‘আপনি গিয়েছিলেন সেখানে?’

‘জি। বেশ কয়েক বছর আগে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। নরওয়ের একজন বিখ্যাত পর্বতারোহী গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে। বেশ এক্সাইটিং একটি অভিযান ছিল।’

‘আশ্চর্য! এত দুর্গম পাহাড়ে বিদেশি গিয়েছিল?’

আমি ২০১১ সালের কথা বলছি। তখন পাহাড়ে এত প্রতিবন্ধকতা ছিল না। বিদেশিরাও পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সহজেই অনুমতি পেয়ে যেত।

‘আপনাদের নিরাপত্তার জন্যই সব।’

‘তাই হবে। এমন চমৎকার জায়গাগুলোতে আমরা ট্রেক করতে পারি না। ব্যাপারটা খুব দুঃখজনক।’

‘আপনাদের অভিযানের গল্প বলুন। কীভাবে বুঝতে পারলেন এটাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া?’

এমন একটি জায়গায় বসে এই প্রশ্নটি বড়ই অপ্রত্যাশিত ছিল। ক্যাম্পে বসে এত দিন শুধু নিজের পরিচয়ই দিয়ে গেছি, এই প্রথম কেউ গল্প শুনতে চাইল। নেটওয়ার্কবিহীন, বিদ্যুৎবিহীন এমন দুর্গম স্থানে আমরা হয়তো একটু নতুন স্বাদ নিয়ে এসেছি। তাই হয়তো উনি এত আগ্রহ নিয়ে কথা বলছেন। আবার হয়তো, সত্যিকারের আগ্রহ আছে বলেই এসব জানতে চাচ্ছেন। আমিও ভাবলাম তাঁকে সাকা হাফংয়ের গল্প খুলেই বলা যাক।

‘আসলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার অস্তিত্ব তো অনেক আগে থেকেই ছিল। এই অঞ্চলের যত প্রাচীন মানচিত্র আছে, আমেরিকার সিআইএ, সোভিয়েত মিলিটারি টপোম্যাপ, সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ম্যাপ, সব জায়গাতেই এর অবস্থান ও উচ্চতা উল্লেখ করা ছিল। ম্যাপ দেখে চূড়াটি চিহ্নিত করে সশরীর সেখানে গিয়ে পরিমাপ করার কৃতিত্ব জিঞ্জে ফুলেন নামের এক ব্রিটিশ পর্বতারোহীর। খুব বেশি দিন আগের কথা নয় কিন্তু, ২০০৬ সালের এক অভিযানে তিনি চূড়াটি আরোহণ করেছিলেন।’

‘তাই নাকি? তখনো বিদেশিদের আমাদের পাহাড়ে আনাগোনা ছিল?’

‘জি। বললাম না আপনাকে, আগে আমাদের পাহাড় ভ্রমণে এতটা প্রতিবন্ধকতা ছিল না। প্রচুর বিদেশি ঘুরতে আসতেন।’

‘কিন্তু ২০০৬ সালে হঠাৎ করে সেই ব্রিটিশ ভদ্রলোক সাকা হাফং খুঁজে পেল কী করে?’

‘জিঞ্জে ফুলেনের গল্পটা কিন্তু খুবই ইন্টারেস্টিং। এই ব্রিটিশ ভদ্রলোক পেশায় ডিপ সি ডাইভার আর পৃথিবীর যত সব উদ্ভট খেলায় অংশ নেওয়া তাঁর শখ। সেই সঙ্গে পৃথিবী সব কটি দেশের সর্বোচ্চ চূড়া আরোহণের গিনেস রেকর্ড করার মিশনে নেমেছেন তিনি।’

‘স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল সবখানেই দেখি তাঁর বিচরণ। বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার।’

‘আসলেই লার্জার দেন লাইফ একজন ক্যারেক্টার জিঞ্জে ফুলেন। এভারেস্ট আরোহণকালে হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তাঁর। এরপর থেকে ছয় হাজার মিটারের ওপর আর ক্লাইম্ব করেন না। তাঁর গিনেস রেকর্ডের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন।’

গল্পে গল্পে তখন সাঙ্গু উপত্যকায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে পুরো চরাচর। শত বছর বয়সী গর্জনের ক্যানোপিগুলো অবাধ্য শিশুর মতো সেই চাদর ভেদ করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই ক্যানটিন থেকে রং-চা আর নোনতা বিস্কুট চলে এল। কাপে চুমুক দিয়ে আবার গল্পে ফিরে গেলাম।

‘আচ্ছা আপনাদের এই পাহাড় মাপামাপি শুরু হয়েছে কবে থেকে?’

‘পার্বত্য চুক্তির আগে সংঘাত চলার সময়ে প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া সমতল থেকে খুব কম মানুষই এই অঞ্চলগুলোতে পরিভ্রমণ করেছে। মূলত ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির পরপরই সমতলে বাস করা মানুষের মধ্যে অচেনা, অজানা, দুর্গম, রহস্যময় ও দীর্ঘদিন রুদ্ধ থাকা বিশাল এই পাহাড়ি এলাকা সম্পর্কে কৌতূহল বাড়তে থাকে।’

default-image

একই সময়ে ঘোরাঘুরিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সমমনা কয়েকজন মিলে সংগঠিত হওয়া শুরু করেন। একে একে গঠিত হয় মাউন্টেন ট্রেকার্স ক্লাব, এক্সপ্লোরার ক্লাব অব বাংলাদেশ, অ্যাডভেঞ্চার অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব, ডি-ওয়ে এক্সপেডিটরস, ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশসহ অনেক ক্লাব বা সংগঠন। এ ছাড়া এমন অনেকেই ছিলেন যাঁরা বন্ধুবান্ধব মিলে নিজেদের মতো পাহাড়ি অঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন।

নতুন একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সমতলের তরুণেরাই সবার আগে আকৃষ্ট হয়েছিল। বিশেষ করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা এই বিষয়ে এগিয়ে ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরিব্রাজক’, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ট্রেকার গ্রুপ, বুয়েটের ছাত্রদের নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

১৯৯৮ সালের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া হিসেবে কেওক্রাডংকেই স্বীকৃতি দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার থেকে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ভৌগোলিক সার্ভের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সার্ভে ডিপার্টমেন্ট ফটোগ্রামাটিক সার্ভে করে বের করে কেওক্রাডং নয় থানচি উপজেলার কাছের আরেকটি চূড়া কেওক্রাডং থেকেও উঁচু, যার স্থানীয় নাম তাজিং ডং। সরকারিভাবে পরে এই চূড়াটির নাম দেওয়া হয় ‘বিজয়’।

১৯৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৩-০৪ পর্যন্ত সংগঠনের সঙ্গে ও স্বতন্ত্রভাবে অনেকেই রুমা বাজার, বগা লেক, কেওক্রাডং ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল, রোয়াংছড়ি, রাইক্ষিয়াং উপত্যকা, তিনমাথা, এদিকে থানচি, বড় মোদক অঞ্চলের নানা জায়গা ঘুরে আসতে লাগল। তাদের মধ্যেই কয়েকজনের মধ্যে ঘোরাঘুরির সঙ্গে সঙ্গে এই অচেনা জায়গায় ভৌগোলিক অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হলো। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় অবস্থিত চূড়াগুলো চিহ্নিত করা, পথের সন্ধান করে চূড়াগুলোর উচ্চতা পরিমাপ করা, জলপ্রপাতগুলোর স্থান চিহ্নিত করার মতো কাজে তারা আত্মনিয়োগ করল। অনেকেই বুঝতে পারছিলেন তাজিংডং কোনোভাবেই কেওক্রাডং থেকে উঁচু হবে না, এমনকি কেওক্রাডং থেকেও উঁচু চূড়া বাংলাদেশে থাকতে পারে। এই ভেবে শুরু হলো অনেকের অনুসন্ধানী অভিযান।

এমন অনেকের মধ্যে একজন ছিলেন গোলাম কিবরিয়া দীপু। তাঁরা কয়েকজন বন্ধু এয়ারফোর্স, বাংলাদেশ আর্মির মানচিত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে রাখা নথি ঘেঁটে ২০০১ সালের দিকে খুঁজে পেয়েছিলেন, কেওক্রাডং বা তাজিংডং নয়—বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের বড় মোদক অঞ্চলেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই অঞ্চলে তাঁরা অভিযানে যেতে পারেননি।

জিঞ্জে ফুলেন নামের একজন ব্যক্তি যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া খুঁজে পেয়েছেন, এটি আমরা জানতে পারি আরও পরে। ২০০৭ সালে প্রথম আলোর সাপ্লিমেন্ট ছুটির দিনে এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে জিঞ্জে ফুলেন ও তাঁর অভিযানের উল্লেখ ছিল।

default-image

সেবার অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তিন সদস্যের একটি দল বান্দরবান ট্রেকিংয়ে গিয়েছিল। সেখানেই স্থানীয় কারবারির কাছে তাঁরা জানতে পারেন, ইংল্যান্ড থেকে কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক নাকি জিপিএস ব্যবহার করে দেখতে পেয়েছেন মিয়ানমার সীমান্তের একটি পাহাড় তাজিংডং থেকেও উঁচু। সে পাহাড়ের নাম ‘ত্ল্যাং ময়।

‘ত্ল্যাং ময়? চূড়াটির নাম না সাকা হাফং?’

‘গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস পয়েন্ট আউট করেছেন। এই চূড়ার অনেকগুলো নাম আছে। পুরোনো ম্যাপগুলো অনুযায়ী ‘মোদক তং’, জিঞ্জে ফুলেন মেংপং নামে একজন বম গাইডের সাহায্য নিয়েছিলেন, নিজ ভাষায় মেংপং এই চূড়ার নাম দিয়েছিলেন ‘ত্ল্যাং ময়’ বা সুন্দর পাহাড়। পর্বতারোহী সজল খালেদ চূড়াটির বাংলা নাম হিসেবে ‘স্বপ্নচূড়া’ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এদিকে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব চূড়ার কাছের ত্রিপুরাপাড়ার এক স্কুল টিচারের সঙ্গে কথা বলে ‘সাকা হাফং’ বা পুবের পাহাড় নামটির ব্যাপক প্রচারণা চালায়। আবার চূড়ার সবচেয়ে কাছের বসতি ম্রোদের ভাষায় এটিকে বর্ডার হুঙ বলে।

‘বেশ ঘোরালো ব্যাপারস্যাপার দেখা যাচ্ছে। যা-ই হোক, এরপর কী হলো?’

‘প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধিৎসু অভিযাত্রীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও এই চূড়া ও সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে দলগুলো বিস্তারিত কোনো তথ্য পাচ্ছিল না। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় প্রথম বাংলাদেশি দল হিসেবে আরোহণ করার কৃতিত্ব নেওয়ার আকর্ষণে অনেকেই সর্বাত্মক চেষ্টা করতে থাকল। প্রথম হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিল দুটি দল—নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব এবং মাউন্টেন ট্রেকার্স ক্লাব। দুটি দলই ডিসেম্বরের ঈদুল আজহার ছুটিতে অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

যাত্রাপথে দুটি দলের মধ্যে বাদানুবাদ ও প্রথম হওয়ার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছিল। চূড়ার নাম নিয়ে হওয়া তথ্যবিভ্রাট, সংবাদ সম্মেলন ও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন মিলিয়ে পুরো পরিস্থিতি জটিল ও ঘোলাটে হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়ে অভিযান শেষ করে নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব ক্রেডিট নেওয়ার জন্য আগেভাগে সংবাদ সম্মেলন করে সত্য লুকিয়ে তাদের আরোহণের কথা ঘোষণা করে। এভাবেই আমাদের সামনে সাকা হাফং নামটি উঠে আসে।

‘আপনাদের মধ্যেও দেখি প্রচুর ঝামেলা।’

‘প্রচুর। আফটার অল বাঙালি বলে কথা।’

‘ইতিহাস বিরক্ত লাগছে না তো?’

‘আরে না, ডিনার পর্যন্ত আমাদের হাতে প্রচুর সময় আছে। এবার আপনার গল্প বলুন? আপনি কীভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন?’

‘২০০৮ সালের শেষ দিকে আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বাংলাদেশের পাহাড় নিয়ে ইন্টারনেটে সার্চ দিতেই অনেকটা ভাগ্যগুণে আমি প্রজেক্ট বাংলাট্রেকের ওয়েবসাইটটি খুঁজে পাই। বাংলাদেশের পাহাড়চূড়া, জলপ্রপাত, গুহাসহ ট্রেইলগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এক জায়গায় সমাবেশ ঘটানো ছিল এই প্রজেক্টের মূল কাজ। সাইটটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল, দিজ ইজ ইট—এটিই আমার কাজ, এক্সপ্লোরেশন!’

প্রজেক্টে কাজ করার সুবাদেই প্রথমবারের মতো জানতে পারি সাকা হাফংয়ের নাম, জিঞ্জ ফুলেনের নাম। স্যাটেলাইট ডেটা ঘেঁটে আমাদের দেশের প্রায় সব কটি উঁচু পয়েন্ট চিহ্নিত করে এই প্রজেক্ট তখন সশরীর এই চূড়াগুলোতে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য অভিযান পরিচালনা করছিল। ভাগ্যক্রমে আমি তাঁদের সঙ্গে জুটে গেলাম।

default-image

‘বাংলাদেশে এমন উঁচু পয়েন্ট কয়টি আছে?’

‘৬০০ মিটার উচ্চতার ওপর এমন পয়েন্ট আছে ছয় শতাধিক। আর তিন হাজার ফুটের ওপরে পয়েন্ট আছে ১৮টি। রিসেন্টলি তালিকার এই ১৮টি পয়েন্টের ডেটা সংগ্রহের কাজ শেষ হয়েছে। পুরো ১০ বছর লেগেছে তালিকাটি শেষ করতে।’

‘বাহ! এত দিন ধরে একটা জিনিস নিয়ে পড়ে ছিলেন! আপনাদের ডেডিকেশনের বাহবা দিতেই হবে। এখন আপনাদের গল্প বলুন, নরওয়েজিয়ানকে কীভাবে পেলেন?’

‘বাংলাট্রেকের সুবাদে আমাদের সবুজ পাহাড়ের রহস্যাবৃত রূপটি মাত্রই উন্মোচিত হওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন নতুন কিছু সামনে আসছে। কত সুন্দর, কত রহস্যময় আমাদের এই সবুজ পাহাড়। নতুন নতুন অঞ্চলে পা রাখা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে দুচোখ ভরে দেখা তখন একপ্রকার নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবানের বিভিন্ন ট্রেকিং রুট, নতুন নতুন ট্রেকিং ডেস্টিনেশন, পাহাড়চূড়া, জলপ্রপাত ও গুহাগুলোর বিস্তারিত তথ্য একে একে ডেটাবেইসে যোগ হতে থাকল। বাংলাদেশের পাহাড়ে দেশি-বিদেশি যারাই তখন ট্রেকিং-হাইকিং নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, সবার জন্য বাংলাট্রেক তখন একটি অথেনটিক ডেটার উৎস ছিল। আমাদের ফোরামটিও সে সময় বেশ অ্যাকটিভ ছিল। মানুষজনের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। বিখ্যাত ট্রাভেল গাইড লোনলি প্লানেটের বাংলাদেশ নিয়ে বইটায় বাংলাট্রেকের নাম চলে আসে। দেশিদের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশিদের জন্যও বাংলাট্রেক আস্থার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। সেই সুবাদেই লিঞ্জভের সঙ্গে আমাদের পরিচয়।’

‘পাস্ট টেন্সে সব বলছেন কেন? আপনাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে নাকি?’

‘জি। বাংলাট্রেক বন্ধ হয়ে গেছে।’

‘ওহ সরি! কিন্তু কেন?’

‘বাংলাট্রেক পুরোটাই স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক প্রজেক্ট ছিল। লোকবল, টাকাপয়সার অভাবে বছর দুয়েক হলো বন্ধ হয়ে গেছে।’

‘আফসোস। আমাদের দেশে ভালো কাজগুলো এভাবেই একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। এরপর কী হলো?’

‘লিঞ্জভও একজন পর্বতারোহী। ফুলেনের মতো তাঁরও ইচ্ছা জীবিতকালে সে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সর্বোচ্চ বিন্দুতে সশরীর যাবেন। সেই সুবাদেই বাংলাদেশের পাহাড় নিয়ে সার্চ করতে গিয়ে বাংলাট্রেককে পেয়ে যান। ঠিক আমার মতোই আরকি। তিনি ফোরামে সাকা হাফং যাওয়ার ব্যাপারে নানা প্রশ্ন করেন। কীভাবে অনুমতি নিতে হবে, কত দিন লাগবে, কীভাবে সেখানে যেতে হয়, কী কী বিপদ আছে—এই বেসিক প্রশ্নগুলো আরকি।’

এরপর তিনি একদিন জানান বাংলাদেশে আসছে। কিন্তু তাঁর হাতে সময় বেশ কম। মাত্র ১০ দিনের ভিসা পেয়েছেন। এত কম সময়ে কীভাবে পুরো অভিযানটি সাজাবেন, বুঝতে পারছিলেন না। আমরা তখন তাঁকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিই।

লিঞ্জভের ভাগ্যও অনেক ভালো বলতে হবে। সেই সময়েই আমাদের তিনটি ভলান্টিয়ার গ্রুপে সাকা হাফং গিয়েছিল। আরেকটি গ্রুপেরও যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ওঁর দেশে আসার সময়েই সে দলটির অভিযানে যাওয়ার কথা ছিল। বান্দরবান ভ্রমণের অনুমতি পেয়ে গেলে আমাদের দলের সঙ্গেই অভিযানে চলে যেতে পারবেন।

default-image

লিঞ্জভের সাকা অভিযানের সবচেয়ে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং পার্ট বোধ হয় ছিল ঢাকা শহরে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চক্কর কাটতে কাটতে, বিভিন্ন কাগজপত্র ফটোকপি করতে করতে আক্ষরিক অর্থে তাঁর জুতার শুকতলি ক্ষয়ে গিয়েছিল। এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করার কোনো উপায় ছিল না। তিন-চার দিন নিজে নিজে চেষ্টা করে, তাঁর সব ধৈর্য ও এনার্জি শেষ হয়ে যায়। একসময় হাল ছেড়ে দেন। পরে উচ্চ ফিসের বিনিময়ে স্বনামধন্য একটি ট্রাভেল এজেন্সির সাহায্যে এক দিনেই প্রয়োজনীয় পারমিট পেয়ে যান। এরপর দৌড়, ওর হাতে মাত্র চার দিন সময় আছে। এরপরই তাঁর রিটার্ন ফ্লাইট।

এক দিনের নোটিশে আমাদেরও এক্সহোট একটি দল গুছিয়ে নিতে হবে। এক মাস আগে সাকা হাফং পরিমাপ করে আসা সম্রাট ভাই আমাদের লিড করবেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জুনিয়র অপুকেও সঙ্গে নিয়ে নিলাম। সেদিন বিকেলেই কারওয়ান বাজারে গিয়ে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ কেনাকাটা করা হলো। রাত ৯টায় আমরা ডলফিন পরিবহনের বাসে করে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেলাম।

বান্দরবান নেমে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে থানচি বাজার থেকে আমাদের ট্রেকিং শুরু হলো। হাতে সময় যেহেতু মাত্র চার দিন, তাই আমরা ট্রেইলে রীতিমতো ছুটতে লাগলাম। রাতে পাড়াগুলোতে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া পথের মধ্যে আমরা খুব কমই বিশ্রাম নিয়েছি। প্রথম দিনই দুপুরের পর রওনা দিয়ে আমরা সন্ধ্যার দিকে শেরকরপাড়া পৌঁছে গিয়েছিলাম।

লিঞ্জভের সঙ্গে শেরকরপাড়ায় কাটানো এই রাতটি আমার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে রাতেই প্রথম তাঁর সঙ্গে খোলামেলাভাবে গল্প করার সময় পেয়েছি। নেপাল, হিমালয়ে তাঁর বিভিন্ন অভিযানের রোমাঞ্চকর গল্প বলছিলেন আমাদের। অ্যাল্পাইনিজমের দর্শন, প্রস্তুতি, এই বিষয়ে লেখাপড়া করা নিয়ে তিনি আমাদের অনেক কিছু বলেছিলেন সেই রাতে। নরওয়ের মতো উন্নত দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে বিভিন্ন দেশে পর্বতাভিযান করতে গিয়ে তিনি মিনিমালিস্টিক লাইফস্টাইলকে আপন করে নিয়েছেন, সেই গল্প আমার জন্য চোখ খুলে দেওয়া এক অভিজ্ঞতা ছিল।

পরদিন সকালে শেরকরপাড়া থেকে রওনা হয়ে সিম তল্যাং পি, থানদুইপাড়া হয়ে রেমাক্রি নদী অতিক্রম করে হাঞ্জোরাই পাড়া হয়ে শেষ বিকেলে সাকা হাফংয়ের ঠিক নিচের নেফিউ পাড়াতে পৌঁছে যাই। সেই রাতে তীব্র ঠান্ডা পড়েছিল পাহাড়ে। শীতের দেশের লোক লিঞ্জভকে দেখলাম দুটি কম্বল নিয়েও কাঁপাকাঁপি করছেন।

পরদিন ভোরে ঘণ্টাখানেক বাঁশের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ট্রেক করে আমরা সাকা হাফং পৌঁছে যাই। এই চূড়ায় কয়েক বছর আগেও একটি সীমান্তপিলার ছিল। কে বা কারা যেন গর্ত খুঁড়ে সেটি নিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার ওপর এখন বিশাল একটি গর্ত হয়ে আছে।

চূড়ার ওপর আমরা খুব বেশিক্ষণ ছিলাম না। ফেরার তাড়া ছিল বলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা ফিরতি পথ ধরি। যে পথে এসেছি সেই একই পথে না গিয়ে আমরা একটু ভিন্ন পথ ধরলাম। রেমাক্রির পাড়ের পাড়া দুলাচরন তামলো হয়ে সেদিন রাতেই আমরা থাইক্ষিয়্যংপাড়া চলে যাই। সেদিন ১৫ ঘণ্টার ওপর ট্রেক করেছিলাম। পানির অভাবে অনেক কষ্ট হয়েছিল আমাদের। প্রায় সবারই পায়ে ক্র‍্যাম্প হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাতে তামলো থেকে থাইক্ষিয়্যংপাড়া পর্যন্ত ট্রেকে অন্ধকার আকাশে নক্ষত্রলোকের যেই জাদুকরি খেলা দেখেছি তার কোনো তুলনা হয় না।

পরদিন আমরা কপিটাল ও কেওক্রাডং আরোহণ করে বগা লেকে এসে বিশ্রাম নিই এবং পরদিন ঢাকার পথে রওনা হয়ে যাই। পরদিনের ফ্লাইটেই লিঞ্জভ থাইল্যান্ড চলে যান।

এই হলো আমার সাকা হাফং আরোহণের গল্প। বলার মতো রোমাঞ্চকর কিছুই হয়নি। আমার জন্য এই অভিযানের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল লিঞ্জভের সঙ্গে কথোপকথন। পরবর্তী সময়ে আমার পর্বতারোহী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর বলা কথাগুলো অনেক বড় প্রভাব রেখেছে।

‘চমৎকার। আপনাদের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনে একটু হিংসা হিংসা লাগছে। আপনাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারলে কখনো মন্দ হতো না।’

‘চলুন না। এবারই চলুন। এইতো মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার ট্রেক করলেই সাঙ্গুর সোর্সের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যাবে। আমাদের তো যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন না। আপনার সুবাদেই না হয় যাওয়া হলো।’

আমার কথা শুনে তরুণ ক্যাপ্টেন এমন এক হাসি দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, সময় কাটানোর জন্য আপনার গল্প শুনে গেলেও তালে কিন্তু আমি ঠিকই আছি। হাইকমান্ডের নির্দেশের সামনে যাওয়া সাধারণের জন্য অফ লিমিট করে রাখা আছে, পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাই থাকবে। ডিনারের টাইম হয়ে এল প্রায়। এবার মানে মানে কেটে পড়ুন।

হাসির পেছনের অর্থটি উদ্ধার করতে পেরে একটু দমে গেলাম। উনি এত আগ্রহ নিয়ে আমাদের অভিযানের গল্প শুনছেন বলে ভেবেছিলাম আমাদের এখানে আগমনের কারণটি কিছুটা হলেও অ্যাপ্রিশিয়েট করবেন। অনুমতি মিললেও মিলে যেতে পারে। অনেকটা হতাশ হয়েই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ঘুরে চলে যাব সেই সময় ক্যাপ্টেন আরেকটি প্রশ্ন করলেন।

default-image

‘ইজ ইট ওয়ার্থ ইট?’

আমি প্রথমে প্রশ্নটি বুঝতে পারিনি। চুপ করে ছিলাম। ভেবেছিলাম এভাবে প্রশ্নটি কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু তা হলো না। তরুণ অফিসার আরও আগ্রহ নিয়ে একঝাঁক সম্পূরক জিজ্ঞাসা ছুড়ে দিল।

‘এত দুর্গম জায়গায়, পদে পদে যেখানে জীবনের আশঙ্কা, জানা-অজানা অস্ত্রধারী বাহিনী, খাবারদাবার ছাড়া, কোনোরকম যোগাযোগ ছাড়া পরিবার থেকে দিনের পর দিন দূরে থেকে এমন বিপৎসংকুল অরণ্যভূমিতে এই যে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কী পাচ্ছেন এর বিনিময়ে? আমরা তা-ও এখানে দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আপনাদের এই পাহাড় থেকে সেই পাহাড়ে এইমলেস ঘোরাঘুরির কারণ বুঝতে পারছি না।’

এমন পরিস্থিতিতে যে আজ প্রথমবার পড়েছি, এমন নয়। এত দিন ধরে বাংলাদেশের পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে প্রতি পদে পদেই উদ্ভট সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। পাহাড়ে দেখার কী আছে? এতবার পাহাড়ে কেন আসি? উদ্দেশ্য কী আমার? থাকার জন্য হোটেল নেই, খাবার জন্য রেস্তোরাঁ নেই, এমন জায়গায় কেউ ঘুরতে আসে নাকি? পাহাড় মাপি আবার কী জিনিস, ফাজলামো পেয়েছেন? আপনারা কি স্পাই? আমেরিকান, ইন্ডিয়ান, রাশিয়ান নাকি চাইনিজ? ম্যাপ, কম্পাস, জ্যামিতি বক্স নিয়ে পাহাড়ে এসেছেন কেন? হাঁড়িপাতিল, তাঁবু নিয়ে বনে-জঙ্গলে আসছেন কেন? ব্যাকপ্যাকিং, ট্রেকিং, ক্যাম্পিং—এগুলো আবার কী জিনিস? নিশ্চয়ই কোনো বদ মতলব আছে। ওঁদের ঘরে যে থাকেন ঘেন্না লাগে না? কেন এসেছেন এমন জায়গায়, আসল উদ্দেশ্য খুলে বলেন? ইত্যাদি ইত্যাদি…

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসলে কীভাবে দেওয়া যায়, আমার জানা নেই। বান্দরবানের মতো দুর্গম জায়গায় পাহাড় থেকে পাহাড়ে কেন ঘুরে বেড়াই, এর সহজ কোনো উত্তর আছে বলে তো জানা নেই। ‘বিকজ ইট ইজ দেয়ার’—বিখ্যাত পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরির ততোধিক বিখ্যাত এই উক্তিটি বাংলাদেশে কোনো কাজেই লাগে না। এক-দুইবার ট্রাই করে দেখেছি, এই কথা বললে উল্টো তারা বিরক্ত হয়। ভেবে নেয় আলগা স্মার্টনেস দেখাচ্ছি। আমার মতো যাঁরা পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান সাধারণের চোখে তাঁরা প্রথমেই হয় কোনো পর্যায়ের অপরাধী। আর যাঁরা আরেকটু লিবারেল চিন্তা করতে পারেন তাঁরা ধরে নেন আমরা ভ্যাগাবন্ড, উড়নচণ্ডী, বাউন্ডুলে। এই শব্দগুলোও আমাদের সামাজিক কনটেক্সটে নেগেটিভলিই দেখা হয়।

খেয়ে না খেয়ে, দিনের পর দিন দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে, জঙ্গলের কাঁটায় সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত করে, তৃষ্ণায় শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট আর পেটভরা খিদে নিয়ে পথে হঠাৎ কোনো জলপ্রপাত আবিষ্কার করে শিশুর মতো উৎফুল্ল হতে পারি, শেষ বিকেলে কোনো পাহাড়চূড়ায় আরোহণ করে দিগন্তে সূর্যাস্তের দমবন্ধ করা সৌন্দর্য দেখে স্তব্ধ হয়ে পড়তে পারি, প্রচণ্ড গরমের দিনে দীর্ঘ চড়াই-উতরাইয়ের পর পাহাড় থেকে শিরা-উপশিরার মতো নেমে আসা উচ্ছল কোনো ঝিরির স্বচ্ছ জল পান করে প্রশান্তি লাভ করতে পারি—কারও জন্য কি এই কারণগুলো যথেষ্ট বলে মনে হবে? খুব বেশি হলে আর্মির মেজরের মতো কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ‘হোপলেস ওয়ান্ডারার’।

নিছক ঘুরে বেড়ানোর উদ্দেশ্য থাকলে, প্রকৃতিসুধা পান করে গল্প, কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজতে, বা সুন্দর আলোকচিত্র তোলার অভিপ্রায় থাকলে বা জলরঙে পাহাড়ের বাঁক ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশ্য তবু ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আমার পাহাড়ে যাওয়ার কারণ তো আরেকটু ভিন্ন। আমি তো পাহাড়ে যাই একজন অনুসন্ধানীর চোখে পাহাড় দেখতে, জানতে, বুঝতে।

শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য, বিশালতা, গাম্ভীর্য উপভোগ নয়। একটা পাহাড় কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, এর প্রমিনেন্স, আইসোলেশন, এটা কি মূল চূড়া, না সাবসিডিয়ারি চূড়া? এ ছাড়া পাহাড়কে ঘিরে বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজি, এর খাঁজ থেকে জন্ম নেওয়া ঝরনা, শিরা-উপশিরার মতো নেমে আসা জলধারার মিলনে সৃষ্টি হওয়া সুবিশাল জলনিষ্কাশনব্যবস্থা। পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অরণ্যভূমি, সেখানে বাস করা বৈচিত্র্যময় প্রাণপ্রাচুর্য ও মানুষদের সুপ্রাচীন জীবনব্যবস্থা—এসবই তো আমার আগ্রহের বিষয়। আমি এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বারবার পাহাড়ে ছুটে যাই। আমি পাহাড়ে যাই এক্সপ্লোর করতে, একজন অনুসন্ধানী অভিযাত্রী হিসেবে।

আমার এই কারণ বেশির ভাগের কাছেই বোধগম্য হবে না। কেন কেউ বুঝতে পারে না এর কারণ এত দিন আমার অজানা ছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে সার্ভে অব বাংলাদেশের একজন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে আমার কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা ছিল, সার্ভে অব বাংলাদেশের মতে আমাদের সর্বোচ্চ চূড়া কোনটি? এই প্রশ্নের জবাবে উনি বলেছিলেন, ‘যেই দেশের মানুষ পরদিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়, সে দেশের সর্বোচ্চ চূড়া খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের প্রায়োরিটি লিস্টে পড়ে না।’

আসলেই তো, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ার নাম কী? চূড়ার উচ্চতা কত? সাঙ্গু নদীর উৎসের অবস্থান কোনটি? এই তথ্য জানা বা না-জানা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য আদৌ কি কোনো গুরুত্ব বহন করে? বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পথে নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষার একটি প্রশ্ন হওয়া ছাড়া এ তথ্যের আর তো কোনো উপযোগিতা নেই। তাই বেশির ভাগ মানুষের কাছেই আমার কারণটি বোধগম্য হবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক।

default-image

সুইজারল্যান্ডের অভিযাত্রী শেন হেডিন বিত্তবৈভব ও আরামদায়ক জীবন উপেক্ষা করে বছরের পর বছর কেন তিব্বতের রুক্ষ পর্বতে ঘুরে বেরিয়েছেন, ডাল্টন হুকার কেন দিনের পর দিন হিমালয়ে চক্কর খেয়ে সেখানে কী কী গাছ জন্মায়, তা লিপিবদ্ধ করেছিলেন, ডগলাস ফ্রেশফিল্ড কী কারণে এত কষ্ট সহ্য করে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন, কিংবা এরিক শিপটন কেন কারাকোরামের দুর্গমসব গিরি অতিক্রম করে ব্ল্যাংক অন দ্য ম্যাপ–এর মতো বই লিখেছিলেন—এসব (অ)কাজের পেছনের তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, আর এসব করে তারা কী পেয়েছিলেন, এমন প্রশ্নে এই জগদ্বিখ্যাত অভিযাত্রীরাও থতমত খেয়ে যেতেন, সেখানে আমি কোন ছাড়।

অপ্রস্তুত একটি হাসি দেওয়া ছাড়া আমি সেই ক্যাপ্টেনকে সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারিনি। শুধু বলেছি, তৃপ্তি, বিশুদ্ধ তৃপ্তি।

সদ্য কমিশন্ড পাওয়া ক্যাপ্টেন আমার উত্তরটি কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন বোঝা না গেলেও পারফেক্ট জেন্টলম্যানের মতো বিদায়বেলায় বললেন, ‘আপনার অন্য চূড়ার গল্পগুলো তো আর শোনা হলো না।’

আমি একটু ঠাট্টাচ্ছলেই বললাম, ‘আমাদের তো আগামীকাল সকালেই ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কয়েক দিন থাকার অনুমতি দিন। আরব্য রজনীর মতো প্রতিদিন গল্প শুনিয়ে যাই।’

‘ভেরি ফানি।’

‘আমাদের অভিযানের অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে একটি বই লিখছি। আশা করি, এই বছরের মধ্যেই বইটির কাজ শেষ করতে পারব।’

‘ওয়াও! কনগ্র্যাচুলেশনস। আমার পক্ষ থেকে শুভকামনা রইল। আগামী বইমেলায় খোঁজ রাখব তাহলে।’

‘ধন্যবাদ। আশা করি, বইটি পড়লে আমাদের কাজগুলো চিন্তাভাবনাগুলো আরেকটু স্পষ্ট হবে আপনার কাছে।’

ক্যাপ্টেনকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে ক্যাম্প থেকে নিচে অবস্থিত পাড়ায় চলে এলাম। কার্বারির ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ক্যাপ্টেনের করা শেষ প্রশ্নটি আমার মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নিজেকেই বারবার এই প্রশ্নটি করেছি—ইজ ইট ওর্থ ইট? প্রায় এক যুগ ধরে সবকিছু ভুলে বান্দরবানের পাহাড়ে পাহাড়ে, শিখর থেকে শিখরে এই যে ছুটে বেড়াচ্ছি, এর ফলাফল কী?

এখন পর্যন্ত পজিটিভ কোনো ইমপ্যাক্টের চেয়ে নেগেটিভ ইমপ্যাক্টই বেশি। আমাদের কারণেই এই জায়গাগুলোতে পর্যটনের নামে অনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। পর্যটনের প্রসার মানেই যে সভ্যতার নামে অরণ্যভূমি উজাড় করে দালানকোঠা তোলা, কংক্রিটের জঙ্গল বানানো নয় এটা আমরা নীতিনির্ধারকদের বোঝাতে পারিনি। কেওক্রাডং চূড়ার মতো জায়গায় আমরা কংক্রিটের দালান তুলে তার সব নান্দনিকতা নষ্ট করে ফেলেছি। এই ধ্বংসে আমাদেরও দায় আছে, সেটা অস্বীকার করি কী করে।

আমি শুধু আশা করতে পারি আমার দেখা ওই সবুজ স্বর্গভূমির রহস্যময় সৌন্দর্য ও মানুষদের না-বলা কিছু গল্প লিখে যেতে পারব। আমার বিশ্বাস আছে, পাহাড়ের গল্পগুলো পড়লে আমরা সবাই পাহাড়কে রক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারব। এই ধ্বংসের হাত থেকে আমাদের এই সবুজ রেফিউজকে রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসব। আর যদি এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো নাই-বা যায়, তাহলেও বইয়ের পাতায় আমাদের পাহাড়ের গল্পগুলো চিরদিনের মতো ধরা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে আমাদের এমন এক ভূস্বর্গ ছিল, যেটা আমরা নিজেরাই নিজেদের হাতে কীভাবে ধ্বংস করে ফেলেছি।

বিশেষ সংখ্যা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন