বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২২ বছর বয়সী রেজাউরের বাবা ছিলেন সিলেটের এক মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক। ২০১৯ সালে তিনি মারা যান। সাত ভাই ও ছয় বোনের সংসারে সবচেয়ে ছোট রেজাউর ছিলেন টেপ টেনিস ক্রিকেটের পাগল।

এলাকার বড় ভাইরা রেজাউরের টেপ টেনিস ক্রিকেটে বোলিং দেখে ডেকে নেন ক্রিকেট বলের টুর্নামেন্টে। প্রথমবার টেপ প্যাঁচানো টেনিস বল ছেড়ে চামড়ায় মোড়ানো ক্রিকেট বলটা হাতে নিয়ে ভিন্ন স্বাদই পেয়েছিলেন রেজাউর।

প্রথম দিন ক্রিকেট বলে বল করেই পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন জাগে তাঁর মনে। স্বপ্নের সলতে জ্বালাতে সাহায্য করেন বড় ভাইরা। একজন একদিন বলে বসেন, ‘তুই তো দারুণ বল করিস। তুই স্টেডিয়ামে অনুশীলন কর।’

default-image

এলাকার ভাইদের ‘ভালো বোলার’ প্রশংসাপত্র পেয়ে তো রেজাউর আনন্দে আত্মহারা। বাড়ি ফিরে ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন পরিবারকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারে সেই চিরাচরিত সংকোচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের সবার একটাই কথা, ‘কী দরকার এসবের?’

এমন প্রশ্নের পেছনে যুক্তিও ছিল। রেজাউর ভালো ছাত্র। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ এবং এইচএসসিতে ৪.৮৮ পয়েন্ট পাওয়া ছেলে ভালো জায়গায় পড়বে, বড় চাকরি করবে—এটাই তো চাওয়া থাকে বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের। শখ মেটাতে কেন খামোখা ক্রিকেটের অনিশ্চিত পথ ধরবে?

ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রেজাউর তখন পরিবারের যুক্তি শোনেননি। কোনো রকমে মাকে রাজি করিয়ে সিলেটের এক একাডেমিতে ভর্তি হন। তবে সিলেটে ঘরোয়া ক্রিকেটের সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার রাস্তাটা রেজাউরের কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।

কিছুদিন অনুশীলন করে টেপ টেনিস খেলে জমানো টাকা নিয়ে রেজাউর ঢাকা চলে আসেন। ভর্তি হন মিরপুরের সিটি ক্লাবে। সেখান থেকে একবার নেট বোলার হয়ে মিরপুর স্টেডিয়ামে গিয়ে বিসিবি হাই পারফরম্যান্স বিভাগের পেস বোলিং কোচ চম্পাকা রামানায়েকের নজরে পড়েন। শুরুর দিকে এইচপি দলের বাইরের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রেজাউরকে নিয়মিত অনুশীলনে আসতে বলতেন চম্পাকা।

default-image

লঙ্কান কোচের এত কিছু করার কারণ নাকি রেজাউরের দক্ষতা। লাইন-লেংথ, ছোট ছোট সুইং ও চমকে দেওয়া বাউন্সারও নাকি আছে রেজাউরের। লম্বা সময় বোলিং করতে পারেন—এই সুনামও ইদানীং শোনা যাচ্ছে। দিনের শেষ স্পেলেও স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে পারেন। আর পুরোনো বল তো রেজাউরের খুবই পছন্দ। দারুণ ফিটনেসের অধিকারী রেজাউর এরপর দুটি এইচপি ক্যাম্প, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ও জাতীয় লিগে দুটি করে মৌসুম খেলে এখন ডাক পেয়েছেন বাংলাদেশ টেস্ট দলে।

আজ চম্পাকা তাঁর প্রিয় ছাত্রের টেস্ট দলে ডাক পাওয়ার খবর শুনে প্রশংসাপত্র লিখে দিলেন, ‘ছেলেটার গতি আছে। আজকাল তো উইকেটও পাচ্ছে। খুব ফিট বোলার। ভালো বাউন্সার আছে। পুরোনো বলেও স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে পারে। দিনে ৩-৪ স্পেলের বোলার রাজা (রেজাউর রহমান)। গত চার বছরে অনেক দূর এসেছে। শুনে ভালো লাগছে যে সে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছে।’

চম্পাকার সঙ্গে সুর মিলিয়ে রেজাউরের প্রশংসা করলেন নির্বাচক হাবিবুল বাশারও, ‘রাজা দারুণ বল করছে। শুধু এ বছরই নয়, গত বছরও সে দারুণ বল করেছে। প্রিমিয়ার লিগে পুরোনো বলে বল করতে দেখেছি। দলে অনেকেই চোটে আছে। আমাদের পেসার লাগবেই। তাই ওকে দলে আনা।’

এখন পর্যন্ত ১০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন রেজাউর। ১৮ ইনিংসে ৩৩ উইকেট নিয়েছেন দুবার ৫ উইকেট ও একবার ৪ উইকেটসহ। ২২ বছর বয়সী এ পেসারের ঘরোয়া ক্রিকেটে শুরুটা বেশি দিন হয়নি। সামনে যে বিশাল পথটা পড়ে আছে, সেটি রেজাউর কীভাবে পাড়ি দেন, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন