কাব্য রচনার কাল

বাংলার ইতিহাসে সুলতানি আমলের গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু বাঙালির ইতিহাসে এই গুরুত্ব অতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা সহজ নয়। বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে তারাই বাঙালি—বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণের ইতিহাস নিশ্চয়ই অত সরল-নিরীহ নয়। অন্য যেকোনো নির্মাণের মতোই এতেও উপকরণ সাব্যস্তকরণের জটিলতা আছে; পক্ষ-বিপক্ষের মামলা আছে; নানা ধরনের স্ববিরোধ এবং দ্বন্দ্ব আছে। তার একটি দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই সংক্ষিপ্ত লেখার উদ্দেশ্য। কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ইতিহাসে সুলতানি আমলের গুরুত্ব কেন সর্বজনস্বীকৃতি পেয়েছে, তার কিছু দিক উল্লেখ করা যাক।

সুলতানি আমলের স্বীকৃত তাৎপর্যের প্রধান দিক এর স্বাধীন অস্তিত্ব। এ আমল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ লম্বা সন্দর্ভ রচনা করেছেন সুখময় মুখোপাধ্যায়। তাঁর বইয়ের নাম বাংলার ইতিহাসের দু’শো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল। একেবারে শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘১৩৩৮ খ্রীষ্টাব্দে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে গিয়াসুদ্দীন মাহ্‌মুদ শাহের উচ্ছেদ পর্যন্ত পুরোপুরি দু’শো বছর বাংলা দেশ যেরকম অবিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতা ভোগ করেছিল, তত দীর্ঘদিন ধরে আর কোন সময় তার স্বাধীনতা স্থায়ী হয় নি। এই দু’শো বছর বাংলা দেশের ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়।’ পরে—এবং আগেও—‘স্বাধীন সুলতানি আমল’ কথাটা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। বাংলার ইতিহাসের দীর্ঘ পরাধীনতার ইতিহাস মনে রাখলে এই স্বাধীনতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবে।

সুলতানি আমলের দ্বিতীয় তাৎপর্য এই যে, বাংলা সাহিত্যচর্চার বিশেষত কাব্যচর্চার বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা পর্ব এ সময়েই সংঘটিত হয়েছিল। মধ্যযুগের সাহিত্যে যাকে আমরা অনুবাদকাব্য বলে থাকি তার বড় অংশ, মঙ্গলকাব্যের গুরুত্বপূর্ণ একাংশ, বৈষ্ণব কবিতার কিছু অংশ, মুসলমান সাহিত্যিকদের বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম এ সময়েই রচিত হয়েছিল। এই সাহিত্যচর্চার পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। মন্ত্রী-আমলাদের একাংশও এ ব্যাপারে গভীর লিপ্ততা দেখিয়েছিলেন। সাধারণভাবে মনে করা হয়, দেশকে এবং দেশের মানুষকে জানা-বোঝার অংশ হিসাবেই ‘বিদেশি’ সুলতানরা দেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে উৎসাহী হয়েছিলেন। এ অবস্থা একধরনের সুশাসনের ইঙ্গিত দেয়। রচয়িতাদের দিক থেকে সমান বা ততোধিক উৎসাহ না থাকলে এ প্রকল্প সফল হতো না। তার মানেই হলো, দেশীয় সমাজ এ সময় বেশ উজ্জীবিত ও প্রকাশ-উন্মুখ ছিল। সুলতানি আমলের বহু সুশাসক এবং তাঁদের সুশাসনের সঙ্গে এ বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক আছে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

সাহিত্যের মতো বাংলা ভাষার সমর্থ হয়ে ওঠা আর পরিণতিলাভের সঙ্গেও এ যুগের বিশেষ সম্পর্ক আছে। হয়তো এ সম্পর্ক কাকতালীয়। বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ধারাবাহিকতায় এ বিকাশ হয়তো এ রকমই হওয়ার কথা। কিন্তু ভাষার একটা পরিশীলিত রূপ সাহিত্যে ধরা পড়ে, এবং ভাষার সাহিত্যিক ব্যবহার ভাষার গতিপথকে কখনো কখনো প্রভাবিত করতে পারে—এ কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সুলতানদের বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে ভাষার বিকাশের একটা কার্যকর সম্পর্ক নির্মাণ করা অসম্ভব হবে না।

বিশেষত, কাব্যিক প্রকাশের প্রয়োজনেই এ সময় সংস্কৃত থেকে প্রয়োজনীয় কর্জ করে আর ব্যবহারিক আরবি-ফারসি শব্দ ধার করে বাংলা ভাষা যে তুলনামূলক প্রকাশক্ষম হয়েছে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

দেখা যাচ্ছে, বাংলা ও বাঙালির পরিচয়নির্মাণে সুলতানি আমল ব্যবহৃত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য ওই পরিচয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বলা যায়, প্রধান উপাদান। জনমিতির দিক থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। যাকে আমরা বাংলা অঞ্চল ও বাঙালি জনগোষ্ঠী বলে থাকি, তার বড় অংশ হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মানুসারীতে বিভক্ত। সেদিক থেকে এদের কোনো সাধারণ নাম কেবল তখনি ফলপ্রসূ হবে, যখন এ দুই ধর্মানুসারীদের পারস্পরিকতার যথেষ্ট আলামত পাওয়া যাবে। সুলতানি আমলে এ ধরনের লেনদেন বেড়েছিল বলে নানা সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ধর্মতত্ত্ব ও সংস্কৃতির দিক থেকেও মিলমিশটা বেশ গভীরভাবে হয়েছিল। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ শ্রীচৈতন্য এবং বৈষ্ণব ধর্ম। হুমায়ুন কবিরসহ অনেকেই মনে করেন, নতুন বৈষ্ণব আন্দোলন মুসলমান ও হিন্দু ধর্মতত্ত্ব ও রীতিপদ্ধতির সংঘাত-সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের ফল। হুমায়ুন কবির তাঁর বিখ্যাত বাংলার কাব্য বইতে আরও একটা মূল্যবান দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বলেছেন, মঙ্গলকাব্যের ব্যাপক উত্থানকে প্রান্তীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর আত্মঘোষণা হিসেবে দেখাই সংগত। সে রাজশক্তির দিক থেকেও বটে, ব্রাহ্মণ্যবাদী আদর্শ আর রীতিপদ্ধতির দিক থেকেও বটে। এসব কথা মনে রাখলে বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণের সিলসিলায় সুলতানি আমল এখন যতটা গুরুত্ব পেয়ে থাকে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারত। কিন্তু তা পায়নি।

আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ধারণা একটা বহুল প্রচলিত মিথমাত্র। দুনিয়ার কোনো সংস্কৃতিই আবহমানকাল ধরে শনাক্তযোগ্য সমরূপতায় বিরাজ করে না। বিশ-একুশ শতকে ব্যাপকভাবে বিকশিত সংস্কৃতি-অধ্যয়ন শাস্ত্রে এ ধরনের ধারণাকে মোটেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতাও অলীক কল্পনামাত্র। সংস্কৃতিমাত্রই মিশ্র, যেমন ভাষা বিচিত্র ভাষিক-সাংস্কৃতিক উপাদান সঙ্গে নিয়েই প্রতিমুহূর্তে বিচিত্র রূপে জায়মান থাকে। বাঙালি ধারণার ‘অনিত্যতা’ সম্পর্কে, উদাহরণ হিসেবে বলা যাক, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বেশ সচেতন ছিলেন। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা সম্পাদনা করতে গিয়ে ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ঈশ্বর গুপ্ত খাঁটি বাঙালি। এরকম খাঁটি বাঙালি আর জন্মিবে না। এ নিয়ে তিনি কোনো হাহাকার করেননি। বরং বলেছেন, ওরকম বাঙালি আর জন্মানোর দরকার নাই। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে আসলে নিজেকে এবং নিজের সময়ের অন্যদের বদলে যাওয়া বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আমরা বাঙালির যে সংজ্ঞা এ জমানায় কাগজে-কেতাবে প্রবলভাবে পাই, তা আসলে এই বাঙালি—উনিশ শতকের শেষ ভাগে এবং বিশ শতকের প্রথম ভাগে কলকাতার বিদ্যায়তনিক আর সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎপাদিত বাঙালি। বোঝার সুবিধার খাতিরে মনে করিয়ে দিই, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, সুশীলকুমার দে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস প্রমুখ ‘শনিবারের চিঠি’র সঙ্গে একদাযুক্ত বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এই বাঙালিত্বই প্রচার করেছিলেন।

বলার কথাটা হলো, অন্য অনেক কিছুর মতো ‘বাঙালিত্ব’ও তৈরি হয়ে থাকা বস্তু নয়; বরং বিশিষ্ট প্রেক্ষাপটের বিশিষ্ট চর্চার ফলমাত্র। উনিশ শতকের বর্ণাঢ্য সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে তার বর্তমান প্রভাবশালী রূপটি তৈরি হয়েছে। এ রূপের সর্বোত্তম প্রকাশ নীহাররঞ্জন রায়ের মহাকাব্যিক গ্রন্থ বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব। আগের কয়েক দশক ধরে কলকাতার কুলীন বিদ্যাঙ্গনে যেসব উপকরণ-বিশ্লেষণ জমা হয়েছিল তার সর্বোত্তম ব্যবহারই নিঃসন্দেহে এ গ্রন্থের কালোত্তীর্ণ মহিমার উৎস। প্রশ্ন হলো, নীহাররঞ্জন বাঙালির পরিচয় এত আগে শেষ করলেন কেন? প্রাচীন যুগে কেন, যেখানে তাঁর সমকালীন বাঙালি জনগোষ্ঠীর বেশি-অর্ধেক মানুষ মুসলমান এবং তাদের বিকাশ-বিবর্তন শুরু হয়েছে কথিত মধ্যযুগের গোড়ায়? স্পষ্টতই নীহাররঞ্জন রায়ের ইতিহাসচিন্তায় এ প্রশ্নটা ছিল না। উনিশ-বিশ শতকে তাঁর পূর্বসূরি বেশির ভাগ ঐতিহাসিকই এ প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামাননি। বিষয়টা তাঁদের গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়নি। কারণ, ওই সময়ে বাঙালিত্বের যে রূপ-প্রকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে মুসলমানরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল বরং ‘অপর’ হিসেবে। রেনেসাঁসের আলোর কল্পনার জন্য আগের যে অন্ধকার দরকার হয়, তার জোগান দিয়েছিল কয়েক শ বছরের মুসলমান শাসন। দেশি সংস্কৃতি আর জনগোষ্ঠীর বিপরীতে মুসলমানরা চিত্রিত হয়েছিল ‘বিদেশি’ হিসেবে। শত শত বছর প্রজন্ম-পরম্পরায় এ দেশে বসবাস করে, বাংলা ভাষা গ্রহণ করে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রক্তসূত্রে মিশে গিয়েও এই অভিধা তারা মুছতে পারেনি। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে কলকাতার যাবতীয় ‘বাঙালিচর্চায়’, বিশেষত ইতিহাসচর্চায়।

বাঙালির ইতিহাসের বিশ্রুত লেখকগণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর রূপলাভের কাল সাব্যস্ত করেছেন পাল আমল। নীহাররঞ্জন রায় অবশ্য সরাসরি এ ধরনের সিদ্ধান্ত জানাননি। কিন্তু তাঁর আলোচনায় স্বভাবতই পাল আমলের চার শ বছর তথ্য-উপাত্তে ও বিচার-বিশ্লেষণে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বাংলা দেশের ইতিহাস-এ সরাসরি পাল আমলকে কেন্দ্র করেছেন। পাল আমলকে গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু অযৌক্তিকতাও কম নেই। সম্ভবত মুসলমান শাসনকে এড়ানোর সচেতন বা অচেতন চেষ্টার কারণেই ঐতিহাসিকদের অনেকেই খেয়াল করেননি যে, পাল শাসনের কেন্দ্র ঠিক বাংলা অঞ্চল ছিল না; আর পূর্ব বাংলার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেশির ভাগ সময়ে পাল রাজত্বের বাইরেই ছিল। স্বাধীন সুলতানি আমল নিয়ে কাজ করলে এ সমস্যাগুলো অনেক কম হতো। কিন্তু উনিশ-বিশ শতকের কলকাতায় তা হবার জো ছিল না।

এটা মোটেই কাকতালীয় নয় যে, কলকাতায় বাংলার ইতিহাসের মধ্যযুগ নিয়ে কাজ হয়েছে বিস্ময়করভাবে কম। সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে বিস্তর কাজ হয়েছে। সমীহ-জাগানো কাজ যথেষ্ট পাওয়া যায়। কিন্তু মুসলমান সাহিত্যিকদের তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সন্দর্ভের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের পূর্বোক্ত বই বেরিয়েছে ১৯৬২ সালে। কলকাতার বিদ্যাবত্তার পরিসরে এ ধরনের বই আরও কয়েক দশক আগেই বেরোতে পারত। যাই হোক, সুখময় তাঁর কেতাবে বেশ যত্নের সঙ্গে রাজা গণেশের ‘সম্পূর্ণ এবং যুক্তিমূলক’ বিবরণ দিয়েছেন। হোসেন শাহ সম্পর্কে ‘পূর্ণাঙ্গ’ বিবরণ দাখিল করেছেন। ভূমিকায় রমেশচন্দ্র মজুমদার এই ভাষায় বইটির প্রশংসা করেছেন। হোসেন শাহর বিবরণী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: ‘বাংলার মুসলমান যুগের এই আদর্শ রাজা সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেন থেকে আরম্ভ করে বর্তমান কালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসলেখকেরা যে কাল্পনিক কাহিনী ইতিহাস বলে চালিয়ে এসেছেন আলোচ্য গ্রন্থে তা একেবারে ভূমিসাৎ হয়েছে।’ অধ্যাপক মজুমদার তাতে দারুণ উল্লসিত হয়েছেন। ইতিহাসের গালগল্প যদি ইতিহাসের তথ্যপ্রমাণের কাছে মার খায়, তাহলে উল্লাস প্রকাশের যথার্থ কারণ ঘটে। কিন্তু এ মন্তব্যকে আমরা অন্যভাবেও দেখতে পারি। হোসেন শাহ সম্পর্কে যদি অধ্যাপক সুখময় পাকা প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন, তাহলে অন্য ঐতিহাসিকেরা কিসের ভিত্তিতে লিখলেন? নিশ্চয়ই চালু গল্পগাথা অবলম্বনে। প্রশ্ন হলো, এ গল্পগুলো চালু হলো কেন? হোসেন শাহ কালো ছিলেন, তিনি বাঙালি মায়ের সন্তান ছিলেন, তিনি হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্য কাজ করেছিলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির চেষ্টা করেছিলেন—এ গল্পগুলো তাঁর নামে চালু হলো কেন? সুখময় মুখোপাধ্যায় এ প্রশ্নগুলোর বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেছেন। মোটেই বিদ্বেষমূলক মনোভাব দেখাননি। কিন্তু গল্পগুলোর মধ্যে জনমনে ‘হিন্দু-মুসলমান’ যৌথ সংস্কৃতির চর্চা দেখার যে আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে মোটেই আমলে আনেননি।

ঠিক এ জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন মমতাজুর রহমান তরফদার। তিনি তাঁর থিসিস গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন ১৯৬৫ সালে, হুসাইন শাহি বেঙ্গল নামে। তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হোসেন শাহর শাসনামলে (১৪৯৪-১৫৩৮) বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের সামগ্রিক ছবি উপস্থাপন করা। কিন্তু বইটি পড়লেই বোঝা যায়, একটি অন্যতর প্রকল্প তাঁর বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে গেছে। ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অধীনে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত জীবনযাপনের একটা চিত্র তিনি আঁকতে চেয়েছেন। কোথাও খোলাসা করে বলা হয়নি বটে, কিন্তু উনিশ-বিশ শতকের কলকাতায় বাঙালি পরিচয়ের যে একদেশদর্শিতা তার প্রতিবাদ হিসেবে বইটি পাঠ করা চলে। তাতে বোঝা যায়, উনিশ-বিশ শতকে বাস্তবের প্রত্যক্ষতা এড়িয়ে অথবা বাস্তবের মোকাবিলা না করে সুদূর অতীতে ‘বাঙালি’র আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান যতই পাণ্ডিত্যপূর্ণ হোক না কেন, তা বাস্তবে জীবনযাপনকারী জনমানুষের সাপেক্ষে বেশ ত্রুটিপূর্ণ; এবং তুলনামূলক অর্বাচীনকালে এ অনুসন্ধান অনেক বেশি কার্যকর ফল দিতে পারত। মমতাজুর রহমান তরফদারের আবিষ্কার অনুসরণ করে এভাবে পড়লে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল ‘বাঙালি’র ইতিহাসে আরও গভীর তাৎপর্য নিয়ে আবির্ভূত হবে।