বিজ্ঞাপন
default-image

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আজ বাংলাদেশের যেটুকুই অবস্থান, তার পেছনে আছে অনেক জানা–অজানা উদ্যোগ, প্রচেষ্টা, ত্যাগ আর কৃতিত্বের গল্প। এমন অনেক স্মারকই হয়তো অবহেলায় পড়ে আছে, যেগুলোর উপযুক্ত প্রদর্শনী বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই প্রদর্শনীর মঞ্চটাই আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ।

অথচ টেস্ট খেলুড়ে প্রায় সব দেশেই আছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের অসংখ্য ক্রিকেট জাদুঘর। ১৯৫৩ সালে লন্ডনের মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবে (এমসিসি) জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু এই সংস্কৃতির। ক্রিকেট দুনিয়ার ঐতিহ্য আর স্মৃতির ধারক এই ক্রিকেট মিউজিয়াম, যেখানে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মারকও। ইংল্যান্ডের প্রায় সব কাউন্টি ক্লাবেরই ক্রিকেট জাদুঘর আছে।

ক্রিকেটের জাদুঘরগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাডম্যান মিউজিয়াম, এমসিজি স্পোর্টস মিউজিয়াম, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট হেরিটেজ সেন্টার, নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট মিউজিয়াম, পাকিস্তানে লাহোরের ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমি মিউজিয়াম, জিমখানা ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও ভারতের কলকাতায় ইডেন গার্ডেনের নিজস্ব ক্রিকেট স্মারক সংগ্রহশালা ও সদ্য প্রতিষ্ঠিত শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট মিউজিয়াম উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশে ব্যক্তিপর্যায়েও ক্রিকেট জাদুঘর বা সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে। যেমন দুবাইয়ের শ্যাম ভাটিয়া ক্রিকেট মিউজিয়াম, কলম্বোর ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফে, পুনের ব্লেডস অব গ্লোরি এবং কলকাতার ফ্যানাটিক স্পোর্টস মিউজিয়াম।

default-image

একজন ক্রিকেট স্মারক সংগ্রাহক হিসেবে ক্রিকেট জাদুঘরের প্রতি আমার আকর্ষণ একটু বেশিই। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে যাওয়ার সুবাদে এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা ক্রিকেট জাদুঘরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। কথা বলেছি সংগ্রাহকদের সঙ্গেও। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটপ্রেমী দম্পতি জেমস ও গ্যাবরিয়েল ওয়াইট প্রতিষ্ঠা করেছেন ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফে। বাস্তবে এটা যত না ক্যাফে, তার চেয়ে বেশি একটি সমৃদ্ধ ক্রিকেট জাদুঘরই।

এখানে ঢোকামাত্রই আপনি ক্রিকেট ইতিহাসের সাগরে ডুবে যাবেন। কী নেই এখানে! শত শত ক্রিকেট স্মারকে ভরা ক্যাফে। দেয়ালগুলো মোড়ানো নানা স্মারকে। ১৯৬৮ সালে নটিংহামের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ লিজেন্ড স্যার গ্যারি সোবার্সের ছয় বলে ছয় ছক্কা মারার ব্যাটটি খুঁজে পাবেন এখানেই। আছে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান ও শচীন টেন্ডুলকারের অটোগ্রাফ দেওয়া ব্যাট। ওয়াসিম আকরামের বিশ্বকাপ ফাইনালের জার্সি, সুনীল গাভাস্কারের হ্যাট, জোয়েল গার্নারের জুতা, বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কা দলের সবার অটোগ্রাফ দেওয়া ব্যাট।

আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় শিল্পপতি শ্যাম ভাটিয়া ২০১০ সালে দুবাইয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রিকেটের বিরাট এক সংগ্রহশালা শ্যাম ভাটিয়া ক্রিকেট মিউজিয়াম। বিশ্বের বিখ্যাত সব খেলোয়াড়ের ব্যবহৃত স্মারক আর ক্রিকেটের ওপর লেখা বইয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহশালাটির দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস। ব্র্যাডম্যান থেকে শুরু করে আমাদের সাকিব আল হাসান—বিশ্বসেরা কারও অটোগ্রাফই বাদ নেই। আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে একটি ছবির ফ্রেম, যেখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৯৭৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সব বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে আঁকা ছবি। ছবির পাশে আছে অধিনায়কদের স্বহস্তে দেওয়া অটোগ্রাফও।

default-image

কলকাতার ফ্যানাটিক স্পোর্টস মিউজিয়ামের আয়োজন এবং সংগ্রহও মুগ্ধ করার মতো। ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখক বোরিয়া মজুমদার এটির প্রতিষ্ঠাতা। এখানে ফুটবল ও অলিম্পিকের পাশাপাশি আছে ক্রিকেট স্মারকেরও বিশাল সংগ্রহ। ডব্লিউ জি গ্রেসের নিজের হাতে লেখা চিঠি, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যবহৃত ব্যাট থেকে শুরু করে শচীন টেন্ডুলকারের শততম সেঞ্চুরিতে ব্যবহৃত গ্লাভস এবং সৌরভ গাঙ্গুলীর ব্যবহৃত ব্যাট—সবই পাবেন এখানে।

এসব জাদুঘরে সাজানো খণ্ড খণ্ড ক্রিকেট ইতিহাস দুঃখ বাড়িয়ে দেয়—বাংলাদেশে কেন আজও হলো না একটা ক্রিকেট জাদুঘর! আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাস হয়তো অন্য অনেক দেশের মতো বেশি দিনের নয়। কিন্তু আমাদেরও তো এমন কিছু ইতিহাস–ঐতিহ্য আছে, যেগুলো ধরে রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেসবের অনেক কিছুই এখন শোভা পাচ্ছে ভিন দেশের জাদুঘরে। লর্ডসের এমসিসি জাদুঘরে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে আমিনুল ইসলামের সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্যাট, নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট মিউজিয়ামে সাকিব আল হাসান-মুশফিকুর রহিম জুটির রেকর্ড গড়া জার্সি আর দুবাইয়ের শ্যাম ভাটিয়া ক্রিকেট মিউজিয়ামে আছে সাকিব আল হাসানের পোর্ট্রেট দেওয়া তাঁর অটোগ্রাফ।

১৯৯৮ সাল থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করা বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্মারকগুলো নিয়ে ২০১১ সালে ঢাকার রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় তিন দিনের ক্রিকেট স্মারক প্রদর্শনী। এরপর ২০১৩ সালে জাতীয় জাদুঘরেও এ রকম একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) আয়োজনে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দৃক গ্যালারিতে এবং ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট ফেস্টিভ্যাল’ নামে ক্রিকেট স্মারক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

এসব প্রদর্শনী ঘিরে মানুষের আগ্রহ দেখে মনে হয়েছিল, তাদের মনের আসল খোরাকটা মেটাতে পারে কেবল একটি সমৃদ্ধ ক্রিকেট জাদুঘরই। বাংলাদেশে সে রকম কিছু না থাকায় আক্ষেপ করতে শুনেছি অনেককেই।

default-image

প্রদর্শনীগুলোতে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, গ্যারি সোর্বাস থেকে শুরু করে শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারার অটোগ্রাফ দেওয়া ব্যাট, শেন ওয়ার্ন, মুত্তিয়া মুরালিধরন, ওয়াসিম আকরামদের অটোগ্রাফ দেওয়া বল যেমন ছিল; ছিল বাংলাদেশের শহীদ জুয়েলের ব্যবহৃত ব্যাট, আমিনুল ইসলামের ক্যাপ কিংবা তামিম, মুশফিক, সাকিবদের জার্সিও। ছিল বাংলাদেশের প্রথম জেতা ওয়ানডের টিকিট, মুশফিকের দুবাই এশিয়া কাপে সেঞ্চুরির গ্লাভস, সাকিবের ২০১৯ বিশ্বকাপে ৫ উইকেট পাওয়া বলসহ আরও অনেক স্মারকই।
ক্রিকেট জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য শুধু সাফল্য আর কৃতিত্ব সংরক্ষণ করা নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসকে তুলে ধরতেই এটি প্রয়োজন। তবে এটাও ঠিক, জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এক দিনের কাজ নয়। এর জন্য চাই যথাযথ গবেষণা, পরিকল্পনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্মারক সংগ্রহ করে সেগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। সে জন্য সবার আগে প্রয়োজন সদিচ্ছা ও উদ্যোগ।

লেখক: ক্রিকেট স্মারক সংগ্রাহক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন