বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৪৮ বলে ৮৫ রানের ইনিংসটা খেলে আউট হয়ে উইলিয়ামসন যখন ফিরছিলেন তখন মনে হতেই পারে, টি-টোয়েন্টিতে পেশিশক্তি-সমৃদ্ধ পাওয়ার হিটারের কি দরকার? উইলিয়ামসনের মতো কেউ থাকলে তো সুবিধা বেশি। অযথা আউট হওয়ার ঝুঁকি যেমন কম তেমনি রানও আসে ঝরনার ফোয়ারার মতো।

এমন নয় যে উইলিয়ামসনের ব্যাট থেকে আজই প্রথম এমন ফোয়ারা দেখা গেল। অতীতেও দেখা গেছে। তবে আজ যেন একটু বেশি-ই নিখুঁত ছিলেন।

ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছে, প্রতিবার ‘স্টান্স’ নেওয়ার আগে ব্যাটিংয়ের একটি আপ্তবাক্য উল্টো করে মনে গেঁথে নিয়েছেন। প্রচলিত একটা কথা হলো, ভালো ব্যাটসম্যানরা মাঠে ফিল্ডারদের পজিশন দেখে ব্যাট করেন। উইলিয়ামসন যেহেতু এক কাঠি সরেস, তাই সম্ভবত ফিল্ডার নয় মাঠের ফাঁকা জায়গাগুলো প্রতিবার ‘স্টান্স’ নেওয়ার আগে মনে গেঁথে নিয়েছেন। এরপর নিজের ‘জ্যামিতি-বক্স’ (ব্যাটিং কৌশল) থেকে কাঁটা-কম্পাস আর স্কেল বের করে নিখুঁত সব শট খেললেন ফাঁকা জায়গা দিয়ে। পৃথিবীর যেকোনো ব্যাটসম্যানের তাঁর ‘গ্যাপ-সেন্স’ দেখে ঈর্ষা হতে পারে।

default-image

রবিচন্দ্রন অশ্বিনের টুইটটা ধরে একটু ব্যাখ্যা করা যাক। নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ব্যাটিং করার সময় ভারতীয় স্পিনারের টুইট, ‘এমন উচ্চতার ফুল টস উইলিয়ামসন কীভাবে মিডউইকেটের সামনে দিয়ে বাউন্ডারি মারল!’ অশ্বিন যে শটের কথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।

আগে উইলিয়ামসনের ইনিংস তৈরির বিবরণী একটু দেওয়া যাক। চতুর্থ ওভারে (৩.৫) উইকেটে আসেন তিনি। এরপর টানা ৩২ বলে নিউজিল্যান্ড কোনো বাউন্ডারি পায়নি। নবম (৮.৪ ওভার) গিয়ে এই শেকল ভেঙেছেন উইলিয়ামসন। কীভাবে? মজাটা এখানেই।

‘পাঁচ নম্বর বোলার’ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও মিচেল মার্শকে ব্যবহার করেছে। মার্শের করা সে ওভারের ওই ডেলিভারিতে উইলিয়ামসনকে একটু এগিয়ে আসতে দেখে খাটো লেংথে বল করেন এ অলরাউন্ডার।

এমনিতে ব্যাটসম্যানরা এসব বল মিডউইকেটে টেনে মারেন। সেখানে ফিল্ডারও থাকে। কিন্তু উইলিয়ামসন তো আজ শুধু ফাঁকা জায়গা দেখেছেন! তিনি খেললেন এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে। চার! পরের বলটা মিডউইকেট দিয়ে চার মারলেন শক্তি ও টাইমিংয়ের সমন্বয়ে।

default-image

১০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ছিল ১ উইকেটে ৫৭। অন্য প্রান্তে এক শ-র নিচে স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করা মার্টিন গাপটিল দ্রুত রান বের করতে পারছিলেন না। এবারও ‘ত্রাতা’ উইলিয়ামসন এবং তাতে কপাল পুড়ল মিচেল স্টার্কের। ওই ওভারে ফাইন লেগে তাঁর ক্যাচ ছাড়েন জস হ্যাজলউড। উইলিয়ামসন তখন ২১ রানে অপরাজিত। হ্যাজলউডের কি তখন নিজেকে হার্শেল গিবস মনে হয়েছে?

১৯৯৯ বিশ্বকাপে ‘সুপার সিক্স’-এ অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়ার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সে ম্যাচে ওয়াহ ৫৬ রানে থাকতে তাঁর সহজ ক্যাচ ছাড়েন গিবস। কথিত আছে, গিবসকে খোঁচা মেরে ওয়াহ নাকি বলেছিলেন, ‘বাছা, বিশ্বকাপটাই তো ফেলে দিলে!’

উইলিয়ামসন নিপাট ভদ্রলোক। হ্যাজলউডকে কিছু না বলে মুখের কথাটা বলেছেন ব্যাটে—অস্ত্রোপচার কক্ষে শল্যবিদ যেমন নিবিষ্ট মনে নিজের কাজটা করেন। পরের বলেই তা বোঝা গেল। স্টার্ক ইয়র্কার মারার চেষ্টা করলেন।

ইঞ্চিখানেক লেংথ গড়বড় হওয়ায় তার সদ্ব্যবহার করে লং অফ দিয়ে উইলিয়ামসনের মাখনের মতো মসৃণ ড্রাইভ—চার! স্টার্ক সম্ভবত চরম হতাশা থেকেই আবারও ইয়র্কার মারতে গিয়ে ১৪৭ কিলোমিটার গতিতে ফুল টস মেরে দেন বুক সমান উচ্চতায়, অফ স্টাম্পের বাইরে। ডিপ ফাইন লেগে ফিল্ডার রাখতে গিয়ে মিডউইকেটটা তখন একটু ফাঁকা রাখেন স্টার্ক। উইলিয়ামসন অবিশ্বাস্যভাবে স্টাম্পের বাইরে থেকে বলটা টেনে কীভাবে মিডউইকেটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে চার মারলেন? ওই তো, কম্পাসের মাপে যখন ব্যাট চলে!

default-image

কিংবা ম্যাক্সওয়েলের করা ১৩তম ওভারের কথাই ধরুন। ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে জোরে খেলতে সাধারণত দেখা যায় না। ম্যাক্সওয়েলের তৃতীয় বলটি ‘বটম হ্যান্ড’-এ ওই জায়গা দিয়ে মারলেন ৮০ মিটারের ছক্কা। পরের বলে আবারও ছক্কা এবং এই শটটা থেকে ‘শিক্ষা’ নিতে পারেন গাপটিল। অ্যাডাম জাম্পাকে মিডউইকেট দিয়ে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ দেন গাপটিল।

ম্যাক্সওয়েল ওই ডেলিভারিটি রাউন্ড দ্য উইকেট দিয়ে অফ স্টাম্পের বাইরে রাখলেও উইলিয়ামসনের মাথায় ছিল মিডউইকেটের ফাঁকা জায়গা। দুবাই স্টেডিয়ামে মাঠের ওই পাশে সীমানা খানিকটা ছোট ছিল। কিন্তু কবজির মোচড়ে খেলা শটে উইলিয়ামসন যে ছক্কাটা মারলেন তা অনেকদিন মনে থাকবে দর্শকদের।

তবে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসে উইলিয়ামসন সবচেয়ে কুশলী শট দুটি খেলেছেন ১৬তম ওভারে। এবারও সেই স্টার্ক। পয়েন্ট ও গালিতে ফিল্ডার রেখে কাভারের ফিল্ডার বের করে দিয়েছিলেন স্টার্ক। কিন্তু মাথায় যাঁর শুধু ফাঁকা জায়গা তিনি এসব ভাববেন কেন!

স্রেফ কবজির মোচড়ে পয়েন্ট ও গালির ফিল্ডারের মাথার ওপর টানা দুই চারে রান বের করে আনেন উইলিয়ামসন। এরপর স্টার্কের কাঁটা ঘায়ে নুন ছিটাতেও দেরি করেননি। ডিপ ফাইন লেগে ফিল্ডার রেখে পরের বলটা স্লোয়ার ইয়র্কার মারার চেষ্টা করেন স্টার্ক। উইলিয়ামসন যেন আগেই জানতেন—একটু সরে কবজির মোচড়ে স্কয়ার লেগ দিয়ে ছক্কা!

এমন সব শট দেখে অস্ট্রেলিয়া দল কি কিছুক্ষণের জন্য হলেও আগ্রাসী মনোভাবটা হারিয়ে ফেলেছিল? উইলিয়ামসন আউট হয়ে ফেরার সময় দৌড়ে এসে তাঁর সঙ্গে হাত মেলান অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু ফিল্ডার। ১৯ বলে ১৮ রান থেকে ২০ বলে ৫১। ৪৮ বলের এ ইনিংসে বাকি ৩৫ রান করেন ১৬ বলে! এই যে ইনিংসের গতি-বদল, সেটাও ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে নিখুঁত ‘গ্যাপ শট’ খেলে—হার্শা ভোগলে থেকে মাইকেল ভনদের টুইটে একটি বিষয় তাই প্রাধান্য পেল, ‘উইলিয়ামসনকে ভালোবাসতেই হবে...একজন খাঁটি খেলোয়াড়।’

সত্য কথা। তবে ভন-ভোগলেদের মাথায় জ্যামিতিবিদ কিংবা শল্যবিদের নামও আসতেও পারত।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন