১৯৫০ বিশ্বকাপ
মারাকানার নীরবতা, ব্রাজিলের কান্না এবং আবার উরুগুয়ে
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
একটা ম্যাচ, একটা স্টেডিয়াম। প্রায় দুই লাখ মানুষ!
এখনো সংখ্যাটা লিখতে গেলেও মনে হয় ভুল হচ্ছে। কিন্তু এটাই সত্যি। ১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই রিও ডি জেনিরোর মারাকানায় চতুর্থ বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন ‘২০০ হাজার’ মানুষ! এর আগে না, এর পরেও না—ফুটবলের ইতিহাসে এত মানুষ আর কোনো একটি ম্যাচে একসঙ্গে গ্যালারিতে বসেননি। একসঙ্গে নীরব হয়ে যায়নি! ১৯৫০ বিশ্বকাপ আসলে মারাকানার সেই নীরবতার গল্প।
বিশ্বযুদ্ধের পর ফের মাঠে
১৯৩৮ সালের পর ১২ বছর বিশ্বকাপ হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে লুক্সেমবার্গে বসল ফিফার প্রথম কংগ্রেস। ইউরোপের দেশগুলো তখন নিজেদের পুনর্গঠনে ব্যস্ত। আয়োজনের বোঝা কেউ নিতে রাজি নয়। এগিয়ে এল ব্রাজিল। পুরোনো স্টেডিয়াম সংস্কার করতে আর নতুন একটা বিশাল মাঠ বানাতে বাড়তি সময় চাইল। পেলও। ফিফা সেই কংগ্রেসেই আরেকটি সিদ্ধান্ত হলো। ২৫ বছর ধরে ফিফার নেতৃত্ব দেওয়া সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে বিশ্বকাপের সোনার ট্রফির নতুন নাম হলো ‘জুলে রিমে কাপ’।
মারাকানা: স্থাপত্যের বিস্ময়
মারাকানা স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছিল এই বিশ্বকাপের জন্যই। ৫০ লাখ বস্তা সিমেন্ট, ১ কোটি কিলোগ্রাম লোহা আর ১১ হাজার শ্রমিকের প্রায় দুই বছরের পরিশ্রমে দাঁড়াল বিশাল এক কলোজিয়াম। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ছয় দিন আগে উদ্বোধন হলো। পাঁচ দিন আগে হলো একটা প্রীতি ম্যাচ—সাও পাওলো ও রিও ডি জেনিরোর মধ্যে। বিনা মূল্যে আসন পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত দর্শকদের ঢুকতে দেওয়া হলো সেই ম্যাচে। উদ্দেশ্য ছিল নির্মাণকাজ ঠিকঠাক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা। সৌভাগ্যক্রমে সব ঠিকঠাক ছিল।
খালি পায়ে খেলার আবদার
জার্মানি ও জাপানের অংশগ্রহণের আবেদন নাকচ হলো। কারণ, বিশ্বযুদ্ধে তাদের ভূমিকা। ভারতের খেলার কথা ছিল। কিন্তু ফিফার নিয়ম অনুযায়ী জুতা পরে খেলা বাধ্যতামূলক হওয়ায় তারা অংশ নেয়নি। কারণ, বোম্বে বা দিল্লির মাঠে খালি পায়ে খেলাই ছিল তাঁদের অভ্যাস। ফ্রান্সকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল একটি ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে। কিন্তু তারা আপত্তি জানাল সূচি দেখে। তাদের গ্রুপে এক ম্যাচ হবে দক্ষিণের পোর্তো আলেগ্রেতে, পরেরটি উত্তরের রেসিফেতে। দুই মাঠের দূরত্ব ৩ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। আয়োজকেরা সূচি বদলাতে রাজি হলেন না। ফ্রান্সও গেল না বিশ্বকাপে। এই বিশ্বকাপেই প্রথম খেলোয়াড়দের জার্সিতে নম্বর ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়।
সুপারগা বিমান দুর্ঘটনা এবং জাহাজে ইতালি
১৯৪৯ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় ইতালির ক্লাব তোরিনোর প্রায় সব খেলোয়াড় প্রাণ হারান। জাতীয় দলের নিয়মিত একাদশের ১০ জনই ছিলেন ওই ক্লাবের। সেই শোকে পাথর ইতালিয়ানরা বিমানে চড়তে অস্বীকার করে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা ব্রাজিলে গেল জাহাজে চড়ে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় খেলোয়াড়দের ফিটনেস আর মেদ—দুটোই বেড়ে গিয়েছিল। ফলাফল? প্রথম রাউন্ডেই সুইডেনের কাছে হেরে বিদায়।
প্রথমবার ইংল্যান্ড এবং ‘দ্য মিরাকল ম্যাচ’
ফুটবলের জনক ইংল্যান্ড প্রথমবার বিশ্বকাপে গেল। দলে আলফ রামসে ও স্ট্যানলি ম্যাথুসের মতো তখনকার সেরা তারকারা। চিলিকে ২-০ গোলে হারিয়ে দারুণ শুরু হলো ইংল্যান্ডের। পরের ম্যাচে প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র। লন্ডনের বাজিতে মার্কিনদের জেতার দর ছিল ৫০০-তে ১। ৩৮তম মিনিটে ২৫ মিটার দূর থেকে ওয়াল্টার বারের একটা বল খুঁজে পেল হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত জোসেফ গেটজেন্সের মাথা। বল জালে, ইংল্যান্ড হারল। রয়টার্সের টেলেক্সে স্কোর গেল ০-১। অনেক ব্রিটিশ পত্রিকা ভাবল টাইপিং ভুল হয়েছে। ছাপল—‘ইংল্যান্ড ১০, যুক্তরাষ্ট্র ১।’ নিউইয়র্ক টাইমস–এর ক্রীড়া সম্পাদক নাকি কাগজটা মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, কেউ রসিকতা করছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটা আলাদা জায়গা করে নিল ‘দ্য মিরাকল ম্যাচ’ নামে।
মারাকানাজো: দুই লাখ মানুষের নীরবতা
একমাত্র বিশ্বকাপ যেখানে কোনো ফাইনাল ছিল না। চূড়ান্ত পর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিল-উরুগুয়ে মুখোমুখি। ব্রাজিল ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন। উরুগুয়েকে জিততেই হবে।
বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ব্রাজিল ওই উরুগুয়েকেই হারিয়েছিল ৩-২ গোলে, একই শহরে। চূড়ান্ত পর্বেও স্পেনকে ৬-১, সুইডেনকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে।
ম্যাচের আগে লকার রুমে উরুগুয়ের এক কর্মকর্তা গিয়ে বলেছিলেন, ‘ছেলেরা, মানসম্মান বেশি ডুবিয়ো না। চেষ্টা করো যেন ছয়ের বেশি গোল না খাও। চারটা হলে খুব ভালো হয়।’ কথাগুলো যেন উল্টো কাজ করল। অধিনায়ক ভারেলা টানেলে দলকে জড়ো করে বজ্রকণ্ঠে বললেন, ‘ওই যে মানুষগুলো বাইরে আছে, মনে করো ওরা সব কাঠের পুতুল। আমাদের জিততেই হবে।’ ভারেলা তারপর নিজের দলকে ব্রাজিলের সঙ্গে একসঙ্গে মাঠে নামালেন, যাতে দুই লাখ দর্শকের সেই গর্জন শুনে কেউ ভয় না পায়।
প্রথমার্ধ গোলশূন্য। বিরতির দুই মিনিটের মধ্যে আলবিনো ফ্রিয়াকা এগিয়ে দিলেন ব্রাজিলকে। মারাকানা ফেটে পড়ল। কিন্তু উরুগুয়ে দমল না। ৬৬ মিনিটে হুয়ান শিয়াফিনোর গোলে সমতা। তারপর ৭৯ মিনিটে আলসিদেস ঘিগিয়ার গোল। দুই লাখ মানুষ একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল! শিয়াফিনো পরে বলেছিলেন, ‘জীবনে প্রথমবার বুঝলাম নীরবতার মানে কী।’
অনেক পরে যে ফাইনালের স্মৃতিচারণা করে ঘিগিয়া বলেছিলেন, ‘কেবল তিনজন লোক মারাকানার দুই লাখ দর্শককে মুহূর্তের মধ্যে নীরব করে দিয়েছিল। ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা (সংগীতশিল্পী), পোপ দ্বিতীয় জন পল এবং আমি।’
‘মারাকানাজো’—তখন পর্যন্ত ব্রাজিল ইতিহাসে ওটাকেই মনে করা হতো সবচেয়ে বড় জাতীয় বিপর্যয়। কে জানত ৬৪ বছর পর একটা ‘মিনেইরোজো’র সাক্ষী হতে হবে ব্রাজিলের ফুটবলপ্রেমীদের।
আজীবন সাজাপ্রাপ্ত এক গোলরক্ষক
মারাকানাজো অভিশাপ হয়ে এসেছিল ব্রাজিলের গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসার জীবনে। একসময়ের বীর হয়ে গেলেন সবচেয়ে ঘৃণার পাত্র। পুরো দেশের কাছে অপয়া হয়ে গেলেন, ছিলেন মৃত্যুর আগপর্যন্ত। ১৯৮০-এর দশকে মারাকানা সংস্কারের সময় পুরোনো গোলপোস্ট দেওয়া হলো বারবোসাকে, অপমান হিসেবে। ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে থাকা দলকে দেখতে গেলেন। ব্রাজিল ফেডারেশনের এক কর্মকর্তা নিরাপত্তাকর্মীদের বললেন, ‘এই মানুষটাকে সরাও, শুধু অশুভ আনে।’
২০০০ সালে মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলের আইনে যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ৩০ বছর। কিন্তু আমার জন্য তা হয়ে গেছে ৫০ বছর।’
হলুদ জার্সির জন্ম
ওই হারের পরই ব্রাজিলের সাদা জার্সি বদলে গেল। ১৯৫৩ সালে নতুন জার্সি ডিজাইনের প্রতিযোগিতা হলো। শর্ত একটাই—জাতীয় পতাকার চারটি রং থাকতে হবে। ৩০০ প্রস্তাব এল। জিতলেন ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ সাংবাদিক, নকশাকার—আলদির গার্সিয়া শ্লে। হলুদ শার্ট, উজ্জ্বল সবুজ গলা ও হাতা, নীল প্যান্ট, সাদা মোজা। পরে জানা গেল—শ্লে জন্মেছিলেন উরুগুয়ের সীমান্তঘেঁষা শহর ইয়াগুয়ারোনে। ছিলেন উরুগুয়ের সমর্থক।
‘মারাকানাজো’র দিন রেডিওতে খেলা শুনে উরুগুয়ের জয়ও উদ্যাপন করেছিলেন!