default-image

আইপিএলে খেলা বিশ্বের যেকোনো ক্রিকেটারের জন্য স্বপ্ন। সে কারণেই সাকিব আল হাসান এবার দল না পাওয়ায় এত আলোচনা। তাসকিন আহমেদ ডাক পেয়েও না যাওয়ায় তাঁর পাশে এত সমব্যথী। সেখানে মোস্তাফিজ প্রবল ব্যতিক্রম। তাঁর আইপিএল–স্বপ্ন পূরণে কোনো কিছুই বাধা নয়। এমনকি ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৫ মে শুরু দুই টেস্টের সিরিজেও হয়তো মোস্তাফিজের অভাবটাই শুধু উপলব্ধি হবে, মোস্তাফিজকে পাওয়া যাবে না। তিনি তখনো থেকে যাবেন আইপিএলে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্দান্ত বোলিং করে আসা দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও শরীফুল ইসলামকে শ্রীলঙ্কা সিরিজে হয়তো পাবে না বাংলাদেশ। দুজনেরই চোট আছে, চিকিৎসার জন্য দুজনেরই দেশের বাইরে যাওয়ার কথা। এই সিরিজে পেসার হিসেবে নির্বাচকদের বিবেচনায় আছেন ইবাদত হোসেন, খালেদ আহমেদ, আবু জায়েদ, শহীদুল ইসলাম ও রেজাউর রহমান। পেসারদের কাছে এবার প্রত্যাশাও থাকবে বেশি।

ঘরের মাঠের সিরিজ মানে স্পিন–সহায়ক উইকেটে স্পিননির্ভর বোলিং আক্রমণ, এমন নীতিতে অন্তত আসন্ন শ্রীলঙ্কা সিরিজে হাঁটার ইচ্ছা নেই বিসিবির। শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানদের জন্য স্পিন–ফাঁদ পেতে উল্টো না আবার শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের স্পিনে পা আটকে যায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদেরই! কাজেই উইকেটের রেসিপি বদলে বোলিং আক্রমণে পেসনির্ভরতাও থাকবে আর সেখানেই আফসোস তাসকিন-শরীফুলের জন্য।

যে আইপিএলে খেলা নিয়ে সাকিবকে ফি বছর বিতর্কে জড়াতে হয়, মোস্তাফিজ টেস্ট না খেলে সেই আইপিএলেই বোলিং করে যাচ্ছেন নীরবে। অথচ আইপিএলের জন্য তিনিও কখনো কখনো জাতীয় দল থেকে মুখ ফিরিয়েছেন।

আফসোস মোস্তাফিজের জন্যও এবং কাল তা ঝরল নির্বাচক হাবিবুল বাশারের কণ্ঠে, ‘শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মোস্তাফিজকে টেস্ট দলে পেলে ভালো হতো, এই কন্ডিশনে ওর বোলিংটা দরকার ছিল। আমি এখনো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, টেস্টে ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। বিশেষ করে ঘরের মাঠে সে আমাদের ১ নম্বর পেস পছন্দ হতে পারে।’

জাতীয় দলে পেসারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটাও টেস্ট থেকে দূরে থাকতে সুবিধা করে দিয়েছে মোস্তাফিজকে। তাঁর টেস্টে না খেলাটাও যেন এখন চোখে পড়ে না কারও! অথচ অভিজ্ঞতার কারণে এখন পেস আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তাঁরই। তাতে পেসারদের বিশ্রাম দিয়ে খেলানোটাও হতো আরও সহজ।

মোস্তাফিজ সর্বশেষ টেস্ট খেলেছেন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। এরপর সদ্য সমাপ্ত দক্ষিণ আফ্রিকা সফর পর্যন্ত টানা ১০টি টেস্ট বাংলাদেশ খেলেছে তাঁকে ছাড়াই। লাল বলের ক্রিকেটের প্রতি বাঁহাতি এই পেসারের অলিখিত অনীহা আরও আগে থেকেই, ক্রিকেটারদের সঙ্গে বিসিবির সর্বশেষ চুক্তিতে যেটি লিখিত রূপ পেয়েছে।

default-image

অনেক ভেবেচিন্তে চুক্তিতে মোস্তাফিজ উল্লেখই করে দিয়েছেন, যত দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জৈব সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে হবে, তত দিন তিনি টেস্ট খেলবেন না। জৈব সুরক্ষাবলয়ের অবরুদ্ধ পরিবেশে হাঁপিয়ে ওঠেন বলেই নাকি এমন সিদ্ধান্ত।

বিসিবিও তাই মোস্তাফিজকে রাখেনি টেস্টের চুক্তিতে। মোস্তাফিজের তাতে ভালোই হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে জৈব সুরক্ষাবলয়ের ঘেরাটোপ অনেকটাই উঠে গেলেও তিনি টেস্ট বাদ দিয়ে আইপিএল খেলে যেতে পারছেন কোনো পিছুটান না রেখেই। দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট খেলেননি, খেলার কথা নয় আসন্ন শ্রীলঙ্কা সিরিজেও। ‘এখন তো আর ওকে নেওয়ার উপায় নেই। আমরাই তাকে আইপিএল খেলতে ছেড়ে দিয়েছি’—যেন একটা দীর্ঘশ্বাসই বেরিয়ে পড়ল হাবিবুলের কথায়।

টেস্টের প্রতি বিরাগ আর আইপিএলের প্রতি অনুরাগ মোস্তাফিজের নতুন নয়। ক্যারিয়ারের শুরুতেই তারকাখ্যাতি পেয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন চোটে ভুগেছেন। এরপর আর ক্রিকেটারজীবনের উত্থান-পতন তাঁকে সেভাবে দেখতে হয়নি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘চুপচাপ ছেলে’ হিসেবে থেকে গেছেন সব তর্কবিতর্কের ঊর্ধ্বে।

default-image

আইপিএলের প্রতি মোস্তাফিজের অনুরাগের কারণটাও বুঝতে সমস্যা হয় না। অল্প পরিশ্রমে টাকা কামানোর এমন সুযোগ কে না নিতে চাইবেন! সেই পথ মসৃণ রাখতে থাকতে হবে চোটমুক্ত। পাঁচ দিনের টেস্ট দিনে দিনে সে কারণেই অপ্রিয় হয়ে উঠেছে মোস্তাফিজের। মর্যাদার খেলা সফেদ টেস্ট তাঁর ক্রিকেটীয় চেতনায় তেমন ভাবান্তর জাগায় না। ঢাক ঢাক গুড় গুড় না করে মোস্তাফিজ তাহলে সরাসরি বলে দিলেই পারেন, টেস্ট আর খেলবেন না।

যে আইপিএলে খেলা নিয়ে সাকিবকে ফি বছর বিতর্কে জড়াতে হয়, মোস্তাফিজ টেস্ট না খেলে সেই আইপিএলেই বোলিং করে যাচ্ছেন নীরবে। অথচ আইপিএলের জন্য তিনিও অনেক সময় জাতীয় দল থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। এখন যেমন টেস্ট খেলছেন না, গত বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠের টি-টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচটাও খেলেননি আইপিএলে যাওয়ার আগে একটু ‘ফ্রেশ’ হতে।

এমনও শোনা যায়, আইপিএলে খেলা নিয়ে সাকিবের মতো অনাহূত বিতর্কে না পড়তে পর্দার আড়ালে আরও অনেক কিছুই করেন মোস্তাফিজ, যেটি করেন না বলেই বিতর্কে জড়ান সাকিব।

টেস্ট না খেলার গ্রহণযোগ্য কারণ হাতড়াতে হাতড়াতেই অবশেষে জৈব সুরক্ষাবলয়ের অজুহাত খুঁজে পেয়েছেন মোস্তাফিজ। তবে সেটিও আর গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন জৈব সুরক্ষাবলয় বলে কিছু নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ক্রিকেটাররা আগের মতোই মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে ঘুরেছেন, ওয়ানডে সিরিজে মোস্তাফিজ নিজেও ছিলেন সেই দলে। বরং দিল্লি ক্যাপিটালসে করোনার হানায় আইপিএলেই তাঁর এখন কিছুটা অবরুদ্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। আইপিএল বলেই হয়তো তিনি সহ্য করে যাবেন সেটি।

তারপরও কি বলা উচিত হবে, মোস্তাফিজ যতটা আইপিএলের, ততটাই বাংলাদেশেরও?

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন