default-image

সংস্কৃতি প্রবহমান নদীর মতো—এর রূপান্তর আছে, মৃত্যু নেই। মানুষের জীবনচর্চা ও চর্যার বৈচিত্র্যময় সমন্বিত রূপই সংস্কৃতি। সামাজিক মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি, ধারাবাহিক ঐতিহ্য, প্রজন্মপরম্পরা আচার-বিশ্বাস, ভূয়োদর্শন, শিল্পবোধের নিদর্শন, মনন-রুচি, নীতি-নৈতিকতা—এসবই সংস্কৃতির মৌল উপকরণ। সংস্কৃতির পরিধি বিশাল ও ব্যাপক। তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা সংজ্ঞা-সূত্রে এর সীমা-সরহদ্দ এঁকে দেওয়া চলে না। দেশ-কাল-ভাষা-ধর্মভেদে সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রূপ পায়। বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলার সংস্কৃতিকে কেউ কেউ নগর-সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও আদিম সংস্কৃতি—এই তিন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনযাপনের সুবিধাভোগী শিক্ষিত নগরবাসীর সংস্কৃতিই নগর-সংস্কৃতি। মার্জিত-শোভন হলেও এই সংস্কৃতি অর্বাচীন—ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় এর জন্ম হয়নি। ভুঁইফোড় নগরবাসীর এই কৃত্রিম সংস্কৃতি একান্তই অনুকরণের ফসল। আদিম সংস্কৃতি বাংলার সুদূর অতীতের কৌমসমাজের স্মৃতিনির্ভর আদিবাসীদের সংস্কৃতি। বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে এই আদিম সংস্কৃতির রয়েছে প্রচ্ছন্ন আত্মীয়তা।

প্রকৃতপক্ষে লোকসংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারা, এর মর্মমূলেই আবহমান বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রোথিত। যথার্থ পরিকল্পিত আধুনিক নগরায়ণ এখনো এ দেশে হয়নি। গ্রামীণ সমাজ ও সভ্যতার স্মৃতি ও ছাপ এখনো এই অপরিণত নগরগুলো বহন করছে। জীবন-জীবিকা ও প্রকৃতিই সংস্কৃতির নিয়ামক। মূলত কৃষিজীবন ও নদ-নদী বাংলার সংস্কৃতিকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই ছিল বাংলার প্রাণকেন্দ্র—সংস্কৃতির উৎস, লালন ও বিকাশক্ষেত্র। এই গ্রামকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যেই বাংলা ও বাঙালির আত্মপরিচয় প্রচ্ছন্ন আছে। এই প্রসঙ্গে সমাজবিকাশের নিবিড় পর্যবেক্ষক অথচ লোকসংস্কৃতির ঘোর বিরোধী অধ্যাপক আহমদ শরীফের একটি ব্যতিক্রমী উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে, ‘বস্তুত বাঙালীর ইতিহাস লোকধর্মের, লোকায়ত দর্শনের, লোকসাহিত্যের, লোকশিল্পের, লোকসঙ্গীতের ও লোকবিশ্বাস-সংস্কারের ইতিকথারই অন্য নাম।’ বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে এই সত্য সহজেই আবিষ্কৃত হয়, কানু ছাড়া যেমন গীত নেই, তেমনি লোকসংস্কৃতির অস্তিত্ব ভিন্ন বাঙালির জীবন-সমাজ-ঐতিহ্য-ইতিহাসের মর্মোদ্ধার অসাধ্য ও অর্থহীন।

বিজ্ঞাপন

২.

সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ গোপাল হালদার হাজার বছরের বহমান বঙ্গ সংস্কৃতিকে ‘পল্লীপ্রধান বাঙালী সংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করেছেন। আফসোস করে এই প্রসঙ্গে তিনি এ-ও বলেছেন, ‘...অত্যন্ত পরিচিত বলিয়াই আমরা তাহার সহজ ও অনাড়ম্বর উপকরণ ও উপাদানকে আমাদের সংস্কৃতির প্রধান অবলম্বন বলিয়া ভাবিতে কুণ্ঠিত হই।’

বাংলার লোকসংস্কৃতির জগৎ বিচিত্র ও ব্যাপক। লোকসমাজের জীবনাচরণ ও ভূয়োদর্শনের প্রতিফলন আছে লোকবিশ্বাস, লোকসংস্কার আর লোকাচারে। পালা-পার্বণ-বিবাহ-ক্রীড়া-মেলা-নবান্নে মূর্ত হয়ে ওঠে উৎসব-আনন্দের রূপ। প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গে আসে পোশাক-পরিচ্ছদ-সজ্জা-প্রসাধন ও খাদ্য-খাবারের খাদ্যের কথা। শিল্পকলার মোহন ভুবনে রচিত হয়েছে প্রয়োজন ও সৌন্দর্যের অনন্ত সখ্য। লোকসাহিত্যে জীবনের উপলব্ধি ও আনন্দের আলেখ্যও জন্ম নিয়েছে। এই সব অনন্য-উজ্জ্বল উপাদানেই রচিত লোকসংস্কৃতির সাতনরি। বাংলার লোকসংস্কৃতি বঙ্গ জনপদবাসীর যৌথ জীবনচর্চার এক আন্তরিক ভাষ্য। সমন্বয়, সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের এক অপূর্ব নিদর্শনের সাক্ষ্য বহন করে বাংলার এই লোকসংস্কৃতি। ইতিহাসের সূচনালগ্নের বঙ্গ জনপদের আদিম অধিবাসীদের বিশ্বাস-সংস্কার ও লোকাচারকে কেন্দ্র করেই এই লোকসংস্কৃতির জন্ম। নানা জনগোষ্ঠীর রক্তের মিশ্রণে যেমন বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে, তেমনি তার সংস্কৃতি সম্পর্কেও এ কথা সত্য। সুদূর অতীতের স্মৃতিচিহ্নবাহী বাংলার লোকসংস্কৃতি তাই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’র ধারণাটি সার্থক করে তুলেছে।

বাংলার লোকসংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় আনন্দ-রূপের সন্ধান, প্রবল জীবনাগ্রহ, প্রতিবাদী চেতনা, জাত-ধর্ম-গোত্র-বর্ণনির্বিশেষ মানুষের কথা, মানবিকতা ও ইহজাগতিকতার পরিচয়। লোকায়ত বাংলার উদার মানবিক জমিনের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী চিরকালই ভাববিদ্রোহী, মিলনপ্রয়াসী, সমন্বয়পন্থী। ‘বিবাদে-বিরোধে বর্বরতা’—এ কথা লৌকিক সমাজের মানুষ তাদের জীবনাচরণে সত্য বলে মেনেছে। আমরা বাংলার লোকসংস্কৃতির সাধারণ রূপের প্রেক্ষাপটে তার সমাজসংলগ্ন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, যার সূত্রে আধুনিক কালে লোকসংস্কৃতির তাৎপর্য ও গুরুত্বের পাশাপাশি তার প্রগতিশীল উপকরণ আবিষ্কৃত হয়ে বর্তমান প্রজন্মকে প্রাণিত ও শ্রদ্ধাবান করে তুলতে পারে।

default-image

৩.

লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সুদূর অতীতের টোটেম, ট্যাবু ও জাদুবিদ্যার সম্পর্ক অতি নিবিড়। সংকট-শঙ্কা-অমঙ্গল দূরীকরণের পন্থা-পদ্ধতির সঙ্গে লোকবিশ্বাস ও সংস্কারের যোগ গভীর। ব্রত-মানত-বশীকরণ-জাদুমন্ত্র-ঝাড়ফুঁক-টোটকা-তাবিজ ইত্যাদির মাধ্যমে ইচ্ছাপূরণ ও মুশকিল আসানের চেষ্টা চলে। এই ক্ষেত্রে যে আচার-পদ্ধতি, তা অনেকাংশেই কোনো ধর্মীয় শাস্ত্রাচার অনুসরণ করে না। লোকবিশ্বাস ও সংস্কারে ধর্মের শাসন-গণ্ডি হামেশাই অতিক্রান্ত হয়ে যায়। গার্সি বা ওলাবিবি-ভিটেকুমোরের পূজা, পির-দরবেশের দরগায় মানত—এসব ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ লুপ্ত। মুসলমান কৃষকের মনসাতুষ্টির পূজা কিংবা হিন্দু মাঝির ‘বদর বদর’ বলে দরিয়ায় যাত্রা শুরু—এসবই লোকসংস্কারের অন্তর্গত, যা প্রজন্মপরম্পরায় প্রচলিত। বৃষ্টি কামনায় যেমন কোনো পল্লিবাসী কৃষিনির্ভর হিন্দু ‘আল্লাহ ম্যাঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই’ গান গাইতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, তেমনি হিন্দু দেবদেবীর নাম নিয়ে সাপের মন্ত্র উচ্চারণে মুসলমান ওঝার কোনো দ্বিধা নেই। আসর-বন্দনায় ভক্তি-নিবেদনে আল্লাহ-ভগবান, রসুল-দেবতা সম-পাঙ্‌ক্তেয়, এক নিশ্বাসে উচ্চারিত।

বাংলার লোকাচারেও সম্প্রদায়নির্বিশেষে অভিন্নতার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু, কৃষিকর্ম—এই সব বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত লোকাচার বাঙালির জনজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বন্ধ্যা নারীর সন্তান কামনা, গর্ভবতী রমণীর ‘সাধভক্ষণ’, সন্তান জন্মের পর অনিষ্ট-ভঞ্জন-সতর্কতা ও বিবাহের কিছু আচার লোকসমাজে ধর্মভেদে অভিন্ন। কৃষিসম্পর্কিত লোকাচারেও সাদৃশ্য আছে। বৃষ্টি কামনা, হল-কর্ষণ, বীজ বপন, ফসল রক্ষা, ফসল তোলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে লোকাচার পালিত হয়, তাতে কৃষিজীবী সমাজের ঐক্য-একাত্মতার আন্তরিক চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলার লোকজীবনে আবাস-আসবাব-খাদ্য-পরিধেয়-প্রসাধন-অলংকার-তৈজসপত্রও মূলত এক। খড় বা শণের দোচালা ঘর, পাটকাঠি বা কঞ্চির বেড়া, এক পাশে গোয়ালঘর, একচিলতে উঠোন, চারপাশে গাছগাছালি—গ্রামীণ মানুষের বাস্তুগৃহের এই হলো সাধারণ ছবি। মাদুর-কাঁথা, বাঁশের মাচা কিংবা মাটির মেঝে—শয়নের উপকরণ ও ব্যবস্থা। তৈজসপত্রের মধ্যে মাটির হাঁড়ি-পাতিল-সানকি-কুঁজো, কাঁসার থালা-বাটি-ঘটি-ঘড়া। কেবল স্ব স্ব সম্প্রদায়ের শাস্ত্রনিষিদ্ধ দ্রব্য বাদে বাঙালি সমাজের খাদ্যাভ্যাসও প্রায় অভিন্ন। লোকায়ত বাঙালির পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল একই ধরনের—ধুতি, লুঙ্গি, চাদর, গামছা, ফতুয়া ইত্যাদি। আর মোটা সুতোর তাঁতের শাড়ি গ্রাম্য রমণীর সর্বজনীন আটপৌরে পোশাক। কোনো কোনো অঞ্চলে হিন্দু সধবার মতো বিবাহিত মুসলিম রমণীর শাখা-সিঁদুর ব্যবহারেরও চল আছে।

প্রমোদ-বিনোদন-ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও সম্মিলিত অংশগ্রহণের বাতাবরণ ও অবাধ সুযোগ ছিল। নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, দাঁড়িয়াবান্ধা কিংবা হাডুডু—এই সব লৌকিক ক্রীড়ার রূপ ছিল সর্বজনীন। সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মেলা কিংবা নবান্নের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। বাংলার প্রায় সব লৌকিক মেলাই ধর্মাশ্রিত, তা মূলত সাধু-গুরুর জন্ম-মৃত্যু, পূজা-পার্বণ কিংবা ঈদ-মহররমকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উপলক্ষ ধর্মীয় উৎসব হলেও মেলার মেজাজ-চেহারা কিন্তু পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ, আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় তা লালিত।

স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমবায়ের আনুকূল্যে বাংলায় এক সমৃদ্ধ লোকশিল্পকলার ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। মূলত জীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজন ও চাহিদাই ছিল এই শিল্পকলার প্রেরণা এবং তা সিদ্ধ করেও এর মধ্যে শিল্পবোধ আর সৌন্দর্যচেতনার স্বাক্ষর প্রতিফলিত হয়েছে। নকশা-আলপনা, লোকচিত্র, মৃৎ-ধাতু-বাঁশ-বেত-কাঠ-সুচি-বয়ন বা বাস্তুশিল্প—লোকশিল্পকলার এই যে বিশাল জগৎ, এতে বাংলার লোকশিল্পীদের মেধা, নৈপুণ্য, উদ্ভাবনা ও শিল্পবোধের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। এই লোকশিল্পের মধ্যেও সম্প্রদায়নিরপেক্ষ অভিন্ন শিল্পচেতনার রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

৪.

বাঙালি সমাজ এক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের গর্বিত উত্তরাধিকারী। ছড়া-ধাঁধা-প্রবাদ-মন্ত্র-কিংবদন্তি-লোকশ্রুতি-লোককথা-লোককাহিনি- গীতিকা ও গীতির এক বিপুল ঐশ্বর্যভান্ডার নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলার লোকসাহিত্য। লোকসংস্কৃতির অবকাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ এই লোকসাহিত্য। বাঙালি মানসের শিল্পচিত্তের গভীর পরিচয় এখানে বিধৃত। লোকসাহিত্যের অন্তর্গত শিল্প-নিদর্শনের মধ্যে লোক-সাধনাশ্রয়ী সম্প্রদায় গীতি ব্যতিরেকে আর সবই সমাজের সমষ্টিগত সৃষ্টি, যা কালান্তরে প্রসারিত, প্রজন্মপরম্পরায় যা লালিত হয়ে আসছে। এই সব রচনায় সমাজ-অভিজ্ঞতার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, কখনো কখনো ইতিহাসের টুকরো ছবিও দুর্লক্ষ নয়। অজ্ঞাতনামা লোককবিদের রচিত গানে পলাশীর যুদ্ধের স্মৃতি, নীল বিদ্রোহের কথা, গণ-আন্দোলনের চিত্র অম্লান হয়ে আছে। টিপু পাগলার বিদ্রোহ, তিতুমীরের সংগ্রাম, ক্ষুদিরামের আত্মবলিদান স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রেরণায় লোককবির কাছে ধরা দেয়।

সামন্ত সমাজের নির্মম শোষণ, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অবিচার, শাস্ত্রাচারশাসিত ধর্মের হৃদয়হীন প্রভুত্ব সমাজে ভাববিদ্রোহী বাউলের জন্ম দিয়েছে। শাস্ত্রদ্রোহী, জীবনজিজ্ঞাসু, সমন্বয়পন্থী বাউলসমাজ সামাজিক বিচ্ছেদ, অনৈক্য ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই দর্শনদারিদ্র্যের দেশে বাউলসমাজই অধ্যাত্মসাধনার মোড়কে একটি জীবনবাদী দার্শনিক তত্ত্ব উপহার দিয়েছে। বাউলগান ও সমানধর্মা মরমি সংগীতে তত্ত্ব ছাপিয়ে মানববন্দনা, মর্ত্যপ্রীতি, সম্প্রদায়-সম্প্রীতি ও মানবিকতাবোধের অন্তরঙ্গ প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

মানবজমিন আবাদের মরমি কৃষক ফকির লালন সাঁইয়ের গানে জাতধর্মের বিভক্তি, ছুতমার্গ-অস্পৃশ্যতা নিন্দিত হয়েছে। বর্ণভেদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ধর্মীয় জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন তাই জাত হাতে পেলে আগুন দিয়ে পোড়ানোর অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। মানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত লালন সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ লুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সব লোকে কয় লালন ফকির হিন্দু কি যবন।/ লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান॥’ পাশাপাশি ইহজাগতিকতার উচ্চারণও শুনি লালনের গানে, ‘এমন মানবজনম আর কি হবে।/ মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে॥ .../ কত ভাগ্যের ফলে না জানি/ মন রে পেয়েছ এই মানব-তরণী/ বেয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়/ যেন ভারা না ডোবে॥’

শুধু তা-ই নয়, লালন ফকির বাংলার লোকসমাজের এই মহত্তম মরমি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি জমিদারের পীড়ন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একতারা ফেলে লাঠি নিয়ে রুখে দাঁড়াতেও পিছপা হননি। লালনের শিষ্য দুদ্দু শাহও ছিলেন সামাজিক অঙ্গীকারে দৃঢ়-দৃপ্ত মুক্তমনের সাধক-বাউল। এইভাবে দূর অতীতের কৃষিসমাজের স্মৃতিবাহী বাউলগান অন্তরে দ্রোহের আগুন জ্বেলে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

৫.

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের যে রূপ প্রতিফলিত, তার আভাস আমরা পেয়েছি। এই লোকসংস্কৃতির মূলধারাটি প্রবল মরমি জীবনাগ্রহ ও মানবিক চেতনাবোধের ভেতর দিয়ে ইহজাগতিকতায় সমর্পিত। সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনের সংকট-সমস্যাতেও লোকসংস্কৃতির জনক-ধারকেরা সাহসী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। ছড়া-গীতি-গীতিকায় আছে সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চেতনার স্বাক্ষর। প্রকৃতপক্ষে জীবনঘনিষ্ঠতা ও সমাজসংলগ্নতা বাংলার লোকসংস্কৃতিতে একটি জীবনবাদী ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে।

এই লোকসংস্কৃতিচর্চার ভেতর দিয়েই একদিন বাঙালির আত্মপরিচয়-সন্ধান ও স্বরূপ অন্বেষার সূচনা হয়েছিল। স্বাদেশিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত রবীন্দ্রনাথই ছিলেন তার ঋত্বিক। গুরুসদয় দত্ত এই লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ব্রতচারী আন্দোলন। বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ উদ্‌ঘাটনে লোকসংস্কৃতিই ছিল অন্যতম অবলম্বন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি যুগের গানের কথা বলতে হয়। বাউল, সারি বা ভাটিয়ালির সুর বসিয়ে রচনা করা তাঁর সেই সব স্বদেশি গান কী অবিস্মরণীয় উদ্দীপনা জাগিয়েছিল বাঙালির মনে, তা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’—যে গানটি আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, সেই গানের কথা ও সুরের জন্যও রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহের মরমি কবি গগন হরকরার বাউলগানের কাছে যেতে হয়েছিল। চারণকবি মুকুন্দ দাসের লৌকিক আঙ্গিকে রচিত স্বদেশি যাত্রাপালা ও জাগরণমন্ত্রের উদ্দীপক গান বাঙালিকে মুক্তিপাগল করেছিল। আমাদের দেশের নানা সংগ্রাম-আন্দোলনেও লৌকিক সমাজের কবি ও গায়কদের বিশেষ ভূমিকা আছে। কবিয়াল রমেশ শীল, বিজয় সরকার বা শাহ আবদুল করিমের মতো মরমি লোককবিকেও ভাষা আন্দোলন গান রচনায় প্রাণিত করেছে। ভাষাসংগ্রামের গান বেঁধে এক বাউল-কবি, মহিন শাহ, পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও লোককবিদের রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে।

৬.

লোকসংস্কৃতি বাঙালি জীবনের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণার নিদর্শন। তবু কোনো কোনো নগর-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক সভ্যতাগর্বী শিক্ষাভিমানী পণ্ডিত অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য আর উন্নাসিকতায় লোকসংস্কৃতিকে খারিজ করতে চান। প্রসঙ্গত, এখানে বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি-ভাবুক আশুতোষ ভট্টাচার্যের একটি উক্তির সারমর্ম স্মরণ করতে চাই। তিনি বলতে চেয়েছেন, বাংলার গ্রামীণ সমাজেই বাংলার সংস্কৃতির ‘জন্ম ও পরিপুষ্টি’—এক প্রাকৃতিক শক্তির প্রতিরোধ আছে বলেই ভুঁইফোড় ‘নাগরিক সংস্কৃতি’ শত চেষ্টা সত্ত্বেও ‘কিছুতেই জাতির মর্মমূলে নিজের শিকড় প্রবেশ’ করাতে সক্ষম হয়নি। বাইরের দিক দিয়ে নাগরিক সংস্কৃতিকে ‘শক্তিশালী’ মনে হলেও আসলে ভেতরে-ভেতরে তা শক্তিহীন ও অন্তঃসারশূন্য। তাই তিনি প্রত্যাশা করেছেন, ‘অতএব কল্যাণের পথে সমাজকে যাহারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে চাহেন, ধ্বংসোন্মুখ পল্লীজীবনের মধ্যেই এখনও তাঁহাদিগকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানের সন্ধান করিতে হইবে।’

জাতির ক্রান্তিলগ্নে কিংবা জাগৃতি মুহূর্তে তার ঐতিহ্যলগ্ন আত্মপরিচয় সম্পর্কে কৌতূহল ও সন্ধিৎসা জাগে, যেমন জেগেছিল স্বদেশি আন্দোলনের যুগে এবং উত্তর সময়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কালে। তাই বারবার ফিরে ফিরে যেতে হয় উৎসের কাছে—পিতৃপুরুষের নিবাস আর স্মৃতির কাছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রাম এবং তার সংস্কৃতিই আমাদের পরিচয়ের যথার্থ ঠিকুজি। বিশাল বাংলার যে গ্রামকে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, আমাদের স্মৃতি-স্বপ্ন, গৌরব, ঐতিহ্য, ইতিহাস—তাকে আবিষ্কারের মাধ্যমেই আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচিত হবে। সে-ই হবে বিস্মৃত-বিভ্রান্ত বাঙালির সত্যিকারের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’।

বিশেষ সংখ্যা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন