সাকারিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।
সাকারিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।ছবি : আইপিএল ওয়েবসাইট

মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে গত রাতে যেন রানের বান ডেকেছিল। প্রথমে ব্যাট করে অধিনায়ক লোকেশ রাহুল, ক্রিস গেইল আর দীপক হুদার তাণ্ডবে ২২১ রান তোলে পাঞ্জাব কিংস। পরে অধিনায়ক সঞ্জু স্যামসনের পাগলাটে এক সেঞ্চুরির ওপর ভর করে প্রায় ম্যাচটা জিতেই যাচ্ছিল রাজস্থান, শেষমেশ হেরেছে চার রানে। বোলারদের বধ্যভূমিতে এই ম্যাচে আলো ছড়িয়েছেন চেতন সাকারিয়া নামের আনকোরা এক তরুণ। খেলছেন রাজস্থানের হয়েই মোস্তাফিজুর রহমানের সতীর্থ হিসেবে।

মোস্তাফিজ, ক্রিস মরিস, ঝাই রিচার্ডসন, রাইলি মেরেডিথ, বেন স্টোকসের মতো বোলাররা যেখানে সপাটে পিটুনি খেয়েছেন, ৪ ওভার বল করে সেখানে ৩১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন সাকারিয়া। উদ্বোধনী বোলার হিসেবে তুলে নিয়েছেন পাঞ্জাবের দুই ওপেনার মায়াঙ্ক আগারওয়াল, লোকেশ রাহুল ও শেষ দিকে ঝাই রিচার্ডসনের উইকেট। বোলিং-বৈচিত্র্যে চমকে দেন গেইলের মতো পোড় খাওয়া ব্যাটসম্যানকেও। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ শেষে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেছে এই বাঁহাতি পেসারকে নিয়ে। সাকারিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।

বিজ্ঞাপন
default-image

বীরেন্দর শেবাগই যেমন। ভারতের সাবেক এই মারকাটারি ওপেনার সাকারিয়ার প্রশংসা করতে গিয়ে তুলে এনেছেন ২৩ বছর বয়সী এই তারকার অতীত সংগ্রামের কথা। ‘অ্যারাউন্ড দ্য উইকেট’ নামের এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকার নিয়েছে সাকারিয়ার মায়ের। সে সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষই টুইটারে পোস্ট করেছেন শেবাগ। সে সাক্ষাৎকারেই উঠে এসেছে সাকারিয়ার জীবনের নানা উত্থান-পতনের কথা।

রাজকোট শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে ভারতেজ নামের এক অঞ্চলে জন্ম এই সুইং বোলারের। ছোটবেলায় হতে চেয়েছিলেন ব্যাটসম্যান। কিন্তু স্কুলে থাকতে দেখলেন, সেখানে ব্যাটসম্যানদের কেউ তেমন পাত্তাটাত্তা দেন না। পেস বোলার হলেই সবাই দাম দেন। ব্যস, সিদ্ধান্ত বদলে হয়ে গেলেন পেস বোলার। তাই বলে ছোটবেলা থেকেই যে বোলিং করা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। ১৬ বছর বয়স হওয়ার আগপর্যন্ত নিজে নিজেই বল করতেন, নিজের আগ্রহেই বোলিংয়ের নানা কলাকৌশল শিখতেন। একসময় তাঁর মনে হতো, তেড়েফুঁড়ে বল করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। তা করতে গিয়ে চোটে পড়ে একবার বছরখানেকের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেলেন। এরপর এমআরএফ পেস বোলিং ফাউন্ডেশনে কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ান পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রার সাহচর্য পেয়েছেন। পেয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও।

‘অ্যারাউন্ড দ্য উইকেট’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেদের পরিবারের কাহিনি জানিয়েছেন চেতনের মা, ‘আশা করব, আমরা যেসব কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছি, কাউকে যেন কাটাতে না হয়। আমার মেজ ছেলে, চেতনের চেয়ে যে এক বছরের ছোট ছিল, সে মাসখানেক আগে আত্মহত্যা করে। চেতন তখন সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফি খেলছিল। আমরা চেতনকে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা দিইনি। কারণ, দিলে দেখা যেত, ওর খেলায় সেটার খারাপ প্রভাব পড়ছে। ১০ দিন ওকে ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ দিইনি আমরা। ওকে শুধু বলেছিলাম, ওর বাবার শরীরটা খারাপ।’

কিন্তু কত দিন আর সত্য লুকিয়ে রাখা যায়? চেতনের মা-ও পারেননি, ‘এরপর থেকে ও যখনই ফোন করত, বাবার সম্পর্কে জানতে চাইতো। ওকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে দিইনি। কারণ, উনি কথা লুকিয়ে রাখতে পারবেন না, বলে দেবেন, তার ভাই মারা গেছে। ও যখন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইত, তখনো আমি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতাম। কিন্তু এক দিন আমি আর সত্য লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। কাঁদতে কাঁদতে ওর ভাইয়ের মরার খবর দিই। ও এক সপ্তাহ ধরে আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি, কিচ্ছু খায়নি। ওরা দুই ভাই অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল।’

বিজ্ঞাপন

সে সময় পরিবারের দায়িত্ব চেতনের বাবার ওপর থাকলেও হানা দেয় আরেক ট্রাজেডি, ‘বাবা ছিলেন ট্রাক ড্রাইভার। তিন-তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁর। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। উনি এখন আর উপার্জন করতে পারেন না। উনি এখনো ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিচ্ছু খান না, কোনো কথা বলেন না।’

এত কষ্টের পর আইপিএলের চুক্তি পেয়ে চেতনের পরিবার এখন নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে, ‘এর এক মাস পরই চেতন আইপিএলের চুক্তি পায়। ১ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন স্বপ্ন দেখছি। আমরা আর্থিকভাবে অনেক কষ্ট করেছি। ছোটবেলায় মামার স্টেশনারি দোকানে কাজ করত চেতন। পাঁচ বছর আগেও আমাদের বাসায় টিভি ছিল না। ক্রিকেটের মাঠে চেতনের উন্নতির খবর ওর বাবা বাইরে থেকে শুনে এসে আমাদের বলত। আমার স্বামীর অসুস্থতার পর থেকে আমাদের পরিবারের ভার চেতন একাই বহন করে। এত কিছুর মধ্যে চেতনের আইপিএল চুক্তিটা আমাদের কাছে অনেকটা ঘায়ে মলম লাগার মতোই মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় আসার জন্য আমার ছেলে অনেক কষ্ট করেছে।’

default-image

সাকারিয়ার এই কাহিনি টুইটারে শেয়ার করে শেবাগ তরুণ তারকাদের ওপর আইপিএলের ইতিবাচক প্রভাবের কথাটাই তুলে ধরেছেন আবার, ‘এসব তরুণ আর তাঁদের পরিবারের জন্য ক্রিকেট যে কী জিনিস, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতীয়দের স্বপ্নপূরণের অন্যতম মাধ্যম এখন এই আইপিএল, কিছু গল্প অনেক অসাধারণ!’

২০১৮-১৯ মৌসুমে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক চেতন সাকারিয়ার। এ পর্যন্ত ১৫টি প্রথম শ্রেণির টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন, সীমিত ওভারের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন সাতটি, আর ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ১৬টি। রঞ্জিজয়ী সৌরাষ্ট্র দলের অন্যতম অংশ তিনি। সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতেও আলো ছড়িয়েছেন, আর সেখানেই নজর কেড়েছেন আইপিএলের স্কাউটদের। মুম্বাই ইন্ডিয়ানসে ট্রায়াল দিয়েও লাভ হয়নি, শেষমেশ ১ কোটি ২০ লাখ রুপিতে জায়গা করে নিয়েছেন রাজস্থানে।

default-image

এককালে ক্রিকেট খেলার জন্য বুট ছিল না সাকারিয়ার। কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে এখন আইপিএল খেলা উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান শেলডন জ্যাকসন সাকারিয়ার অনুশীলনের জন্য বুটজোড়া উপহার দিয়েছিলেন শুরুর দিকে। এরপর থেকেই দুজন অনেক ভালো বন্ধু।

যেভাবে খেলছেন, উন্নতির ধারা বজায় রাখলে সাকারিয়া নিজের বুট নিজে কিনেই কূল পাবেন না একদিন হয়তো!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন