
‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ...’ যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা ছড়া জপতে জপতে এখন কি আর কেউ বাজারের পথ ধরে?
উদ্যমী অনেক তরুণের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে আমাদের বাজারসদাই করার রীতি। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ই-কমার্স। অনলাইনে এখন অনেকে নানা রকম শৌখিন পণ্য তো কিনছেনই, এমনকি কাঁচাবাজারও সেরে ফেলছেন। আর এই অভ্যাস দ্রুত বাড়ছে। না বাড়ার কোনো কারণ নেই। এক ক্লিকে যদি চাল-ডাল, টাটকা মাছ এসে হাজির হয় দোরগোড়ায়, বাজারের ধুলো কাদা কে আর মাখতে যাবে?
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে মোজাম্মেল হোসেন সপ্তাহে ছয় দিন অফিস করেন। দুই সপ্তাহ ধরে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কাঁচাবাজার সারছেন। তাতে শুক্রবার ছুটির দিনটায় বাজারে যাওয়ার চাপ নেই। সারা সপ্তাহ টাটকা সবজি মিলছে। খরচও বেশি নয়।
ঈদ, পূজা, নববর্ষ, পয়লা বৈশাখ—উৎসবগুলো ঘিরে অনলাইনে চলে মৌসুমি বিকিকিনি। শীত জেঁকে বসার আগেই ফেসবুকে নানান ডিজাইনের জ্যাকেট, হুডির প্রচারণা। রং, মাপ, দাম, কাপড়ের ধরন ঘরে বসেই সব যাচাই-বাছাই করে নেওয়া যায়। অর্ডার করলে পছন্দের পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দরজায়।
অনলাইন সুপারশপ ‘চাল ডাল ডট-কম’-এর ওয়েব সাইটে প্রতিদিন গড়ে চার শ চাহিদা আসে। মুঠোফোনেও অ্যাপের মাধ্যমে চাহিদা পেশ করা যায়। এক ঘণ্টার মধ্যে পণ্য সরবরাহ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান রনি জানালেন, বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁদের সরাসরি যোগাযোগের কারণে বাজারমূল্যের চেয়েও কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারেন তাঁরা। তাঁদের এই সেবা ঢাকার বাইরে পৌঁছে বিস্তৃত করার প্রক্রিয়া চলছে।
অনলাইন শপিং মল ‘আজকের ডিল ডট-কম’ সারা দেশেই সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ফাহিম মাশরুর জানালেন, তাঁদের শতকরা ৬০ ভাগ অর্ডার আসে ঢাকার বাইরে থেকে। ঢাকার ভেতরে সরবরাহ মাশুল ১০ টাকা আর ঢাকার বাইরে ৫০ টাকা। ফাহিম জানান, মোবাইল, জামাকাপড়, ঘড়ি, পর্দা, চাদর, ইলেকট্রনিক সামগ্রীসহ এক লাখেরও বেশি পণ্য তাঁদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কেনার সুযোগ আছে। ঢাকার ভেতরে দুই দিন আর ঢাকার বাইরে তিন দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করেন তাঁরা। ক্রেতার যদি পণ্য পছন্দ না হয়, তাহলে বদলে নেওয়ার সুযোগও আছে।
ই-শপিংয়ের দরজা খুলে যাওয়ায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা নামছেন বিপণন খাতে। অনেকে বয়সে এত তরুণ, এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিই পার হননি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বন্ধু জান্নাতুল ফেরদৌস ও এস এম নাইমুল ইসলাম ফেসবুকে ‘ড্রেস হ্যাভেন’ নামে একটি পেজ চালু করেছিলেন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়। এখন সপ্তাহে গড়ে ১৫ থেকে ২০টি অর্ডার পাচ্ছেন। ঈদের মৌসুমে সেটি ১০০ ছাড়িয়ে যায়। জান্নাতুল বলছিলেন, ‘বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক আমরা তৈরি করি। ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করি, সেখানেই অর্ডার আসে। বেশির ভাগ ক্রেতাই প্রবাসী বাঙালি। ঢাকার ভেতরে সরবরাহ মাশুল নেই। ঢাকার বাইরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাশুল দিতে হয়।’
অনলাইন কেনাকাটায় ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি রাজিব আহমেদ অবশ্য মনে করেন, এটা সবে শুরু। এখনো জনসংখ্যার তুলনায় অনলাইন ক্রেতার হার শতকরা এক ভাগও না। বাংলাদেশে ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। সেভাবে দেখলে এই খাতে একটা জোয়ার আসার অপেক্ষা মাত্র।