রংপুরের শতরঞ্জি

শুরুটা ছবি দিয়ে। তাও প্রথাগত রংতুলি নয়, ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর গমের খড় দিয়ে তৈরি ছবি। হাজার দেড়েক ছবি বানিয়ে হাজির হলাম রাজধানীর শিল্পমেলায়। সময়টা ১৯৮৬ সাল। একটি স্টল নিলাম মেলায়। চারদিকে ছবি ঝুলিয়ে বসে পড়লাম। মনে আশা, নিশ্চয়ই ভালো বিক্রি হবে। কিন্তু দিন যায়, মেলা ফুরায়, আমার ছবি তেমন বিক্রি হয় না। গমের খড় দিয়ে তৈরি সেসব ছবি ছিল মূলত দেশি-বিদেশি বরেণ্যজন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের মুক্তিসংগ্রামের প্রতিকৃতি। বিক্রি নেই দেখে হতাশ লাগল।
এমন সময় একটা নতুন আইডিয়া খেলে গেল মাথায়। ‘আপনি কি আপনার নিজের ছবি গমের খড় দিয়ে বানাতে চান?’—এই কথাগুলো একটা কাগজে হাতে লিখে স্টলে টাঙিয়ে দিলাম। ফল পেতে শুরু করলাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। অর্ডার আসতে শুরু করল। ছবির ক্রেতারা এবার নিজের প্রতিকৃতির জন্যও অর্ডার দিতে শুরু করলেন। স্টলে ভিড় বাড়তে লাগল। বিক্রিও বেশ ভালো। উৎসাহিত হলাম। মেলা শেষে ফিরে এলাম রংপুরে। স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম, রংপুরে একটা স্থায়ী হস্তশিল্প উৎপাদন ও বিপণনকেন্দ্র কেন আমার ভবিষ্যৎ কর্মজীবন হবে না?
আসলে ব্যবসা তো সেভাবে করতে চাইনি কখনো। যখন ছিল চাওয়ার বয়স, যখন স্বপ্ন দেখার দিন, তখন ভাবতাম একটা শ্রেণিহীন সমাজের কথা। স্বপ্ন দেখতাম মানুষের মুক্তির। চার-পাঁচ ক্লাস থেকেই ‘বেগার খাটি’ বাবার ব্যবসায়। আমার বাবা ছিলেন সাম্যবাদী। হয়তো তাঁরই ছায়ায় থেকে আমিও এমন এক সমাজের কথা ভাবতে শিখেছিলাম, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। কল্পনার তুলি দিয়ে আঁকা সুন্দর এক পৃথিবীর স্বপ্নে মজে ছিলাম আমরা সবাই।
এদিকে মধ্যবিত্ত পরিবার। টানাটানি নিত্যসঙ্গী। তবে মিছিল-মিটিং করি পুরোদমে। যা হবার তাই। সাতাশির আন্দোলনে ছাত্ররাজনীতির কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাসের জন্য আমার নিবাস হলো রংপুর কারাগার। কারাগারে ছিল ‘তাঁতচালি’। কয়েদিরা সেখানে হরেক রকম তাঁতে কাপড় বুননের কাজ করেন। টানা তিন মাস ওঁদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের বুননকাজ দেখলাম। আমার বুননশিক্ষা এবং অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে এ সময়টা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৭ সালে কোনো একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বাবা ভর্তি করে দেন। কিন্তু কোনো কারণে অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে না পেরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বাবা ক্ষুব্ধ হলেন। আমার ওপর রাগারাগি করলেন। তারপর নিজের চেষ্টায় আরও একটি স্বনামধন্য স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। ফল বের হলে জানতে পারি, আমি ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি। সে কারণে ওই স্কুলে ভর্তি হতে আমার কোনো টাকা লাগেনি। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর স্কুল ফাঁকি দেওয়ার কারণে সেখানেও পড়তে পারিনি। তারপর অন্য এক স্কুল থেকে এসএসসি পাস করি। পরে রংপুর কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পাস করি। ১৯৯১ সালে রংপুরে ‘কারুপণ্য’ নামের একটি হস্তশিল্প বিপণনকেন্দ্র খুলি।
১৯৭২ সালে উত্তরবঙ্গের যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের পুনর্বাসনে কুটিরশিল্প উৎসাহিত করার একটা সৎ উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ওই উদ্যোগে শতরঞ্জি তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় অনেক মানুষকে। কিন্তু তার সুফল তেমন পাওয়া যায়নি। আশির দশকে বিসিক শতরঞ্জি প্রকল্প নামে নতুনভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটাও সাফল্য অর্জন করেনি। আমি বিসিকের সেই বন্ধ থাকা শতরঞ্জি প্রকল্প ব্যক্তিগত উদ্যোগে লিজ নিয়ে পুরোনো কারিগরদের সংগঠিত করি। নতুন করে কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্প পরিসরে শতরঞ্জি উৎপাদন ও বিপণন শুরু করি। রংপুরের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য শতরঞ্জিশিল্পকে পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখি। বুঝতে পারি, সে জন্য সবকিছুর আগে দেশজুড়ে শতরঞ্জির নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। উঠেপড়ে লাগলাম এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে। আমার স্ত্রী শীলা, আমার ছোট ভাই লেনিন, শামীম এবং আমার বন্ধুরাও আমার পাশে দাঁড়াল সহকর্মী হিসেবে। লোকজনের অর্ডার আসতে শুরু হলো। কারিগরদের দিয়ে শতরঞ্জি বানিয়ে তা ক্রেতাদের সরবরাহ করতে লাগলাম। এতে সামান্য আয় হতে থাকে।
এবার ভাবলাম, শতরঞ্জি বিক্রির জন্য ব্যাপক প্রচারণায় নামতে হবে। নামলাম, তাতে সাড়াও পেলাম প্রচুর। শতরঞ্জি বানিয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় স্টল দিতে শুরু করলাম। একক উদ্যোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, যশোরসহ ১৬টি স্থানে শতরঞ্জি প্রদর্শনীর আয়োজন করি। শতরঞ্জির কদর ও চাহিদা বাড়তে থাকে। ২০০২ সালে ঢাকায় ‘শতরঞ্জি’ নামে একটি বিপণনকেন্দ্র চালু করি।
একসময় বুঝতে পারলাম, দেশের বাইরে, শীতপ্রধান দেশগুলোতে শতরঞ্জির এক বিশাল বাজার অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। ২০০২ সালে জার্মানিতে ডোমোটেক্স নামে কার্পেট এক্সপোতে অংশগ্রহণ করি কারুপণ্যের শতরঞ্জি নিয়ে। ওইখানেই খুলে গেল সম্ভাবনার জানালা। যে শতরঞ্জি প্রায় হারাতে বসেছিল জনপদ থেকে, প্রায় ২৫ বছরের অগ্রযাত্রায় সেই শতরঞ্জি আজ রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়াসহ পৃথিবীর ৩৮টি দেশে। গত অর্থবছরে ১২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের শতরঞ্জি রপ্তানি করেছি। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছি ২০ মিলিয়ন ডলার। এই কৃতিত্বের প্রকৃত দাবিদার রংপুর অঞ্চলের পাঁচটি কারখানার পাঁচ হাজার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, যাঁদের ৯০ শতাংশের বেশি নারী। কারুপণ্যের সঙ্গে ইতিমধ্যে জড়িয়ে গেছে মোট ২০ থেকে ২২ হাজার মানুষের জীবন।
শতরঞ্জি বিক্রি করতে গিয়ে দেখেছি, ক্রেতারাই সুন্দরতম রুচির ধারক। তাঁরাই আমাদের শিক্ষক। রংপুর থেকে একটা শতরঞ্জি বানিয়ে ক্রেতার সামনে গেছি। ক্রেতা আরও দশ রকম পরামর্শ দিয়েছেন। পথ বাতলে দিয়েছেন। ফিরে গিয়ে উৎপাদন বাড়িয়েছি। বেড়েছে আমাদের কর্মী-কারিগর। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও শতরঞ্জির চাহিদা বাড়ছে ব্যাপকভাবে। কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড গার্মেন্টসের বর্জ্য ঝুট, কাঁচা পাট, পাটের সুতলি, রিসাইকেল সুতাসহ শতভাগ দেশি কাঁচামাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের নকশা ও আকারের শতরঞ্জি হস্তচালিত তাঁতে তৈরি করে চলেছে। সবই মেঝে বা দেয়াল মুড়িয়ে দেওয়ার উপযোগী কার্পেট। শতরঞ্জিকে আমরা ‘বাংলাদেশের হস্তশিল্প’ হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরছি। দেশের বাজারে আজ অনেক ধরনের শতরঞ্জি বা হাতে বোনা কার্পেট দেখা যায়। সেগুলো সবই আমাদের উৎপাদন নয়।
আমাদের সাফল্য অনুপ্রাণিত করেছে অন্যদের। ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে ৩০-৩৫টি নতুন শতরঞ্জি উদ্যোগ। কিন্তু এটা বিরাট সম্ভাবনার ক্ষুদ্র অংশ। আমাদের ভাবতে হবে আরও বড় করে। আজ কারুপণ্যে যেসব শিল্পী-কারিগর কাজ করছেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবতে হবে। আগামী দিনের সেই অবকাঠামো তৈরির কাজে হাত দিতে হবে এখনই, যাতে তারাও বয়ে নিয়ে যেতে পারে সাফল্যের এই পরম্পরা। তাদের জন্য উন্নত জীবন এবং তাদের সন্তানদের জন্য লেখাপড়ার সুযোগ সুনিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজারে চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ প্রতিযোগীদের পাশাপাশি জায়গা করে নিতে হলে পণ্যের গুণগত মান আর কাজের দক্ষতা নিরন্তর বাড়াতে হবে। প্রয়োজন উন্নত কর্মপরিবেশ, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব কারখানা। উদ্যোক্তাকে সব সময় মনে রাখতে হবে, কারা তার আসল চালিকাশক্তি। তাদের উন্নয়ন ও সামগ্রিক কল্যাণে নিজেকে সব সময় নিয়োজিত রাখতে হবে। বলা বাহুল্য, এটাই কারুপণ্যের সাফল্যের চাবিকাঠি।
(অনুলিখন)
সফিকুল আলম সেলিম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড।