বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অন্য কোনো সময় হলে হয়তো ডেভিড বনাম গোলিয়াথের গল্পে লিভারপুলের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ বলে দেওয়া যেত। কিন্তু এই মৌসুমে নকআউট পর্বে যেভাবে চমকের পর চমক দেখিয়েছে ভিয়ারিয়াল, তাদের বিরুদ্ধে বাজি ধরার সাহস করবে কে! শেষ ষোলোতে জুভেন্টাসকে রীতিমতো গুঁড়িয়েই দিয়েছে, জুভেন্টাসেরই মাঠে দ্বিতীয় লেগে ভিয়ারিয়াল জিতেছে ৩-০ গোলে। তা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে হারানো, মাসিমিলিয়ানো আলেগ্রির অধীনে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকা জুভেন্টাসকে কেউ চাইলে এই মৌসুমে গোনায় না-ও ধরতে পারেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ভিয়ারিয়ালের জয়টাকে কী বলবেন!

দুটি জয়ের পেছনের গল্প হয়তো ভিয়ারিয়ালের চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞার জয়গানই গাইবে। ভিয়ারিয়াল মিডফিল্ডার দানি পারেহোর সৌজন্যে বায়ার্নকে হারানোর পরের গল্পটা তো সবার জানা। বায়ার্ন কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান চেয়েছিলেন প্রথম লেগেই দফারফা করে ফেলতে। চাওয়ায় সমস্যা নেই, সেটি সংবাদমাধ্যমে মুখ ফুটে বলেও ফেলেছিলেন নাগলসমান। ভিয়ারিয়াল কড়া জবাব দিল বায়ার্নকে বাড়ি পাঠিয়ে, যা কথা শোনানোর শুনিয়ে দিল দ্বিতীয় লেগের পর! আর জুভেন্টাস? লিভারপুলে কিছুটা ভয় ধরাতে পারে সে গল্প। গল্পটাতে জড়িয়ে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ!

ওদের দলে সম্ভবত বিশ্ব ফুটবলে সফলতম কাপ টুর্নামেন্ট কোচ আছেন, তিনি জানেন তিনি কী করতে চান। উনাই এমেরি হচ্ছেন কাপ টুর্নামেন্টের রাজা। যা করছেন, সেটা অবিশ্বাস্য
ইয়ুর্গেন ক্লপ, লিভারপুল কোচ

বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে জুভেন্টাস সুপার লিগের মূল হোতা, এখনো এই তিনটি ক্লাবই পরিকল্পনাটা আঁকড়ে পড়ে আছে। তবে এর বাইরে ইউরোপের আরও বিখ্যাত, কিন্তু লোভী যে ১২ ক্লাব জড়িয়ে গিয়েছিল, তাদের একটি তো লিভারপুলও। জুভেন্টাস, বায়ার্নকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে যে অবিশ্বাস্য গল্পের জন্ম দিয়েছে ভিয়ারিয়াল, সুপার লিগে তেমন কিছুর সম্ভাবনাই নেই। এটিকেই যুক্তি বানিয়ে সুপার লিগের পরিকল্পনার সময় জুভেন্টাস সভাপতি আন্দ্রেয়া আনিয়েল্লির কাছে গিয়েছিলেন ভিয়ারিয়ালের মালিক ফের্নান্দো রচ। বলেছিলেন, যে পরিকল্পনায় তাঁর ক্লাবের মতো ছোট ক্লাবগুলোর খেলার সুযোগই সেভাবে থাকছে না, সে পরিকল্পনা ‘আবর্জনা!’ আনিয়েল্লি কানে তোলেননি রচের কথাগুলো। চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোর পর কি কথাগুলো মনে পড়েছে আনিয়েল্লির?

লিভারপুল জুভেন্টাসের মতো সুপার লিগের মূল হোতাও নয়, বায়ার্নের মতো লিভারপুলকে খাটো করেও দেখছে না। অন্তত সংবাদমাধ্যমে বলছে না। বরং উল্টো, লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের কথায় মনে হতে পারে, তাঁর দলই বুঝি আন্ডারডগ! ‘ওদের দলে সম্ভবত বিশ্ব ফুটবলে সফলতম কাপ টুর্নামেন্ট কোচ আছেন, তিনি জানেন তিনি কী করতে চান। উনাই এমেরি হচ্ছেন কাপ টুর্নামেন্টের রাজা। যা করছেন, সেটা অবিশ্বাস্য’—ক্লপের এমেরি মুগ্ধতা। একটুখানি কি ভয়ও আছে?

কোচিং ক্যারিয়ারে ১১টা শিরোপা জিতেছেন এমেরি, সবই ২০১৩ সালের পর। বড় যত সাফল্য, সব সেভিয়া আর ভিয়ারিয়ালেই!

এমেরি কী, সেটি বুঝতে ইউরোপা লিগের ইতিহাসই যথেষ্ট। সেভিয়াকে নিয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইউরোপা লিগের হ্যাটট্রিক গড়েছেন—তৃতীয়টি ক্লপের লিভারপুলকে হারিয়েই! রেকর্ড চতুর্থবার ইউরোপা লিগ জয়ের কীর্তিটা গত মৌসুমে গড়েছেন ভিয়ারিয়ালকে নিয়ে। ‘ইউরোপা লিগের প্রেমে পড়েছি আমি’—এই মৌসুমে একবার বলেছিলেন এমেরি। এর মাঝে ২০১৯ সালে আর্সেনালকে নিয়ে হয়েছেন রানার্সআপ। ঘরোয়া কাপ টুর্নামেন্টের মধ্যে পিএসজির কোচ থাকার সময় ফরাসি কাপ ও লিগ কাপ জিতেছেন দুবার করে। যে টুর্নামেন্টে বাঁচা-মরাই একমাত্র সমীকরণ, এমেরি সেখানে প্রায় প্রতিবারই প্রতিপক্ষকে খুন করে বেরিয়ে আসেন।

এই কঠিন সমীকরণে প্রায় সব সময়ই জয়ের প্রেরণাটা কী? ২০১৩ সালে সেভিয়ার সভাপতি হোসে মারিয়া দেল নিদোর সঙ্গে একটা কথোপকথনকে অনুপ্রেরণা মানেন এমেরি, ‘তাঁকে বলছিলাম যে আমার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেওয়া, যেমনটা ভ্যালেন্সিয়ায় করেছিলাম। তিনি উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কোনো শিরোপা জিতেছি কি না, কোনো উদ্‌যাপন করতে পেরেছি কি না। এখন বুঝি তিনি কেন আমাকে কথাগুলো বলেছিলেন।’ কোচিং ক্যারিয়ারে ১১টা শিরোপা জিতেছেন এমেরি, সবই ২০১৩ সালের পর। বড় যত সাফল্য, সব সেভিয়া আর ভিয়ারিয়ালেই!

কোচিং ক্যারিয়ারে তাঁর একমাত্র লিগ জয়ের গল্পটা অবশ্য পিএসজিতে। সেভিয়ায় সফল এমেরিকে দেখে পিএসজির মনে হয়েছিল, তিনিই তাদের ইউরোপে সাফল্য এনে দেবেন! কিন্তু একে পিএসজির প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর, সেটির সুবিধা নিয়ে পিএসজির ড্রেসিংরুমে তারকাদের দাপটও বেশি। পিএসজিতে তাই সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই চোখে পড়ে বেশি এমেরির। ব্যর্থতা বলতে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোতে বার্সেলোনার মাঠে দ্বিতীয় লেগে ৬-১ গোলের হার, তবে সেটির ভারই পিএসজিতে তাঁর সাফল্যকে ছাপিয়ে গেছে। ফরাসি লিগ আর ঘরোয়া টুর্নামেন্ট জিততে পিএসজির কোচ লাগে নাকি!

default-image

এমেরি সফল হতে পারেননি আর্সেনালেও। সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাষা! তাঁর ইংরেজি বলার ধরন নিয়ে হাস্যরস একটু বেশিই মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডে। কিন্তু এই পিএসজিতে খেদানো, আর্সেনালে তাড়ানো এমেরিই ভিয়ারিয়ালে নতুন করে নিজেকে যেন খুঁজে পেয়েছেন।

তাঁর সাফল্যের পেছনে মন্ত্রটা সহজ—একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা, আর খেলোয়াড়দের সেটিতে অন্ধবিশ্বাস! ভ্যালেন্সিয়া-সেভিয়ায় তা পেয়েছিলেন, পাচ্ছেন ভিয়ারিয়ালেও। ইয়োলো সাবমেরিনদের ড্রেসিংরুমে তারকা নেই, এমেরির পরিকল্পনাই সেখানে সবকিছু।

পরিকল্পনাগুলো অবশ্য অনেক বেশিই পুঙ্খানুপুঙ্খ! গত মৌসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারানোর পেছনে পরিকল্পনা করার আগে ইউনাইটেডের ১৭টি ম্যাচের ভিডিওর খুঁটিনাটি দেখেছিলেন এমেরি। এবার লিভারপুলের কত ম্যাচের ভিডিও দেখেছেন, কে বলতে পারে! শুধু নিজে ভিডিও দেখেই ক্ষান্ত নন, কৌশলে কোন খেলোয়াড়ের ভূমিকা কী হবে, কীভাবে কোন পরিস্থিতি সামলে নেবে, সেসবের ভিডিও নির্দেশনা বানিয়ে খেলোয়াড়দের ম্যাচের কয়েক দিন আগেই দিয়ে রাখেন এমেরি। সেটি না দেখেও উপায় নেই খেলোয়াড়দের।

জুভেন্টাসের মাঠে দ্বিতীয় লেগের আগে আমরা জানতাম, ওরা শুরুতেই গোল না পেলে অস্থির হয়ে ওঠে। আমরা জানতাম আমাদের সুযোগ আসবেই! সেটিই হয়েছে। উনাই আগেই সেটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
আরনাউত দানিউমা, ভিয়ারিয়াল উইঙ্গার

এ নিয়ে মজার একটা গল্পও আছে। এমেরি তখন ভ্যালেন্সিয়ায়। সে সময়ে ভ্যালেন্সিয়ার লেফটব্যাক জেরেমি ম্যাথিউকে দেখে এমেরির কয়েক দিন মনে হলো, তাঁর দেওয়া ভিডিও ম্যাথিউ দেখছেন না। যদিও জিজ্ঞেস করলে ম্যাথিউর কাছে ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখেছি’ উত্তরই আসে! কী করলেন এমেরি? পেনড্রাইভে ভিডিও দিতেন সবাইকে, ম্যাথিউকে দিলেন খালি পেনড্রাইভ। পরের দিন আবার ম্যাথিউকে প্রশ্ন, ভিডিও দেখেছ? ম্যাথিউ নিয়মিত উত্তরটা দিতেই এমেরি বললেন, ‘তোমাকে তো পেনড্রাইভে কিছু দিইনি!’

এত নিখুঁত পরিকল্পনার ফল কী, সেটি ইংলিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে বলছিলেন ভিয়ারিয়ালের আরনাউত দানিউমা, ‘জুভেন্টাসের মাঠে দ্বিতীয় লেগের আগে আমরা জানতাম, ওরা শুরুতেই গোল না পেলে অস্থির হয়ে ওঠে। আমরা জানতাম আমাদের সুযোগ আসবেই! সেটিই হয়েছে। উনাই আগেই সেটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।’
লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যাচ ঘিরেও কি ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছেন এমেরি? এমনই কি যে এবার আর গল্পটা ২০০৬-এর মতো হবে না!

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন