বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন করতে পারেন, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ বিসিবির ‘হার্ট’ কেন? ‘হার্ট’ এ কারণে যে বিসিবির আরও অনেক কর্মকাণ্ডকে প্রেক্ষাপটে রেখে দেশের ক্রিকেটের চূড়ান্ত ছবিটা আমরা যে ক্যানভাসে ফুটে উঠতে দেখি, সেটি হলো জাতীয় দল। জাতীয় দল সফল হলে আমরা উল্লাস করি। জাতীয় দল ব্যর্থ হলে আমরা সমালোচনা করি। স্পন্দনের এমন ওঠানামা তো হৃদয়েই থাকে! ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের মূল কাজ যেহেতু এই জাতীয় দলকে ঘিরেই, একে ক্রিকেটের হৃৎপিণ্ড বলাই যায়।

বিসিবির এই বিভাগ জাতীয় দল গঠন থেকে শুরু করে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা কী খাবেন, কী পরবেন—সবই দেখে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে আইসিসি ও অন্য দেশের বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, আন্তর্জাতিক খেলার সূচি ঠিক করা, ‘এ’ দল নির্বাচন, ক্রিকেটার-কোচদের চুক্তি-ছুটি-শৃঙ্খলা, জাতীয় নির্বাচক কমিটি পরিচালনা—সবই ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের আওতায়। সব মিলিয়ে এ বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটের শিরা-উপশিরায় রক্ত সরবরাহকারী অঙ্গ, ক্রিকেটের প্রাণ।

তো সেই প্রাণে এত বছর কাটিয়ে এখন কেন সেখান থেকে ছুটে যেতে চাইছেন আকরাম খান? একটা প্রকাশ্য কারণ তো বলাই হলো—এখানে তিনি অনেকটা পুতুলের ভূমিকায় দিন যাপন করছেন। তাতে হয়তো তাঁর আত্মসম্মানে ঘা লাগছে। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী—সবারই প্রিয় আকরাম খান, সবার কাছেই তাঁর দারুণ গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু এ অর্জনে কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দিচ্ছে ক্রিকেট পরিচালনাপ্রধান হিসেবে তাঁর যথাযথ সম্মান না পাওয়া। এ পদে তিনি যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের চাঁদ, যার নিজের কোনো আলো নেই।

default-image

নিয়ম অনুযায়ী বড় কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ তা বোর্ডকে জানাবে। বোর্ড আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগকে জানালে তারা সেটা বাস্তবায়ন করবে। আবার অনেক সময় ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগই পারে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বোর্ড থেকে তা অনুমোদন করিয়ে নিতে।

কিন্তু আকরাম খান ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান থাকার সময়ে এমন অনেক উদাহরণই আছে, যেখানে এ প্রক্রিয়া মানা হয়নি। সিদ্ধান্ত এসেছে স্বয়ং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের কাছ থেকে। ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ শুধু তা বাস্তবায়ন করে গেছে এবং অবশ্যই বিনা প্রতিবাদে। কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদকে জাতীয় দলের টিম ডিরেক্টর করা, পাকিস্তান সিরিজের আগে জাতীয় দলের ক্যাম্পে কয়েক তরুণ ক্রিকেটারকে ডাকা এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।

‘কাহিনি’ জমানোর প্রয়োজনে এখানে চাইলে বিসিবি সভাপতিকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন। তিনি কেন আকরাম খানকে কাজের স্বাধীনতা না দিয়ে ওপর থেকে ছড়ি ঘোরাবেন? সবকিছুতে নাক গলাবেন? তাঁর কারণেই নিশ্চয়ই আকরাম খান আজ ক্রিকেটের হৃদয় ছিন্ন করে চলে যেতে চাইছেন!

কিন্তু যদি উল্টো প্রশ্ন করা হয়, আকরাম খান কি কাজ করার সেই স্বাধীনতা কখনো চেয়েছেন? কখনো প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁকে কেন কাজ করতে দেওয়া হয় না? কখনো প্রতিবাদী হয়েছেন? কোচ-ক্রিকেটাররাই-বা কেন তাঁকে পাশ কাটিয়ে যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি সভাপতির দ্বারস্থ হন? তাঁরা কেন আস্থা রাখতে পারেন না ক্রিকেট পরিচালনাপ্রধানের ওপর? আর বিসিবি সভাপতির কাছে কেউ যদি কোনো সমস্যা নিয়ে যান, তাঁকে তো সমাধানের চেষ্টা করতেই হবে!

default-image

আকরাম খান আসলেই কাজের স্বাধীনতা না পেয়ে সরে যাচ্ছেন কিনা, সেটা তাই একটা প্রশ্ন বটে। দুদিন আগে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের যখন পদ ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানালেন, তখনো তিনি বলেছেন, ‘মাননীয় বোর্ড প্রেসিডেন্ট, আমার যিনি অভিভাবক, গত আট বছর যাঁর থেকে আমি সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছি ভালো-খারাপ সব সময়ে, ওনার সঙ্গে আলাপ করে হয়তো কালকের মধ্যে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব।’

এই যদি হয় কাজ করতে না পারার প্রতিক্রিয়া, তাহলে দুষবেন কাকে? আসলে স্বার্থের সমীকরণ কখনো কখনো আপনাকে শেষ কথাটা বলতে দেবে না, এটাই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সংস্কৃতি। কারণ সব ছেড়ে দিয়েও কিছু ধরে রাখার আশাটা ছাড়া যায় না। কথাটা দেশের ক্রিকেটনীতি নির্ধারণী মহলের সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

একটা সময় ছিল, বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে ক্রিকেটার-সংগঠক বলতে তেমন কেউ ছিলেন না। দেশের ক্রিকেট চালাতেন সংগঠকেরা। এরপর দাবি উঠল, ক্রিকেট পরিচালনার ভার থাকতে হবে ক্রিকেটারদের হাতেও। সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকে আগ্রহী হলেন, তাঁরা নানাভাবে নির্বাচিত হয়ে বোর্ডেও এলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করলেন।

আকরাম খানের সঙ্গে বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আছেন আরও দুজন—খালেদ মাহমুদ ও নাঈমুর রহমান। কিন্তু ক্রিকেটার হিসেবে পেছনে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার রেখেও সংগঠক পরিচয়ে দেশের ক্রিকেটকে তাঁরা কতটুকু দিতে পারছেন, সেই প্রশ্ন তুললে উত্তর খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে।

default-image

আকরাম খান একসময় ছিলেন বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান। এরপর আসেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের দায়িত্বে, যে বিভাগ বরাবরই ছিল বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের ওপর নির্ভরশীল। একসময় সে দায়িত্বে ছিলেন বর্তমানে আইসিসির প্যানেল আম্পায়ার ও সাবেক ক্রিকেটার শরফুদ্দৈালা ইবনে শহীদ, পরে দায়িত্ব নেন কিছুদিন আগে বিসিবি থেকে ইস্তফা দেওয়া আরেক সাবেক ক্রিকেটার সাব্বির খান। দুজনই এ কাজে তাঁদের যোগ্যতার পরীক্ষায় লেটার মার্ক পেয়ে পাশ করে গেছেন।

কিন্তু বিভাগীয় ব্যবস্থাপকেরা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই করেন শুধু, সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ বা জাতীয় দল পরিচালনার কাজটা হয় ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির নির্দেশনায়। সে কাজে কমিটির প্রধান হিসেবে আকরাম খান কতটুকু সফল, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

জাতীয় দলের কোচ, ক্রিকেটাররা যখন তাঁদের যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি বোর্ড সভাপতিকে ফোন দেওয়ার অধিকার পেয়ে যান, ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির প্রধানকে যখন বারবারই ওপরের অঙ্গুলিহেলনে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন, ক্রিকেটারদের ছুটির পরিকল্পনা, অবসরের ভাবনা—সবই যখন তিনি জানেন সবার শেষে, তখন আসলে সফল হওয়া কঠিনও।

ক্রিকেট পরিচালনাপ্রধান হলেও ক্রিকেটার-কোচদের তাঁদের কাজের জন্য কখনোই আকরাম খানের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। সেটি তাঁরা সরাসরি করেন দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, সেই ‘চেইন অব কমান্ডে’ আকরাম খান নামটা শুধুই একটা শোভাবর্ধক হয়ে আছে।

default-image

এমন চরিত্র থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে আকরাম খানকে হয়তো অনেকেই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তবে আসলেই তিনি চরিত্রটিতে অসহ্য হয়ে একান্ত নিজের সিদ্ধান্তে সরে এসেছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকেই।

আকরাম খান বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন, সামনে বাংলাদেশের ক্রিকেটের খারাপ সময়। অভিজ্ঞরা ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে, নতুনদের মধ্যেও নেই আশাজাগানিয়া ঝলক। এ অবস্থায় দেশের ক্রিকেটের হৃৎপিণ্ডে থাকা মানে ক্রিকেটের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার দায় নেওয়া। ক্রিকেট পরিচালনাপ্রধানের পদ থেকে সরে গিয়ে হয়তো তিনি সেই দায় থেকেও বাঁচতে চাইছেন।

আবার এমনও শোনা যায়, কমিটি পুনর্বিন্যাসের আসন্ন বোর্ড সভায় আকরাম খানের পরিবর্তে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হবে নতুন কাউকে। সেই পূর্বাভাস পেয়েই হয়তো আকরাম খান ঠিক করেছেন, তাঁকে বাদ দেওয়ার আগে তিনিই আর এ পদে না থাকার ইচ্ছার কথা জানিয়ে দিয়ে সসম্মানে বিদায় নেবেন।

আকরামের মতো জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ বোর্ড পরিচালক হয়েও অনেক বেশি আনন্দ পান মাঠের ক্রিকেটে। নিজেকে বেশি সম্পৃক্ত রাখেন সেদিকে। অনেক খাটাখাটনি করেন, যদিও এই কাজগুলো মাহমুদ একজন পেশাদার কোচ বা ম্যানেজার হয়ে করলেই বেশি মানাত। তাঁকে নিয়ে বিতর্কটাও তখন কম হতো। বিসিবির পরিচালকের পাশাপাশি বোর্ড এবং বোর্ডের বাইরে মাহমুদ এত বেশি ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট পদ অলংকৃত করে রেখেছেন যে স্বার্থের সংঘাত সেখানে অনিবার্য।

default-image

বোর্ডে নাঈমুর রহমানের উপস্থিতি কদাচই বোঝা যায়। একসময় ক্রিকেট পরিচালনাপ্রধানের দায়িত্বে থাকা নাঈমুর এখন বিসিবির হাইপারফরম্যান্স বিভাগের প্রধান। যখন যে দায়িত্বে থাকেন, নাঈমুর রুটিন কাজগুলো ঠিকঠাক করেন। বোর্ডের ভেতরে দু-একবার তাঁর প্রতিবাদী হয়ে ওঠার কথাও শোনা গেছে। কিন্তু নাঈমুর নিজে একজন সাংসদ। বিসিবির সভাপতি তাঁর দলেরই প্রভাবশালী আরেক সাংসদ। কাজেই বোর্ডে নাঈমুরের যেকোনো প্রতিবাদী আচরণ একসময় স্তিমিত হয়ে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়কও তাই পারেননি দেশের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছাপ রাখার মতো কিছু করতে।

কেউ কলঙ্ক থেকে বাঁচতে চান, দায় নিতে চান না ব্যর্থতার, কারও স্বার্থের সংঘাত, কারও রাজনৈতিক ‘আচরণবিধি’—সব মিলিয়েই আকরাম-মাহমুদ-নাঈমুররা তাঁদের খেলোয়াড়ি জীবনের পারফরম্যান্সকে টেনে আনতে পারেননি বোর্ড পরিচালকের ভূমিকায়।

বোর্ড পরিচালকেরা নীতিনির্ধারণী কাজ করবেন, দেশের ক্রিকেটকে দিকনির্দেশনা দেবেন, অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাবেন। ক্রিকেটার থেকে বোর্ড পরিচালক হওয়াদের কাছে সেই আশাটা আরও বেশি। কিন্তু কোথায় সেই আলো? যে কারণেই হোক জাতীয় দলের তিন সাবেক অধিনায়কের কাছ থেকে প্রত্যাশার সিকি ভাগও পায়নি বাংলাদেশের ক্রিকেট। আর তাঁরাই যখন পারলেন না, আর কেউ পারবেন বলেও মনে হয় না।

পারিবারিক ও শারীরিক কারণের আবহসংগীত বাজিয়ে আকরাম খানের ‘আত্মসমর্পণ’ আমাদের আসলে সে অপ্রিয় সত্যটাই জানিয়ে দিল—মাঠের ক্রিকেট আর মাঠের বাইরের ক্রিকেট এক নয়। সবাই পারেন না সৌরভ গাঙ্গুলী হতে।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন