পুঁথি-মালঞ্চের মালাকর

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৬৯—৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩) প্রতিকৃতি এঁকেছেন মাসুক হেলাল
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৬৯—৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩) প্রতিকৃতি এঁকেছেন মাসুক হেলাল

রবীন্দ্রনাথের ‘আবেদন’ কবিতায় ভৃত্যের নেই অন্য কোনো প্রার্থনা—একমাত্র—‘আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর’। রানী তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভৃত্যের ওই একটিই কাঙ্ক্ষা, ‘আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর’। পুনরাবৃত্ত রসনায় বারবার। রানী তো বলেই দিলেন, এ হলো কর্মভীরু কিঙ্করের অলস অকাজ। ভৃত্য সেটি মেনে নেন, অকাজের কাজ বটে, কিন্তু ‘সহস্র সঞ্চয়’। কেবল সঞ্চয় নয়—‘শত শত আনন্দের আয়োজন’। কার কাছে কোনটি প্রত্যাশিত, কোনটি তাঁর একান্ত কাজ, কোনটি তাঁর আনন্দ, কোনটি তাঁর জীবন-মন উন্মুখ করা সাধনা, সেটি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিই জানেন। তাই সৌন্দর্যদেবী রানীর কাছে সৌন্দর্যের সেবকের এমনই কাতর অনুনয়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদও একজন সৌন্দর্যসেবক, তবে সে সৌন্দর্য রমণীর রোমান্টিক সৌন্দর্য নয়, সে হলো পুঁথি, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। সাহিত্যবিশারদও মালঞ্চের মালাকর, নিশ্চয়ই ওই মালঞ্চ পুষ্পকানন নয়, পুঁথির বাগান। তাতে ফুটে আছে কত কত ফুল, পূর্ববঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে, চট্টগ্রামের বৃহৎ এলাকায়, ফুটে রয়েছে গোপনে, লুকিয়ে, নিভৃত নিরালায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে; কখনো ঝরে ঝরে পড়ে যাওয়ার অন্তিম লগনে, জীর্ণ, মরণ দুয়ারে।
আবদুল করিমের কাজ ওই ভৃত্যের মতো অলসের নয়, বরং নিরলস কর্মসাহসীর দৃঢ় সাধনা। খুঁজে পেতে হবে সব পুঁথি। তাতেই জানা যাবে মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকীর্তি, যার কিছুই জানেন না ইংরেজ-শাসিত আধুনিক বঙ্গসংস্কৃতি ও সাহিত্যকেন্দ্র কলকাতার কোনো গবেষক, সাহিত্যামোদী ও জাতীয় ঐতিহ্য অন্বেষী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আগ্রহে ও ব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ খোলা হলো। তিনিই কুমিল্লা থেকে দীনেশচন্দ্র সেনকে কলকাতায় এনে বাংলা বিভাগ গড়ার দায়িত্ব দিলেন। পাঠদানের পাশাপাশি তিনিও লুপ্ত সাহিত্যকীর্তি অর্থাৎ পুঁথি ও লোকসাহিত্যের সঞ্চয় সন্ধানে নেমে পড়লেন। তাতেই পাওয়া গেল মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার মতো চিরকালীন সাহিত্য।
উনিশ শতকের কলকাতার লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে তুলেছেন। সেই নবজাগরণে মুসলমানেরা ছিলেন না। তাঁরা যুক্ত হলেন অনেক অনেক পরে। নবজাগরণের কালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ইত্যাদি বিদ্যাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল বাংলাপ্রেমী শিক্ষিত বাঙালির মানসচর্চা ও ঐতিহ্য-অনুসন্ধানের প্রয়োজনে। সেই সময়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আশ্চর্য চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় ও বসন্তরঞ্জন বিদ্বদ্বল্লভ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুঁথি আবিষ্কার করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সমৃদ্ধ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মনে এই ধারণা ছিল যে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের তেমন কোনো অবদান নেই। তাঁরা আদালতের বটতলার পুঁথির কল্যাণে মুসলমান-রচিত দু-চারটি দোভাষী রীতির পুঁথির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। যেমন গরীবুল্লাহ, মুহম্মদ হামজা, মালে মুহম্মদ প্রমুখের পুঁথি। এই শূন্যাবস্থায় সাহিত্যের রঙ্গমঞ্চে সদর্পে এলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ।
পারিবারিক নাম আবদুল করিম, পরে তাঁকে ‘সাহিত্যবিশারদ’ উপাধি দেন চট্টল ধর্মমণ্ডলী। প্রকৃত নামের চেয়ে উপাধিই তাঁকে সর্বজনপরিচিত করেছে। চট্টগ্রামের পটিয়া থানার সুচক্রদণ্ডী গ্রামের এই স্মরণীয় পুরুষ এন্ট্রান্স পাস। এর বেশি তিনি পড়েননি। সে আমলে এটিই যথেষ্ট উচ্চশিক্ষার স্তর। পাস করে তিনি নানা জায়গায় কাজ করেন। কখনো আদালতের মুনশি, কখনো ইশকুলশিক্ষক, কখনো ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান। এসব জাগতিক কাজে তিনি আর সব গড়পড়তা মানুষের সমান ছিলেন। কিন্তু অল্প বয়স থেকেই তিনি পুঁথি-অনুরাগী হয়ে ওঠেন। পুঁথি পড়তে শেখেন। পুঁথি পড়ার আসরে অংশ নিতেন। আর পুঁথি পেলেই বিপুল তৃপ্তিতে সিক্ত হতেন। সেই থেকে তিনি সারা জীবন ব্যেপে পুঁথিরই সাধনা করেছেন—পুঁথি সংগ্রহ, পুঁথি সংরক্ষণ, পুঁথি সম্পাদনা ইত্যাদি পুঁথির যাবতীয় কাজ। পুঁথি গবেষণাও, তার সঙ্গে পুঁথি-বিষয়ক লেখালেখি। সে লেখাও বিস্তর—সেগুলোতে আছে পুঁথির বিবরণ, বাংলা সাহিত্যের উপকরণ—শিষ্ট সাহিত্য, লোকসাহিত্য, ছড়া, ধাঁধা, গাথা, প্রবাদ, চট্টগ্রামী ভাষার রূপ, বাংলা সাহিত্যের গবেষণা, প্রাপ্ত পুঁথির আলোচনা, পুঁথিকারদের পরিচিতি, নাথ সাহিত্য, সত্যপীর, সুফি সাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলি, চট্টগ্রামী চণ্ডীদাস প্রসঙ্গ, ইতিহাসের নানা বর্ণনা, পুরাতত্ত্ব, হিন্দু-মুসলমানের মিলন ইত্যাদি কত যে বিষয়! ৫০০-র বেশি প্রবন্ধ তিনি লিখেছিলেন ওই সব বিষয়ে। আর পুঁথি সম্পাদনা করেছেন ১০টি।

>সাহিত্যবিশারদের সাহিত্যদৃষ্টি সর্ববঙ্গীয়, সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িকতামুক্ত। তাঁর আবিষ্কারই মুসলমানদের হীনম্মন্যতা দূর করেছে

সম্পাদনায় তাঁর পারিপাট্য ও নৈপুণ্য দেখে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁকে জর্মান সম্পাদকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি যা করতেন পরম মমতায় ও যত্নে। সংগৃহীত পুঁথিগুলোকে সেভাবেই সংরক্ষণ করেছেন, সেগুলোর পরিচায়ন লিখেছেন উঁচু গবেষকের দক্ষতাসহকারে। তাঁর পুঁথি-পরিচয়নই পরে রূপ নিয়েছে আহমদ শরীফের পুঁথি-পরিচিতিতে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেরও প্রথম বই। গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ডক্টর সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন আ ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ অব বেঙ্গলি মেনাসক্রিপ্ট নামে। এই পুঁথিগুলোই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারকে উপহার দিয়েছিলেন। এগুলো মুসলমান-রচিত, সংখ্যায় ৬০০-র মতো; শ চারেক হিন্দু-রচিত পুঁথি তিনি দিয়েছিলেন বরেন্দ্র রিসার্চ সমিতিকে। কত পুঁথি তিনি একক প্রচেষ্টায় সংগ্রহ করেছিলেন—এ প্রশ্নের উত্তর সুস্পষ্ট নয়, তবে এক পুঁথির একাধিক কপিসহ তিনি দুই হাজার পুঁথি সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়।
পুঁথি সংগ্রহের দল হয়েছিল অত্যুত্তম। সংগ্রহকাজে গবেষণার সুপরিচিত নিদর্শন আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য গ্রন্থটি, যা তিনি তরুণ গবেষক ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক সহযোগে সম্পাদনা করেছিলেন। এতেই আমরা জানলাম আলাওল, কাজী দৌলত, মাগন ঠাকুর, মরদন প্রমুখ বিখ্যাত পুঁথিকারের কথা। পরে বেরোল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে দুই খণ্ডে বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ নামের আকর গ্রন্থ। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য ছিলেন; একবার সহসভাপতিও হয়েছিলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা এম এ শ্রেণির প্রশ্নকর্তাও। সুতরাং তাঁর পাণ্ডিত্য ও গবেষণা সুবিদিত উচ্চমানের জন্য।
বাঙালি মুসলমানের মধ্যযুগীয় সাধনার পূর্ণ পরিচয় তাঁর সংগ্রহ ও গবেষণার ফলেই জানা গেল। এটি আমরা এখন পূর্ণ প্রত্যয় নিয়ে বুঝে নিয়েছি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যও হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনা। সাহিত্যবিশারদের সাহিত্যদৃষ্টি সর্ববঙ্গীয়, সম্পূর্ণ সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, উদার বাঙালির মন ও মনোভাব যে রকম। তাঁর আবিষ্কারই মুসলমানদের হীনম্মন্যতা দূর করেছে। ওই যুক্ত সাধনাই প্রণোদিত করেছে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ভাইপো ও দত্তকপুত্র আহমদ শরীফকে বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য নামের দুই খণ্ডে পূর্ণ সর্ববাঙালির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-গ্রন্থ রচনা করতে। এ রকম একটি ইতিহাস রচনার আজীবন স্বপ্ন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদেরও ছিল। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি তা করতে পারেননি। এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁরই স্নেহাষ্পদ আহমদ শরীফ। এ-বৃত্তান্ত আহমদ শরীফ তাঁর বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য ইতিহাস গ্রন্থের ভূমিকায় জানিয়েছেন।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সভায় যত মূল্যবান অভিভাষণ দিয়েছেন, সবগুলোতেই বাঙালি মুসলমানের বাংলা সাহিত্য সাধনার দিকটিই সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন, আর কণ্ঠের বাণী নিঃসৃত করেছেন লেখায়—এই কথা আরও গুরুত্ব দিয়ে উচ্চারণ করে যে, বাঙালি মুসলমানের ভাষা বাংলা। যে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হলো, জাতিসত্তা গড়ে উঠল, সেটি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের আগে আর কেউ বলেননি। সুতরাং এটা তো নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত জাতীয় মানস সৃষ্টির তিনিই প্রথম আধুনিক রূপকার।
একদা আবদুল করিমের পুঁথি-সাধনা মডার্নদের নাক সিটকানোর ব্যাপার ছিল। এখন তাদের কী মনোভাব জানি না। তবে সব বাংলাভাষীর জানা উচিত, তাঁর সংগৃহীত পুঁথি অবলম্বনে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, হিন্দিভাষী ভারতের পণ্ডিত ও গবেষকেরা পিএইচডি গবেষণা করেছেন ও করছেন, গুরুতর আলোচনা লিখছেন, আরও আগ্রহী হচ্ছেন তাঁর সংগৃহীত পুঁথির ব্যাপারে। বিদেশিরা অনুরাগী ঐতিহ্যের অন্বেষণে, আর আমরা স্বদেশিরা আনন্দ পাই বিসর্জনে।
বাঙালি মুসলমান এমনিতেই অধঃপতিত সম্প্রদায়। এদেরকে আবদুল করিম আত্মচেতনার উপকরণ দিয়েছেন। দেশধ্যানের এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এত বড় একনিষ্ঠ প্রেমিকই তো ‘পুঁথি-মালঞ্চের মালাকর’। বাংলাদেশ যদি কোনো দিন কাউকে ‘বাংলারত্ন’ খেতাব দিতে চায়, তার প্রথম দাবিদার হবেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ; তার পর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
আহমদ কবির: প্রাবন্ধিক; সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।