>

default-image

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটার এবং ধারাভাষ্যকার সাথীরা জাকির জেসি। বিকেএসপিতে তাঁর সহপাঠী ছিলেন সাকিব আল হাসান। আর মুশফিকুর রহিমকে তিনি পেয়েছিলেন বড় ভাই হিসেবে। আবার লেখাপড়ার সূত্রে তাঁর ছোট ভাই হলেন মুমিনুল হক বা লিটন দাস। বিকেএসপিতে একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছেন সবাই। স্মৃতিচারণায় সাথীরা জাকির জেসি জানাচ্ছেন বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটারদের অন্য ভুবনের বৃত্তান্ত।

ছোটবেলা থেকেই আমার মনের ভেতরে ছিল ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। শচীন টেন্ডুলকারের ভীষণ ভক্ত আমি। তাঁর ব্যাটিং কী যে ভালো লাগত, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। ক্রিকেটার হব বলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে বাবার হাত ধরে একদিন গিয়েছিলাম বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। সেখানে গিয়ে অনেক ক্রিকেট তারকার সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো! আমার সিনিয়র বা জুনিয়র অনেকেও পরবর্তী সময়ে কাঁপিয়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চ। সবার সঙ্গে এত স্মৃতি, কার কথা প্রথমে বলব? তাঁরা সবাই–ই আমার ভাই–বেরাদার। তাই বরং নিজের কথা দিয়েই শুরু করি।

২০০১ সালে প্রথম দিন বিকেএসপিতে ঢুকে মন জুড়িয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা আমিও সেখানে গিয়ে মুগ্ধ, চারপাশে এত সবুজের সমারোহ, এত গাছপালা! তবে যে কারণে বিকেএসপিতে যাওয়া, সেই স্বপ্নটা হোঁচট খেয়েছিল শুরুতেই। চেয়েছিলাম ক্রিকেটে ভর্তি হব। কিন্তু গিয়ে হতাশ হতে হলো।

হতাশ না হয়ে উপায়ই–বা কী? বিকেএসপিতে মেয়েদের ক্রিকেট তখনো তো চালুই হয়নি। কী আর করা, ভাবছিলাম ফিরেই যাব। এমন সময় বিকেএসপির একজন শিক্ষক আমাকে বললেন, ‘তোমার ফিটনেস তো ভালো। পরীক্ষা দিয়ে দেখো, যদি শুটিং বা টেনিসে সুযোগ পাও। এরপর ক্রিকেট চালু হলে তাতে তুমি ভর্তি হতে পারবে।’

অতঃপর শুটিংয়ে ভর্তি হলাম। কিন্তু ভেতরে–ভেতরে অন্য আশায় দিন গুনি।

default-image

আমার বন্ধু সাকিব

আমি যেবার সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই, সে বছরই আমাদের সঙ্গে ভর্তি হলো এখনকার বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। তখন ক্রিকেটারদের ক্লাস হতো এক সেকশনে। আরেক সেকশনে হতো শুটিং, ফুটবল, হকিসহ অন্যদের ক্লাস।

এক সময় শুটিং ছেড়ে আমি ক্রিকেটে ভর্তি হই।

বিকেএসপিতে ভর্তির শুরু থেকেই আমার ভালো বন্ধু হয়ে যায় সাকিব। ক্লাসে বা করিডরে যদিও খুব বেশি আলাপ হতো না, কিন্তু ক্রিকেট অনুশীলনের সময় ওর সঙ্গে অনেক বিষয়ে কথাবার্তা হতো। সাকিব আল হাসান এখন মস্ত বড় ক্রিকেটার। তবে আমাদের কাছে সাকিব এখনো সেই বিকেএসপির বন্ধু সাকিব হয়েই আছে। অনুশীলনে এখনো ওর কাছ থেকে অনেক বিষয়ে টিপস নিই। আর সাকিব ব্যস্ত না থাকলে বিকেএসপির ২০০১ সালে ভর্তি হওয়া সবাই আমরা মাঝেমধ্যেই ওর বাসায় পুনর্মিলনীতে মিলিত হই। এই তো কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর আমাদের সবাইকে ওর বাসায় ডেকেছিল সাকিব। আমরা কেক কাটলাম। কত্ত মজা করলাম!

নিজের বন্ধু বলে বলছি না, সাকিবের মতো ভালো মনের মানুষ হয় না। অসম্ভব বন্ধুবৎসল। যখন সে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, কখনোই ভাবে না ও অনেক বড় কেউ। যখন ও বিশ্বকাপে ভালো খেলছিল, প্রায়ই খুদে বার্তা পাঠাতাম ফোনে। বিনিময়ে সে শুধু হাসত, আর উত্তরে লিখত, ‘আমার জন্য দোয়া করিস।’

গরিব–দুঃখীকে অনেকভাবে সাহায্য করে সাকিব। কিন্তু এটা সে কাউকে কখনো বলে না। ওর সবচেয়ে ভালো গুণ হলো ও সব সময় সত্যি কথা সবার মুখের ওপর বলে দেয়। বাংলাদেশ দল যখন মাঠে খেলে, তখন তো সমর্থন থাকেই। তবে সাকিব যখন খেলে, তখন ওর জন্য আলাদা সমর্থন থাকে। মন থেকেই চাই যে ও ভালো খেলুক।

default-image

মুশফিকুর রহিম ভাইয়া

সাকিব আমাদের ব্যাচের হলেও উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম ভাই আমাদের সিনিয়র ছিলেন। ভাইয়ার সঙ্গে আমি প্রতিবছর ২৬ মার্চ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। বেশির ভাগ সময় আমি দ্বিতীয় হতাম। আঁকা শেষ হলে কৌতূহলভরে অপেক্ষা করতাম, কে প্রথম হবে। শেষে দেখতাম পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন মুশফিক ভাই। 

বিকেএসপিতে সব স্যার–ম্যাডাম মুশফিক ভাইকে ভীষণ পছন্দ করতেন। তাঁকে পছন্দ করার কারণ একটাই—অসম্ভব ভালো ছাত্র ছিলেন তিনি। ক্রিকেটে তো আগে থেকেই ভালো ছিলেন, পড়ালেখার জন্যও তাঁর আলাদা সুনাম ছিল পুরো ক্যাম্পাসে।

অন্য ক্রিকেট তারকা

আমাদের সঙ্গে পড়তেন ব্যাটসম্যান নাসির হোসেন আর পেসার শাহাদাত হোসেন। নাসিরের কথা আর কী বলব, ও ছিল দুষ্টুর শিরোমণি। আর শাহাদাত? সে তো তালগাছের মতো লম্বা। ভোরে যখন আমরা অ্যাসেম্বলি করতে মাঠে এসে দাঁড়াতাম, সবার চেয়ে লম্বা দেখাত শাহাদাতকে। ও অনেক লম্বা, এটা নিয়ে আমরা বন্ধুরা কত যে হাসাহাসি করেছি। প্রায়ই ওকে ‘লম্বু’ বলে ডাকতাম। তবে সে আমাদের কিছুই বলত না, শুধু হাসত।

ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক ছিল আমাদের জুনিয়র। বিকেএসপিতে ওর পরিচয় ছিল সবচেয়ে ভদ্র ছেলে হিসেবে। মুমিনুলের একটা বড় গুণ, সারাক্ষণ অনুশীলনে ডুবে থাকত সে, এখনো তা–ই করে। মিরপুর ক্রিকেট একাডেমি আর ইনডোর—যখন যেখানে যাই, সেখানেই দেখি অনুশীলন করছে মুমিনুল। সে আমার জুনিয়র হলেও তার কাছ থেকে প্রায়ই টিপস নিই আমি—কীভাবে স্পিন খেলব, আমার ফুটওয়ার্ক কেমন হবে—এগুলো আমাকে খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দেয় মুমিনুল। ওর টেকনিক্যাল জ্ঞান খুবই অসাধারণ। মাঠে ব্যাট হাতে মুমিনুল যতটাই অশান্ত, ব্যক্তি মুমিনুল ঠিক তার উল্টো, ভীষণ শান্ত আর চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। ও প্রেম করে বিয়ে করেছে শোনার পর খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম। আগে যখন ওকে প্রায়ই বলতাম, তোমার কি গার্লফ্রেন্ড আছে—তখন উত্তর না দিয়ে শুধুই হাসত সে। সেই হাসির মধ্যেই যে উত্তর লুকিয়ে আছে, বুঝতে পারিনি।

জুনিয়র হিসেবে ব্যাটসম্যান এনামুল হককেও পেয়েছি বিকেএসপিতে। যথেষ্ট ভদ্র ছেলে। তবে শেষে এখানে আরেকজনের কথা বলতে চাই, সে উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান লিটন দাস। বলা বাহুল্য সে–ও আমার জুনিয়র। লিটন অবশ্য একটু লাজুক প্রকৃতির। আমাদের সঙ্গে খুব বেশি কথাবার্তা বলত না। তবে ওর ব্যাটিংয়ের ভীষণ ভক্ত আমি। আমার দেখা অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান লিটন।

বিকেএসপি থেকে বেরিয়ে এসে এখন যখন সারা বিশ্বের ক্রিকেটাঙ্গন মাতাচ্ছেন আমাদের মুশফিক ভাই বা আমার বন্ধু সাকিব, সত্যি অন্য রকম একটা অনুভূতি হয়, গর্ব হয়। কেননা, আমিও তো তাদের সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি, আমাদের সবার ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ই তো বিকেএসপি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন