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। তিনি মুসলিম লীগের অফিশিয়াল প্রার্থী আনোয়ার সাহেবকে পরাজিত করে ছাত্র সংসদের নেতা নির্বাচিত হন।

এই সময় থেকেই মুসলিম লীগের মধ্যে দুটো অংশ। একটা অংশ ঢাকার নবাব পরিবারের নেতৃত্বাধীন, রক্ষণশীল। আরেকটা অংশকে বলা হতো প্রগতিশীল। আবুল হাশিম তাদের তত্ত্ব শেখাতেন। ক্লাস নিতেন। বঙ্গবন্ধু সেই ক্লাস করতেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই সময় আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে পাকিস্তান দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু–মুসলমানদের মেলানোর জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য। তিনি আমাদের কিছুসংখ্যক কর্মীকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে রাতে আলোচনা সভা করতেন মুসলিম লীগ অফিসে। হাশিম সাহেব পূর্বে বর্ধমানে থাকতেন, সেখান থেকে মুসলিম লীগ অফিসে একটা রুমে এসে থাকতেন, কলকাতায় আসলে। মুসলিম লীগ অফিসটা শহীদ সাহেব ভাড়া নিয়েছিলেন। তাঁকেই ভাড়া দিতে হয়েছে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, “একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তোমাদের লেখাপড়া করতে হবে। শুধু হিন্দুদের গালাগালি করলে পাকিস্তান আসবে না।” আমি ছিলাম শহীদ সাহেবের ভক্ত। হাশিম সাহেবও শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলেন বলে আমিও তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম, তাঁর হুকুম মানতাম। হাশিম সাহেবও শহীদ সাহেবের হুকুম ছাড়া কিছু করতেন না। মুসলিম লীগের ফান্ড ও অর্থ মানে শহীদ সাহেবের পকেট। টাকাপয়সা তাঁকেই জোগাড় করতে হত। সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করব। হাশিম সাহেব বলতেন, মুসলিম লীগকে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। গ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। উপরের তলার প্রতিষ্ঠান করলে চলবে না। জমিদারদের পকেট থেকে প্রতিষ্ঠানকে বের করতে হবে। তিনি শহীদ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে সমস্ত বাংলাদেশ ঘুরতে আরম্ভ করলেন। চমৎকার বক্তৃতা করতেন। ভাষার উপর দখল ছিল। ইংরেজি বাংলা দুই ভাষায় বক্তৃতা করতে পারতেন সুন্দরভাবে।’

কাজেই বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগ করেছেন, পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন, তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে তিনি মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশটাকে ধারণ করতেন, সেটারই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। 

আবুল হাশিম তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে রাত আড়াইটা পর্যন্ত ক্লাস হতো। শেখ মুজিব ক্লাসে আসতেন। এবং প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তেন। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বলতেন, কাজ কী করতে হবে। তিনি অনন্যসাধারণ ভালো কর্ম–উদ্যমী তরুণ ছিলেন। হি ওয়াজ এক্সেপশনালি গুড ইয়াং ম্যান অব অ্যাকশন, নট থট। (ইন রেট্রোস্পেক্ট, আবুল হাশিম)

 দুই

বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়। ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়।’ তিনি লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয়, তখন আমার বয়স বার–তের বছর হতে পারে।...রেণুর বয়স বোধ হয় তখন তিন বছর হবে।’ বঙ্গবন্ধুর জীবনে বেগম মুজিব এবং তাঁর আব্বা শেখ লুৎফর রহমানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ই তাঁর আব্বা তাঁকে বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি করো, আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ, এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না করলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখো, “সিনসিয়ারিটি অব পারপোজ অ্যান্ড অনেস্টি অব পারপোজ” থাকলে জীবনে পরাজিত হবে না।’ বঙ্গবন্ধু এ কথা ভোলেননি।

বেগম মুজিব সম্পর্কে কামরুদ্দীন আহমদ বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ বইয়ে লিখেছেন, ‘শেখ সাহেবের স্ত্রী পরম ধৈর্যশীলা এবং শেখ সাহেবের রাজনীতির প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন।...শেখ সাহেবের স্ত্রী বুদ্ধি হবার পর থেকেই তাঁর স্বামীর জীবনধারার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিতে পেরেছিলেন। কারণ, বিয়ে হয়েছিল শেখ সাহেবের সঙ্গে, যখন তিনি ছোট বালিকা। তাই বাল্যে, কৈশোরে এবং যৌবনে স্বামীর সকল কাজের মধ্যে নিজেকে অংশীদার করে ফেলেছিলেন।’

১৯৪৩-এর মন্বন্তরের সময় শেখ মুজিব মানুষের সেবায় প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন। তাঁর ভাষায়, ‘এই সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেকগুলি লঙ্গরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম। মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরও অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খুললাম, দিনভর কাজ করতাম, আর রাতে কোনো দিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোনো দিন অফিসের টেবিলে শুয়ে থাকতাম।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময় কলকাতায় শেখ মুজিব দিবারাত্র পরিশ্রম করেন, হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, নিরাপত্তা দেবার চেষ্টা করেন। ভারতের একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ এবং ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষক ভবতোষ দত্তর স্মৃতিকথায় পাই, ‘বাংলাভাষী দলের নেতা ছিল একটি কৃশকায় ছেলে, নাম শেখ মুজিবুর রহমান।...ইসলামিয়া কলেজের ছাত্ররা যে আমাদের জন্য কতটা করতে পারত, তার প্রমাণ পেলাম ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত দাঙ্গার সময়। বালিগঞ্জ থেকে ইসলামিয়া কলেজ পর্যন্ত পদে পদে বিপদ। এই রাস্তা আমাদের ছাত্ররা পার করে দিত। ওরা বালিগঞ্জের কাছে অপেক্ষা করত আর সেখান থেকে ওয়েলসি স্ট্রিটে কলেজে নিয়ে যেত। আবার সেভাবেই ফিরিয়ে দিত।...এই সব ছাত্রের একজনের নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান।’ (আট দশক, ভবতোষ দত্ত)

 তিন

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকা নিয়ে একাধিক দেশ করার কথা ছিল লাহোর প্রস্তাবে, এ কথা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বইয়ে বারবার করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তবু যখন পাকিস্তান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল, তখন তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দী ও সুভাষ বসুর ভাই শরৎ বসু মিলে দুই বাংলা, আসাম ইত্যাদি মিলে একটা বৃহত্তর বাংলা গড়ার আন্দোলন গড়ে তুললেন। শেখ মুজিব সেই আন্দোলনে যোগ দিলেন। 

কিন্তু ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হলো। পাকিস্তান আর ভারত এই দুইটি স্বাধীন দেশ হবে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে। শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজের সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেলে ডেকে পাঠালেন তাঁর ছাত্র সহকর্মীদের। এই সভায় তিনি বললেন, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে যেতে হবে। কারণ আমার আশঙ্কা হচ্ছে এই স্বাধীনতা স্বাধীনতা নয়।’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, মযহারুল ইসলাম)

শেখ মুজিবুর রহমান যে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর অখণ্ড বাংলা আন্দোলনে ছিলেন, সেই জুজুর ভয় পাকিস্তানে এসবি রিপোর্টে ১৯৪৮ সালেও দেখা যায়। শেখ হাসিনা সম্পাদিত সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বইয়ের ১ নম্বর খণ্ডের ১০ নম্বর পৃষ্ঠায় গোয়েন্দারা শেখ মুজিবের পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাঁর ঢাকার ঠিকানা ১৫০ মোগলটুলি, লালবাগ। তিনি মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সাবকমিটির নির্বাচিত সদস্য। নারায়ণগঞ্জে ১৬ মে ১৯৪৮ সালে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে তাঁকে এ পদে নির্বাচিত করা হয়। 

সোহরাওয়ার্দী শরৎ বসুর কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পাচ্ছেন দুই বাংলাকে এক করার জন্য। সোহরাওয়ার্দী কাজ করছেন ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ইত্যাদি ইত্যাদি।

শেখ মুজিব নবাব, উর্দুভাষী ও বুর্জোয়া মুসলিম লীগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন সেই ১৯৪৭ থেকেই। ১৯৪৮ সালে তিনি নেতৃত্ব দেন একটা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের। সচিবালয়ের সামনে হরতালে পিকেটিং করার সময় গ্রেপ্তার হন।

১১ মার্চ ১৯৪৮। জেলখানায় অনিভজ্ঞ ছাত্ররা গুনতির সময় এক লাইন থেকে গোপনে আরেক লাইনে গিয়ে বসছে। যারা গুনবে, তারা হিসাব মেলাতে পারছে না। এই নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে গার্ডদের বচসা। পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠল। মুজিব দেখলেন সর্বনাশ। পুলিশ এসে ছাত্রদের বেধড়ক মারবে। তিনি উঠে গিয়ে দরজায় দাঁড়ালেন। পুলিশকে বাধা দিয়ে বললেন, খবরদার। কেউ ভেতরে ঢুকতে পারবে না। জেলারকে ডেকে আনো। আমি দেখছি সব।

পুলিশের বন্দুক এসে ঠেকল মুজিবের বুকে। ২৮ বছরের মুজিব তবু অকুতোভয়।

সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম তাঁর অশ্লেষার রাক্ষুসী বেলায় বইয়ে এই বিবরণ সুন্দরভাবে দিয়েছেন।

default-image

১৯৪৮ সালের জেলখানার বর্ণনা পাই অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে, ‘আমাদের এক জায়গায় রাখা হয়েছিল জেলের ভিতর। যে ওয়ার্ডে আমাদের রাখা হয়েছিল, তার নাম চার নম্বর ওয়ার্ড। তিনতলা দালান। দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করতো, আর চারটায় শেষ করতো। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হত না। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই”, “পুলিশি জুলুম চলবে না”—নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, “হক সাহেব, ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না।” হক সাহেব আমাকে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব।”’

ওই সময়েরই চমৎকার আরেকটা বর্ণনা আছে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে, যখন আব্বাসউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নদীপথে শেখ মুজিব ফিরছিলেন, ‘নদীতে বসে আব্বাসউদ্দীন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে। তাঁরই শিষ্য সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন তাঁর নাম কিছুটা রেখেছিলেন। আমি আব্বাসউদ্দীন সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাসো, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কথা দিয়েছিলেন এবং কথা রেখেছিলেন। তিনি বাংলাভাষার রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত করে ছেড়েছিলেন।

শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন সমর্থন করলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো। তাঁকে বহিষ্কার করা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আরও অনেককেই বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাঁরা গোপনে বন্ড সই দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। শেখ মুজিব যাননি। পরে রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলবেন, তাতে ভালোই হয়েছে। তার ছাত্রত্ব ঘুচে গেল। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গেলেন। আর উকিল হওয়া তাঁর হলো না। পরে দেখা গেছে, রাজনীতিতে উকিলরা সক্রিয় যেমন থাকেন, তেমনি রাজনীতিকেরা সময়–সুযোগমতো উকিল হয়ে যান। কিন্তু মুজিব পেছনে ফেরার সেতু পুড়িয়ে দিলেন। এ জন্য তিনি সহযোগী হিসেবে পেলেন তার সুযোগ্য সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ওরফে রেণুকে। অভয় পেলেন তাঁর আব্বার কাছ থেকে। শেখ মুজিব তাঁর জীবন উৎসর্গ করলেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য। 

কারাগারে তিনি নিক্ষিপ্ত হয়েছেন অসংখ্যবার। তাঁর কাছে যেতেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা। তাঁরা যেসব রিপোর্ট করতেন, এখন সেসব প্রকাশিত হয়েছে। মুজিবকে তাঁরা বলতেন, ‘আপনি দস্তখত দিন, আপনাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে।’ মুজিব বলতেন, ‘জীবন দেব, কিন্তু দাসখত দিয়ে মুক্তি নেব না, বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দেব। তবু আপস করব না।’ এসবির লোকেরা তাঁদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘এই বন্দীর মনোবল অতি উচ্চ।’

দেশ স্বাধীন করার ভাবনাটা তাঁর মাথায় কখন প্রথম আসে? অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন, শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এল?’

‘শুনবেন?’ তিনি মুচকি হাসলেন। ‘সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙালির এক দেশ।’

নিজের জীবন, নিজের পারিবারিক জীবনকে বাংলার মানুষের জন্য উৎসর্গ করে ‘সিনসিয়ারিটি অব পারপজ অ্যান্ড অনেস্টি অব পারপাজ’ দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের বাংলাদেশ নামের দেশটি দিয়ে গেছেন। 

আনিসুল হক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন