>

রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার ছয়টি থানা এলাকায় বিতর্কিত ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ নামের একটি সংগঠন সর্বহারা নির্মূলের অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানা যায় ২০০৪ সালে। জাগ্রত মুসলিম জনতার কমান্ডার বা প্রধান ছিলেন আজিজুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। প্রথমবারের মতো তাঁর সাক্ষাৎ​কার নিতে পারে প্রথম আলো। ৫ মে​ সেই সাক্ষাৎ​কার প্রকাশিত হয়। এতে বাংলা ভাই বলেছিলেন সর্বহারা নির্মূলের দায়িত্ব তিনি নিজেই নিয়েছেন, প্রশাসন তাঁকে সহায়তা করছে।

সারা দেশে সন্ত্রাসী তৎ​পরতা পরিচালনাকারী সংগঠন জেএমবির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই বাংলা ভাই। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে জঙ্গি তৎ​পরতা চালিয়ে বোমাবাজি ও মানুষ হত্যার অপরাধে বাংলা ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

default-image

রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার ছয় থানা এলাকায় বিতর্কিত ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ নামের একটি সংগঠন সর্বহারা নির্মূলের অভিযান পরিচালনা করছে। এ সংগঠনের ক্যাডাররা সর্বহারা সন্দেহে লোকজনকে ধরে নির্যাতন চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদের নির্যাতনে নিহত হয়েছেন সাতজন। নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে গেছেন শতাধিক মানুষ। পুলিশ প্রশাসন তাদের সমর্থন দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জাগ্রত মুসলিম জনতার কমান্ডার বা প্রধান আজিজুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। বাংলা ভাই সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে রয়েছে চরম ভীতি ও আগ্রহ। বিতর্কিত ও রহস্যময় এই ব্যক্তি সমের্ক বাগমারা, আত্রাই, রানীনগর, নলডাঙ্গাসহ অন্যান্য এলাকার মানুষের ঔত্সুক্য দেখা গেছে এলাকা ঘুরে। গত ৩ মে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই বাংলা ভাই বাগমারার হামিরকুত্সা ইউনিয়নের রামরামা গ্রামের একটি বাড়িতে এই প্রতিনিধিকে এক দীর্ঘ সাক্ষাত্কার দেন। সাক্ষাত্কার গ্রহণের সময় বাগমারা থানার একজন দারোগার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বাড়িটির বাইরে সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল।

প্রথম আলো: সর্বহারা উচ্ছেদের যে কাজ আপনি করছেন, সে দায়িত্ব আপনাকে কে দিয়েছে?

বাংলা ভাই : এই দায়িত্ব আমাকে কেউ দেয়নি। আমি নিজেই দায়িত্ব নিয়েছি। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় আমার আত্মীয়স্বজন রয়েছে। তারা সর্বহারাদের হাতে সহায়-সম্পদ এবং আত্মীয়পরিজন হারিয়েছে। এই কারণে আমি মনে করেছি, এই এলাকা থেকে সর্বহারাদের উচ্ছেদ হওয়া দরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে নেমে পড়েছি এবং সফল হয়েছি।

প্রথম আলো : দেশে আইন-প্রশাসন থাকতে আপনি কেন সর্বহারা উচ্ছেদের দায়িত্ব নিলেন? আপনার এসব কর্মকাণ্ড আইন পরিপন্থী নয় কি?

বাংলা ভাই : আপনি নিশ্চয়ই জানেন, বৃহত্তর রাজশাহীর বাগমারা, আত্রাই, রানীনগর, দুর্গাপুর ও পুঠিয়া এবং নাটোরের নলডাঙ্গা এলাকায় বাহ্যত কোনো আইন-প্রশাসনের অস্তিত্ব ছিল না। এখানে সর্বহারারা দিনের বেলায় মানুষ জবাই করেছে। স্বামীকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে। এই অবস্থায় কেউ যদি সর্বহারা নামধারী ডাকাত-সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করে, সেটা কি আইনবিরোধী কাজ হতে পারে? আমরা তো আইনের পক্ষেই কাজ করছি। প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

প্রথম আলো: আপনারা সর্বহারা সন্দেহে লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন করছেন, নির্যাতনের মাধ্যমে প্রাণে মেরে ফেলছেন, পঙ্গু করে দিচ্ছেন, এটা কি আইনবিরোধী কাজ নয়?

বাংলা ভাই: আমরা নির্যাতন করে কোনো মানুষকে প্রাণে মেরে ফেলছি, এটা ঠিক নয়। যারা মারা যাচ্ছে তারা এনকাউন্টারে অথবা জনগণের রোষানলে পড়ে মারা পড়ছে। যারা পঙ্গু হচ্ছে, তারা জনরোষে পড়ে অবস্থার শিকার হচ্ছে। তবে আমরা যখন জানতে পারছি তখন সর্বহারাদের জনগণের রোষানল থেকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছি। জাগ্রত মুসলিম জনতার পক্ষে কাউকে প্রাণে মেরে ফেলা হচ্ছে না। একটি বিশেষ মহল জাগ্রত জনতার ওপর দায় চাপিয়ে মিথ্যা প্রচার করছে, তারাই সর্বহারাদের পৃষ্ঠপোষক।

প্রথম আলো: আপনারা সর্বহারা সন্দেহে ক্যামেঙ্ নিয়ে গিয়ে নির্মম কায়দায় নির্যাতন করছেন এবং নির্যাতন সেল করেছেন ক্যাম্পে— এমন অভিযোগ উঠেছে।

বাংলা ভাই: ক্যাম্প কথাটিতে আমার আপত্তি আছে। আমরা যেখানে থাকি, সেটা কোনো ক্যাম্প নয়। একটা নির্দিষ্ট বাড়িতে এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে মুসলিম জনতার লোকজন থাকে এবং তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করার কোনো অভিযোগ নেই। আপনি এলাকার মানুষকে জিজ্ঞাসা করেন, তারা কেউ বলবে না, আমরা এমন কিছু করি। আমাদের কোনো নির্যাতন সেলও নেই। আপনি (এলাকার কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যানকে দেখিয়ে) এদেরকে জিজ্ঞাসা করুন, তারাও কেউ বলবেন না, আমরা কাউকে নির্যাতন করি। এটা সর্বহারা ও তাদের সহায়তাকারী গোষ্ঠীর বিশেষ প্রচারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

এটা সর্বহারা ও তাদের সহায়তাকারী গোষ্ঠীর বিশেষ প্রচারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রথম আলো: আপনারা কীভাবে নির্ধারণ করেন কে সর্বহারা আর কে নয়? নিশ্চিতইবা কীভাবে হন? আর এই কাজ তো পুলিশের?

বাংলা ভাই: কেউ কারো সমের্ক অভিযোগ দিলে সেটা কয়েক দিন ধরে যাচাই করি বিভিন্ন সূত্র অনুসন্ধান করে। তারপর তাকে ডাকিয়ে আনি। সে স্বেচ্ছায় স্বীকার করে অস্ত্র দিয়ে দিলে আমরা ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়ে থাকি। জনগণের জন্যই তো পুলিশ। আমরা তো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে থাকি। পুলিশও আমাদের সঙ্গে সহায়তা করে থাকে।

প্রথম আলো: কেউ স্বেচ্ছায় অস্ত্র না দিলে তখন নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করেন?

বাংলা ভাই: আমরা যাকে ডেকে আনি বা জনগণ যাকে তুলে নিয়ে আসে, সেটা নিশ্চিত হয়েই নিয়ে আসে। কার কাছে অস্ত্র আছে, সেটা জনগণ ভালোভাবেই জানে। কেউ স্বেচ্ছায় অস্ত্র না দিলে পরিস্থিতি বাধ্য করে তার অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে, যা করার তা-ই করতে।

প্রথম আলো: তাহলে স্বীকার করছেন, আপনারা প্রয়োজনে নির্যাতন করেন?

বাংলা ভাই: আমি তো বললাম, জনগণ মনে করলে করে।

প্রথম আলো: আপনারা যেসব অস্ত্র উদ্ধার করেন, তা কী করেন? এখন পর্যন্ত কত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলতে পারবেন কি?

বাংলা ভাই: আমরা বলতে জনগণ যেসব অস্ত্র সর্বহারাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী উদ্ধার করে, তা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে দেওয়া হয়। পুলিশ আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যায়। কত অস্ত্র এ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে, তা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। হিসাব করে বলতে হবে।

প্রথম আলো: জাগ্রত মুসলিম জনতার ব্যানারে আপনি বহু হত্যা মামলা এবং বড় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের আত্মসমর্পণ করাচ্ছেন। এই অঞ্চলের একজন পুলিশ সুপার বলেছেন, এ ধরনের কোনো কাজ করার আইনগত কোনো অধিকার আপনার বা জাগ্রত জনতার নেই। আপনি কী মনে করেন?

বাংলা ভাই: এটা ওনারা হয়তো আপনাদের কাছে বলেছেন কিন্ত আমাদের তারা বলেননি। বরং পুলিশ তো আমাদের কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। আর আমরা তো ভালো কাজ করছি।

প্রথম আলো: আপনারা যেভাবে কাজ করছেন সে ক্ষেত্রে সর্বহারাদের আক্রমণের শিকার হলে কী করবেন? প্রতিরোধইবা কীভাবে করবেন?

বাংলা ভাই: প্রথমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মোকাবিলা করব।

প্রথম আলো: সর্বহারারা যদি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে তখন আপনারা কীভাবে প্রতিরোধ করবেন? আপনাদের কাছে কি অস্ত্র আছে?

বাংলা ভাই : জীবনের মালিক আল্লাহ। মৃত্যু তার নির্দেশেই হবে। তবে আত্মরক্ষার অধিকার আল্লাহ সবাইকে দিয়েছেন। সর্বহারারা যেভাবে আক্রমণ করবে, তাদের সেভাবে মোকাবিলা করা হবে। তারা যদি আগ্নেয়াস্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টি করে, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় আমরাও সেভাবে তাদের হামলার জবাব দেব।

প্রথম আলো : তাহলে আপনাদের কাছেও আগ্নেয়াস্ত্র আছে, এটা স্বীকার করছেন?

বাংলা ভাই : জনগণই তো আগ্নেয়াস্ত্র। তারা সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনমতো জবাব দেবে। লাঠির প্রয়োজনে লাঠি, অস্ত্রের প্রয়োজনে অস্ত্র— যখন যা দরকার হবে জনগণ তা-ই দিয়ে জবাব দেবে।

প্রথম আলো : আপনি এই অঞ্চলের জনগণের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। দেশের অন্য যেসব এলাকায় ব্যাপক মাত্রায় সর্বহারার উত্পাত রয়েছে, সেসব এলাকার লোক যদি আপনাকে ডাকে, যাবেন সেখানে?

বাংলা ভাই : আমরা কারো চাকরি করি না। অন্য কোনো এলাকায় যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করি না। আপাতত এই এলাকাকে সর্বহারামুক্ত করাই আমাদের প্রধান মিশন।

প্রথম আলো : তাহলে লোকে বলে আপনারা সরকারি লোক, এটা কি ভুল?

বাংলা ভাই : লোকের ধারণা একদম ভুল। আমরা সরকারি লোক নই। আমরা স্বেচ্ছাসেবীমাত্র। আল্লাহর নির্দেশে এখানে এসেছি মানুষকে সাহায্য করতে।

প্রথম আলো : আপনি নাটোরের উপমন্ত্রী দুলু, রাজশাহীর এসপি মাসুদ মিয়াসহ এই অঞ্চলের বড় বড় নেতা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন? কী কথা হয়েছে তাদের সঙ্গে?তারা কীভাবে আপনাকে সাহায্য করছেন?

বাংলা ভাই : এদের সঙ্গে আমার সরাসরি সাক্ষাত্ হয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগও রয়েছে। তারা আমাদের কাজে খুশি।

প্রথম আলো : এবার বলুন, আপনি এলেন কীভাবে, এখানে কে আপনাকে আনল, কীভাবে আপনি সফল হলেন সর্বহারা দমনে?

বাংলা ভাই : আমরা প্রথমত হিট অ্যান্ড রান পদ্ধতিতে অপারেশন শুরু করি। সর্বহারার দল প্রতিরোধের চেষ্টা করে পালিয়ে যায়। সেটাতে বড় ঝুঁকি ছিল জেনেও আমরা তা করি। দেখি প্রথম প্রথম জনগণ আমাদের বিরোধিতা বা সহযোগিতা কোনোটাই করছে না। প্রথম দিনেই আমরা সফল হলে হাজার হাজার মানুষ আমাদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত সফলতা অব্যাহত রয়েছে। সর্বহারা যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তারাও সাহায্য করছে আমাদের।

প্রথম আলো : আপনাদের থাকা-খাওয়াসহ গাড়ির তেল কারা দিচ্ছে?

বাংলা ভাই : আমরা নিজেরাই নিজেদের খরচে চলছি। কারো কাছ থেকে কোনো অনুদান বা চাঁদা নিই না।

প্রথম আলো : আপনার নাম বাংলা ভাই হলো কীভাবে? আপনি কোন এলাকার লোক?ব্যক্তিজীবনে কী করেন ?

বাংলা ভাই : আসলে আমি একসময় ঢাকার একটি খ্যাতনামা কোচিং সেন্টারে বাংলার ক্লাস নিতাম। আমার ক্লাসের সকল ছাত্রই বাংলায় ভালো করত। এই জন্য কোচিং সেন্টারের পরিচালক আমাকে বাংলা ভাই বলে ডাকতে থাকেন। পরে ছাত্রছাত্রীরা সকলেই বাংলা ভাই বলে। সেই থেকে আমার নাম বাংলা ভাই হয়ে গেছে।

আর আমি এই এলাকারই মানুষ। ব্যক্তিজীবন বলতে যা করছি এ-ই আমার জীবন।

প্রথম আলো : কত দিন থাকবেন এ এলাকায়?

বাংলা ভাই : আল্লাহপাক আমাকে যত দিন রাখবেন তত দিন এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে আছি।

আরও পড়ুন :

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0