
দিনটি ছিল সোনাঝরা। বহুদিনের একটানা বৃষ্টির পর যখন গনগনে সূর্য দেখা দিল মহাকাশে, সত্যি সত্যি স্বর্ণ ঝরে পড়তে লাগল আকাশ থেকে—এত দিন যেমন পানির ফোঁটা ঝরে চারদিক টলমলে হয়ে উঠেছিল আর কিছু মানুষ তাদের ভাগ্যকে অভিসম্পাত করেছিল নিজের জন্ম বা জন্মস্থানের ভাসমান অবস্থার জন্য, বহুকালের সঞ্চিত দুর্বল নিত্যপ্রয়োজনীয় কুড়িয়ে পাওয়া গৃহস্থালির সামগ্রী বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার জন্য। সেদিনটি হঠাৎই খটমটে শুকনো। রাতারাতি এত দিনের জমা সব জল উধাও ঢাকা শহর থেকে। ঢাকা শহরের মানুষেরা—যারা খুব ভোরে, প্রায় অন্ধকার থাকতেই কাজে বেরিয়ে পড়ে—তাদের চোখে সেদিনই প্রথম ধরা পড়ে বিষয়টি। সূর্য পুরোপুরি দেখা দেওয়ার পরপর কুলি-মজুর, রিকশাওয়ালা—অনেকেই দেখেছিল হলুদ চকচকে কী যেন ওপর থেকে ভেসে ভেসে মাটিতে পড়ছে। প্রথমে মানুষগুলো ভেবেছিল, যেভাবে ঢাকা শহর সিগারেটের নেশায় মত্ত (অন্য হাজারো নিষিদ্ধ নেশার সঙ্গে), হয়তো কেউ সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরের সোনালি রাংতা কাগজ টুকরো করে ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে মজা দেখছে। কিন্তু বিষয়টা যে তা নয়, একটু পরই পরিষ্কার হয়ে গেল। বস্তুগুলো সাধারণ কাগজ নয়, তা অসাধারণ-সত্যিকারের স্বর্ণখণ্ড। ঢাকা শহরের মানুষের ভেতরে মহামারির মতো কথাটা ছড়িয়ে যেতে মিনিট খানেক সময় লাগল। ফেসবুকে স্ট্যাটাস আর ছবি আপলোড হতে লাগল; হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ট্যাংগো—কিছুই বাদ পড়ল না। তবে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো কোনো ব্রেকিং নিউজ প্রকাশ করতে পারল না। তারা তাদের চ্যানেল বন্ধ ঘোষণা করল। কারণ, তারাও স্বর্ণ কুড়ানোয় ব্যস্ত। ঢাকা শহরে মৃত্যুকূপের মতো ট্রাফিক জ্যামও নেই যানবাহনের; বিপরীতে আছে মানুষের ভয়ংকর ভিড়। কারও চেহারা বোঝার উপায় নেই। শুধু থকথক করছে অগুনতি মানুষের কালো কালো মাথা। শহরের স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত কিছুই চলল না সেদিন। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই খোলা আকাশের নিচে চাতক পাখির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে স্বর্ণ লুফে লুফে নিচ্ছে। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ ভাবছিল, ঘটনা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন বা অবচেতনের কোনো অজানা খেলা? কিন্তু না। এ সত্য। সবই সত্য। তবে অসহিষ্ণু মানুষেরা ইতিমধ্যেই পাশের মানুষগুলোকে শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। ধাক্কাধাক্কি, কনুইয়ের গুঁতো, পা দিয়ে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে বাধাগ্রস্ত করার নানা চেষ্টাচরিত্র চলছে এদের মধ্যে।
বাইরের হইচইয়ে শামিমের ঘুম ভেঙে গেছে। আজ কলেজে তার ক্লাস নেই। ভেবেছিল অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে কাটাবে আলস্যে। কিন্তু হলো না। রেণুকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, স্বর্ণবৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে সবাই স্বর্ণ নিয়ে গোলমাল করছে। ঠিক বুঝতে না পেরে শামিম তার সাত মাস বয়সী ঘুমন্ত কন্যার দুপাশে বালিশ দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস না হলেও বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো সে। শুধু তা-ই নয়, সে দেখল ঘটনার আকস্মিকতায় সে রূপান্তরিত হয়েছে পাথরের মূর্তিতে। নড়তে পারছে না। হাঁ করে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। যত দূর চোখ যায় কেবল স্বর্ণখণ্ড ঝরছে। মানুষের হাত উপচে উঠেছে। কেউ হাঁড়ি, কেউ গামলা, কেউ–বা বড় চাদর—যার যা খালি পাত্র, তাই নিয়েই হাজির এবং চারপাশে প্রচণ্ড চিত্কার-চেঁচামেচি।
শামিম দেখল, পাশের বাড়ির মহসীন চাচা, যাঁর ৯৬তম জন্মদিন পালন করা হয়েছে গত পরশু এবং যিনি ছিলেন পুরোপুরি শয্যাশায়ী, তিনিও নিজের গায়ের শাল খুলে কিছু স্বর্ণ লুফে নিলেন। যারা পথচারী, তাদের ভেতরে যাদের মাথায় ক্যাপ বা হ্যাট ছিল, তারা সেসবের সদ্ব্যবহার করল। তাদের মনে হলো, এই জিনিসগুলো যে কত বড় সহায় হতে পারে, আজকের আগে বোঝা যায়নি। অবশ্য অনেকের পোশাকের পকেটগুলোও বেশ বড়সড়। সেখানেও তারা পুরতে পারল অনেকগুলো করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যুবতী মেয়েদের খোলামেলা বিলবোর্ড দেখে দেখে ঢাকার মানুষদের চোখের আকার এখন আগের চেয়ে বড়। জীবনটাকে যখন অর্থহীন মনে হয়, তখন তারা ওই সব বিলবোর্ডের নারী ও পুরুষদের পুলকিত অঙ্গভঙ্গির দিকে তাকিয়ে জীবনের গূঢ় অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে। চোখ দিয়ে তারা ওই বিলবোর্ড-রাজ্যের ভেতরে প্রবেশ করে, তারপর...অপেক্ষা করে আরও আধুনিকতার জন্য। মনে মনে ভাবে, দেশটা বেশ এগিয়েছে। কারণ, মেয়েদের গায়ে কাপড়ের পরিমাণ কমছে। ভালো লক্ষণ। মেয়েদের গায়ের কাপড় যত কমছে, তার অর্থ দেশ উন্নতির দিকে এগোচ্ছে। তারা এ দেশে চূড়ান্ত উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে। এ-ও ভাবে, মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারবে তো! সেই বড় বড় চোখ লোভে, স্বর্ণের চেয়েও অনেক বেশি চকচক করতে থাকে সোনাঝরা দিনে।
শামিম দেখল তাদের বাড়িওয়ালার স্ত্রী, যিনি সচরাচর পরপুরুষের সামনে যান না, তিনিও আঁচল বাড়িয়ে স্বর্ণ ভরছেন। এ এলাকার রক্ষক-ভক্ষক, ছোট চোর-বড় চোর, সাধু-অসাধু এমনকি ছোট ধনী বা বিশাল ধনী—সবাই তাদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছে।
শামিম ভাবছিল, কী করবে তারা এই বস্তু দিয়ে? বিক্রি করবে? প্রচুর টাকার মালিক হবে? পুরো দেশটা কিনতে চায় তারা সবাই, নাকি পুরো পৃথিবীটাই তারা হাতের মুঠোয় পুরতে চায়, যেখান থেকে একবিন্দুও অন্য কাউকে দেওয়ার নয়—না-পিতাকে, না-পুত্রকে।
শামিম ভাবছিল, তারা কি প্রেম কিনতে পারবে? নাকি পৃথিবী কেনার আকাঙ্ক্ষায় মানুষ মহৎ প্রেম বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করে না? তার মানে এদের জীবনে অর্থই নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত করে সম্পর্কের বন্ধন! শামিম তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরও ভাবছিল, এ শহরের মানুষের এত লোভ? শিক্ষা, কর্ম, নৈতিকতা, বাত্সল্য, ধর্ম, দর্শন—সবকিছু মানুষ বিসর্জন দিল আজ? এর মধ্যে জানা গেল, স্বর্ণের ভাগাভাগি নিয়ে কোথাও কোথাও মারামারি, সংঘর্ষ, রক্তপাত এমনকি খুনোখুনিও চলছে। সন্তানের মৃতদেহ টপকে পিতা স্বর্ণ ভরছে তার থলের ভেতরে, আবার কোথাও মায়ের শ্বাসরোধ করে সন্তান স্বর্ণ-উল্লাস করছে। সোনাঝরা দিনে সবাই যেন সম্পর্কের পরিসীমার ঊর্ধ্বে, নিজের অনুভূতির ঊর্ধ্বে।
দুপুর ১২টার দিকে স্বর্ণখণ্ডের পরিমাণ বাড়তে লাগল। সকালের দিকে চারপাশটা মোটামুটি পরিষ্কার ছিল। স্বর্ণগুলো অপরূপ ঝলকানি দিচ্ছিল। এখন সূর্য মাথার ওপর। শামিম দেখল, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। স্বর্ণের ওপর প্রখর সূর্যালোকের ঝলকানিতে তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আর দু-একটা যখন তার বারান্দায় এসে পড়তে লাগল—শামিমের পায়ের পাতায়ও একটা পড়ল, যেমন বর্ষায় শিল পড়ে—সোনালি সেই ধাতুর তাপে চমকে উঠল শামিম। সে ভাবছিল, সূর্য যদি আগুনের বৃহদাকার গোলা হয়, তবে স্বর্ণ কি সূর্যের সন্তান? ওর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যটাকে তো আগুন নয়, স্বর্ণের একটা চাকতির মতো দেখাচ্ছে। আবার উল্টো করে ভেবেও ভয়ে শিহরিত হলো শামিম। সূর্যই যদি স্বর্ণের উত্স হবে, তবে তো স্বর্ণের ভেতর নিভৃতে লুকিয়ে আছে মানুষকে নিমেষে ঝলসে ছাই করে দেওয়ার উপাদান—অগ্নি।
রেণু বারান্দার দরজা ফাঁক করে শামিমকে একবার ডাকল।
‘দেখো তো আমের আচারে চিনি লাগবে কি না?’
শামিম দেখল, রেণু একবারও তাকাল না স্বর্ণবৃষ্টির দিকে। ও নিয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে মহা আনন্দে আজ দশ কেজি কাঁচা আম আর তেঁতুল মিশিয়ে শামিমের জন্য মিষ্টি আচার তৈরি করছে। শামিমের এই এক অভ্যাস। আচার ছাড়া ভাত খেতে পারে না। তাই রেণু পরম যত্নে আর আদরে সারা বছর আম-কুল-তেঁতুল-জলপাই—নানা ফলের নানা স্বাদের আচার তৈরি করে বাড়ি ভরিয়ে ফেলে। তবে গত বছর জলপাইয়ের সিজনে সে বেশি আচার বানাতে পারেনি। জলপাইয়ের ভরা মৌসুমে জন্মেছে তাদের প্রথম সন্তান। সে সময় শামিম আর রেণু সারা রাত জাগত। জেগে থেকে তারা তাকিয়ে থাকত তাদের মেয়ের দিকে—তাকিয়ে থাকত বিস্ময়ে। কী আশ্চর্য পৃথিবীর খেলা! মানুষের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তার কী অপরূপ সব আয়োজন! দর্শনের ছাত্র শামিম এসব কথা বুঝতে পেরেছিল অল্প বয়সেই। পৃথিবীটাকে সে একটা প্লেগ্রাউন্ড হিসেবে আবিষ্কার করেছিল। খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় তাকে কীভাবে অপার আনন্দ দেওয়ার জন্য তৈরি, সেগুলো খুঁজত সে। যেমন বুনো গাছের ঘ্রাণ, সন্ধের কনে দেখা আলো অথবা হাতির আকারের মেঘ, তরমুজের লাল, হাওয়ার শব্দ ইত্যাদি। রেণুর সঙ্গে তার বিয়ের ঘটনাটাও মজার। তার বান্ধবীদের একদিন সে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘বলো তো পাতা নড়ে কেন?’
মনে মনে ঠিক করল, এদের ভেতরে যে তার মনের মতো উত্তর দেবে, সে তাকেই বিয়ে করবে। মিতা বলল, ‘বাতাসের জন্য।’ জয়া বলল, ‘কারণ গাছের প্রাণ আছে।’ আর রেণু বলল, ‘কারণ সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন পাতার দোলা মানুষের মনে যেন আনন্দের দোলা দিয়ে যায়।’
বিয়ে হয়ে গেল রেণু আর শামিমের। শামিমের মায়ের পুরোনো একটা স্বর্ণের টিকলি দিয়েই বিয়ে হলো। খুবই হালকা টিকলি। আট রতি সোনাও আছে কি না সন্দেহ। একাত্তরে ঘর ছেড়ে পালানোর সময় শুধু টিকলিটা কী করে যেন হারায়নি। বিয়ের পর রেণুকে আর কখনো সেটা পরতে দেখেনি শামিম। যত্ন করে সে ওটা ফ্রেম করে শাশুড়ির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেয়ালে সাজিয়ে রেখেছে। শামিম কলেজশিক্ষক। অতি সামান্য তার বেতন। কিন্তু কী এক অসামান্য সুখ আছে তার ঘরের ভেতরে। একবার এসে ঢুকলে আর বেরোতে ইচ্ছে করে না।
মানুষ বলে, বিবাহিত জীবনে ‘প্রেম’ শব্দটির অস্তিত্ব নেই, কেবল আছে বিশ্বাস-নির্ভরতা। কিন্তু শামিম আর রেণু এখনো অপলক তাকিয়ে থাকতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুজনের দিকে। এখনো শামিমের সামান্য স্পর্শে রেণু আনন্দে কেঁপে ওঠে। শামিম জানে, রেণু আজ স্বর্ণবৃষ্টি দেখে ভীষণ আফসোস করছে, মনে মনে ভাবছে, আহা স্বর্ণবৃষ্টি না হয়ে যদি জলবৃষ্টি হতো আজ, অঝোরধারায় বৃষ্টি পড়ত! তবে রেণু নির্ঘাত একটা লাল শাড়ি গায়ে দিয়ে শামিমের হাত ধরে কৃষ্ণচূড়ার মতো ভিজত। জীবনের সৌন্দর্যে আর আয়োজনে রেণুর চোখের জলে মাখামাখি হতো বৃষ্টির জল।
শামিম একবার ভাবল, আজ আক্ষরিক অর্থেই সোনাঝরা দিন। কিন্তু ‘সোনাঝরা দিন’ ছিল সেদিন, যেদিন তাদের কন্যার জন্ম হয়েছিল। যদিও গভীর রাতে তার জন্ম, তবু আমরা তো বিমূর্ত অর্থেই কথাটি উচ্চারণ করি।
শামিম আরও ভাবল, কিছু কথা ‘মূর্ত’ হতে নেই। ‘বিমূর্ত’ই সুন্দর। অনেকটা বিমূর্ত শিল্পের মতো।
তবে সবচেয়ে সুন্দর শিল্প তো মানুষ।
আর মানুষ তার সৌন্দর্য আহরণ করে প্রকৃতি থেকে। যে মানুষ প্রকৃতি থেকে যত বিচ্ছিন্ন, সে তত অসুন্দর। গায়ে গা ঘেঁষে থাকা ইট-কাঠ-পাথরের নতুন-পুরোনো অযত্নে ছড়ানো দালানের ঢাকা শহরের মানুষগুলো তাই হয়তো এত অসুন্দর। প্রকৃতি তাদের কাছে মাছির মতোই অপ্রয়োজনীয়। অন্তরের মালিন্য পচন ধরিয়েছে তাদের সমস্ত সত্তায়। এদের অনেকেই এখন আর মানুষ নেই—নিত্যনতুন কায়দায় শিশুহত্যা তাদের কাছে আনন্দযজ্ঞ।
শামিমের বারান্দার গাছে একটা-দুটো করে বেলি ফুল ফুটতে শুরু করেছে। সন্ধ্যাবেলার চায়ের কাপে সে আর রেণু টাটকা বেলি ফুল ছেড়ে দেয় স্বর্গীয় ঘ্রাণের জন্য। অনেকক্ষণ ধরে তারা তাদের কন্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে ও চা খায়। কখনোবা জীবনানন্দের কবিতার পঙ্ক্তিগুলো দুজন মিলে ঝালাই করে নেয় অথবা কখনো ছয় শ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের গ্রিক মিলেশিয়াস দার্শনিকদের কৃতজ্ঞতা জানায়, যাঁরা পৃথিবীতে প্রথম দর্শন নিয়ে ভেবেছিলেন। আবার কোনো কোনো রাতে তারা দুজন প্রবল বিষাদগ্রস্ত হয়ে হাহাকার করে যখন ভাবে, আজ ঢাকা শহরের মানুষেরা দর্শনশূন্য সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে; তখন সন্ধ্যার চায়ের বেলি ফুলের সুঘ্রাণ তাদের মস্তিষ্কে আর অনুরণন ঘটায় না। তারা আবারও তাদের শিশুকন্যার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, খুব দ্রুতই ওর ভেতরে মানবতা আর সুন্দরের বীজ বুনে চাষাবাদ শুরু করতে হবে। অনেক সাধনা আর পরিশ্রমের কাজ সেটা। শামিম আর রেণু নিজেদের সে জন্য প্রস্তুত করতে থাকে।
শামিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না বারান্দায়। স্বর্ণলালসায় দলাদলি থেকে গোলাগুলি আর রক্তারক্তি শুরু হয়ে গেছে প্রবলভাবে। শামিম ভাবতেও পারেনি ঢাকা শহরে এত মানুষের কাছে অস্ত্র থাকতে পারে! হলিউডের কোনো সিনেমাতেও সে এত আধুনিক অস্ত্র কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ে না। পুরো দৃশ্যটা তার কাছে অনেকটা ইনিড মহাকাব্যে ভার্জিলের যুদ্ধদৃশ্য বর্ণনার মতো মনে হতে লাগল।
যখন সে দেখল এক রমণী তার সদ্যোজাত শিশুর কান্নায় বিরক্ত হয়ে তাকে পথের পাশে ছুড়ে ফেলে স্বর্ণের দিকে ছুটে গেল আর জনগণের পায়ের নিচে দলে শিশুটি পিষ্ট হলো নিমেষে—সত্যি শামিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। ঘরে এসে তার শিশুকন্যাকে জড়িয়ে কেঁদে চলল অবিরাম। তার সঙ্গে কাঁদল রেণুও। বহুদিন মুখ দিয়ে তারা কোনো শব্দ করেনি, বাক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর ঢাকা শহরের উন্মাদ বাসিন্দারা সেই সোনাঝরা দিনের মাঝদুপুরের পর যারা বেঁচে ছিল, স্বর্ণের ওপর সূর্যালোকের প্রতিফলনে এক দুর্দমনীয় ছটা তাদের চক্ষুগোলকে আঘাত হানল, বহুদূর থেকে সবেগে ছুটে আসা তীরের ফলার মতন। স্বর্ণখণ্ডগুলোও উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে আগুনের ফুলকির মতন। শরীরের যেখানে লাগছে ঝলসে যাচ্ছে, তবু তাদের ক্লান্তি নেই। ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ কেউ অবশ্য ঢলে পড়তে লাগল রক্তভেজা মাটিতে। আর কোনো দিন উঠতে পারল না।
বিকেলে শামিম জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল স্বর্ণবৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। উদ্ভ্রান্ত স্বর্ণ-উন্মাদ লোকগুলো এবার ছুটছে নিজেদের আস্তানার দিকে। কিন্তু তারা কেউ পৌঁছাতে পারল না। স্বল্পবসনা রমণীদের বিলবোর্ড দেখা বিশাল আকার চোখগুলো এখন কেবলই সবকিছু ঝাপসা দেখছে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা এক হাত দূরের বস্তুকেও ঠাওর করতে পারল না। তারপর...দৃষ্টির সীমারেখা এসে পৌঁছাল শূন্যের কোঠায়। পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের স্পর্শানুভূতি হলো প্রবল। তাপিত স্বর্ণখণ্ডের স্পর্শে ঝলসে যাওয়া দেহাংশে সীমাহীন ব্যথা আর সংক্রমণ শুরু হলে নগরের বিবেকবিসর্জিত মানুষেরা প্রাণপণে চিত্কার করতে লাগল। পোড়া দেহ তাদের নরকযন্ত্রণার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, যা তারা নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে পড়েছিল বা লোকমুখে শুনেছিল। তারা ভাবছিল, তবে কি যা ঘটছে এখন তা মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাবলি? কিন্তু না। তা নয়। এ সত্য। এ বাস্তব। মিলেশিয়াস দার্শনিকেরা যে বৃহৎ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন—নরকযন্ত্রণায় আর্তচিত্কার করতে করতে ঢাকার মানুষেরাও সেই প্রশ্ন ছুড়ল অস্তগামী স্বর্ণবর্ণের সূর্যের কাছে—বাস্তব তবে কী? কী দিয়ে সে তৈরি?
বড় দেরি হয়ে গেছে। তারা উত্তর পেল না। উত্তর দেওয়ার মতন কেউ তো নেই। সবাই প্রশ্নকর্তা।
শামিম যখন দুহাতে চাপা কান খুলে চারপাশের আর্তনাদের অস্তিত্ব সন্ধান করছিল—শুনতে পেল না কোনো শব্দ—যা অক্ষরে অক্ষরে মিলিত হয়ে তৈরি হয়। অদ্ভুত ধ্বনি কানে বাজল তার। তাদের শিশুকন্যাটি চমকে উঠে কাঁদতে শুরু করলে রেণু তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। শামিম আবারও বারান্দার যে পাশে গন্ধরাজ সগৌরবে ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে, সে পাশে এসে দাঁড়াল। মরুভূমিতে বোধ হয় এমনই হাড়পোড়া দাবদাহ। বাতাসে লু হাওয়া ছুটছে। তবু শামিমের পুরো শরীর ঠান্ডা হিম হয়ে এল। ভয়ে কাঁপতে লাগল ঠকঠক করে। যে অদ্ভুত ধ্বনির উত্স সন্ধানে সে বাইরে এসেছিল, তা আসছে ঢাকা শহরের স্বর্ণভুক বাসিন্দাদের যন্ত্রণাদগ্ধ কণ্ঠ অথবা মস্তিষ্ক থেকে; কিংবা এ তাদের হৃদয়ের ধ্বনি, যে হৃদয় নিয়ে জন্মেছিল তারা। তারপর কত শত বিচ্যুতি তাদের সে শুদ্ধ হৃদয়কে বদলে দিয়েছিল।
শামিম বুঝল না কেন তারা প্রায় নিথর। কেন এত হাহুতাশ করছে। আজ তারা তো পেল অনেক, যা প্রয়োজন তার চেয়েও লাখোকোটি গুণ বেশি। তাদের তো এখন উল্লাসের সময়। তবে?
ঢাকা শহরের পাপবিদ্ধ মানুষেরা সেই সত্যিকারের সোনাঝরা দিনের পর থেকে সবাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শামিম আর রেণুর সংসার ছাড়া শহরের আর কোনো এলাকায় আর কখনো কোনো মানবশিশুর জন্ম হয়নি।
সেই যন্ত্রণাদগ্ধ স্বর্ণখোর মানুষগুলো তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কেবল মৃত্যুর দিনের জন্য আহাজারি করছিল—খুব দ্রুত। খুব দ্রুত আসুক তাদের মৃত্যু। স্বর্ণ চাই না আর। যন্ত্রণার যেন অবসান হয়।
কিন্তু মৃত্যু সহজে এল না। শুধু শামিমের বারান্দার টবে ফুটল এক অপরূপ ঝুমকোলতা ফুল। তাই শামিম আর রেণু তাদের কন্যার নাম রাখল ঝুমকোলতা।