বাঙালির বহুভাষা চর্চা

পড়াশোনা ও চাকরির উদ্দেশ্যে বহু শিক্ষার্থী এখন নানা রকম ভাষা শিখছে। ছবি: প্রথম আলো
পড়াশোনা ও চাকরির উদ্দেশ্যে বহু শিক্ষার্থী এখন নানা রকম ভাষা শিখছে। ছবি: প্রথম আলো

সপ্তদশ শতকে এক ইংরেজ সাহেব কলকাতা বন্দরে নেমে এক দোভাষীর খোঁজ করলে লোকজন ভুল বুঝে এক ধোপাকে নিয়ে এসেছিল। সে যুগে দোভাষীদের সার্টিফিকেটে নাকি লেখা থাকত: ‘প্রত্যয়ন করা যাইতেছে যে শ্রীমান অমুক বিশটি ইঙ্গরাজি শব্দ বলিতে পারেন।’
গঙ্গা ও বুড়িগঙ্গা দিয়ে এরপর অনেক জল ও পানি গড়িয়েছে। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফরাসি ভাষা কোর্স চালু হওয়ার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাশিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয়। এরপর একে একে চালু হয় চীনা (১৯৪৯), জার্মান (১৯৫৫), তুর্কি ও রুশ (১৯৬৫), জাপানি (১৯৭৪), আরবি ও ফারসি (১৯৭৫) ভাষা কোর্স। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদেশি ভাষা শিক্ষা বিভাগ, যেটি ১৯৭৪ সালে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়। বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান, চীনা, তুর্কি, ফারসি, আরবি, রুশ, স্পেনিশ ও ইতালিয়ান—এই ১৩টি ভাষায় বর্তমানে ইনস্টিটিউটের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। এ ছাড়া বিভিন্ন ভাষায় ৬০ ঘণ্টার স্বল্পমেয়াদি কোর্স আছে বছরে ৩০টির মতো, যেগুলোয় ভর্তি হয় আরও হাজার খানেক শিক্ষার্থী। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধীনে স্পেনিশ ভাষা শিক্ষা দিচ্ছে ‘ইন্ডিটেক্স’ নামক এক স্পেনিশ প্রতিষ্ঠান এবং চীনা ভাষা শিক্ষা দিচ্ছে ‘কনফুসিয়াস সেন্টার’।
রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দশক ধরে বিদেশি ভাষা শেখানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছে বা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ফরাসি, গ্যোটে ইনস্টিটিউটে জার্মান ও ব্রিটিশ কাউন্সিলে ইংরেজি ভাষা শেখানো হয়। ব্র্যাক, গণবিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে বিদেশি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা আছে।
ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কোনো ভাষায় শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়তে-কমতে পারে। নব্বইয়ের দশকে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে চীনা ভাষায় ছাত্রসংখ্যা খুব কম ছিল। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩১৭ জন। সত্তরের দশকে অনেক শিক্ষার্থী রুশ ভাষায় ভর্তি হতো। ২০১৫ সালে রুশের শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে হয়েছে মাত্র ১৪ জন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থা থাকাটা ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কেন বর্মি, নেপালি, পশতু, মালয়, হিন্দি ও তামিল ভাষা জানা দোভাষী-অনুবাদক এবং এসব ভাষা ও সংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ থাকবে না? বাংলাদেশে ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, স্পেন ইত্যাদি দেশের রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞও খুব কমই আছে। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফরাসি ভাষার বিএ অনার্সের মতো শিক্ষাক্রম এ ঘাটতি পূরণে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যাতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ও অন্যত্র ডিগ্রিপ্রাপ্ত ভাষাশিক্ষার্থীরা সারা দেশের এক হাজার স্কুল ও কলেজশিক্ষককে ইংরেজি, ফরাসি, স্পেনিশ, জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান, রুশ, আরবি ও চীনা—এই নয়টি ভাষা শিক্ষা দেবে। ভাষা প্রশিক্ষণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে ওই শিক্ষকেরা ভাষা শেখাবেন ৬৪ জেলায় তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত এই শিক্ষকেরা নিজেরা স্বল্পসময়ে কতটা ভাষা শিখে উঠতে পারবেন এবং তাঁদের কাছ থেকে তৃণমূলের শিক্ষার্থীরাই-বা কতটা ভাষা শিখতে পারবেন, এ-জাতীয় প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবু বরফ যে গলছে, অর্থাৎ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যে মানবসম্পদ উন্নয়নে ভাষাশিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন, সে ব্যাপারটা ইতিবাচক।
যেকোনো ভাষায় সাধারণ কথোপকথনের সামর্থ্য অর্জনের জন্য ভাষাশিক্ষকের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে কমবেশি ২০০ যোগাযোগ-ঘণ্টা অতিবাহিত করাকে যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়। তাহলে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় হাজার ঘণ্টা ইংরেজি শেখা সত্ত্বেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইংরেজি বলতে পারে না কেন? চীন ও জাপানে ইংরেজি ভাষা শিক্ষণে প্রচুর বিনিয়োগ করার পরও কেন প্রার্থিত ফল আসেনি? অথচ হল্যান্ড ও জার্মানিতে নিছক স্কুলপর্যায়ে শিখেই সাধারণ জনগণ কেন ভালো ইংরেজি বলতে পারে? ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজির মান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় উন্নত কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ইংরেজি অংশে ভর্তি-ইচ্ছুকেরা কেন হাস্যকরভাবে খারাপ করে? ভাষা পরিকল্পনাকারী ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে তারপর ভাষাশিক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের অর্থের সাশ্রয় হবে।
সারা দেশের ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। অনেক শিক্ষার্থী একাধিক ভাষাও শিখে থাকে। সাধারণ কথাবার্তা বলার মতো ভাষাজ্ঞান অর্জনের পর শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের নানা দেশে। সবই ইতিবাচক খবর, সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও তো সত্য যে প্রতিটি ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর শ্রেণিগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা এককের কোঠায়। এর প্রথম কারণ প্রণোদনার অভাব। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এযাবৎ অনুবাদক বা দোভাষীর মতো পেশাগুলোর কোনো চাহিদা সৃষ্টি করা হয়নি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে সাহিত্যকর্ম ও পাঠ্যবই অনুবাদ করানোর জন্য বাংলা একাডেমিকে অর্থ ও লোকবল সরবরাহের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলা একাডেমি যদি গত ছয় দশকে এই উদ্যোগ নিত, তবে ইতিমধ্যে দেশে অনুবাদকের চাহিদা সৃষ্টি হতো। দ্বিতীয় কারণ, কোনো ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য যে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ ও সময় দেওয়া আবশ্যক, খুব কম বাঙালি শিক্ষার্থীই তা দিতে আগ্রহী। তৃতীয় কারণ, অর্জিত ভাষাকে পঠন, শ্রবণ, দর্শন ও কথোপকথনের মাধ্যমে চর্চা ও লালন করতে হয়, যা করার মতো অবসর ও আগ্রহ বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর নেই। এসব কারণে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাষাশিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে পেশাদার অনুবাদক ও দোভাষী নেই বললেই চলে।
ভাষাজ্ঞান একটি শক্তি। অনেক ক্ষেত্রে শুধু ইংরেজি জানার বদৌলতে ভারত, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার লোকেরা কর্মক্ষেত্রে সুপারভাইজার হয়, আর ইংরেজি না জানার কারণে বাংলাদেশিরা হয় অদক্ষ শ্রমিক। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইংরেজির ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ব্যাকরণে বিনিয়োগ করতে হবে। সংস্কৃত ব্যাকরণের সনাতন পদ্ধতি পরিত্যাগ করে আধুনিক পদ্ধতিতে ইংরেজি ও বাংলা ভাষার কাঠামোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, কারণ যেকোনো একটি মানবভাষার কাঠামো ঠিকমতো জানলে অন্য সব ভাষার কাঠামো বোঝা সহজ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো ভাষানীতি আছে বলে মনে হয় না। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে ভাষাশিক্ষা বা শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। বর্তমানে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি—এই তিনটি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সংবিধানের নির্দেশ মেনে প্রমিত বাংলাই সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে কি না। সেটা যদি অসম্ভব হয়, তবে তা অবিলম্বে স্বীকার করে নিয়ে কোন ভাষাটি কোন স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা ঠিক করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলো আদৌ শিক্ষার মাধ্যম হতে পারবে কি না, বা কোন স্তর পর্যন্ত সে ভাষাগুলোকে শিক্ষার মাধ্যম রাখা যাবে—ভাষা পরিকল্পনার জন্য এগুলো জরুরি কিছু প্রশ্ন।
প্রান্তিক এলাকার মানুষকে বিদেশি ভাষা শিক্ষার সুযোগ দিতে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, গ্যোটে ইনস্টিটিউট ও কনফুসিয়াস সেন্টারের মতো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে বিভাগীয় পর্যায়ে শাখা খোলার প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট গঠনের বিকল্প নেই। মাদ্রাসাগুলোকে আধুনিক ও কথ্য আরবি শেখানোর কাজে ব্যবহার করা গেলে ভালো হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান অর্ধশতকেরও বেশি সময় যাবৎ বিদেশি ভাষা শিক্ষণ ও গবেষণার দায়িত্ব পালন করে আসছে, সেগুলোকে উপেক্ষা করে ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে ‘বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং তৎসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা’র দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে।
গত ৩০০ বছরে ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতির কারণে দোভাষীর সঙ্গে ধোপাকে গুলিয়ে ফেলার মতো বাঙালি হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কালোপযোগী ভাষানীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগ না করা গেলে এবং নীতিনির্ধারক ও প্রকৃত পেশাদারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার সংস্কৃতির অবসান না হলে ভাষাশিক্ষার সুফল ঘরে তুলতে বাঙালি জাতির আরও বহু যুগ লেগে যাবে।
শিশির ভট্টাচার্য্য: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়