আর্জেন্টিনার পাগলামির নেপথ্যের গল্প

>কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনাল ম্যাচের তারিখ পরিবর্তন হয়েছে দুবার। কারণ, সমর্থকদের মারামারি। উত্তাল এক অবস্থা জারি হয় বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের খেলার আগে। বিপক্ষ দলের মাঠে নিষিদ্ধ করা হয় সমর্থকদের। তবু থামানো যায় না তাদের। ইংলিশ পত্রিকা দ্য অবজারভারের মতে, ৫০টা ডার্বি ম্যাচ রয়েছে বিশ্ব ফুটবলে, যেগুলো মৃত্যুর আগে দেখা উচিত। যার মধ্যে প্রথমে রয়েছে সুপার ক্লাসিকো। এমন উত্তাল সুপার ক্লাসিকোর নেপথ্যের গল্পটা শুনুন।
ক্লাসিকো বলতেই বোঝায় হাড্ডাহাড্ডি এক লড়াই, যে লড়াইয়ের মূলমন্ত্র ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আর সুপার ক্লাসিকো নামেই বোঝা যায় এর মাহাত্ম্য। কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনালের তারিখ ইতিমধ্যে পরিবর্তন হয়েছে দুবার। দুবার তারিখ বদলের কারণ একটিই, সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ। সংঘর্ষের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারেননি ফুটবলাররাও। ফলাফল হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকার ‘চ্যাম্পিয়নস লিগে’র ফাইনাল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে চলে এসেছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। তবু সমর্থকদের উন্মাদনা কেউ থামাতে পারেনি। সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে এসেছেন স্পেনে। হাজার হলেও ম্যাচটা বোকা জুনিয়র্স বনাম রিভার প্লেটের।
‘রাইভালরি’ শব্দটার অর্থ শত্রুতা। ফুটবলের মাঠে বড় বড় রাইভালরি বলতেই নাম আসবে ‘এল ক্লাসিকো’, ‘ম্যানচেস্টার ডার্বি’, ‘মিলান ডার্বি’র নাম। নামকরা বেশির ভাগই ডার্বির দলগুলো হয়ে থেকে একই শহরের দুই সেরা দলের। বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের রাইভালরিও ঠিক তাই। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের সামুদ্রিক বন্দরের পাশে লা বোকা অঞ্চলে চার বছরের ব্যবধানে জন্ম হয় দুই ক্লাবের। কিন্তু ১৯২৫ সালের দিকে রিভার প্লেট নিজ শিকড় ছেড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাড়ি জমায় বুয়েনস এইরেসের সমৃদ্ধিশালী এলাকা নুনেজে।
দুই ক্লাবেরই জন্ম হয়েছে বাইরের মানুষদের হাত ধরে। বাইরে থেকে আসা লোকজন নামত লা বোকার বন্দরে। সেখানে আসা ইতালিয়ানদের চোখে পড়ে আনাচে–কানাচে খেলতে থাকা খেলোয়াড়দের। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, এই অঞ্চলে গড়ে তোলা হবে ক্লাব। ১৯০১ সালে বন্দরের আশপাশে খেলতে থাকা ছোট ছোট খেলোয়াড়কে নিয়েই গড়ে ওঠে ক্লাব। কিন্তু ক্লাবের নাম কী হবে? সমাধানও এল সঙ্গে সঙ্গেই। পাশে থাকা এক বাক্সে ‘দ্য রিভার প্লেট’ নাম থেকেই ক্লাবের নাম হয়ে গেল রিভার প্লেট।

লা বোকার অন্য ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের জন্মের ঘটনা আরও আশ্চর্যজনক। লা বোকায় জন্ম নেওয়া ক্লাবের নাম শহরের নামেই হবে। এমন সিদ্ধান্ত ছিল সে সময়ের বোর্ড ম্যানেজমেন্টের। কিন্তু জার্সির রং কী হবে? সাদা–লাল তো ইতিমধ্যে রিভার প্লেটের নেওয়া শেষ। তবে? সিদ্ধান্ত হলো এই বন্দরে ভেড়া প্রথম জাহাজের রঙে হবে জার্সির রং। সে বন্দরে প্রথম ভিড়ল সুইডিশ এক জাহাজ, যার রং ছিল নীল আর হলুদ। সেই থেকেই নীল–হলুদ জার্সিই হয়ে উঠেছে বোকা জুনিয়র্সের জার্সি।
ভেদাভেদ শুরু হলো যখন রিভার প্লেট তল্পিতল্পা গোছাতে শুরু করল। লা বোকায় থাকছে না রিভার প্লেট। তারা লা বোকা ছেড়ে পাড়ি জমান নুনেজে। সেই থেকে ক্লাবের নিকনেম হয়ে যায় লস মিলিয়নারিয়োস। আর শহরের কোটিপতি, বড়লোকদের ক্লাব হয়ে ওঠে রিভার প্লেট। কিন্তু বোকা নিজেদের শিকড় ছাড়তে রাজি ছিল না। বোকা থেকে যায় তাদের জন্মস্থান বোকাতেই; তাদের নিকনেম হয়ে ওঠে জেনেজিস আর সে সঙ্গে পরিচিতি পায় শ্রমজীবী মানুষের ক্লাব হিসেবে।
দুই দলের পার্থক্যটা চোখে পড়ে তাদের মাঠের দিকে তাকালেই। বোকা জুনিয়র্সের মাঠ ‘লা বোমবোনেরা’র আশপাশে ভাঙা বাড়ি, অগোছালো এক শহর। অন্যদিকে, রিভার প্লেটের মাঠ ‘এস্তাদিও মনুমেন্টাল’, শহরের সবচেয়ে ধনী এলাকায়। আশপাশে বিশাল আকার বাড়ি, সবকিছু পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন। এমনকি খেলার মাঠেও দেখা যায় পার্থক্য। রিভার প্লেটে দেখা যায় পজেশনাল সুন্দর ফুটবল। এই মাঠ থেকে উঠে আসে মাঠের শিল্পীরা। ডি স্টেফানো, আরিয়েল ওর্তেগা, বাতিস্তুতার মতো খেলোয়াড়েরা। আর বোকা জুনিয়র্সের সমর্থকদের কাছে সুন্দর ফুটবলের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ খেলার প্রতি, দলের প্রতি ডেডিকেশন। জান-প্রাণ দিয়ে খেলে যাওয়াই তাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পায়। ম্যারাডোনা, রিকুয়েলমের মতো খেলোয়াড়দের আঁতুড়ঘর হয়েও তাই এদের প্রিয় খেলোয়াড় কার্লোস তেভেজ, মার্টিন পালেরমোরা।
১৯১৩ সালের ২৪ আগস্ট, প্রথম মুখোমুখি হয় দুই দল। সেদিনই বোঝা গিয়েছিল, এদের ভবিষ্যৎ সুবিধের নয়। কারণ, সেই ম্যাচ সবাই যতটা না মনে রেখেছে ফলাফলের জন্য, তার থেকে বেশি মনে রেখেছে পুরো ম্যাচের মারামারির জন্য। ম্যাচে শেষ পর্যন্ত রিভার প্লেট জয় লাভ করে ২-১ গোলে। কিন্তু তা সংকেত দেয়, ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া ঘটনার প্রতি। ১৯৩৫ সালে প্রথমবারের মতো প্রফেশনাল ফুটবলের সুপার ক্লাসিকো অনুষ্ঠিত হয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকনাম হলেও এই নামে মাঠে কেউ কাউকে ডাকে না বললেই চলে। বোকার সমর্থকেরা রিভার প্লেটের সমর্থকদের ডাকে গ্যালিনেস নামে। যার অর্থ মুরগি। ঘটনার সূচনা ১৯৬৬ সালের কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনাল ম্যাচে। সে ম্যাচে বোকা জুনিয়র্স ছিল না। কিন্তু রিভার প্লেট সে ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও ৪-২ গোলে হেরে বসে। পরের ম্যাচে মাঠে মুরগি ছেড়ে দেয় বোকার সমর্থকেরা। শুধু সমর্থকেরা না, এসব নিয়ে খেলোয়াড়েরাও কম যান না। তেভেজ রিভার প্লেটের বিপক্ষে ম্যাচে এই উদ্যাপন করে লাল কার্ডও দেখেছেন। একসময় তো রিভার প্লেটের গাড়িতে মুরগির খাবার ছুড়ে মারা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
রিভার প্লেটের সমর্থকেরাও কম যায় না, তারাও বোকা জুনিয়র্সকে ডাকে বুস্তেরোস নামে। যার অর্থ ঘোড়ার গোবর। কারণ, বোকার স্টেডিয়াম লা বোমবোনেরার পাশে শুরুতে একটি ইটের ফ্যাক্টরি ছিল। যেখানে ইট নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হতো ঘোড়ার গোবর। ডাকনাম পাওয়ার জন্য আর কী চাই!
১৯৬৮ সালের ১২ জুন দিনটি সুপার ক্লাসিকো ইতিহাসের কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সেদিন খেলা হয়েছিল রিভার প্লেটের মাঠ ‘এস্তাদিও মনুমেন্টাল’-এ। সেদিন গেট ১২–তে মোট ৭১ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন মারামারিতে জড়িয়ে। সে ঘটনার এখনো কোনো কারণ পাওয়া যায়নি, এমনকি কোনো বিচার হয়নি। তাই এই দিনকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের কালো দিন হিসেবে ধরা হয়।
বুয়েনস এইরেস ছাড়িয়ে লড়াইটা এখন পুরো বিশ্বের। আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তের ৩৮ ভাগ বোকার সমর্থক, আর ৩৩ ভাগ রিভারের। দেশের ৭১ ভাগ ফুটবলপ্রেমী যখন শুধু দুইটা দলের অন্ধভক্ত, তখন আর কীই–বা বলার বাকি থাকে? ইংলিশ পত্রিকা দ্য অবজারভারের মতে, ৫০টা কাজ যা মৃত্যুর আগে দেখা উচিত, যার মধ্যে প্রথমে রয়েছে সুপার ক্লাসিকো। বলা হয়ে থাকে, বোকা জুনিয়র্স আর রিভার প্লেটের ম্যাচ নির্ধারণ করে সমর্থকেরা, খেলোয়াড়েরা না। প্রতি ম্যাচের উত্তেজনাই ঠিক করে দেয় ম্যাচের জয়–পরাজয়। ইউরোপের ফুটবলের তোড়ে সুপার ক্লাসিকো অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছিল। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর কোপা লিবার্তোদোরেস ফাইনাল ইউরোপকে নতুন করে বুঝিয়ে দেবে ‘রাইভালরি’ কথাটার অর্থ।