বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শুধু এই ফাইনাল বলেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এলেই কেমন যেন অস্ট্রেলিয়ার সামনে মিইয়ে যায় কিউইরা। তাসমানিয়ান প্রতিবেশীদের বিপক্ষে বড় টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে দেখা হলেই নিজেদের সেরাটার কথা ভুলে যায় নিউজিল্যান্ড। দ্বিপাক্ষিক নয়, এমন যে কোনো টুর্নামেন্টে ফাইনাল বা অন্য নকআউট ম্যাচে দুই দলের খেলায় নিউজিল্যান্ডের সর্বশেষ জয় ১৯৮১ সালে!

বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজের প্রথম ফাইনালে জন রাইট আর রিচার্ড হ্যাডলির নৈপুণ্যে অস্ট্রেলিয়াকে ৭৮ রানে হারিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। পরের তিন ফাইনালে যদিও অস্ট্রেলিয়ানদেরই জয়জয়কার। উইলিয়ামসনদের সামনে তাই এ ম্যাচটা একটা গেরো কাটানোর উপলক্ষও বটে।

তবে মঞ্চটা যেহেতু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, সেখানে একটু হলেও সাহস পাচ্ছেন উইলিয়ামসন-বোল্টরা। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মিচেল ম্যাকলেনাহানের আঁটসাঁট বোলিংয়ের জবাব দিতে না পেরে ৮ রানে হেরে গিয়েছিলেন ওয়ার্নার-স্মিথরা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার এটি দ্বিতীয় ফাইনাল, আর নিউজিল্যান্ড ফাইনালে উঠল এবারই প্রথম।

যে-ই জিতুক, এই সংস্করণে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতবে তারা। কিছু বিষয় শিরোপার লড়াইয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আজ। সেসবের দিকেই চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক-

আগে আগ্রাসী ব্যাটিং
দুবাইয়ের পিচে এই বিশ্বকাপে রাতে নয়টা ম্যাচ হয়েছে, সব কটিতেই জিতেছে পরে ব্যাট করা দল। তাই বলে আগে ব্যাট করা মানেই ম্যাচে হার? অবশ্যই নয়। সে ক্ষেত্রে প্রথমে যে দল ব্যাট করবে, তাদের শুরু থেকেই ধুন্ধুমার ব্যাটিং করতে হবে। সন্ধ্যার পরে দুবাইয়ে শিশির পড়ে, যা পরে ব্যাট করা দলকে সুবিধা দেয়।

তবে পরে ব্যাট করার দলের সাফল্যের পেছনে যে শুধু শিশিরই ভূমিকা রাখছে, তা কিন্তু নয়। শুরুতে ব্যাট করা প্রতিটি দলই এবার সাবধানী ব্যাটিং করছে। প্রথমে ব্যাট করা দল উইকেটপ্রতি মাত্র ১৭ করে রান তুলেছে, যা এই পিচের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৭ রান কম। শুরুতে ব্যাট করা দল আক্রমণাত্মক শটও খেলছে মাত্র ৫১ শতাংশ। যেখানে রান তাড়া করা দল খেলেছে ৫৬ শতাংশ আক্রমণাত্মক শট।

default-image

ডেভিড ওয়ার্নার
অস্ট্রেলিয়াকে যদি শুরুতে ব্যাট করতে হয়, সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে ডেভিড ওয়ার্নারের। সেমিফাইনালে খেলা অস্ট্রেলিয়ার একাদশে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ছিলেন মাত্র তিনজন। লোয়ার অর্ডারের ম্যাথু ওয়েড আর টেইল-এন্ডার হিসেবে মিচেল স্টার্ককে বাদ দিলে বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে শুধু ওয়ার্নারই বাঁহাতি।

নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ইশ সোধি ও মিচেল স্যান্টনারের স্পিন। এঁদের মধ্যে একজন ডানহাতি রিস্ট স্পিনার (সোধি), আরেকজন বাঁহাতি ফিঙ্গার স্পিনার (স্যান্টনার)। দুজনই ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বল বাইরে বের করে নিতে পারদর্শী, যে ধরনের বল খেলতে সাধারণত ডানহাতি ব্যাটসম্যানরা পছন্দ করেন না। স্বাভাবিকভাবেই তাই আজ ওয়ার্নারকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে সোধি-স্যান্টনারদের স্পিন সামলানোর জন্য।

সোধি-স্যান্টনারের যুগল স্পিন
আগেই সোধি-স্যান্টনারের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে। এ বিশ্বকাপে দুজনই ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বেশ সফল। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে অবশ্য সেটা বলা যায় না। সেমিফাইনালের আগে দুজন মিলে আটবার ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের আউট করেছেন, সেমিফাইনালের হিসেব ধরলে নয়বার।

শেষ চারের আগে ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে দুজনের গড় আর ইকোনমি রেট ছিল যথাক্রমে ছিল ১৯ ও ৬.৪। ওদিকে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে দুজনের গড় আর ইকোনমি রেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ আর ৭.৭-এ। লেগ স্পিনারদের অন্যতম অস্ত্র গুগলি, যে অস্ত্রটা সোধিকে বলতে গেলে ব্যবহার করতে দেখাই যায় না। বল সেভাবে ঘোরাতেও পারেন না, নিজের উচ্চতাকে ব্যবহার করে বলে ফ্লাইট দিতে বেশি পছন্দ করেন তিনি, অনেকটা অনিল কুম্বলের মতো।

default-image

দুজনই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে তেমন কার্যকরী নন। ওয়ার্নার আর ওয়েডের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারে ডানহাতি ব্যাটসম্যান আছেন অ্যারন ফিঞ্চ, মিচেল মার্শ, স্টিভেন স্মিথ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও মার্কাস স্টয়নিস। এদের বিপক্ষে সোধি-স্যান্টনারদের বেশ দাপুটে থাকারই কথা।

অফ স্পিনে ফিঞ্চের সাফল্য
একটা ছোট্ট তথ্য দেওয়া যাক। টুর্নামেন্টজুড়ে ভালো বোলিং করে আসা অফ স্পিনার মঈন আলীকে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বোলিং করতেই দেখা যায়নি। কারণ, ক্রিজে ফিঞ্চের উপস্থিতি। ডানহাতি ফিঞ্চের বিপক্ষে শুরুর দিকে লেগস্পিনার আদিল রশিদ ও পরে লিয়াম লিভিংস্টোনকে ব্যবহার করেছিল ইংল্যান্ড।

যদিও সে ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া নাকানি-চুবানি খেয়েছিল, তাও ফিঞ্চ একাই লড়ে গিয়েছিলেন। এদিক দিয়ে অবশ্য নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

গাপটিল-মিচেলের দুর্বলতা
নিউজিল্যান্ডের দুই ওপেনারই ডানহাতি, দুজনই অফস্পিনে তেমন স্বচ্ছন্দ নন। ডানহাতি অফ স্পিনে সেমিফাইনালের আগে ড্যারিল মিচেলের স্ট্রাইক রেট আর গড় ছিল যথাক্রমে ৭.৬৯ ও ১৮.২০। মার্টিন গাপটিলের ক্ষেত্রে সেটা ৬.৮৭ ও ২২.৬২।

ওদিকে বাঁহাতি পেসারদের বিপক্ষেও গাপটিল সেভাবে রান তুলতে পারেন না, যা নিঃসন্দেহে মিচেল স্টার্ককে সাহস জোগাবে। আরেক কিউই ওপেনার মডেলের দুর্বলতা আবার ফুল লেংথের ডেলিভারিতে। শর্ট বলে যেখানে প্রায় ১৬০ স্ট্রাইক রেটে খেলতে পারেন, ফুল লেংথের ডেলিভারিতে তেমনটা পারেন না। সেখানে তাঁর গড় মাত্র ১৩।

default-image

অ্যাডাম জাম্পা
সোধি-স্যান্টনার যে কারণে ম্যাচ নিয়ে আশাবাদী, সে একই কারণে আশাবাদী হতে পারেন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা। বেশ সফল এক টুর্নামেন্ট কাটাচ্ছেন তিনি। ছয় ম্যাচে ১২ উইকেট নিয়েছেন ৫.৬৯ ইকোনমি রেটে বোলিং করে। ডানহাতি এই লেগ স্পিনার বল করার জন্য পাচ্ছেন কিউই টপ অর্ডারের পাঁচজন ডানহাতি ব্যাটসম্যানকে। যে বাঁহাতি ডেভন কনওয়ে ছিলেন, চোটের কারণে তিনিও ফাইনালে খেলতে পারছেন না।

তাঁর জায়গায় ডানহাতি টিম সেইফার্টের একাদশে ঢোকার সম্ভাবনাই বেশি। সোধির সঙ্গে জাম্পার মূল পার্থক্য বল স্কিড করার ক্ষেত্রে। জাম্পা বেশ ভালোভাবে বল স্কিড করাতে পারেন। যে কারণে তাঁর বল খেলতে না পারলে ব্যাটসম্যানের বোল্ড হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

টিম সেইফার্ট
কনওয়ের জায়গায় একাদশে ঢুকতে পারেন সেইফার্ট, আগেই বলা হয়েছে। সেইফার্ট অবশ্য স্পিনের বিপক্ষে অনেক কার্যকরী। কেইন উইলিয়ামসন তেমন ফর্মে নেই, স্পিনের বিপক্ষে তেমন হাত খুলে খেলতে দেখা যাচ্ছে না তাঁকে। সে হিসেবে জাম্পা ও ম্যাক্সওয়েলের স্পিনের বিপক্ষে সেইফার্টের সুইপ ও রিভার্স-সুইপ করার প্রবণতা বেশ কাজে আসতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বোলার

স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জাম্পা ও জশ হ্যাজলউডের ১৬ ওভারের পর কোন বোলার বা বোলারদের দিয়ে অস্ট্রেলিয়া বাকি ৪ ওভার করায়, সেটার ওপর ম্যাচের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করবে। এই ৪ ওভারের জন্য অস্ট্রেলিয়া ঘুরেফিরে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অফ স্পিন আর মার্শ-স্টয়নিসের মিডিয়াম পেসের ওপর নির্ভর করেছে বেশির ভাগ ম্যাচেই। নিউজিল্যান্ডের টপ অর্ডার এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত স্পিনের বিপক্ষে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেনি, সে হিসেবে এ ম্যাচে পঞ্চম বোলার হিসেবে ম্যাক্সওয়েলকে ৪ ওভারই করতে দেখার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

এ টুর্নামেন্টে কিউইরা আবার প্রতিপক্ষের পঞ্চম বোলারের ওপর সেভাবে চড়াও হতে পারেনি। পঞ্চম বোলারের মাত্র ৫৪ শতাংশ বলে আক্রমণাত্মক শট খেলেছে তারা। ফাইনাল জিততে চাইলে পঞ্চম বোলারের বিপক্ষে উইলিয়ামসন-ফিলিপসদের খোলস ছেড়ে বের হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

default-image

পাওয়ার প্লেতে বোল্ট বনাম স্টার্ক
ক্রিকেটের এ সংস্করণে নতুন বলে বোল্ট বেশ কার্যকরী। কিউই এ গতিতারকা পেসের সঙ্গে সুইংটাও মেশাতে পারেন কার্যকরী উপায়ে। এ বিশ্বকাপে অন্য যে কোনো বোলারের চেয়ে পাওয়ারপ্লেতে সবচেয়ে বেশি সুইং করাচ্ছেন বোল্ট। একই কাজ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে করে যাচ্ছেন আরেক বাঁহাতি ফাস্ট বোলার মিচেল স্টার্ক।

পাওয়ারপ্লেতে অবশ্য স্টার্ককে ভালোভাবে খেলেছিলেন ইংল্যান্ডের জেসন রয়-জস বাটলাররা, ২ ওভারে ২২ রান নিয়েছিলেন তাঁরা। ফুল লেংথের ডেলিভারিগুলো সপাটে পেটাচ্ছিলেন, ওদিকে শর্ট বলগুলো খেলছিলেন সাবধানে।

তবে বোল্ট আর স্টার্কের মধ্যে পাওয়ারপ্লেতে বোল্ট ফুল লেংথের ডেলিভারি তুলনামূলকভাবে কম দেন। তবে বোল্টের ফুল লেংথের ডেলিভারিগুলো কার্যকরীও হয় বেশি। এ পর্যন্ত পাওয়ারপ্লেতে দশটি ফুল লেংথের ডেলিভারি দিয়ে দুটি উইকেট তুলে নিয়েছেন বোল্ট, যেখানে স্টার্ক একটু পিছিয়ে আছেন।

নিউজিল্যান্ডের লোয়ার অর্ডার
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পার্থক্যের আরেকটা জায়গা হলো লোয়ার অর্ডার ব্যাটিং। ব্যাটিংয়ের শক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে নিউজিল্যান্ড খানিকটা পিছিয়েই এবং সেটা সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে লোয়ার অর্ডারে এসে।

ইনিংসের শেষ দিকে পেটানোর মতো অস্ট্রেলিয়ার হাতে ম্যাথু ওয়েড ও মার্কাস স্টয়নিসরা থাকলেও ‘ফিনিশার’ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের আছে শুধু জিমি নিশাম। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে শুধু নামিবিয়ার বিপক্ষেই ঝলসে উঠেছিলেন নিশাম, সে একই প্রত্যাশা ফাইনালেও থাকবে তাঁর ওপর। কিন্তু নিশাম যদি ব্যর্থ হন? সে চিন্তাটা হয়তো করতে চাইবে না কিউইরা!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন