
বাংলাদেশের ক্রিকেটে আশার ফুল হয়ে ফুটেছিলেন তিনি। সেই ফুল কিছুদিন সুবাস ছড়িয়ে মাঝপথেই গেল শুকিয়ে। অবশেষে সেটি ঝরেও পড়ল। বিস্ময়কর আবির্ভাবের মতোই বিস্ময়কর তাঁর পতন। যতটা সাড়া জাগিয়ে এসেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, সেই শুরুর সঙ্গে শেষের অনেক মিল। বিপিএলে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন টেস্ট ক্রিকেটে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান।
দ্বিতীয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া সব ধরনের ক্রিকেটেই এই শাস্তি পেলেন আশরাফুল। তাঁর বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের চারটিই প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দিয়েছেন বিসিবির ট্রাইব্যুনাল। প্রতিটির কারণেই তাঁকে আট বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একটি অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের এই ক্রিকেটারকে।
বিসিবির দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালার ৬.২ ও ৬.৪ ধারা অনুযায়ী কাল আশরাফুলকে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটার কৌশল লোকুয়ারাচ্চিকে দেড় বছর এবং নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটার লু ভিনসেন্টকে তিন বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আশরাফুলের বিরুদ্ধে চারটি ম্যাচে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ থাকলেও এই দুই বিদেশি ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্পট ফিক্সিং হচ্ছে জেনেও তাঁরা আকসুকে তা জানাননি।
ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার দায়ে শাস্তি পেয়েছেন ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের মালিক সেলিম চৌধুরীর ছেলে ও ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিহাব চৌধুরীও। ৬.৩.৩ ধারা অনুযায়ী আগামী ১০ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাঁকে। সঙ্গে জরিমানা করা হয়েছে ২০ লাখ টাকা। শাস্তি পাওয়া ক্রিকেটার ও কর্মকর্তারা রায় ঘোষণার ২১ দিনের মধ্যে বিসিবির শৃঙ্খলা কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদের কাছে আপিল করতে পারবেন। এর পরও রায়ে সন্তুষ্ট না হলে তাঁরা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিল করতে পারবেন।
কাল গুলশানের রেডিয়াস সেন্টারে শাস্তির শুনানি শেষে রায় ঘোষণার পর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বিসিবির শৃঙ্খলা কমিটির তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল প্রধান সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য আজমালুল হোসেন কিউসি ও সাবেক ক্রিকেটার শাকিল কাসেম।
আকসু প্রথমে যে নয়জনের বিরুদ্ধে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ আনে, সেখানে ছিলেন না লু ভিনসেন্ট। বিচার-প্রক্রিয়া চলাকালীন বেরিয়ে আসে তাঁর নাম। আশরাফুল ও লোকুয়ারাচ্চির মতো লু ভিনসেন্ট নিজের দোষ স্বীকার করলেও বাকি সবাই তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। আকসুর সরবরাহকৃত তথ্য-প্রমাণ ব্যবহার করে অভিযোগ অস্বীকার করাদের মধ্যে একমাত্র শিহাব চৌধুরীকেই বিচারে দোষী সাব্যস্ত করতে পেরেছেন ট্রাইব্যুনাল। নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন তাঁর বাবা ও ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের মালিক সেলিম চৌধুরী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গৌরব রাওয়াত, সহকারী কোচ মোহাম্মদ রফিক, বাংলাদেশি দুই ক্রিকেটার মোশাররফ হোসেন ও মাহবুবুল আলম এবং ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার ড্যারেন স্টিভেন্স। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের আইনজীবীরা বিসিবি ও আইসিসির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে তা নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল৷
ট্রাইব্যুনাল প্রধান জানিয়েছেন, শাস্তি কার্যকর ধরা হবে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট থেকে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল ওই দিনই। তবে আশরাফুল প্রথম পাঁচ বছর ট্রাইব্যুনালের শর্ত মানলে শেষ তিন বছর শাস্তি ভোগ করতে হবে না। শর্তটি হলো, এই পাঁচ বছরে আইসিসি, এসিসি এবং বিসিবির আওতাধীন দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তাঁকে অংশ নিতে হবে। আশরাফুলের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সবগুলোর শাস্তির মেয়াদেরই শুরু ধরা হবে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট থেকে। তাঁর যে অপরাধ তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারত আজীবন বহিষ্কারাদেশ। সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের বহিষ্কারাদেশ।
ট্রাইব্যুনাল প্রধান সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম জানিয়েছেন, রায়ের বিস্তারিত বিসিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে বলেছেন তাঁরা, ‘সব পক্ষের সম্মতি নিয়ে আমরা এটি বিসিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে বলেছি। যেন এ নিয়ে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি না হয়। এই রায় এখন পাবলিক প্রপার্টি।’ যদিও কাল রাতে এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও ওয়েবসাইটে রায় পাওয়া যায়নি।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল আকসুর তদন্ত সম্পর্কে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। তদন্তকে বলা হয়েছে ‘ত্রুটিপূর্ণ’। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রাইব্যুনাল প্রধান বলেছেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায়ে আমরা বলেছি কী কী করা ঠিক হয়নি, কী কী করা উচিত ছিল। তাদের (আকসু) উচিত ছিল খেলা হওয়ায় বাধা দেওয়া, খেলা বন্ধ করা।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব ছিল বিসিবি ও আইসিসির, বিশেষ করে আইসিসির। কিন্তু ছয়জনের বেলায় আমরা প্রমাণাদিতে সন্তুষ্ট হইনি। সেগুলো তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করে না।’
শাস্তির শুনানিতে অংশ নিতে এলেও রায় শোনার পর সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলে যান আশরাফুল। পরে প্রতিক্রিয়া জানতে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম আরও কম শাস্তি হবে।’ শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না, সেটি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবেন বলে জানিয়েছেন আশরাফুল। সঙ্গে জানালেন আবার ক্রিকেটে ফেরার ইচ্ছার কথাও, ‘পাঁচ বছর হোক, আট বছর হোক, আমি আবার মাঠে ফিরব ইনশা আল্লাহ। এখনো আমি নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও নিজেকে ঠিক রাখার জন্য অনুশীলন করে যাব।’
আপিল প্রসঙ্গে আশরাফুলের ব্রিটিশ আইনজীবী ইয়াসিন প্যাটেল অবশ্য বলেছেন, ‘রায়ের ওপর কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। রায় ঘোষণার পর বেশ কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণের ব্যাপার আছে। দেখা যাক কী হয়।’ তবে শিহাবের আইনজীবী নওরোজ এম আর চৌধুরী বলেছেন, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
আপিল করার সুযোগ আছে বিসিবি এবং আইসিসিরও। তবে কালই এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সংস্থা দুটি। বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী টেলিফোনে বলেছেন, ‘যেহেতু এটি সম্পূর্ণভাবে বোর্ডের বিষয় এবং আইসিসিও এখানে বোর্ডের সঙ্গে কাজ করছে, আমরা দুই পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কার্যক্রম ঠিক করব।’
ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক, ১৮ জুন তারিখটি আশরাফুলের জীবনে দুই রূপেই ধরা দিল। কাল এই তারিখে বহিষ্কৃত হলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। ২০০৫ সালের এই ১৮ জুনেই কার্ডিফে দৃষ্টিনন্দন এক সেঞ্চুরিতে তাঁর ব্যাট হারিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। সেই আশরাফুলকে বাংলাদেশের ক্রিকেট মিস করবে নিশ্চিত।