default-image
>২০০১ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে অস্ট্রেলিয়ায় বিপক্ষে লক্ষ্মণের ২৮১ রানের ইনিংসটিই ইয়ান চ্যাপেলের দেখা স্পিনের বিপক্ষে সেরা ইনিংস

সাকলাইন মুস্তাকের দুসরা, আবদুল কাদেরের গুগলি বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল ক্রিকেট বিশ্বের। করোনাভাইরাসের আবির্ভাবও ক্রিকেট বিশ্বের জন্য অনেকটা দুসরা বা গুগলির মতো। মহামারি আকার ধারণ করা এই কোভিড-১৯ সামাল দেওয়ার জন্যও সময় নিতে হচ্ছে ক্রিকেট বিশ্বকে। করোনাভাইরাসের কারণে সব ধরনের ক্রিকেটই এখন বন্ধ। ক্রিকেট শূন্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে ক্রিকেট ভক্তরা। পুরোনো ক্রিকেট ম্যাচের গল্প আর হাইলাইটসই এখন সম্বল। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ইয়ান চ্যাপেলও ব্যতিক্রম নন। তিনিও অলস সময় কাটাচ্ছেন স্মৃতি রোমন্থন করে।

স্পিনারদের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানের পায়ের কাজ ৭৬ বছর বয়সী চ্যাপেলের খুব পছন্দ। স্পিনের বিপক্ষে তাঁর দেখা সেরা দুটি ইনিংস নির্বাচন করাটাও তাই খুব কষ্ট করতে হয়নি। স্মৃতি হাতড়ে সতীর্থ ডাগ ওয়ালটার্স ও ভারতের ভিভিএস লক্ষ্মণের দুটি ইনিংস বের করলেন চ্যাপেল। ২০০১ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে অস্ট্রেলিয়ায় বিপক্ষে লক্ষ্মণের ২৮১ রানের ইনিংসটিই তাঁর দেখা স্পিনের বিপক্ষে সেরা ইনিংস। ১৯৭৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ত্রিনিদাদ টেস্টে ওয়ালটার্সের ১১২ রানের ইনিংসটিও আছে তাঁর ছোট্ট তালিকায়।

লক্ষ্মণকে বল করা নাকি দেয়ালে রাবার বল ছোড়ার মতো! দেয়ালে বল লেগে কোন দিক থেকে বল ফেরত আসবে কেউ জানে না। হায়দ্রাবাদি ব্যাটসম্যান বলে কথা! মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনও তাঁর চোখে একই গোত্রের। কবজির মোচড়ে হাজার হাজার রান করেছেন এই দুই ভারতীয়। কলকাতায় টার্নিং উইকেটে ২৮১ রানের ইনিংসেও লক্ষ্মণকে চ্যাপেলের মনে হয়েছে দেয়াল, আর বিশ্বের সেরা বোলার শেন ওয়ার্নকে মনে হয়েছে রাবারের বল ছোড়া বালক।

কলকাতায় সেদিন রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে লেগ স্টাম্পের বাইরে বল ফেলে বিশাল সাইড স্পিন আদায় করে নিচ্ছিলেন ওয়ার্ন। সঙ্গে ফ্লাইট তো আছেই। লক্ষ্মণ এক-দুই পা এগিয়ে স্পিনের বিপক্ষে ওয়ার্নকে মিড অন ও মিড উইকেট খেলছিলেন কবজির মোচড়ে। আবার লেগ সাইডে সরে এসে লেগ স্পিন করে বেরিয়ে যাওয়া বলে অফ সাইডে খেলছিলেন। ৪৫২ বল ক্রিজে থাকা পুরো সময়টা লক্ষ্মণের ব্যাটিং ছিল এমনই। ভালো উইকেটে এই শট খেলা কঠিন। ওয়ার্নের বিপক্ষে কলকাতার টার্নিং উইকেটে তো আরও কঠিন। তা ছাড়া ম্যাচের পরিস্থিতির বিচারে এমনিতেই ইনিংসটি ইতিহাসের সেরা ইনিংসের ছোট্ট তালিকায় জায়গা পাবে। যখন লক্ষ্মণ ক্রিজে আসেন, ভারত তখন পিছিয়ে ২৭৪ রানে। সেখান থেকে ২৮১ অকল্পনীয়।

কলকাতায় ধারাভাষ্য দিতে আসা চ্যাপেলের তো চোখ তখন ছানাবড়া, ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি কী দেখছি! ম্যাচ শেষে ওয়ার্নের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি কেমন বল করেছ?’ ওয়ার্ন বলে, ‘আমার মনে হয় না খারাপ বল করেছি।’ আমি বলি, তুমি খারাপ করোনি। লক্ষ্মণই অসাধারণ খেলেছে।’

১০ ওভার পর কী হবে না ভেবে পরের বলে কী হবে সেদিকে পুরো মনোযোগ দিতে পারার গুণ ছিল লক্ষনের। যেখানে ডাগ ওয়ালটার্সের সঙ্গে লক্ষ্মণের মিল খুঁজে পান চ্যাপেল। ম্যাচের আগের দিন রাতে হয়তো এক ফোঁটা ঘুমাননি। সারা রাত মদ পান করে সিগারেট ফুঁকে সময় কাটিয়েছেন। সকালে আবার ব্যাটিং করতে নেমে ঠিকই এক সেশনে সেঞ্চুরি করে বসতেন ওয়ালটার্স। চ্যাপেলরা তাঁর ডাক নাম দিয়েছিল ‘অস্বাভাবিক’। স্পিনের বিপক্ষে তাঁর ব্যাটিং আসলেই ছিল অস্বাভাবিক রকমের ভালো।

১৯৭৩ সালের কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে যায় ইয়ান চ্যাপেলের অস্ট্রেলিয়া। স্যাবাইনা পার্কে প্রথম টেস্টের সময় চ্যাপেলের মনে খটকা লাগে। ক্যারিবিয়ানরা স্যাবাইনা পার্কে জয়ের জন্য খেলছে না। বার্বাডোজে পরের টেস্টেও ড্র’র মানসিকতা ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তৃতীয় টেস্ট স্পিন স্বর্গ ত্রিনিদাদে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ছিলেন লান্স গিবস ও ইনশান আলী, দুই স্পিনার দিয়ে ত্রিনিদাদে জিতে সিরিজ নিজেদের করার পরিকল্পনা ছিল ক্যারিবিয়ানদের।

ক্যারিবিয়ানদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেন ওয়ালটার্স। গিবসের অফ স্পিনের বিপক্ষে এক সেশনেই ১০৩ রান। গিবস বল করছিলেন অফ স্টাম্পের ঠিক বাইরে, বোলারের বুটের ক্ষত লক্ষ্য করে। কিছু বল লাফিয়ে উঠছিল, কিছু সাইড স্পিন করে লেগ স্টাম্পের দিকে। এমন উইকেটে কাভার ড্রাইভ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ওয়ালটার্স ক্রিজে এসে প্রথম বলটাই পাঠালেন কাভার বাউন্ডারিতে। একপর্যায়ে তাঁর জন্য অফ সাইডে তিন ফিল্ডার ও লেগ সাইডে ছয় ফিল্ডার নিয়ে বল করছিলেন গিবস। ওয়ালটার্স তবু ব্যাক ফুট থেকে লেগ সাইডে পুল শটে চার মারছিলেন।

গিবস বাধ্য হয়ে পয়েন্ট ফিল্ডারকে লেগ সাইডে পাঠান। এবার ওয়ালটার্স ব্যাক ফুটে গিয়ে পয়েন্টে কাট শটে চার মারেন। বেচারা গিবস পয়েন্টে ফিল্ডার ফিরিয়ে আনলে ওয়ালটার্স চার মারেন লেগ সাইডে, ঠিক যেখান থেকে ফিল্ডার সরিয়েছিলেন গিবস। হতাশ গিবসের কাছে এরপর আর কোনো জবাব ছিল না।

ত্রিনিদাদ টেস্ট ওয়ালটার্স করেন ১১২ রান। অস্ট্রেলিয়া জিতে ৪৪ রানে, সঙ্গে সিরিজও। পার্থক্য গড়ে দেয় ওয়ালটার্সের অবিশ্বাস্য ইনিংস। চ্যাপেলের দৃষ্টিতে, অফ স্পিনের বিপক্ষে তাঁর দেখা সেরা ব্যাটসম্যান ওই ওয়ালটার্সই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0