বিজ্ঞাপন

নুরুলের অভিষেককে খারাপ বলার উপায় নেই। দল জিতেছে। নিজেও ছিলেন অপরাজিত। এদিকে উইকেটকিপিংয়ে যে তিনি বাংলাদেশের সেরা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে অভিষেক ম্যাচে স্কুপ করে মারা সেই চার নুরুলের জন্য বদনাম রটিয়ে দেয়।

কারণ, তাঁর ব্যাটিং নিয়ে আগে থেকেই আলোচনাটা ছিল এমন, ‘ও তো শুধু স্কুপটাই পারে।’ কথাটা হয়তো নুরুলও অস্বীকার করবেন না। সে জন্যই ২০১৬ সালে অভিষেক ম্যাচসহ বাংলাদেশের জার্সিতে টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে, টেস্ট মিলিয়ে নুরুল খেলেছেন মাত্র ১৬ ইনিংস—২৫১ রান।

default-image

পরিসংখ্যান নাজুক। এর সঙ্গে ব্যাটিংয়ে ওই বদনাম তো আছেই। বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরিমণ্ডলে এসব নিয়ে টিকে থাকা একটু কঠিনই। বিশেষ করে জাতীয় দলে যখন উইকেটকিপার হিসেবে খেলেন মুশফিকুর রহিমের মতো উঁচু মানের ব্যাটসম্যান। পাশাপাশি আছেন লিটন দাসের মতো প্রতিভা।

শুধু স্কুপ খেলে তো আর এ দুজনের ধারেকাছে যাওয়া সম্ভব নয়। সে জন্য কিপিংয়ের পাশাপাশি পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হতে হবে। শুধু উইকেটের পেছনে রান করলেই হবে না। রান করতে হবে মাঠের চারপাশে। খেলতে হবে ড্রাইভ, কাট, পুল, সুইপ। আরও পরিষ্কার ভাষায়, খেলতে হবে স্বাভাবিক ক্রিকেট। শুধুই প্রথার বাইরে খেলে আর কত দিন!

বোঝাই যাচ্ছে, অনেক বড় পথ পড়ে ছিল নুরুলের সামনে। দুই বছর আগে নুরুল তাই ফিরে যান তাঁর বয়সভিত্তিক দলের কোচ মিজানুর রহমানের কাছে। নুরুলকে তিনি দেখছেন অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে। নুরুলের ব্যাটিংয়ে কী আছে, কী নেই—তাঁর নখদর্পণে।

প্রথম আলোকে তিনি বলছিলেন দুই বছর আগের নুরুলের কথা, ‘ড্রাইভ খেলতে পারত না। একজন ব্যাটসম্যান ড্রাইভ খেলতে না পারলে সে তো ব্যাটসম্যানই না, তাই না? স্কয়ার কাট খেলতে পারত না। ব্যাকরণের বাইরে সে অনেক বেশি শট খেলত। তাঁকে ক্রিকেটের মৌলিক বিষয়গুলোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। সুন্দর কাভার ড্রাইভ, অন ড্রাইভ, অফ ড্রাইভ—এসব নিয়ে আরও কাজ করার জায়গা ছিল।’

default-image

যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যা চিহ্নিত করা। নুরুলের ক্ষেত্রে সমস্যাটা প্রায় সবারই জানা ছিল। দরকার ছিল সমাধানের। অস্বাভাবিক থেকে স্বাভাবিক ব্যাটিং করা শুরু করতে হতো নুরুলকে। সে জন্য মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ইনডোরে কোচ মিজানুরের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করেন নুরুল।

‘আমরা প্রচুর অনুশীলন শুরু করি ওর দুর্বলতা নিয়ে। ওর অস্বাভাবিক ব্যাটিং করা থামিয়ে স্বাভাবিক ব্যাটিং করানোর চেষ্টা করেছি। সে যখন স্কয়ার কাট, ড্রাইভ, সুইপ খেলতে পারবে, তখন ওই স্কুপের দরকার হবে না’—বলছিলেন মিজানুর।

পরিশ্রমের ফল কি জলে যায়? না, নুরুল তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কদিন আগে শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে যে নুরুলকে দেখা গেল, তা অনেকের কাছেই অচেনা ছিল।

আগের সেই বদনাম তিনি মুছে ফেলেন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে ১৫ ইনিংসে প্রায় ১৫০ স্ট্রাইক রেটে ৩৮৯ রান করে। নুরুলের এই রান এসেছে কোচ মিজানুরের ভাষায় ‘স্বাভাবিক’ ক্রিকেট খেলে।

default-image

কোচ-ক্রিকেটারের রসায়ন ভালো হওয়ার কারণও জানালেন মিজানুর, ‘কোচের ওপর আস্থা থাকতে হয়। অনেকে দেখা যায় অনেক রকম কথা শোনে। অনেকের মূল্যায়ন শোনে। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। এখানে যদি কোচ আর ক্রিকেটারের মধ্যে আস্থা থাকে, বিশ্বাস থাকে, তাহলে একসময় সেটা কাজে লাগবেই। আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি জানি, তাঁর মধ্যে কী আছে, আর কী নেই। সে অনুযায়ী কাজ করেছি। ওই জিনিসগুলো তাঁর খেলায় এনে দিলেই সে কিন্তু দারুণ প্যাকেজে পরিণত হবে।’

তবে নুরুলের সঙ্গে জুটি বাঁধার আগে একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন মিজানুর। পেশাদার ক্রিকেটের এই যুগে কোনো কিছুই যে মুফতে মেলে না!

নুরুলের সঙ্গে কাজ শুরুর আগে মিজানুর পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন, ‘আমি নিজে থেকেই তাঁকে বলেছিলাম—দেখো, আমার সঙ্গে কাজ করতে হলে আমাকে পয়সা দিতে হবে। তুমি আমাকে ২ টাকা দাও, আর ২ হাজার টাকা দাও, সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। কিন্তু তোমাকে পয়সা দিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলে দুই পক্ষের মধ্যেই পেশাদারি আসে।’

default-image

নুরুলের পয়সা নিশ্চয়ই উশুল হয়েছে! আজ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ দিয়ে প্রায় পাঁচ বছর পর ওয়ানডে দলে খেললেন তিনি। মজার ব্যাপার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নুরুলের প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে তাঁকে ব্যাটিংয়ে হ্যাটট্রিক বলে। ডোনাল্ড তিরিপানোর পর পর দুই বলে তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহ আউট।

এমন সময় নুরুল ক্রিজে এসেই স্কয়ার কাটে মারলেন দর্শনীয় চার। আগের নুরুল হলে হয়তো একই বলে অন্য শট খেলতেন। এসব না করে নুরুল খেলেছেন প্রথাগত স্কয়ার কাট। ‘শুধু স্কুপটাই পারে’—নুরুল এই বদনাম মুছে আজ যে সুনামের জন্ম দিলেন, তা ধরে রাখতে পারাই হবে তাঁর আসল চ্যালেঞ্জ।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন