চোটের কারণে দর্শক হয়েই সাকিবকে দেখতে হলো বাংলাদেশের আশাভঙ্গের গল্প।
চোটের কারণে দর্শক হয়েই সাকিবকে দেখতে হলো বাংলাদেশের আশাভঙ্গের গল্প।ছবি: প্রথম আলো

‘উপমহাদেশে চার শ তাড়া করে কেউ জেতে নাকি?’
‘এটা তো হয় না।’
‘আজও হবে না। উইকেট আজ ভাঙবে। টার্নগুলোতে প্রাণ থাকবে। নাহ! সম্ভব না।’

জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে টেস্টের পঞ্চম দিনের সকালবেলায় কান পাতলে এমন কিছুই শোনা যাচ্ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভাঙবে। প্রথম ঘণ্টায় ভারী পাগুলো আটকা পড়বে তাইজুল-মিরাজদের ঘূর্ণিতে। খুব ভালো খেললে না হয় প্রথম সেশনটাই টিকে থাকবেন দুই ব্যাটসম্যান এনক্রুমা বোনার ও কাইল মেয়ার্স।

লাঞ্চের পর নতুন বল পাবে বাংলাদেশ। নতুন বলে নিশ্চয়ই স্পিনাররা ছোবল দেবেন। মোস্তাফিজুর রহমান নিশ্চয়ই বলটা ভেতরে আনবেন। এলবিডব্লিউ, বোল্ডের সুযোগ তৈরি হবে।

না হলে কাটার? পঞ্চম দিনের উইকেটে তো মোস্তাফিজের কাটার ধরার কথা। কিছুই কাজে না এলে বাউন্সার? ২০১৭ সালে সেঞ্চুরি করা ডেভিড ওয়ার্নারকে এই মাঠেই বাউন্সারে আউট করেছিলেন মোস্তাফিজ। আজও না হয় করবেন। মেয়ার্স তো আর যা–ই হোক, ওয়ার্নার না। দুজনের মধ্যে বাঁহাতি ছাড়া আর কোনো মিল নেই।

বিজ্ঞাপন

একমাত্র পেসার মোস্তাফিজের কাছে বেশি চাওয়া হয়ে যাচ্ছে? টেস্টের পঞ্চম দিনের খেলা। মূল কাজটা তো স্পিনারদের। ঠিক তা-ই। সকাল থেকে তো সুযোগটা তৈরিও করছিলেন স্পিনাররা। তাইজুল ইসলামের বলে যেমন ৪৭ রানে থাকা মেয়ার্স সুযোগ দিলেন।

default-image

ওভারের প্রথম তিনটি বল ওভার দ্য উইকেট থেকে করে হুট করেই চলে এসেছিলেন রাউন্ড দ্য উইকেটে। সেখান থেকে মিডল স্টাম্প বরাবর বল ফেলে টার্ন করে বল আনলেন ভেতরে। মেয়ার্সের প্যাডে পরিষ্কার লেগেছিল বলটি। বাংলাদেশের জোরালো আবেদনে আম্পায়ার সাড়া দেননি। কিন্তু বাংলাদেশের সুযোগ ছিল রিভিউ নেওয়ার। তাইজুল আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু উইকেটের পেছন থেকে লিটন দাস হাত দেখিয়ে যা ইঙ্গিত করলেন তাঁর অর্থ দাঁড়ায়, ‘রিভিউ নিয়েন না। বল লেগ স্টাম্পের বাইরে পড়েছে।’

পরে দেখা গেল বল পড়েছেন ঠিক মিডল স্টাম্পে। আঘাতও করেছে ঠিক মিডল স্টাম্পে। স্টেডিয়ামের জায়ান্ট ক্রিনে তখন তিন লাল দাগ। অর্থ—রিভিউ নিলে মেয়ার্স এতক্ষণে থাকতেন ড্রেসিংরুমে।

‘যাক! সমস্যা নেই। সারা দিন পড়ে আছে। আরও সুযোগ আসবে। পঞ্চম দিনের উইকেট। সুযোগ আসতে বাধ্য।’

এই ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার সুযোগ। এবার মেয়ার্সের রান ৪৯। বোলার মেহেদী হাসান মিরাজের ফুল লেংথের বল ড্রাইভ করতে গিয়ে স্লিপে নাজমুল হোসেনের কাছে ক্যাচ তোলেন মেয়ার্স। নাজমুলের পিচ্ছিল হাত বলটি ধরতে পারেনি। মেয়ার্স ১ রান নিয়ে পৌঁছে যান ফিফটিতে।

‘ভাগ্য ভালো। অভিষেক টেস্টেই ফিফটি। নিশ্চয়ই আজ মেয়ার্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকবে এই উদ্‌যাপনের ছবি। এই সফরে আসা অধিকাংশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারই তাই করছেন। অনেকের কাছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যেন স্বপ্নের মতন। তাঁরা যেন স্বপ্নে বাঁচছেন। অভিষেকেই টেস্ট ফিফটি মেয়ার্সের জন্যও হয়তো তাই হবে। কারণ, এই স্বপ্ন তো বেশিক্ষণ টিকবে না। এই তো। একটু পরই নামবে ধস।’

default-image

‘এনক্রুমা বোনার মনে হয় চাপে আছেন। প্রচুর ডট বল খেলছেন। সামনে ভালো খেলছেন। পেছনেও। বোনার আউট হলেই হলো। মেয়ার্স আর দ্রুত রান নেওয়ার সাহস পাবেন না।’

ঠিক তখনই নাঈম হাসানের একটি বল উইকেটের ক্ষতে পড়ে জোরে স্পিন করে বোনারকে ক্রিজে আটকে ফেলে। নাঈম আবেদন করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। আম্পায়ার ভাবলেন, বেশি স্পিন করে বল লেগ স্টাম্প ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আর আউট দিলেন না।

আম্পায়ারের মতোই ভাবলেন উইকেটকিপার লিটন এবং অধিনায়ক মুমিনুল হক। নাঈম খুব চাইলেও বাংলাদেশ রিভিউ নেয়নি। পরে দেখা গেল বলটির একশ ভাগ আঘাত হানছে লেগ স্টাম্পে। বোনার তখন খেলছিলেন ২৫ রানে।

বিজ্ঞাপন

ততক্ষণে প্রথম ঘণ্টা শেষ। তিন–তিনটি সুযোগ হাতছাড়া বাংলাদেশের। বোনার-মেয়ার্স জুটি দিনের প্রথম চ্যালেঞ্জটা পার করে ফেলেছেন। সাগরিকার উইকেট পঞ্চম দিন কেমন আচরণ করবে বুঝে গেছেন।

একদম সামনে ও একদম পেছনে এসে খেললে এই মন্থর টার্ন সামলানো কোনো ব্যাপার না। ক্রিজে আটকা না পড়লেই হলো। বল তখন ৫০ ওভার পুরোনো। এসজি বলের দুর্নাম তো আছেই আগ থেকে। পুরোনো হলে কিছুই থাকে না এই ভারতীয় বলে। তার ওপর উইকেট একদমই নির্বিষ। একটুও ভাঙার নাম নেই।

এই বিশ্বাসেই যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানরেট একটু একটু করে বাড়তে লাগল। এই বিশ্বাসই বোনার-মেয়ার্সকে মধ্যাহ্নবিরতিতে নিয়ে যায়। অক্ষত।

default-image

বাংলাদেশের মুখে তখনো চওড়া হাসি। এই দলটা অ্যালিস্টার কুকের ইংল্যান্ডকে এক সেশনে অলআউট করেছে। প্রথম ইনিংসে এই উইকেটে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই ৫ উইকেট নিয়েছে মাত্র ২৩ বলের ব্যবধানে। আজও এমন কিছুই হবে। লাঞ্চের পরেই হবে। শুধু নতুন বলের অপেক্ষার পালা। প্রথম ইনিংসে নতুন বল দিয়েই ক্যারিবীয়দের চোখের পলকে অলআউট করেন মিরাজ-তাইজুলরা।

হলো ঠিক উল্টো। মেয়ার্স নতুন বল পেয়ে যেন ওয়ানডে মানসিকতায় প্রবেশ করলেন। সারা সকাল যা করেননি ঠিক তাই করা শুরু করলেন লাঞ্চের পর। খেললেন বেশ কিছু বাতাসে ভাসানো শট। যার বেশির ভাগ খুঁজে পায় বাউন্ডারি। এতেই মুমিনুল ফিল্ডার ছড়াতে বাধ্য হলেন। পারলেন না নতুন বলে আক্রমণ করতে। উল্টো তাঁকে ভাবতে হলো রান থামানোর পন্থা নিয়ে।

‘রান থামালে চাপ বাড়বে। মেয়ার্স কতক্ষণ আর এভাবে খেলবে? সম্ভব না। কিছু কিছু বল উঁচু–নিচু হলেই হলো। মনের ভয়েই ভুল শট খেলবেন মেয়ার্স।’

কিন্তু মেয়ার্সকে ভুল শট খেলতে হয়নি। নাঈম-মোস্তাফিজরা করেছেন ভুল বল। প্রচুর শট বল দিয়েছেন। যা পেছনে গিয়ে পুল করেছেন সজোরে। অফ স্টাম্পের বাইরে পেলে খেলেছেন কাট শট।

সাগরিকার ওপর দিয়ে তখন তীব্র বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। মাঠে বিজ্ঞাপনের বোর্ডও উড়ে যাচ্ছিল সেই বাতাসে। মুমিনুলের এক একটি পরিকল্পনাও যেন মেয়ার্স–ঝড়ে উড়ে যাচ্ছিল। বোনার ফিফটি করেন, মেয়ার্স পৌঁছে যান সেঞ্চুরিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ চা পান করতে যায় স্কোরবোর্ডে ২৬৬ রান নিয়ে। বোনার-মেয়ার্স জুটির ততক্ষণে দিনের দুই সেশন খেলে ফেলেছেন।

default-image

‘শেষ সেশনে কিছু তো হবেই। উপমহাদেশের উইকেটে এই রান তাড়া করা যায় না। বললাম না। অসম্ভব। একজন গেলেই দেখবেন শেষের সারির ব্যাটসম্যানরা উঁকি দেবে। শুরু হবে আসা–যাওয়া।’

শেষ সেশনের শুরুতে বোনার আউট হন ৮৬ রানে। তাইজুলের বলটি সোজা হয়ে বোনারের প্যাড আঘাত করে। ক্রিজে ৩২৫ মিনিট সময় কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে মাঠ ছাড়েন বোনার। বাংলাদেশের বিশ্বাসের পালে তখন হাওয়া লাগে।

সাগরিকার ঝোড়ো হাওয়া। সেই হাওয়াতেই যেন বিভ্রান্ত জার্মেইন ব্ল্যাকউড। নাঈমের তেড়েফুঁড়ে মারতে গিয়ে ব্ল্যাকউড হলেন বোল্ড।

‘আর দরকার ৫ উইকেট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১০৩ রান। স্পিনাররা জায়গায় করলেই হয়। জয় শুধু সময়ের ব্যাপার।’

কিন্তু জায়গায় আর করা হয় না নাঈমদের। কিছু ভালো বলের ফাঁকে ফাঁকে কিছু খুবই বাজে বল। সেগুলোতেই মেয়ার্স করেন রান। আর নতুন ব্যাটসম্যান জশুয়া দা সিলভা ভালোই ঠেকিয়ে দিচ্ছিলেন। এভাবেই আরও ২২ ওভার খেলে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

default-image

মেয়ার্সের রান দেড় শ ছাড়িয়ে যায় দুই শ। রেকর্ড বইয়ের বহু কলামে জায়গা করে নেন এক অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোরে যোগ হয় আরও এক শ রান। জয় তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুধুই সময়ের ব্যাপার।

‘সত্যিই কি এটা হচ্ছে? পঞ্চম দিনে এই রান তাড়া করছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ?’
‘বাংলাদেশের শরীরী ভাষা দেখুন! তাহলেই বুঝতে পারবেন আসলেই হচ্ছে কি না।’

মুমিনুলের ছোট কাঁধটা যেন আরও ছোট মনে হচ্ছিল ক্লান্তিতে। বারবার দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের চেহারাগুলো ভেসে উঠছিল স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে। সাকিব আল হাসান চোটের কারণে খেলছেন না। কিন্তু আজ ড্রেসিংরুম ছেড়ে বাকি স্পিনারদের বার্তা দিতে বাইরে আসেন।

বিজ্ঞাপন

কিছুক্ষণ তাঁর দিকে ক্যামেরা ধরা ছিল। কিছুক্ষণ তামিম ইকবালের দিকে। লং অফ বাউন্ডারি থেকে সেই কতক্ষণ ধরে তিনি বোলারদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মুশফিকের ‘কাম অন ল্যাডস’ কথাটা আওয়াজ ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল।

‘হচ্ছে না।’

কথাটা হয়তো মুমিনুলরাও মনে মনে বলছিলেন। মেয়ার্সের শেষের ছক্কাগুলোও কথাটাকে বাস্তবে পরিণত করছিল। দা সিলভা, কেমার রোচ শেষে আউট হলেও কিছুই বদলানোর সুযোগ ছিল না।

default-image

শেষ পর্যন্ত নাঈমের বলে মেয়ার্সের মিড অনে ঠেলে নেওয়া সিঙ্গেলের সঙ্গেই ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপের ভারী কণ্ঠের উচ্ছ্বাস শোনা যায়। মেয়ার্সের মুখে হাসি, কোচ ফিল সিমন্সের মুখে হাসি। অবিশ্বাস্য সাধনের হাসি। স্বচক্ষে অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্যে পুরো প্রেসবক্সে সাংবাদিকেরাও দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়।

‘অবিশ্বাস্য।’

সকালে যা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে, বিকেলে সেই অবিশ্বাস্য সাধনের পরও ঘোর কাটছিল না। সত্যিই কি ৩৯৫ রান তাড়া করে জিতল! সত্যিই কি উপমহাদেশের মাটিতে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জিতল ওয়েস্ট ইন্ডিজ!

উত্তর সবার জানা।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন