মরিনহোর ঝলকে গার্দিওলা কাল এমন ঝাপসাই ছিলেন যেন।
মরিনহোর ঝলকে গার্দিওলা কাল এমন ঝাপসাই ছিলেন যেন।ছবি : রয়টার্স

খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বৈরথে তো থাকেই। মেসি-রোনালদো, মেসি-নেইমার, ফেদেরার-নাদাল, নাদাল-জোকোভিচ, টেন্ডুলকার-লারা, মুরালিধরন-ওয়ার্ন, ক্যাসিয়াস-বুফন, রোনালদো-বাতিস্তুতা থেকে হালের ফন ডাইক-রামোস, কোহলি-স্মিথ, কান্তে-কাসেমিরো কিংবা ডি ব্রুইনা-ক্রুস; যেকোনো খেলাতেই এমন দ্বৈরথ দেখা যায় ভূরি ভূরি। এই দ্বৈরথই খেলা নিয়ে আমাদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়, খেলাটার প্রেমে ফেলে দেয় নিরন্তর। কিন্তু মাঠের বাইরে যাঁরা থাকেন, যাঁদের মাথা থেকে বের হয় ম্যাচ জয়ের নানান কৌশল, তাঁদের দ্বৈরথও কি কম আকর্ষণীয়? জোসে মরিনিও আর পেপ গার্দিওলার কথাই ভেবে দেখুন। এক যুগ ধরে কতবারই তো মুখোমুখি হলেন এই দুই কিংবদন্তি কোচ, এখনো তাঁদের দুই দলের মুখোমুখি হওয়া মানে ফুটবলের স্বাদ আবারও নতুন করে উপভোগ করা!

গত রাতের ম্যাচটাই যেমন—রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ‘এল ক্লাসিকো’র উত্তুঙ্গ উত্তাপ ছেড়ে দুই কোচ এখন ভিড়েছেন টেমস নদীতীরে, ইংল্যান্ডের দুই ক্লাবের দায়িত্ব নিয়ে। মরিনিও এসেছিলেন আগেই, চেলসি-ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড পেরিয়ে তিনি এখন টটেনহামের ‘বস’। ওদিকে গার্দিওলা আছেন ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্বে। টটেনহাম আর সিটি গত রাতে মুখোমুখি হয়ে যে ফুটবল খেলল, তাতে আরও স্পষ্টভাবে বোঝা গেল, দুই কোচের বয়স বাড়লেও ফুটবল মাঠে দর্শকদের মনে রোমাঞ্চ জাগাতে দুজন এখনো একইভাবে তৎপর। দুই দলের খেলা একটু ভালোভাবে দেখলেই ফুটবলপ্রেমীদের বুঝে যাওয়ার কথা, কোন দলটা গার্দিওলার, আর কোনটা মরিনিওর। দুজনের কৌশলের মধ্যে পার্থক্য প্রকট, বিশেষত্ব এতটাই অনন্য। শেষমেশ জয় হয়েছে মরিনিওর টটেনহামেরই। সিটিকে ২-০ গোলে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে গেছে তারা। গার্দিওলার বিপক্ষে যেটা মরিনিওর মাত্র সপ্তম জয়।

বিজ্ঞাপন

আর মরিনিওকে এই দুর্দান্ত জয়টা এনে দিল চিরচেনা সেই কৌশল, যে কৌশলটা এত দিন ধরে তাঁকে সফল করেছে, বানিয়েছে গার্দিওলার ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান বাধা।

default-image

গার্দিওলার ৪-৩-৩ ছকের বিপরীতে মরিনিও দলকে সাজিয়েছিলেন ৪-২-৩-১ ছকে। এ মৌসুমে টটেনহাম যে দুর্দান্ত ফুটবল খেলছে, তাঁর অনেকটাই এই ৪-২-৩-১ ছকের কৃতিত্ব। মরিনিও জানতেন, গার্দিওলার দল যথারীতি বল পজেশনভিত্তিক ফুটবল খেলবে আগাগোড়া। বলের দখল সিটির কাছেই বেশি থাকবে। সিটির খেলোয়াড়দের বলের দখল দিয়ে দিতে কোনো সমস্যা ছিল না মরিনিওর। শিষ্যদের বুঝিয়েছিলেন, ওরা বল নিয়ে খেলুক, তোমরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকো। সুযোগ পেলেই গোল করে আসবে, নষ্ট করা যাবে না মোটেও। ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যান দেখলেই মরিনিওর এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়, গোল করার জন্য ২২টি শট নিয়েও গোল করতে পারেননি সিটি তারকারা। ওদিকে মাত্র পাঁচটা নিয়েছেন মরিনহোর শিষ্যরা, দুটি রাখতে পেরেছেন পোস্ট বরাবর, ওই দুটি শট থেকেই এসেছে গোল!

default-image

মরিনিও বেশ ভালোই জানতেন, বলের অতিরিক্ত দখল নেওয়ার পাশাপাশি সিটি গোল পাওয়ার জন্য আরেকটা কাজ করতে চাইবে। সেটা হলো টটেনহামের ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ‘হাফস্পেস’গুলোয় ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ গড়ে তুলে প্রতিপক্ষ রক্ষণে চিড় ধরাবে। যে কাজ করতে কেভিন ডি ব্রুইনা, বের্নার্দো সিলভা, রিয়াদ মাহরেজরা সিদ্ধহস্ত। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, হাফস্পেস আবার কোন জায়গা? একজন সেন্টারব্যাক ও তাঁর দিকে থাকা ফুলব্যাকের মাঝের জায়গাটুকুই হাফস্পেস। অর্থাৎ রাইটব্যাকের (এই ম্যাচে সার্জ অরিয়ের) সঙ্গে ডান দিকের সেন্টারব্যাক (এ ম্যাচে টবি অল্ডারভেইরেল্ড), লেফটব্যাকের (সের্হিও রেগিলন) সঙ্গে বাঁ দিকের সেন্টারব্যাকের (এরিক ডায়ার) মাঝের জায়গাটা। যথারীতি এই জায়গায় গত রাতেও ঘুরঘুর করেছেন ডি ব্রুইনারা। লাভ হয়নি। দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার পিয়েরে এমিল হইবিয়া আর মুসা সিসোকোকে দুই হাফস্পেসে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। হইবিয়াকে ডায়ার ও রেগিলনের মাঝে, সিসোকোকে অরিয়ের-অল্ডারভেইরেল্ডের মাঝে। ফলে হাফস্পেসে সেভাবে ছড়ি ঘুরাতে পারেননি সিটির কেউ।

default-image

বিশেষ করে হইবিয়ার কথা না বললেই নয়। মুসা দেম্বেলে চলে যাওয়ার পর, আর ভিক্টর ওয়ানিয়ামা, এরিক ডায়ারদের ফর্ম পড়ে যাওয়ার পর টটেনহাম বহুদিন ধরেই একজন আদর্শ রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার খুঁজছিল। এই মৌসুমেই সাউদাম্পটন থেকে আসা এই ড্যানিশ তারকা মরিনিওর অভাবটা ঘুচিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, গার্দিওলা যখন বায়ার্নের কোচ ছিলেন, এই হইবিয়া খেলেছেন তাঁর অধীনে। হইবিয়ার ফুটবলীয় মস্তিষ্ক দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন গার্দিওলা, দলের অন্যতম বুদ্ধিমান খেলোয়াড় বলেছিলেন এই তারকাকে। পরে কালক্রমে সে হইবিয়া এখন গার্দিওলার অন্যতম বড় ‘শত্রু’র সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যে হাতিয়ার গত রাতে থামিয়ে রাখল ডি ব্রুইনাকে, গত মৌসুমে যিনি লিগের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন।

default-image

হাফস্পেসে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ায়, গার্দিওলা চাইলেন দুই ফুলব্যাক (ডান দিকে কাইল ওয়াকার, বাঁ দিকে জোয়াও ক্যানসেলো)–কে দিয়ে আক্রমণ করতে। অন্যান্য ম্যাচে ওয়াকার একটু ওপরে এসে সিটির রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার রদ্রির সঙ্গে জুটি গড়লেন। জুটি গড়ে একই দিকে থাকা ডি ব্রুইনাকে সাহায্য করেন। এ ম্যাচে পারেননি। না পারার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টটেনহামের ফরাসি মিডফিল্ডার তাঙ্গি এনদোম্বেলের ক্রমাগত মুভমেন্ট। ৪-২-৩-১ ছকে স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনের পেছনে ‘নাম্বার টেন’ হিসেবে খেললেও সুযোগ পেলেই আরও ওপরে গিয়ে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হয়ে যাচ্ছিলেন এই এনদোম্বেলে। কেইন-এনদোম্বেলে মিলে প্রেস করছিলেন সিটির দুই সেন্টারব্যাক রুবেন দিয়াস ও এমেরিক লাপোর্তকে। দিয়াস-লাপোর্তের ওপর চাপ কমানোর জন্য তাই ওয়াকার ওপরে উঠতে পারেননি, তৃতীয় সেন্টারব্যাকের ভূমিকা পালন করেছেন। ওদিকে ওপরে ওঠার কাজটা করেছেন আরেক ফুলব্যাক, জোয়াও ক্যানসেলো। ওপরে ওয়াকার-দিয়াস-লাপোর্ত আর পেছনে ক্যানসেলো-রদ্রির জুটি সামলাতে শেষমেশ সেন্টারব্যাকদের প্রেস করা ছেড়ে দেন এনদোম্বেলে-কেইন জুটি।

বিজ্ঞাপন
default-image

তাতে অবশ্য লাভই হয় টটেনহামের। কেইন-এনদোম্বেলে প্রায়ই মিডফিল্ডে নেমে যাচ্ছিলেন, ফলে মিডফিল্ডে ভিড় বেড়ে যাচ্ছিল। ডি ব্রুইনারা হাফস্পেসে সুবিধা করতে পারছেন না দেখে উঠে যাচ্ছিলেন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার রদ্রিও। রদ্রির ফেলে যাওয়া জায়গাটাতে ইচ্ছেমতো খেলেছেন কেইন। সিটির সেন্টারব্যাকদের জায়গা থেকে সরিয়েছেন, সন হিউং মিনের জন্য জায়গা বের করেছেন। গতি দিয়ে সেই জায়গার সদ্ব্যবহার করেছেন সন, লো সেলসোরা। দুটি গোলই এভাবে হয়েছে। কেইন বারবার নিচে নেমে আসছিলেন, সঙ্গে টেনে আনছিলেন একজন-দুজনকে, ফলে ফাঁকা জায়গায় দৌড়ে গোল দিয়ে এসেছেন সনরা। দুটি গোলেই সহায়তা ছিল কেইনের, এই নিয়ে লিগের নয় ম্যাচে নয়টি অ্যাসিস্ট হয়ে গেল এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের। এত দিন সবাই তাঁকে নিরেট গোলদাতা হিসেবে চিনলেও এই মৌসুমে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন কেইনকে, যিনি গোল করার চেয়ে করানোতে বেশি পারদর্শী।

default-image

মিডফিল্ডে ভিড় দেখে অনেকবার লং বলে খেলতে চেয়েছে সিটি, চেয়েছে ক্রসনির্ভর ফুটবল খেলতে। কিন্তু প্রতিবার হইবিয়া-ডায়ার-সিসোকো দেয়ালে বাধা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে সব আক্রমণ।

শেষমেশ জয়ের হাসি হেসেছে টটেনহামই। আর আরেকটা মরিনিও-মাস্টারক্লাসের সাক্ষী হয়েছে ফুটবল বিশ্ব।

মন্তব্য পড়ুন 0