শুভ্র: শান্ত ও মুমিনুলের কথায় আসি—৩ ও ৪ নম্বর এভাবে ক্রমাগত ব্যর্থ হলে দল রান করবে কীভাবে? সাদা চোখে শান্তর সমস্যা অফ স্টাম্পের বাইরের চ্যানেলে। কেন এমন হচ্ছে, এ থেকে নিরাময়ের উপায়ই–বা কী?

নাজমূল: শান্তর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দ্বিধাদ্বন্দ্বটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওপেনার তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেলে ওকে দ্রুতই নামতে হয়। বল নতুন থাকে, মুভমেন্ট থাকে, উইকেটে সাহায্য থাকে। ডিসাইসিভ ফুটওয়ার্কে শান্তর যথেষ্ট ঘাটতি আছে। মানসিক দিকটা, মানে আত্মবিশ্বাসেরও এখানে ভূমিকা থাকে। একটা নির্দিষ্ট লাইনে যথেষ্ট সমস্যা আছে। যেটা হয়, এসব জায়গায় বল পড়লে যারা ফর্মে থাকে না, তারা বলের খুব কাছে যেতে চেষ্টা করে। ওটা করতে গিয়ে আরও বিপদ টেনে আনে। ব্যাট আনার যথেষ্ট জায়গা থাকে না। মুমিনুলের ক্ষেত্রে যেটা গত ম্যাচে হয়েছে। ব্যাট আনার জায়গায় রাখেনি, যে কারণে ব্যাট প্যাডে আটকে গেল।

শুভ্র: মুমিনুলকে নিয়ে তো এ সিরিজের আগে অনেক কাজ করলেন। তাঁর কোন সমস্যাটা বেশি চোখে পড়েছিল?

নাজমূল: ফুটওয়ার্কের ব্যাপারে ডিসাইসিভ হতে না পারা। স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে ফুটওয়ার্কটা হয়, ওটা ছাড়া পেস বোলিং খেলা, কঠিন কন্ডিশনে খেলা সম্ভব নয়। তিন দিনের মাথায় ও নিজেই সাবলীল হওয়ার কথা বলেছে। তবে প্র্যাকটিস তো প্র্যাকটিসই। আমাদের এখানে নেটে সেভাবে ভালো বোলারও পাওয়া যায় না, অমন পরিস্থিতিও তৈরি করা যায় না। ওখানে যে চ্যালেঞ্জ, তা ফেস করতে গিয়ে ও মানসিক দিক দিয়ে আগের জায়গায় চলে গেছে কি না, আমি নিশ্চিত না। তবে আমি এখানে যা দেখেছিলাম, তাতে ভালো মনে হয়েছিল। আশা করেছিলাম, চারটা ইনিংস যদি খেলে, অন্তত দুইটা ইনিংসে সে ভালো খেলবে। তবে সর্বশেষ যে আউটটা হলো, সেটা দেখে খুবই হতাশ হয়েছি।

default-image

শুভ্র: মুমিনুলের তো দেশের মাটিতে দুর্দান্ত রেকর্ড। বিশেষ করে চট্টগ্রামে। তাঁকে কি তাহলে ‘ফ্ল্যাট ট্র্যাক বুলি’ বলা যায়, নাকি তা অন্যায় হয়ে যায়?

নাজমূল: একটা সময় মিডল লেগে বুক বা কাঁধ উচ্চতার বলে ওর সমস্যা হতো। এটা নিয়ে বছরখানেক আগে কাজ করেছিলাম, এরপর বেশ ভালো মনে হয়েছিল। যে কারণে নিউজিল্যান্ডে একটা ভালো ইনিংস দেখেছি। বোলাররা ওই লাইনে বল করেছে, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। এরপর কেন এ সমস্যা হলো, বুঝতেই পারলাম না। অকারণে ও আর এত রান করেনি, লম্বা লম্বা ইনিংস খেলেনি; সেখান থেকে একজন ব্যাটসম্যান কীভাবে সরে যেতে পারে, এটা অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। আমি জানি না, ও যাদের সঙ্গে কাজ করেছে, জাতীয় দলের কোচ হোক, ব্যাটিং কোচ হোক, সেখানে ওর সঙ্গে কতটা কী করা হয়েছে। সেটা ওর এই অবস্থার জন্য কতটা দায়ী, আমি নিশ্চিত না। এসব কিন্তু ভাবার বিষয়। চাইলেই আপনি ওর রিপ্লেসমেন্ট পাবেন না। আরও দুটি ইনিংস আছে, ও খেলবে কি না, নিশ্চিত নই। যদি সুযোগ পায়, এই দুই ইনিংস দিয়ে যদি বের হয়ে আসতে না পারে, তাহলে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্যই হবে নির্বাচক এবং টিম ম্যানেজমেন্ট।

শুভ্র: আপনি কি মনে করেন, মুমিনুলের দ্বিতীয় টেস্টটা খেলা উচিত? নাকি একটা ব্রেকই তাঁর জন্য ভালো হবে?

নাজমূল: সাকিবের ওপর নির্ভর করে। সাকিব ভাবতেই পারে, ওর সমস্যা নিয়ে আরেকটু কথা বলে দেখি, ওকে আরেকটু ফ্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করে দেখি, আরেকটু সুযোগ দিয়ে দেখি। মুমিনুল যদি এখন বের হয়ে যায়, তাহলে অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হবে। ফিরে আসার মধ্যে যে গ্যাপটা হবে, সে পর্যন্ত কে হাল ধরবে, সেটিও ভাবতে হবে। বাদ তো যেকোনো সময় দিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যাবে অনেক।

শুভ্র: বল একটু সুইং বা স্পিন করলেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এত অসহায় মনে হয় কেন? এসবই তো ব্যাটিংয়ের চিরন্তন চ্যালেঞ্জ, এটা জয় না করতে পারলে কিসের ব্যাটসম্যান...

নাজমূল: সমস্যাটা অনেক গভীরে। একজন প্লেয়ার বেড়ে ওঠার সময় যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হয়, সে কিন্তু নিজেকে সেভাবেই মানিয়ে নেয়। আমাদের প্লেয়ারদের ওখানেই সমস্যা। সাকিব আল হাসানের দ্বিতীয় ইনিংসের কথা যদি চিন্তা করি, এই শটটাই যদি পুরোনো বলে খেলত, তাহলে কিন্তু বল ফিল্ডারের ওপর দিয়ে চলে যেত। নতুন বলটা একটু হার্ড ছিল, বাউন্স একটু বেশি, মুভমেন্ট ছিল একটু। যেটার সঙ্গে সাকিব অ্যাডজাস্ট করতে পারেনি। আমাদের ব্যাটসম্যানরা কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে এটির মুখোমুখি হয় না। তবে এটাও তো ঠিক, যারা অনেক দিন ধরে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খেলেছে, তাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাদের জানার কথা যে এই জিনিসটা হতে পারে। ক্রিকেট বোর্ড কিন্তু সিরিজের আগে বাইরে পাঠিয়ে দেয়, তখন সুযোগ থাকে এসব নিয়ে ভাবার। তবে সেটাই যথেষ্ট কি না, এটাও একটা প্রশ্ন। টেস্ট শুরুর আগে যে ফিল্ডিং সেশন হয়, সেখানে খুব স্লিপ ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করতে দেখি, সারা বছর কিন্তু কিছুই হয় না। এগুলো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আপনি আমাদের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট দেখলে দেখবেন, কিছুই হয় না। আপনি দেখবেন না, স্লিপে কেউ সিরিয়াসলি প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু আপনি যদি ওই পর্যায়ে যেতে চান, সারা বছরই একটা চর্চার মধ্যে থাকতে হবে। না হলে যত মেধাই থাক, এই পর্যায়ে ভালো করা কঠিন।

default-image

শুভ্র: তাহলে সারকথাটা হলো, আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটকে আরও পেশাদার, আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলার সঙ্গে ব্যক্তিগত চেষ্টাটা যোগ না হলে এই সমস্যার সমাধান নেই, তাই তো?

নাজমূল: হ্যাঁ। ঘরোয়া ক্রিকেট বলতে শুধু উইকেট না, ম্যানেজমেন্টও…আমাদের প্রিমিয়ার লিগ লিস্ট ‘এ’, মালিক হয়তো বিদেশে থাকে, যথেষ্ট টাকাপয়সা আছে, দেশে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে দেয়, সে ক্রিকেট বুঝুক বা না বুঝুক। সে-ই কিন্তু ম্যানেজমেন্ট। একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন তো, বোম্বে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনে কে চালায় টিমটা?

শুভ্র: তার মানে তো সেই পুরোনো কথাই, পুরো পরিবেশ মানে ক্রিকেট সংস্কৃতির একটা পরিবর্তন জরুরি...

নাজমূল: হ্যাঁ। আমাদের সব ফোকাস জাতীয় দলে। ম্যানেজমেন্টের দিকে যদি তাকান, জাতীয় দলেরটা ১০০ হলে ফার্স্ট ক্লাসে হয়তো ১ হবে। বিশাল পার্থক্য। গলির ছাপরা হোটেল থেকে আপনি ফাইভ স্টারে চলে যাচ্ছেন। ব্যাপারটা কিন্তু এ রকম।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন