ক্ষুদ্রঋণের বিশ্বস্বীকৃতি

নোবেল পদক
নোবেল পদক

গ্রামীণ সমাজে অগণিত দরিদ্র পরিবারের ক্ষুদ্রঋণের চাহিদা আদিকাল থেকেই একটি চলমান বাস্তবতা। অসচ্ছলতা ও নানামুখী ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিনিয়ত যুদ্ধরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণ ছিল একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং এখনো অনেকাংশে তাই। চার দশক আগে অবশ্য ‘ক্ষুদ্রঋণ’ শব্দযুগলের প্রচলন ছিল না। ঋণ, ধার, দেনা, কর্জ, হাওলাত—ইত্যাদি শব্দই ব্যবহৃত হতো, যা মূলত ব্যক্তিপর্যায়ে ফেরতযোগ্য আর্থিক আদান-প্রদানের বিষয়টিকে বোঝাত। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক খাত তথা ব্যাংক ব্যবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে। চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে, কম বা বিনা সুদে প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকেই তাদের ঋণের চাহিদা যদ্দুর সম্ভব মেটাতে হতো। এ ধরনের একটি বাস্তবতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তন সময়ের বিবেচনায় যথার্থই একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল, যা ২০০৮ সালে প্রফেসর ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিল।

প্রচলিত উন্নয়ন ধ্যানধারণায় চারটি মৌলিক নতুনত্ব ক্ষুদ্রঋণকে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামের ছোট্ট গণ্ডি ছাড়িয়ে আজ বিশ্বব্যাপী এক মহাকর্মযজ্ঞে উপনীত করতে ভূমিকা রেখেছিল। প্রথম নতুনত্ব ছিল দার্শনিক, দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচলিত উন্নয়ন দর্শন ছিল অনেকটা এ রকম—দরিদ্র মানুষ অসহায় ও অসচেতন, তাকে শুধু সহায়তা করলে হবে না, সে কীভাবে তার ভাগ্যের উন্নয়ন করবে, তা তাকে শিখিয়ে দিতে হবে। এখানেই ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ উদ্যোগ মৌলিকভাবে ভিন্ন একটি দার্শনিক অবস্থান নেয়—নিরক্ষর হলেও দরিদ্র মানুষেরা প্রায়োগিক জীবনদক্ষতায় নানাভাবে সক্ষম, এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের কর্মকাণ্ড সাজাতে হবে।

ক্ষুদ্রঋণের দ্বিতীয় মৌলিক নতুনত্ব ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির সেসব কর্মকাণ্ডকে একধরনের বৈধতা দেওয়া ও উন্নয়ন আলোচনায় নতুন গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে আসা, যা সত্তর দশকের শেষে ও আশির দশকের প্রথম দিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল টুকটাক অর্থনীতি হিসেবে। ‘টুকটাক’ তথা নানা ধরনের স্বল্প উৎপাদনশীলতার সেবা বা বাজারজাত–সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের হাত ধরেই ক্ষুদ্রঋণের প্রথম দিককার প্রসার সম্ভব হয়। এলিট উন্নয়ন দর্শনে এসব ‘টুকটাক’ অর্থনীতির তেমন কোনো কদর ছিল না। কিন্তু এই ‘টুকটাক’ অর্থনীতিই গ্রামীণ অকৃষি খাতের বিকাশের একটি সম্ভাবনার জায়গা ছিল, যা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বাস্তব রূপ লাভ করে।

ক্ষুদ্রঋণের তৃতীয় মৌলিক নতুনত্ব ছিল দরিদ্র পরিবারের অব্যবহৃত শ্রম তথা নারী শ্রমকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যেসব টুকটাক কাজে দরিদ্র পরিবার জড়িত হচ্ছিল, সেগুলো পরিবারের জন্য ছিল বাড়তি আয়ের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ পরিবারপ্রধান তাঁর গতানুগতিক মূল পেশাই চালিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ হিসেবে পরিবারের অব্যবহৃত নারী শ্রমকে কাজে লাগানোর একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এ জন্যই ক্ষুদ্রঋণের প্রারম্ভিক যাত্রায় নারী গ্রাহকদের এত আধিক্য ছিল। এভাবেই নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে প্রথম দফায় একটি বড় অগ্রগতি সম্ভব হয়ে ওঠে।

ক্ষুদ্রঋণের চতুর্থ মৌলিক নতুনত্ব ছিল উন্নয়নকৌশল বাস্তবায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে। বহু আগে থেকেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল ছিল সমবায় কিন্তু আমলাতান্ত্রিক নিয়মের গুরুভারে সমবায় কৌশলটি সত্তরের দশকের মধ্যেই অনেকটা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থায় ক্ষুদ্রঋণ বাস্তবায়নে সমবায় ধারণার পরিবর্তে অপ্রাতিষ্ঠানিক সমিতির ধারণা ব্যাপকভাবে সফলতার মুখ দেখতে পায়। ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হলেও তা হতো পাঁচ সদস্যের সমিতির মাধ্যমে, যেখানে সপ্তাহান্তে ক্ষুদ্র ইনস্টলমেন্টে ঋণ ফেরত দেওয়ার একটি শৃঙ্খলাকাঠামো গড়ে ওঠে, যা ক্ষুদ্রঋণের অভাবনীয় প্রসারের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ক্ষুদ্রঋণের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি ও প্রসার তাই কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের, বিশেষ করে গ্রামীণ অকৃষি খাতের বিকাশ, নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, উন্নয়ন বাস্তবায়নকৌশলে সমিতি-ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা ও বৃহত্তর অর্থে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখা ক্ষুদ্রঋণের অনস্বীকার্য মৌলিক অবদান হিসেবে চিহ্নিত হওয়া যৌক্তিক।

সময়ের বিবর্তনে ও ধারাবাহিক অর্জনের সূত্র ধরে ক্ষুদ্রঋণ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত খাত হলেও নতুন কিছু প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। এর অন্যতম হলো খাত হিসেবে বিকাশের ‘এফিশিয়েন্সি গেইনস’ সংস্থা ও গ্রাহকের মধ্যে কীভাবে বিতরিত হচ্ছে। সুদের হার ও নানা ধরনের বাড়তি পরিবর্তন এখানে একটি বিতর্কের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ যখন চালু হয়, তখন দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছিল। আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তি বা ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তনের একটি অন্যতম অর্জন হলেও শুধু এই একটি দিকের ওপর নজর দারিদ্র্য বিমোচনের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করে না। এখানে একটি বিতর্কের সুষ্ঠু উত্তর খোঁজাটা বর্তমান সময়ের একটি প্রাসঙ্গিক চ্যালেঞ্জ। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমেই কি দরিদ্র মানুষের বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও প্রয়োজন মেটানোর কৌশল যথার্থ, নাকি ক্ষুদ্রঋণের আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়টি অক্ষুণ্ন রেখে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক কার্যক্রম ধরেই আগানো উচিত? এই বিতর্ক এখনো চলছে।

চার দশকের মাথায় এসে নির্মোহ বিশ্লেষণে এই বলা যায় যে ক্ষুদ্রঋণের প্রবর্তন দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। শুরুতে অতি-উৎসাহী বিশ্লেষকেরা ক্ষুদ্রঋণকে দারিদ্র্য বিমোচনের ম্যাজিক বুলেট হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেও আরও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য বিমোচনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার, যদিও একক হাতিয়ার কোনো সময়ই ছিল না। সময়ের বিবর্তনে ক্ষুদ্রঋণের নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। অতীতে যেমন এই খাত বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে, আগামী দিনেও নতুন চ্যালেঞ্জ সময়ের সুষ্ঠু সমাধানের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকবে, এই আশা করাটাই বাঞ্ছনীয়।

হোসেন জিল্লুর রহমান, অর্থনীিতবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা