তাসফিন আহমেদ, যাকে সবাই আদর করে রিহান নামে ডাকে, তার বয়স সাড়ে তিন বছর। এই বয়সেই তার শৈশব চোখে ক্রিকেটের একটার পর একটা ছবি আঁকা হয়ে যাচ্ছে। ব্যাটিং, বোলিং, ছক্কা, ক্যাচ, বাউন্সার, আউট, ট্রফি। কারণ, তাসফিনের বাবা একজন ক্রিকেটার। বাবার নাম তাসকিন আহমেদ।

সাড়ে তিন বছরেই তাসফিন জানে বাসায় দাদা, দাদু, মা, ফুফিরা টেলিভিশন ছেড়ে বসা মানে বাবার খেলা আছে। বাবাকে টেলিভিশনে দুহাত মেলে দৌড়াতে দেখার অর্থ বাংলাদেশ ভালো খেলছে। তাসফিনও তখন আনন্দে চিৎকার করতে করতে ঘরের মধ্যে বাবার মতো দৌড়াতে থাকে। কখন কোথায় গিয়ে পড়ে মাথা ঠুকে যায় ঠিক নেই, তবু দৌড় থামে না। মাঝেমধ্যে সেই দৌড়ে সঙ্গী হয় তার চেয়েও ছোট ফুফাতো ভাই জুহায়ের। তাদের দুজনের চিৎকারে অন্যদের তখন বাসায় টেকাই দায়।

বয়স কম হলে কী হবে, তাসফিন কী করে যেন বুঝে গেছে, বাবাদের মতো ক্রিকেটারদের কীভাবে উৎসাহ দিতে হয়। একদিন কোনো এক ম্যাচের আগে বাবাকে সে বলেছিল, ‘আজ তুমি তিনটা উইকেট পাবে।’ তাসকিন সেদিন সত্যি সত্যি তিনটি উইকেট পেয়েছিলেন। ছেলে তাসফিন হয়তো না বুঝেই বলেছিল কথাটা। কিন্তু লেগে তো গেছে। বাবার যেন সেদিন ঈদের আনন্দ!

তাসকিন যখন বিদেশে খেলতে যান, বাবাকে খুব মিস করে ছেলে তাসফিন। তবে ভিডিও কলে বাপ-বেটার আবেগের ‘রানিং বিটুইন দ্য উইকেট’ চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। তাসফিন বলে, ‘আমি তোমার কাছে যাব, আমি হোটেলে যাব।’

default-image

তাসফিন যখন আরও ছোট ছিল, তখন তো বাবা বিদেশে গেলে অভিমানে সে বাবার সঙ্গে কথাই বলতে চাইত না। বাবা ভিডিও কল দিলে সেদিকেও তাকাত না। তাসফিনের অভিমান, বাবা কেন তাকে ফেলে বিদেশে চলে গেল!

বিদেশে থাকলে বাবার বুকটাও মাঝেমধ্যে ছেলের জন্য হু হু করে ওঠে। ভিডিও কলে ছেলের পাকা পাকা কথা আর মজার সব অভিব্যক্তি তখন তাসকিনের একমাত্র বিনোদন। এটা-ওটা বলতে বলতে একসময় মুঠোফোনের স্ক্রিনের বাবাটাকে তাসফিন ধরতে চায়। তাসফিন বলে, ‘বাবা, তুমি আসো না কেন?’

খেলা শেষে বাবা ফিরে এলে তাসফিনের আর কিছু লাগে না। বাবা ঘরে ঢোকামাত্র তাঁকে জড়িয়ে ধরে বাবার বুকেই ঢুকে থাকবে। বাবা শুধু তার, আর কেউ কাছে আসতে পারবে না। এরপর আস্তে আস্তে খুঁজে বের করবে চকলেট, খেলনা কী কী এল তার জন্য। সেগুলো পেয়ে যাওয়ার পর আবার বাবার সঙ্গেই সেঁটে থাকা। তাসফিনের আসল চকলেট, আসল খেলনা তো বাবাই!

তার সব খেলাধুলাও বাবার সঙ্গেই। বাবার জুতায় পা ঢুকিয়ে বসে থাকা, স্পাইক পরে হাঁটার অ্যাডভেঞ্চার, হেলমেট মাথায় দিয়ে ঘোরা—ঘরে তাসফিনের খেলার অভাব নেই।

এবার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তাসকিন ছেলের জন্য যে দুটি খেলনা নিয়ে এসেছেন, সেগুলো একটু অন্য রকমই। তাসফিনের জন্য সেগুলোকে ঈদ উপহারই বলতে পারেন।

তবে ঈদের উপহারে থাকতে হয় নতুনত্ব। কিন্তু তাসফিনের আবার খেলনা দুটি আগে থেকেই চেনা। টেলিভিশনে দেখেছে বাবার হাতে কারা যেন ওগুলো তুলে দিয়েছে। বাবা দেশে ফেরার পর সেই খেলনা পেয়ে তার সে কী আনন্দ! একবার এটায় চুমু খায় তো আরেকবার ওটায়। তাসফিন বোঝে না ওগুলোর একটা ম্যান অব দ্য ম্যাচ, আরেকটা ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার। ও শুধু জানে, ওগুলো ‘প্রাইজ’, বাবা পেয়েছে। তার মানে বাবা ভালো খেলেছে।

তাসকিন অবশ্য মজা করে বলেন, ‘ভালো খেললে যে প্রাইজ পায়, এটা ও বুঝে গেছে। কিন্তু খারাপ খেললে যে মানুষ মন্দ বলে, সেটা এখনো বোঝেনি। ওটা যত দেরিতে বুঝবে, ততই ভালো।’ কথাটা বলে হাসতে থাকেন তাসকিন।

ছেলের কাণ্ডকীর্তিতে না হেসে উপায়ও নেই। তবে তাসকিনের জন্য সময়টা এখন হাসার নয়। কাঁধের চোট নিয়ে ঘরে বসে আছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো খেলে এসেও শ্রীলঙ্কা সিরিজটা খেলা হবে না। এবারের ঈদটা কাটবে সেই হতাশায়।

মজার ব্যাপার হলো, এই যে বাবা মাঠে যাচ্ছেন না, বোলিং করছেন না—এটা আবার অস্বাভাবিক লাগছে তাসফিনের। বাবাকে ঘরে পেলে যার আনন্দের সীমা থাকে না, সেই কিনা সেদিন প্রশ্ন করে বসেছে—

—পাপা, তুমি কি আর খেলবে না?

বাবা: আমি তো ব্যথা পেয়েছি।

তাসফিন: কেন ব্যথা পেয়েছ? কোথায় ব্যথা পেয়েছ?

বাবা: কাঁধে…।

বাবাকে প্রতিদিন কাঁধে বরফ দিতে দেখেও ছেলের কৌতূহলের অন্ত নেই, ‘তোমার এখানে কী হয়েছে? বরফ দাও কেন?’

তাসকিন ছেলেকে বোঝান কখন কাঁধে ব্যথা হয়, কেনই-বা দেওয়া লাগে বরফ। শুনে তাসফিন কতটুকু বোঝে সে-ই জানে। তবে ও এখন এতটুকু জেনে গেছে, খেলাটাই বাবার সৌন্দর্য। দুহাত মেলে বাবাকে দৌড়াতে দেখাতেই তার আনন্দ। এটাই তাদের বাপ-বেটার ক্রিকেট! বাবা যেহেতু ঘরেই আছেন, এবারের ঈদে নিশ্চয়ই সেই ক্রিকেট জমে উঠবে আরও।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন